somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম সার্কাস দর্শন.....

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম সার্কাস দর্শন.....[

শীতকালে বিশেষ কিছু ব্যাপার স্পেশাল।
যার মধ্যে অন্যতম খেঁজুর রস,
মাটির হাড়িতে খেঁজুরের রস।
নরম উলের উষ্ণতা।
লেপের আরাম।
পিঠে পায়েস।
আরো কত কি!
দুপুরে খাওয়ার পর রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে রোদ পোহানো। এইসব আরামদায়ক মূহুর্ত একমাত্র শীতকালেই পাওয়া যায়। আরও আছে সদলবলে বনভোজন বা চরুইভাতি। বেগুন ভাজা.... শাকসবজি তো অফুরান- তার বর্ণনা আর দিলাম না।
এসব ছাড়াও যা বলতে চাই তা হ'ল সার্কাস। আমার শৈশব ও ছেলেবেলায় দেখা সার্কাস।
তখন বয়স কত হবে! নয়-দশ! একটি রিকশায় মাইক বাঁধা। কান ফাটানো শব্দে ভেসে আসছে-
‘আসুন! আসুন! আসুন! আর মাত্র সাত দিন!
সার্কাস! সার্কাস! সার্কাস!’ লিফলেট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে হাতে হাতে। ছোট চাচার হাত ধরে সেই সার্কাস দেখেছিলাম এক শীতের রাতে। শরীরে গরম জামাকাপড় ছিল। তার পরেও চাচাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম বারে বারে।
কেন জড়িয়ে ধরেছিলাম? ভয়ে আর আনন্দে। কেমন সেই ভয়? সিংহের গর্জনের ভয়! হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যাওয়া বাঘের চাহনিতে। হাতি দেখে অন্য রকম আনন্দ হয়েছিল। আর আনন্দ? টিয়া-কাকাতুয়ার ডাকে আনন্দে মেতে উঠেছিলাম! কী সুন্দর নাম ধরে ধরে ডাকছিল- ‘হিমু'! 'হিমু’!

ওই প্রথম শুনেছিলাম পাখির কথা। এখনো কানে ভেসে আসছে সেই মাইকের শব্দ— ‘সার্কাস! সার্কাস! সার্কাস!’
মনে পড়ে তখন "লক্ষ্মণ দাস সার্কাস"(স্বাধীনতার পর নাম বদলে হয় "দি লায়ন সার্কাস") পার্টি। সার্কাস শুরুর দশ পনের দিন আগে থেকেই সার্কাস মঞ্চ আর তাবু টাঙানো চলে। পশুপাখি জন্তু জানোয়ার এনে সে এক ধুন্ধুমার কান্ড! আমি ছিলাম ছোট চাচার ভক্ত। চাচাও আমি অন্ত প্রাণ। আমি যেকোনো আবদার করলেই ছোট চাচা সে দাবী পূরণ করবেনই। আমার ক্ষুদ্র জীবনে চাক্ষুস করা প্রথম লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট "দি লক্ষ্মণ দাস সার্কাস" ছোট চাচার হাত ধরেই দেখেছিলাম। কাছ থেকে হাতি, ভাল্লুক, টাট্টু ঘোড়া, বানর দেখার অভিজ্ঞতা সেই প্রথম। জ্যান্ত কাকাতুয়া সেই প্রথম দেখেছিলাম সামনে দাঁড়িয়ে। একদল রাজহাঁস ছিল যারা কম্পাউন্ডের ভেতর ঘুরে বেড়াতো আর কাছাকাছি গেলেই তেড়ে আসতো।

লক্ষ্মণ দাস সার্কাস এর মালিক লক্ষ্মণ বাবু বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার বাসিন্দা- অত্যন্ত বনেদী পরিবারের দানশীল এবং সৌখিন ব্যক্তি ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক মিলিটারীর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে। তখন তার পোষা হাতীটি মিলিটারীদের দিকে তেড়েমেরে যায়...পাক হানাদার বাহিনী ব্রাশফায়ারে হাতী, সিংহ এবং বাঘগুলোকেও মেরে ফেলে।

ছোট চাচার ভেসপায় চড়ে আরও দুইদিন সকাল বিকাল সার্কাসের প্রস্তুতি দেখতে গিয়েছিলাম। রিয়ের্সালের সময় ভেতরে ঢোকার ব্যাপারে তেমন কড়া বিধিনিষেধ ছিল না, যা আরোপিত হয়েছিল কঠোরভাবে সার্কাস চালু হওয়ার পর। বাঘ ও সিংহ চিতাবাঘের খাঁচাগুলির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বোঁটকা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা খেত। পেটের ভিতরটা গুলিয়ে উঠতো। তবু আমরা ছোটরা দিনের বেলা হাজির হ'তাম কাঠের তৈরী খাঁচাগুলির আসেপাশে। কাঠের তক্তার ফাঁক দিয়ে যদি একটু চোখে পড়ে ডোরাকাটা বাঘ- সেই চেষ্টা চলতো। মাঝে মাঝে হুংকার ছাড়তো সেই বাক্সবন্দী শ্বাপদকূল। লোহার খুঁটীর সঙ্গে বাঁধা হাতিগুলি নিরন্তর একবার সামনে-পিছনে দুলতে থাকতো সর্বক্ষণ। উটদুটো সারাক্ষণ জাবড় কাটতো আর মুখ থেকে নোংরা বের হতো। উটের মুখ অত্যন্ত কদাকার। সার্কাস চালু হলে যেদিন দেখতে গেলাম সেদিন প্রথম জোকারদের কান্ড কারখানা খুব মনে ধরেছিল। পরে সকালে চায়ের দোকানে ওই বেঁটে মানুষগুলোকে চা খেতে দেখে খুব অবাক চোখে চেয়ে থাকতাম। সার্কাসের খেলাগুলির মধ্যে ট্রাপিজের খেলা গ্লোবের মধ্যে মোটর সাইকেল ও গাড়ি চালানো। দড়ির উপর দুটি মেয়ের সাইকেল চালানো ছিলো শ্বাসরুদ্ধকর! খাঁচার ভেতর বাঘ সিংহের চলাচল ও কাকাতুয়ার সাইকেল চালানো বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে উপভোগ করেছিলাম। জীবনের সেই প্রথম সার্কাস দর্শন আমাকে বুঁদ করে রেখেছিল বহুদিন পর্যন্ত। এখনো চোখ বুজলে সাইকেল কসরৎ চোখে ভাসে। তারপর আরো অনেক দেশী বিদেশি সার্কাস দেখেছি জীবনে। যেমন ইন্ডিয়াতে ভারত এম্পায়ার, অলিম্পিক রাশিয়ান, চায়নাতে দেখেছি চায়না এক্রোবেটিক গ্রুপ ছাড়াও আরো কত কী! কিন্তু জীবনের প্রথম দেখা "দি লক্ষণ দাস সার্কাস" এবং "দি রয়্যাল বেংগল সার্কাস" এদের মধ্যে আমার দেখা সবচেয়ে সেরা ও অতুলনীয় অন্তত আমার চোখে।

এক সময়ে দেশে রীতিমতো জনপ্রিয় ছিল শীতকালীন বিনোদনের এই মাধ্যম। ছিল বলার কারণ একটাই- বর্তমানে সার্কাস দলও নাই, সাধারণ মানুষের দেখার চাহিদাও নাই। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের সূত্রে হালফিলে সার্কাসে বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ বা হাতির মতো চতুষ্পদদের দেখা মেলে না। কাকাতুয়ার সাইকেল চালানো, কুকুরের আগুনের রিংয়ের মধ্যে দিয়ে ঝাঁপ দেওয়া- এসব খেলার পাটও তুলে দিতে হয়েছে। সার্কাস এখন তাই এসে ঠেকেছে শুধুই মানুষের কৃৎকৌশলে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:৫৪
১৬টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:৪২


ছবিঃ আমার তোলা।

মন মেজাজ ভালো নেই।
তাই ব্লগে কম আসি। কম লিখি। যদিও বেশ কিছু লেখা মাথায় জমে আছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্লগে আসলে ঝামেলা হয়ে যাবে। দেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতাস বুঝে ছুইটেন !

লিখেছেন স্প্যানকড, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১:৪১

ছবি নেট।

হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেনঃ "মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তবে বাঙালির ওপর বিশ্বাস রাখা বিপদজনক! " 

আসলেই তাই! খবরে দেখলাম ইকবাল নামের একজন ব্যক্তি পবিত্র কুরআন মুর্তির কাছে রেখে চলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ভবঘুরে ইকবাল হোসেন জন্য সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৩৫



গত বুধবার ভোরে শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির উত্তর পাড়ে দর্পণ সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন দেখা যায়। ব্যস আর যায় কোথায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি ও আমার পৃথিবী......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৫১

আমি ও আমার পৃথিবী......

আজও খুব ভোরে উঠেছি প্রতিদিনের মতো। আকাশে তখনও আলগোছে লেগে রয়েছে রাত্রির মিহি প্রলেপ। আমার চেনা পাখিরা জেগে ওঠেনি তখনও। মনটা কেমন যেন একটু বিস্বাদে ভরে আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেডাগোজিকাল ট্রানজিশন- শিশু শিক্ষনে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কি ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়

লিখেছেন শায়মা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৩:৪৪


করোনাকালীন চার দেওয়ালে বন্দী জীবন ও অনলাইনের ক্লাসরুমের মাঝে গত বছর নভেম্বরে BEN Virtual Discussion "শিশুদের নিয়ে সব কথা" একটি টক শো প্রোগ্রাম থেকে ইনভিটেশন এলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×