এক চুমুকে বুশমিলের পুরোটুকু শেষ করে দৌড়াতে দৌড়াতে প্লেনে উঠতে গিয়ে দেখি ফ্লাইট অনাকাংখিত কারনে বিলম্ব। মেজাজ চরম বিগড়ে গেলো। মনে মনে অল্প কয়েকটা শ্লীল এবং অনেক গুলো অশ্লীল গালি দিলাম এয়ারলাইন্সকে। যাইহোক একটু পরে প্লেনে উঠে জানালার পাশে বসে গেলাম। প্লেনে উঠলেই আমার কেমন জানি একা লাগতে থাকে। ইচ্ছা হচ্ছিল প্লেনটাকে আয়ারল্যান্ড থেকে লন্ডনের দিকে না নিয়ে ঢাকায় ল্যান্ড করাতে পারলে ভালো হতো।
গিয়েছিলাম ছুটি কাটাতে আয়ারল্যান্ড। আইরিশ আথিতেয়তা আর প্রাকৃতিক নৈসর্গে আমি রীতিমতো মুগ্ধ। সত্যি বলতে কি লন্ডনের নাগরিক জীবন আমাদেরকে খুব সহজেই ক্লান্ত করে ফেলে। লন্ডনের জীবন যেন একঘেয়েমিতার চূড়ান্ত। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সেই একই পাউরুটি চিবোতে চিবোতে দিন শুরু হয়। সেই একই ট্রেনে বাড়ি ফিরি। সেই একই গান বাজতে থাকে কানের ভেতর। যেন দিনের তারিখটা ছাড়া সবই একই।
তাই হঠাৎ করেই ঈদের আগে দুই বন্ধু মিলে আয়ারল্যান্ড চলে এলাম। প্রথম দিন এয়ারপোর্ট থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ভ্যাগাবন্ডে (আমাদের হোস্টেলের নাম) উঠলাম। ট্যাক্সি ড্রা্ইভার বেশ বন্ধুবৎসল। আইরিশ আতিথেতয়তার সেটাই শুরু। এরপর হোস্টেলে পরিচয় হল,ম্যানেজার শন ক্যারির সাথে। শন চমৎকার একটা ছেলে। মনে হচ্ছিল যেন আমরা কোন বন্ধুর বাসায় বেড়াতে এসেছি। পুরো বাসাটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমাদের রুম ৩ তলায়। নিচ তলায় কমন রুম, কিচেন, ডাইনিং। পেছনে গার্ডেনের মতো একটা জায়গা আছে। বারবিকিউ করার জন্যে পারফেক্ট।
আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে ব্যাগ রেখে খেতে বেরোলাম। খুঁজছিলাম ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে দুইটা রেস্টুরেন্ট পেলাম কিন্তু দুটোই বন্ধ। অগত্যা কে এফ সি তে ঢুকতে হল মুরগির ঠ্যাং চিবোতে।
খেতে খেতে পুরো প্লান করে ফেললাম। শহর খুব একটা বড় না। সারাদিনে পুরো শহরটাই এক চক্কর দেয়া যাবে। আর সেই সাথে চলবে ঈদ শপিং। সন্ধ্যায় গেলাম অ্যালেন ট্যুরস এর বুকিং দিতে। কারন পরদিন প্লান হল বেলফাস্টের বাইরে যাওয়ার।
রাতের খাওয়ার পরে হোস্টেলে গিয়ে দেখি কমনরুমে ২/৩ জন মেয়ে মুভি দেখছে। আমরাও ওদের সাথে জয়েন করলাম। মুভি শেষ করে রুমে গিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় ২টা। সকালে জায়ান্ট কজওয়ে তে (বেলফাস্টের বাইরে একটা জায়গা)যাওয়ার জন্যে বাস ছাড়বে সাড়ে নয়টায়। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমানোর দরকার ছিল।
সকালে উঠে নাস্তা করে দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে বাস ধরলাম। বাস যখন বেলফাস্ট ছাড়ল তখন থেকে শুরু হল কোস্টাল রোড। সমুদ্রের ঠিক পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল আমাদের বাস। এতো সুন্দর সেই দৃশ্য যে আমরা দুইজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।
জায়ান্ট কজওয়ে দেখার পথে আমরা আরো দেখেছিলাম একটা ক্যাসেল, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো আইরিশ হুইস্কির ডিস্টিলারি আর একটা রোপওয়ে।
এখন এই ফিরে যাওয়ার সময় নিজেকে উদাস উদাস লাগছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি নিচে নিভু নিভু বেলফাস্ট। রাতের আঁধারে জ্বলজ্বল করছে শহরটা। আস্তে আস্তে প্লেন চলে এলো আইরিশ সাগরের উপরে। নিচে মেঘ আর মেঘ আর তার নিচে নীল রং এর সমুদ্র। আগামীকাল ঈদ। ঈদের আগের রাতে আর দশটা প্রবাসী মানুষের মতোই আমিও একটু সময়ের জন্যে হলেও নস্টালজিক হয়ে গেলাম। আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল কোন এক মানবীর সাথে কথা বলতে। ঢাকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আইরিশ সি এর হাজার হাজার ফুট উপরে আমার খুব শূন্য লাগছিল। এই শূন্যতার কোন সংজ্ঞা হয়না। সংজ্ঞাহীন এই নিঃসঙ্গতাকে আমি কি ভালোবাসা বলব কিনা জানি না। আমি উত্তরহীন তাকিয়ে থাকিয়ে থাকি প্লেনের বাইরের নিকষ অন্ধকারের দিকে।
কিছুদিন পরেই স্কুলের রিইউনিয়ন। দেশের বাইরে থাকার কারনে স্বাভাবিক ভাবেই যেতে পারছি না। প্রিয়মুখ গুলো এখনো স্মৃতিকাতর করে তোলে। ইউনিফর্ম পরে একসাথে বৃষ্টিতে ভেজার দিন গুলোতে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু কেন জানি এখন বৃষ্টি এলেই আমরা মাথার উপর ছাদ খুঁজি। একই রং এর সেই ইউনিফর্ম পরে অন্য কোন ছেলের দল ভিজতে থাকে।
কেমন যেন হঠাৎ করে সবাই বড় হয়ে গেলাম। বড় হওয়া মানেই যেন একটু একটু করে একা হয়ে যাওয়া। রাতের আকাশে তখন মেঘগুলোকে খুব আপন মনে হচ্ছিল। যেন এই মেঘগুলোও আমারই মতো একা, আমারই মতো উদভ্রান্ত এক বোহেমিয়ান।
আলোচিত ব্লগ
সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....
ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।
ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন
তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-
বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন
দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন
DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।