somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পানশালা 001

০৮ ই মার্চ, ২০০৬ সকাল ৯:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[পান প্রসঙ্গে পোস্টটা যদি পড়ে থাকেন, তাহলে পানশালার উদ্দেশ্যও আপনার কাছে পরিষ্কার হবার কথা। পানশালায় পানই মুখ্য। পান করে যে শালারা, তাদের জন্যেই পানশালা খোলা। ধন্যবাদ।]

মদ আমাকে খায় না, আমিই মদকে খাই, এই ভ্রান্তি বুকে পুষে আকৈশোর যাতায়াত করছি আমার প্রিয় শুঁড়িখানা, এই দুষ্ট শহরের বুকের মিষ্টি মধু হোটেল গিলগামেশ বার অ্যান্ড রেস্তোরাঁয়। গিলবার জন্য গিলগামেশের চে ভালো জায়গা হয় না। সস্তায় ভালো মদ, একটু দাম দিয়ে কেনা বাদামের চাট, আর ভালো মাতালদের সঙ্গ পেতে চান, গিলগামেশে ঢুকে পড়ুন।

আমার ঐ তীর্থস্থানে পান্ডামি করেন ফাকরুল ভাই। তিনিও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, পান্ডা প্যালেস নামে একখানা চৈনিক খাবার দোকান চালান তিনি। ফাকরুল ভাই নামের মর্যাদা রাখেননি, আইনকানুনের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অটল, তবে পেটে কিঞ্চিৎ জলবত্তরলম পড়লেই তিনি জেগে ওঠেন, বুকে জমে থাকা সব কথা, সব ব্যথা বিজবিজ করে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। বড়বড় লোকজনের জননীর সাথে সঙ্গমের দৃঢ় প্রত্যয় আর কিছু পবিত্র খিস্তিকে ছেঁকে আলাদা করা গেলে তাঁর গল্পগুলো এমন খারাপ কিছু নয়।

আজ একটু দেরি করে গিয়ে দেখি ফাকরুল ভাইয়ের সামনে বোতলে তরলের শীর্ষ সেই নিকষস্তরে, যে স্তরে আশাবাদী আর নিরাশাবাদীর মধ্যে সব ফারাক দূর হয়ে যায়। আমি আশাবাদী, বলি, "উস্তাদ, বোতল দেহি এখনও অর্ধেক ভরা!"

ফাকরুল ভাই রক্তিম চোখে বোতলটাকে দেখেন। তারপর বলেন, "আহ, কী মাল যে ছিলো!"

বিগত তরলের সাথে বর্তমান তরলের কোন গুণগত পরিবর্তন দেখি না, গুণের পরিবর্তন যদি কিছু ঘটে থাকে তো ফাকরুল ভাইয়ের মধ্যে। আমি বাদামের পর্বতপ্রমাণ চাটে চামচ চালিয়ে বলি, "ঠিক!"

ফাকরুল ভাই হুঙ্কার দ্যান, "ঠিক মানে? কিয়ের ঠিক? আমি কই মালের গল্প আর তুমি কও ঠিক! হাল্লা ভুদাই!"

আমি সায় দেই, "হ, হাল্লা ভুদাই!"

ফাকরুল ভাই আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু আমি সায় দিয়ে যাই। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে তিনি গল্পটা শুরু করেন। গল্প আগায়, বোতলের তরল নামতে থাকে।


1980 সালের কথা। ফাকরুল ভাই তখন সেন্টমার্টিনে জাহাজডুবি হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। পাঁচ ছয় হাজার লোক নিয়ে তাঁর জাহাজ ডুবে গেছে বঙ্গোপসাগরে, একা তিনি মাইল পাঁচেক সাঁতরে সেন্ট মার্টিনের সৈকতে উবুড় হয়ে পড়েছিলেন।

তো, জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি আবিষ্কার করলেন, প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। তিনি আশেপাশে হোটেলের খোঁজ করলেন, পেলেন না, কারণ আমাকে বুঝতে হবে যে সময়টা 1980 সাল, তখনও সেন্ট মার্টিন একটা বুনো দ্্বীপ, পাহাড় পর্বতে ভরা জংলা একটা জায়গা, সেখানে কোন মানুষের বসতি নাই, তিনিই সে দ্্বীপে প্রথম আদম। আমি আমতা আমতা করে বলতে চেয়েছিলাম যে সেন্ট মার্টিন তো একটা প্রবালদ্্বীপ, কিন্তু ফাকরুল ভাই "কী বাল কইলা?" বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দ্যান আমার কথা।
যাই হোক, সেন্ট মার্টিনের সৈকতে ভরা তালতমাল গাছ, একটাও নারিকেল গাছ নাকি তখন ছিলো না, ফাকরুল ভাই তাই নারিকেল পেড়ে তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারেন নাই। তবে অনেক খোঁজাখুঁজি শেষে তিনি একটা কাঁঠালগাছ আবিষ্কার করেন। একটি প্রমাণ সাইজের রসখাজা কাঁধে করে তিনি আবার সৈকতে ফিরে আসেন। কাঁঠালটাকে ছিলে সেটার চামড়া দিয়ে তিনি একটি কৌপীন নির্মাণ করেন, এবং সেটিকে কোমরে এঁটে লজ্জা নিবারণ করেন। আমি জানতে চাই, তিনি ল্যাংটা ছিলেন কেন। ফাকরুল ভাই বলেন, কী আশ্চর্য এই সাধারণ কথাটা আমি কেন বুঝি না, জাহাজডুবি হয়েছে, বিশপঁচিশ মাইল সাঁতরাতে হয়েছে, জামাকাপড় কোথায় গেছে কে জানে। আমি বললাম, লজ্জার কী ছিলো, দ্্বীপে যদি ফাকরুল ভাই একা হন। ফাকরুল ভাই জানতে চাইলেন, ভালো দেখে একটা কাঁঠালের চামড়া পরেছিলেন দেখে আমার কেন পশ্চাদ্দেশ জ্বলে।

তো, কাঁঠালের চামড়া দিয়ে লজ্জানিবারণের পর (ভাগ্যিস) কাঁঠালটা ভেঙে তিনি খাওয়া শুরু করলেন, এক কোষ দুই কোষ করে, আহা কী মিষ্টি, সেন্ট মার্টিনে এখন কাঁঠাল লুপ্ত হয়ে গেছে, নাহলে তিনি রোজ ওখান থেকে আনিয়ে খেতেন ... এমন সময়, হ্যাঁ, এমন সময় তাঁর সামনে এসে হাজির হলো এক অপরূপা সুন্দরী। একেবারে ডানাকাটা পরী।

ফাকরুল ভাই হাঁ করে সেই ললনাকে তাকিয়ে দ্যাখেন। কী সুন্দর চেহারা, কী শরীরের গড়ন! একেবারে দিল মে চাক্কু।

সুন্দরী তাঁকে দেখে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে, তারপর বলে, "হ্যাল্লো।"

ফাকরুল ভাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন।

সুন্দরী হাত বাড়ায় কাঁঠালের দিকে। "খান। দিয়া খান।"

ফাকরুল ভাই কাঁঠালটাকে আড়াল করেন। "না, দিমু না। আমার বহুত ভুখ লাগছে। এই বালের দ্্বীপে কোন নাইকল নাই, দিন লাগায় খুইজ্যা এই কাডাল পাইছি, দশ মাইল হাঁটন লাগছে, এখন আপনি ক্যাঠা না ক্যাঠা আয়া কইবার লাগছেন দিয়া খাইতে। দিমু না। খাইতে মন চাইলে গিয়া পাইড়া খান।"

সুন্দরী হাঁ করে তবু তাকিয়ে থাকে কাঁঠালের দিকে, ফাকরুল ভাই বিরক্ত হয়ে উলটা দিকে ঘুরে আবার এক কোষ দুই কোষ করে কাঁঠাল ভেঙে খেতে থাকেন। সুন্দরী হাঁ করে দ্যাখে তার কাঁঠাল খাওয়া।

এমন সময় কোত্থেকে হাফপ্যান্ট পরা টুপি মাথায় এক লোক এসে হাজির হয়, এসে বলে, "এ কি দিয়া? এই জংলিটা কে? কাঁঠালের ছাল পড়ে বসে কাঁঠাল খাচ্ছে?"

সুন্দরী বলেন, "হ্যাঁ, লোকটা অদ্ভূতই। কিন্তু বিষ্টা, এই দ্্বীপে তো জানতাম কোন লোকজন নেই, এ কোত্থেকে এলো?"

বিষ্টা বলেন, "দাঁড়াও দেখি জিজ্ঞেস করে।"

ফাকরুল ভাইয়ের ততক্ষণে কাঁঠাল খাওয়া শেষ, বিষ্টা বুক ফুলিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে বলে। "দে। বিষ্টা দে।"

ফাকরুল ভাই আকাশ থেকে পড়েন, এক সুন্দরী তাঁর কষ্টার্জিত কাঁঠালে ভাগ বসাতে এসেছিলো, আর তার চামুন্ডারা এসে বিষ্ঠা দাবী করছে, কাঁঠাল ঠিকমতো হজম হবার আগেই! তিনি প্রবল হাল্লাচিল্লা শুরু করে দ্যান। অনেক বাক বিতন্ডা শেষে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি কথা বলছেন প্রবাদপ্রতিম সিনেমা পরিচালক বিষ্ণুচরণ দে ওরফে বিষ্টা দে-এর সাথে, আর ঐ সুন্দরী হচ্ছেন নায়িকা দিয়া খান। সিনেমার শু্যটিং চলছে সেন্ট মার্টিনে, সিনেমার নাম, নিরালায় অভিসার।

তো, সে যাত্রা উদ্ধার পেয়ে যান তিনি, সিনেমার দলের সাথেই অক্ষত দেহে আবার সভ্য দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারেন। তবে সিনেমার লোকজন যে এতো অসভ্য, এতো বেলেল্লা হয় তিনি নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতেন না।

তারপর বিড়বিড় করে বলেন, "কী যে মাল আছিলো একখান!"

আমিও গোলাপী হাতি দেখার প্রস্তুতি নেই, বলি, "ক্যাঠা? ঐ দিয়া খান? হেই মাতারি?"

ফাকরুল ভাই বলেন, "আরে দূরো। আমি কই কাডলের কথা! কী ফাউল প্যাচাল পারো হালায়?"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেট প্রেমানন্দ মহারাজ

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮



'প্রেমানন্দ' একজন ভারতীয় হিন্দু তপস্বী ও গুরু।
১৯৭১ সালে কানপুরের কাছে 'আখরি' গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। ১৩ বছর বয়সে প্রেমানন্দ সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য গৃহ ত্যাগ করেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ বিকাল ৫:১০



আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×