আত্মহত্যা (Suicide).....
ফরাসী মনোবিজ্ঞানী ও চিত্রশিল্পী এমিল দ্যুর্কেম এর লেখা "ল্য সুইসিদ’ (Le Suicide) গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ 'Suicide' পড়লাম। তিনি তার বইয়ে আত্মহত্যা বিষয় নিয়ে মানুষের মনের চমৎকার কিছু মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেছেন।
আত্মহত্যা হল ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজেকে হত্যা করার প্রক্রিয়া যার ফলাফল সম্পর্কে আত্ম-হত্যাকারী পূর্ব থেকেই সচেতন থাকে। মনোবিজ্ঞানী বিজ্ঞানী এমিল দ্যুর্কেম এর মতে- আত্মহত্যা মৃত্যু ঘটায় যেটা ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক কাজ থেকে উদ্ভূত হয় এবং আত্মহত্যাকারী তার এই কাজের ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকেই জ্ঞাত থাকে। এমিল দ্যুর্কেম এর মতে- সাধারণত চার রকম আত্মহত্যার প্রবনতা আছে যথাঃ ইগোসটিক আত্নহত্যা, অলট্রুসটিক আত্নহত্যা, এনোমিক আত্নহত্যা এবং ফেটালিস্টিক আত্নহত্যা।
ইগোসটিক আত্নহত্যাঃ
এই ধরনের আত্মহত্যা তাদের মধ্যেই বেশি দেখা যায় যাদের সাথে কমিউনিটি কিংবা পরিবারের সম্পর্ক খুবই দুর্বল। জীবনের অর্থহীনতা আত্মহত্যাকে প্রভাবিত করে। এই ধরনের আত্নহত্যাকারিদের সাথে সমাজের একাত্মতা খুবই কম থাকে এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যটা প্রবল পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, প্রথা এবং লক্ষ্যের সাথে সম্পর্ক শিথিল থাকে। সামাজিক সহযোগিতা এবং নির্দেশনার নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল থাকে। অবিবাহিত পুরুষদের মধ্যে এই ধরনের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
অলট্রুসটিক আত্নহত্যাঃ
যারা দল বা কমিউনিটির লক্ষ্য এবং বিশ্বাস দ্বারা বেশি প্রভাবিত তাদের মধ্যেই এই আত্মহত্যা বেশি লক্ষণীয়। সমাজের সাথে এদের সম্পর্ক এতই নিবিড় থাকে যে- সামগ্রিক প্রয়োজন , ব্যক্তি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। এখানে ব্যক্তি সমাজের বা সামগ্রিক প্রয়োজনে আত্মহত্যা করে।
এনোমিক আত্নহত্যাঃ
অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে এনোমিক আত্মহত্যা বেশি দেখা যায়। নৈতিকতার মধ্যকার সংশয় এবং সামাজিক দিক নির্দেশনার অভাব মানুষকে এই ধরনের আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। সমাজের কোন জায়গায় তারা যোগ্য এবং তাদের চাহিদার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অজ্ঞতা আত্মহত্যাকে প্রভাবিত করে।
ফেটালিস্টিক আত্নহত্যাঃ
যে সমাজে ব্যক্তি মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ বেশী, যাদের ভবিষ্যৎ বদ্ধ এবং যাদের আবেগ অনেক বেশী শৃঙ্খলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তারা এই ধরনের আত্মহত্যা করে।
প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। কিশোর-কিশোরী আর যাদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। পুরুষদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা নারীদের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ।
চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে এনোমিক আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তরুণ এবং তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা যেহেতু সবচেয়ে বেশি, সেহেতু অনাকাঙ্ক্ষিত আত্মহত্যা প্রতিরোধ করার জন্য এদের আবেগ, অনুভূতির প্রতি আমাদের অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে হবে।
জগৎ সংসারে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া জীবন মানেই দুঃখ কষ্ট হতাশা। জীবন মানেই কি শুধু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা? কিম্বা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে গলদ করণ করা??
পৃথিবীতে যদি পাঠালেই তুমি, অস্তিত্ব বজায় রাখা, কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সক্ষমতা যদি না-ই দিলে, জয়ী হওয়ার অমন ক্ষিধে কেন দিলে সর্বশক্তিমান?
মানুষের সারিতে নিজেকে দেখবার যোগ্যতা বা সাহস যদি না-ই দিলে অমন বোকার মতন ইচ্ছেটা কেন দিলে!
এইরকম ইচ্ছের জন্য-ই তো গদবাঁধা পথে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে রক্তাক্ত হতে হয়.......!!!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



