প্রথম সার্কাস দর্শন.....[
শীতকালে বিশেষ কিছু ব্যাপার স্পেশাল।
যার মধ্যে অন্যতম খেঁজুর রস,
মাটির হাড়িতে খেঁজুরের রস।
নরম উলের উষ্ণতা।
লেপের আরাম।
পিঠে পায়েস।
আরো কত কি!
দুপুরে খাওয়ার পর রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে রোদ পোহানো। এইসব আরামদায়ক মূহুর্ত একমাত্র শীতকালেই পাওয়া যায়। আরও আছে সদলবলে বনভোজন বা চরুইভাতি। বেগুন ভাজা.... শাকসবজি তো অফুরান- তার বর্ণনা আর দিলাম না।
এসব ছাড়াও যা বলতে চাই তা হ'ল সার্কাস। আমার শৈশব ও ছেলেবেলায় দেখা সার্কাস।
তখন বয়স কত হবে! নয়-দশ! একটি রিকশায় মাইক বাঁধা। কান ফাটানো শব্দে ভেসে আসছে-
‘আসুন! আসুন! আসুন! আর মাত্র সাত দিন!
সার্কাস! সার্কাস! সার্কাস!’ লিফলেট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে হাতে হাতে। ছোট চাচার হাত ধরে সেই সার্কাস দেখেছিলাম এক শীতের রাতে। শরীরে গরম জামাকাপড় ছিল। তার পরেও চাচাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম বারে বারে।
কেন জড়িয়ে ধরেছিলাম? ভয়ে আর আনন্দে। কেমন সেই ভয়? সিংহের গর্জনের ভয়! হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যাওয়া বাঘের চাহনিতে। হাতি দেখে অন্য রকম আনন্দ হয়েছিল। আর আনন্দ? টিয়া-কাকাতুয়ার ডাকে আনন্দে মেতে উঠেছিলাম! কী সুন্দর নাম ধরে ধরে ডাকছিল- ‘হিমু'! 'হিমু’!
ওই প্রথম শুনেছিলাম পাখির কথা। এখনো কানে ভেসে আসছে সেই মাইকের শব্দ— ‘সার্কাস! সার্কাস! সার্কাস!’
মনে পড়ে তখন "লক্ষ্মণ দাস সার্কাস"(স্বাধীনতার পর নাম বদলে হয় "দি লায়ন সার্কাস") পার্টি। সার্কাস শুরুর দশ পনের দিন আগে থেকেই সার্কাস মঞ্চ আর তাবু টাঙানো চলে। পশুপাখি জন্তু জানোয়ার এনে সে এক ধুন্ধুমার কান্ড! আমি ছিলাম ছোট চাচার ভক্ত। চাচাও আমি অন্ত প্রাণ। আমি যেকোনো আবদার করলেই ছোট চাচা সে দাবী পূরণ করবেনই। আমার ক্ষুদ্র জীবনে চাক্ষুস করা প্রথম লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট "দি লক্ষ্মণ দাস সার্কাস" ছোট চাচার হাত ধরেই দেখেছিলাম। কাছ থেকে হাতি, ভাল্লুক, টাট্টু ঘোড়া, বানর দেখার অভিজ্ঞতা সেই প্রথম। জ্যান্ত কাকাতুয়া সেই প্রথম দেখেছিলাম সামনে দাঁড়িয়ে। একদল রাজহাঁস ছিল যারা কম্পাউন্ডের ভেতর ঘুরে বেড়াতো আর কাছাকাছি গেলেই তেড়ে আসতো।
লক্ষ্মণ দাস সার্কাস এর মালিক লক্ষ্মণ বাবু বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার বাসিন্দা- অত্যন্ত বনেদী পরিবারের দানশীল এবং সৌখিন ব্যক্তি ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক মিলিটারীর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে। তখন তার পোষা হাতীটি মিলিটারীদের দিকে তেড়েমেরে যায়...পাক হানাদার বাহিনী ব্রাশফায়ারে হাতী, সিংহ এবং বাঘগুলোকেও মেরে ফেলে।
ছোট চাচার ভেসপায় চড়ে আরও দুইদিন সকাল বিকাল সার্কাসের প্রস্তুতি দেখতে গিয়েছিলাম। রিয়ের্সালের সময় ভেতরে ঢোকার ব্যাপারে তেমন কড়া বিধিনিষেধ ছিল না, যা আরোপিত হয়েছিল কঠোরভাবে সার্কাস চালু হওয়ার পর। বাঘ ও সিংহ চিতাবাঘের খাঁচাগুলির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বোঁটকা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা খেত। পেটের ভিতরটা গুলিয়ে উঠতো। তবু আমরা ছোটরা দিনের বেলা হাজির হ'তাম কাঠের তৈরী খাঁচাগুলির আসেপাশে। কাঠের তক্তার ফাঁক দিয়ে যদি একটু চোখে পড়ে ডোরাকাটা বাঘ- সেই চেষ্টা চলতো। মাঝে মাঝে হুংকার ছাড়তো সেই বাক্সবন্দী শ্বাপদকূল। লোহার খুঁটীর সঙ্গে বাঁধা হাতিগুলি নিরন্তর একবার সামনে-পিছনে দুলতে থাকতো সর্বক্ষণ। উটদুটো সারাক্ষণ জাবড় কাটতো আর মুখ থেকে নোংরা বের হতো। উটের মুখ অত্যন্ত কদাকার। সার্কাস চালু হলে যেদিন দেখতে গেলাম সেদিন প্রথম জোকারদের কান্ড কারখানা খুব মনে ধরেছিল। পরে সকালে চায়ের দোকানে ওই বেঁটে মানুষগুলোকে চা খেতে দেখে খুব অবাক চোখে চেয়ে থাকতাম। সার্কাসের খেলাগুলির মধ্যে ট্রাপিজের খেলা গ্লোবের মধ্যে মোটর সাইকেল ও গাড়ি চালানো। দড়ির উপর দুটি মেয়ের সাইকেল চালানো ছিলো শ্বাসরুদ্ধকর! খাঁচার ভেতর বাঘ সিংহের চলাচল ও কাকাতুয়ার সাইকেল চালানো বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে উপভোগ করেছিলাম। জীবনের সেই প্রথম সার্কাস দর্শন আমাকে বুঁদ করে রেখেছিল বহুদিন পর্যন্ত। এখনো চোখ বুজলে সাইকেল কসরৎ চোখে ভাসে। তারপর আরো অনেক দেশী বিদেশি সার্কাস দেখেছি জীবনে। যেমন ইন্ডিয়াতে ভারত এম্পায়ার, অলিম্পিক রাশিয়ান, চায়নাতে দেখেছি চায়না এক্রোবেটিক গ্রুপ ছাড়াও আরো কত কী! কিন্তু জীবনের প্রথম দেখা "দি লক্ষণ দাস সার্কাস" এবং "দি রয়্যাল বেংগল সার্কাস" এদের মধ্যে আমার দেখা সবচেয়ে সেরা ও অতুলনীয় অন্তত আমার চোখে।
এক সময়ে দেশে রীতিমতো জনপ্রিয় ছিল শীতকালীন বিনোদনের এই মাধ্যম। ছিল বলার কারণ একটাই- বর্তমানে সার্কাস দলও নাই, সাধারণ মানুষের দেখার চাহিদাও নাই। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের সূত্রে হালফিলে সার্কাসে বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ বা হাতির মতো চতুষ্পদদের দেখা মেলে না। কাকাতুয়ার সাইকেল চালানো, কুকুরের আগুনের রিংয়ের মধ্যে দিয়ে ঝাঁপ দেওয়া- এসব খেলার পাটও তুলে দিতে হয়েছে। সার্কাস এখন তাই এসে ঠেকেছে শুধুই মানুষের কৃৎকৌশলে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



