somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা ..

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা ..

-"হ্যালো! নিখিলেশ চিনতে পারছিস? আমি মঈদুল, ঢাকার মঈদুল।"
ফোনটা কানে তুলেই বাকরুদ্ধ নিখিলেশ! বহু বছর হয়ে গেছে নিখিলেশের কলকাতা ছেড়ে আসা। তারপর থেকে অনেক খুঁজেছে সে পুরনো বন্ধুদের কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
বাবা মা, স্ত্রী সবাইকে নিয়ে এখন স্থায়ীভাবে সে প্যারিসেই রয়েছে।
হঠাৎ এরকম ফোন পেয়ে একটু হতভম্ভ সে, কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ভাঙা গলায় নিখিলেশ বললো.."মঈদুল... আমাদের মঈদুল, ভাই কেমন আছিস ? অনেক খুঁজেছি রে তোদের কিন্তু কারোর কোন খবর পাই নি , কোথাই পেলি আমার নম্বর?"
-কেমন আছি ? হয়তো ভালোই... কিন্তু কি জানিস্ খুব বাজে ভাবে মিস করি তোদের,কফি হাউসের প্রত্যেক দিনের আড্ডাটা মিস করি। তোর অনেক খোঁজ করার পর কাল প্যারিসের বিখ্যাত আর্ট কলেজের ওয়েবসাইটে তোর নাম দেখলাম, বুঝতে দেরি হয়নি এটা আমাদের নিখিলেশ সান্যাল, সবার প্রিয় নিখিল। তোর এখন অনেক নাম হয়েছে বল...
-সত্যি বলতে ভগবানের দয়ায় এখন আমার সব আছে, শুধু যা নেই তা হল তোদের মতো বন্ধু,আড্ডা আর সময়। প্রত্যেকটা দিন তোদের কথা মনে পড়ে। রমা, অমল, সুজাতা ওরা সবাই কেমন আছে রে?
- *সুজাতার সাথে যোগাযোগ ছিল, কিন্তু এখন হয়তো নম্বর বদলেছে... ফোন করে পাই না, আর তেমন কারোর সাথে যোগাযোগ নেই। তবে জানিস্ ভাই আমাদের ডিসুজা আর এ পৃথিবীতে নেই।
-এটা আমি শুনেছি ,তাই ওর কথা আর জিজ্ঞেস করলাম না। একমাত্র ডিসুজার বাড়ির নম্বরটা আমি পেয়েছিলাম, ফোন করার পর জানলাম সে সবাইকে ছেড়ে চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছে,আর আমরা তো সবাই বেঁচে থেকেও বিচ্ছিন্ন। বছর পাঁচেক আগে বাবা মাকে নিয়ে ৩ দিনের জন্য কলকাতা এসেছিলাম, বিশ্বাস কর মইদুল চেনা শহরটা খুব অচেনা লেগেছিল আমার, অথচ আমার কত স্মৃতি জড়িয়ে এই শহরে!
সে যাই হোক তুই এখন ঢাকা তে আছিস্ ?
-হ্যাঁ, এখন ঢাকাতে আছি। তবে চ্যানেলের কাজের সূত্রে বছরের বেশির ভাগ সময়টা আমাকে কলকাতাতেই থাকতে হয়। একটু সময় পেলেই আমাদের কফি হাউসে গিয়ে বসি। জানিস্ নিখিল, আমার সবসময় মনে হয় কফি হাউসের পেয়ালা, টেবিল গুলো আজও আমাদেরকে খোঁজে। আগের মতো সময় করে কেউ রোজ আড্ডা দিতে আসে না এখানে ,সবাই সময় বের করে তবেই আড্ডা দিতে আসে।
-ভাই আমাদের কফি হাউসটা আগের মতোই জমজমাট আছে তো? আমাদের সেই ওয়েটার সিরাজ চাচা , সব কাজ ফেলে কেমন আমাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো সে এখনও আছে কফি হাউসে ?
-না সিরাজ চাচাকে দেখি না আর.. এসেছে অনেক নতুন মুখ।
-আজও কি যামিনী রায় , বিষ্ণু দে-কে নিয়ে তর্কের ঝড় ওঠে সেখানে ?
-না রে ভাই। সেসব এখন অতীত ; তর্কে উঠে আসে শুধুই নোংরা রাজনীতি, কেউ কেউ আবার দেখি সময়টা উপভোগ করার চেয়ে ক্যামেরা বন্দি করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে, তুলেই চলে সেল্ফি-গ্রুপফি।
-এখন আর অমলের মতো কবিতা পড়ে শোনায় কেউ ?
-হাসালি ভাই। এখন সবার অতো সময় কোথায় যে কি কবিতা লিখেছে পড়ে শোনাবে ? কোন টেবিলে দেখি কেউ ঘষেই চলে ঠোঁটে লিপস্টিক তো কেউ আবার হাতে নিয়ে বসে সেল্ফিস্টিক।
-ভাই কফি হাউসের প্রেম এখনও বেঁচে আছে ?
-হ্যাঁ প্রেমটা তখনও ছিল আজও আছে। আমাদের গ্রুপে যেমন সপ্তাহে রমা রায় কতগুলো প্রেমপত্র পেতো তার হিসেব তো সুজাতা রেখেছে।
তবে এখন আর প্রেম পত্র পড়তে দেখি না কাউকে, প্রেম গুলোও সব ওয়্যাটস্ আপ, ম্যাসেঞ্জারে বন্দি।
আমাদের সময় যেমন প্রেমিক প্রেমিকারা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কফি হাউসেই কাটিয়ে দিত সে প্রেম আর নেই।
একটা দীর্ঘস্বাস ফেলে নিখিলেশ জিজ্ঞেস করলো
-ডিসুজার মতো আর গানও ধরে না বল কেউ ?
-না ভাই নির্বাক শ্রোতা হয়েও একবার বলাতেই ডিসুজার মতো গান ধরতে দেখিনা কাউকে।
তবে আমার সবসময় মনে হয় জানিস ডিসুজার গান গুলো আজও কফি হাউসের মধ্যেই বাজে... কফি হাউসের মধ্যে ওকে খুঁজে পাই আমি।
কফি-হাউসের রংবদলের টুকরো টুকরো কাহিনী শুনে চোখের এক কোণ চিকচিক করে উঠলো নিখিলেশের..
-তবে আর আগের মতো নেই আমাদের কফি হাউসটা ? ভাঙা গলায় কিছুটা ধীরে ধীরে বললো কথা গুলো নিখিলেশ।
-ভাই কফি হাউসটা আছে শুধু আড্ডাটা নেই আগের মতো। প্রেম ভালোবাসাটাও আছে, শুধু সময়টা নেই কারোর আগের মতো। বলছি, একবার আয় না পারলে ছুটি নিয়ে কলকাতায় , অনেক কথা জমে আছে সব কথা ফোনে শেষ হবে না।
-আসবো ভাই শীঘ্রই আসবো, আসার আগে তোকে জানাবো... শুধু যোগাযোগটা রাখিস্।
... হঠাৎ নিখিলেশ এর কানের কাছে একটা চেনা গলা "কি গো ঘুম থেকে উঠবে না আজ ? কি বিড়বিড় করছো ঘুমের মধ্যে..."
গলাটা নিখিলেশের স্ত্রী শ্রাবণীর , মঈদুলের বন্ধু নিখিলের আর বুঝতে দেরি হল না মঈদুলের ফোনটা তার স্বপ্নেই এসেছিল...
একটু বিরক্তের সাথে নিখিলেশ বলে উঠলো স্ত্রীকে
-"আজ আমাকে ঘুমোতেই দাও ,আজ না হয় ঘুমের জগতেই স্মৃতিচারণ করি, ফিরিয়ে আনি সেই ফেলে আসা অতীতের একটু পরশছোঁয়া"...
* সুজাতাও ঢাকার মেয়ে। আওয়ামী লীগের নেতা ওয়ালিউর রহমানকে ভালোবেসে ১৯৭২ সনে বিয়ে করেন।
* ২০১৪ সনে মাঈদুল মারা গেছেন। কল্পনাসৃষ্ট লেখাটা লিখেছিলাম ফেসবুকে, যা হারিয়ে গিয়েছে সেই আইডি সমেত। স্মৃতিভর করে আবারও লিখলাম....

("নিখিলেশ প্যারিসে, মঈদুল ঢাকাতে/ নেই তারা আজ কোনও খবরে..."- প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মান্না দে'র বিখ্যাত 'কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আর নেই' গানের মঈদুল মারা গেছেন। তার আসল নাম নূর আহমদ। ২০১৪ সনে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ৭৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মঈদুলকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ১ ছেলে ও ১ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। মঈদুল ১৯৩৬ সালের ১৩ জানুয়ারি কলকাতার উত্তর চব্বিশ পরগণায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। ১৫ বছর বয়সে মান্না দে'র সঙ্গে পরিচয় হয়। মান্না দে'র গানের আসরে নিয়মিত যোগ দিতেন। কলকাতার ক্রীড়াঙ্গনে খেলোয়াড় হিসেবে সফল মঈদুল ঢাকায় এসে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং ইকবাল স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ব্যাডমিন্টন ও ফুটবল খেলেন। ১৯৬৪ সালেই তিনি পাকিস্তান রেডিওতে ক্রীড়া ধারা ভাষ্যকার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ১৯৬৬ সাল থেকে দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, ইনকিলাব, সংবাদ, বাংলার বাণী ও দৈনিক পূর্বদেশে খেলাধুলা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও পাক্ষিকেও লেখালেখি করে গেছেন তিনি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির আজীবন সম্মাননা পান তিনি)।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:২৭
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সমগ্রঃ পর্ব ২

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



আকবর শেঠ।



'বৈঠকি খুনের জনক' আকবর শেঠ এর জন্ম ১৯৫০ এর দশকে। আকবরের প্রথমদিককার জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। আকবর শেঠ প্রথম লাইমলাইটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিব হল → ওসমান হাদি হল: নতুন বাংলাদেশের শুরু ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে ডাকসু নেতারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি‼️রবিন্দ্র নাথ সঠিক ছিলেন বঙ্গবন্ধু ভুল ছিলেন। বাঙালি আজও অমানুষ!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:১৩


১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের জনগন সহ সমগ্র বিশ্বের প্রতি যে নির্দেশনা। তা এই ভাষণে প্রতিটি ছত্রে ছত্রে রচিত করেছিলেন। ৭ই মার্চের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ভাষণের নির্দেশনাগুলো! কি অবলীলায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মের শুভেচ্ছা হে রিদ্ধী প্রিয়া

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:০১



জন্মের শুভেচ্ছা নিও হাজার ফুলের
শৌরভে হে রিদ্ধী প্রিয়া, তোমার সময়
কাটুক আনন্দে চির।স্মৃতির সঞ্চয়
তোমার নিখাঁদ থাক সারাটা জীবন।
শোভাতে বিমুগ্ধ আমি তোমার চুলের
যখন ওগুলো দোলে চিত্তাকর্ষ হয়
তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

=হাঁটি, আমি হাঁটি রোজ সকালে-মনের আনন্দে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

রোজ সকালে খুব হাঁটার অভ্যাস আমার, সকালটা আমার জন্য আল্লাহর দেয়া অনন্য নিয়ামত। হাঁটা এমন অভ্যাস হয়েছে যে, না হাঁটলে মনে হয় -কী যেন করি নাই, কী যেন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×