somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কাওসার চৌধুরী
জন্মসূত্রে মানব গোত্রভূক্ত; এজন্য প্রতিনিয়ত 'মানুষ' হওয়ার প্রচেষ্টা। 'কাকতাড়ুয়ার ভাস্কর্য', 'বায়স্কোপ', 'পুতুলনাচ' এবং অনুবাদ গল্পের 'নেকলেস' বইয়ের কারিগর।

রঙিন ফানুস (গল্প)

১৬ ই জুন, ২০১৮ সকাল ১০:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.
গত এক মাস থেকে মামুন সাহেব ভীষণ ব্যস্ত। জেলা পর্যায়ের বড় নেতা হওয়ায় রাত নেই, দিন নেই শুধু কাজ আর কাজ। এলাকার বিচার আদালত থেকে শুরু করে রাজনীতির খেল সবই তাঁর ইশারায় চলে। তবে এবারের ব্যস্ততা একটি বিশেষ উপলক্ষে। দলীয় প্রধান আসছেন এলাকায়। জেলা শিল্পকলা একাডেমি মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেবেন, এজন্য চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশী বাকি নেই। যতটুকু জানেন নেতা এখান থেকেই আনুষ্ঠানিক ভাবে আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করবেন। কেন্দ্র থেকে নির্দেশ এসেছে সভায় প্রচুর লোক সমাগম ঘটাতে হবে। পাশাপাশি নেতার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সভার দিন তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে মামুন সাহেবের ব্যস্ততাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
হঠাৎ নেতার মোবাইলে ক্রিং ক্রিং করে রিংটোন বেঁজে উঠল। পিএস কাসেম মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বললো-
-- স্যার, ম্যাডামের ফোন।
-- কোন ম্যাডাম?
-- বাসা থেকে স্যার, বলছেন জরুরী কথা আছে।
-- ঠিক আছে দাও।
টেলিফোনের ওপাশ থেকে গিন্নি-
-- রাত সাড়ে বারোটা বাজে, এখনো বাসায় আসার কোন নাম নেই। গত কাল সকালে সেই যে বাসা থেকে বের হলে, তারপর থেকে বিলকুল লাপাত্তা! সারাদিন এতবার কল দিলাম, ফোনটিও ধরলে না। সময় করে নিজেও তো একবার কল দিতে পারতে?
-- আর বলো না। কেন্দ্র থেকে প্রচুর চাপ দিচ্ছে যাতে সব আয়োজন প্ল্যান মতো ঠিক সময়ে সম্পাদন করা হয়। সব সময় কেন্দ্রকে কাজের আপডেট দিতে হচ্ছে। এজন্য তোমার ফোন ধরতে পারিনি। কি যে ঝামেলায় আছি বলে বোঝাতে পারবো না। এতো কাজের চাপ!
-- নেতা কী তুমি একা?
-- একা হবো কেন?
-- সব কাজ যদি তোমাকেই করতে হয় তাহলে বাকিরা আছে কি করতে?
-- সবাই তো করছে। এতো বিশাল জনসভা, সব নেতারা ব্যস্ত।
-- তোমার দৌড়ঝাপ তো দেখি সবার চেয়ে বেশি।
-- কি যে বল তুমি। সামনে সংসদ নির্বাচন। গত দুইবার চেষ্টা করেও নমিনেশন পাইনি, তবে এবার বেশ আশাবাদী। এইবার মিস হলে এমপি হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন আলোর মুখ দেখবে না। এবার আমার আসন থেকে আরো অনেকে নমিনেশন চাচ্ছে। কোটি টাকা খরছ করেও টিকেট কিনতে রাজি। অনেক টেনশনে আছি।
-- আর তোমার এমপি হওয়া! গতবার কত নাম না জানা নেতা ইলেকশন ছাড়াই অটো এমপি হলো। আর তুমি! সারা জীবন রাজনীতি করে কি পেলে? গতবার আমার ফ্যামেলির সবাইকে জানালাম তুমি এমপি হচ্ছ। কত বাহবা পেলাম। পরে সবার কাছে আমার মুখটা ছোট হলো। এমপি তো দূরে থাক, নমিনিশনটা পর্যন্ত ভাগিয়ে নিতে পারলে না।
-- আর লজ্জা দিওনা। আমিও কি কম কষ্ঠ পেয়েছি? তবে এবার নেতা আশ্বস্ত করেছেন। গতবার এমপি না হলেও দল আমাকে মূল্যায়ন করেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ পেয়েছি। জেলার উন্নয়ন কমিটির চেয়াম্যানও আমি। দলের হাই কমান্ডের সাথে যোগাযোগটা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বুঝলে, রাজনীতি করলে মাঝে মাঝে সেক্রিফাইজ করতে হয়।
-- সেক্রিফাইজ! শুনলাম টমাস নামের একজন শিল্পপতি তোমার আসনে নমিনেশন চাচ্ছে।
-- কি বল্লে? শিল্পপতি টমাস! ও তো গত কয়েক বছর আগেও ইয়াবা, হিরোইন ও ফেনসিডিলের ব্যবসা করতো। শুনেছি প্রশাসন ম্যানেজ করে এখনো করে, তবে গোপনে। অনেকে তাকে 'ট্যাবলেট টমাস' বলে ডাকে। এখন নাকি তার অঢেল সম্পদ। কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে আমাদের দলে ভিড়েছে।
-- এসব লোকেরা কেমনে দলে ভীড়ে?
-- দেখো দলে সব রকমের নেতা লাগে। টাকা ছাড়া দল চালানো মুশকিল। প্রয়োজনে পেশিও।
-- ঠিক আছে রাখ তোমার প্যাঁচাল। আজ তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসবে। শীতের রাত, বেশি অপেক্ষা করতে পারবো না।
-- আরে না। আজ কোন অবস্থাতে বাসায় আসতে পারব না। দলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মহোদয় আজ সভার অগ্রগতির খোঁজ নিতে ঢাকা থেকে এসেছেন। বিমান বন্দরে রিসিভ করা থেকে শুরু করে সার্কিট হাউজ পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নেতার সাথে ছায়ার মতো ছিলাম।
-- কানাডা থেকে তোমার মেয়ে ফোন দিয়েছিল। তোমার সাথে নাকি জরুরী কথা আছে।
-- মেয়েটি আমার কেমন আছে?
-- আছে ভাল। তোমার আদরের ছেলে লিঙ্কন লন্ডন থেকে ফোন করে মেয়েকে বলেছে পড়াশুনা করতে তাঁর ভাল লাগেনা, দেশে চলে আসতে চায়।
-- দেশে চলে আসবে মানে? এই কিছুদিন আগেও তার ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি বাবদ ২৩ লাখ টাকা পাঠালাম। এছাড়া প্রতি মাসে থাকা খাওয়ার খরছ হিসাবে লাখ টাকা পাঠাই। তোমার লাই পেয়েই ছেলেটি এমন হয়েছে।
-- আমার লাই পেয়ে মানে? এই নিশি রাতে ঝগড়া করতে চাও? যেমন বাবা তেমন ছেলে। একদম তোমার মতো একরোখা আর মেজাজি হয়েছে। ছেলেটি যা বলে তাই করে দেখায়, কারো কথা শুনতে চায় না।
-- এবার তার একদিন কি আমার একদিন। কি পাইছে? যা বলবে তাই হবে?
-- শোন, রাগলে চলবে না। মাথা ঠান্ডা করে বুঝাতে হবে। টিভিতে দেখলাম কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা, গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রী জনসভার তদারকি করতে এসেছেন।
-- তাঁরা তো গত এক সপ্তাহ থেকে আছেন।
-- এতো নেতা রাতে থাকবে কোথায়? খাওয়া দাওয়া করবে কই?
-- বোকা মেয়ে। সার্কিট হাউস আছে না! এখানে সরকারী খরছে প্রতিদিন শত শত মানুষের জন্য কোরমা-পোলাও রান্না হচ্ছে। আছে পাঁচ তারকা মানের থাকার ব্যবস্থা।
-- তাহলে তুমিও গত রাতে সার্কিট হাউসে ছিলে?
-- হ্যা। তবে কোন রুম খালি ছিল না। সোফায় ঘুমাইছি।
-- কি বল্লে (রেগে), তুমি সোফায় ঘুমাইছ! বাসায় এত আরামের বিছানা ফেলে সোফায়?
-- এতো রাগ করছো কেন? এটাই পলিটিক্স। কেন্দ্রীয় নেতারা সকালে ঘুম থেকে জেগে যখন দেখবে আমি ঘুমানোর জায়গা না পেয়ে সোফায় শুয়ে আছি, তখন আমার প্রতি তাদের সিম্পেথি বাড়বে। আমি সত্যিকারে দলের নিবেদিত প্রাণ এটা বুঝতে পারবে। দলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিও সার্কিট হাউসে থাকবেন। কষ্ট হলেও নেতার সান্নিধ্য পেতে আজও সোফায় ঘুমাবো।
-- তাহলে আজো বাসায় আসছো না? তোমার গলাও তো ভেঙ্গে গেছে। রাতে মনে করে ব্লাড প্রেসারের ঔষধ খাবে। ডায়বেটিসের কি অবস্থা?
-- আর তো মাত্র দুইটা দিন। ঠান্ডায় একটু গলা ধরেছে ঠিকই তবে ওটা এমন কিছু না ঠিক হয়ে যাবে। ডায়বেটিস কন্ট্রোলে আছে। মনে হয় কিছুটা বেড়েছে, তবে ইনসুলিন নিলে ঠিক হয়ে যাবে। আর শোন, জনসভার জন্য টেইলার্সে দেওয়া কোটটি কালকের মধ্যে অবশ্যই ড্রাইভারকে পাঠিয়ে আনবে। আর গত মাসে ভারত ভ্রমনের সময় কলকাতা থেকে কেনা পাঞ্জাবী ও পায়জামা মনে করে আয়রন করে রেখে দেবে যাতে জনসভার দিন সকালে পরতে পারি।
-- ঠিক আছে, মনে করে ঔষধ খাবে। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। এখন রাখি তাহলে।
-- শোন, রোটন বাসায় ফিরেছে?
-- রোটন কখনো এত আর্লি বাসায় ফিরে? বল্লাম দেখে শুনে ভাল ঘরের একটি মেয়ের সাথে বিয়ে দাও। সারা রাত পার্টি আর পার্টি। যখন অঘটন ঘটাবে তখন বোঝবে।
-- রাখি তাহলে।
-- শুভ রাত্রি।
-- গুড নাইট, শ্যামলী।


২.
রায়হান সাহেব সকালে আয়রণ করা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা পরে বাড়ি থেকে বের হলেন। আজ জেলা শহরে কেন্দ্রীয় নেতার বিশাল জনসভা। এজন্য গত কিছু দিন থেকে তিনিও খুব ব্যস্ত। দলের উপজেলা সভাপতি হিসাবে তাঁর অনেক দায়িত্ব। সবাইকে অর্গেনাইজ করতে হয়েছে। কর্মীদের জড়ো করে জনসভার গুরুত্ব বোঝাতে হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে প্রচারনা চালাতে হয়েছে। লিফলেট বিতরন করতে হয়েছে।

হঠাৎ ফোনটা বেঁজে উঠল রায়হান সাহেবের। দেখলেন তার এক নিবেদিত কর্মী লিটন কল দিয়েছে।
-- সালাম, বস। আমাদের সব গাড়ি রেডি। সবাই এক সাথে যাবে নাকি আলাদা আলাদা? আপনি কি নিজের পাজারুতে যাবেন নাকি আমাদের সাথে?
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল লিটন।
-- আলাদা আলাদা যাবে মানে? সব গাড়ি এক সাথে ছাড়বে। আমিও তোমাদের সাথে যাব। আমি সবার সামনের গাড়িতে উঠবো। আর সবাইকে জানিয়ে দেয় উপজেলায় আমাদের অফিসের সামনে থেকে গাড়িগুলো ছাড়বে। সবাই যেন মিছিল সহকারে এখানে এসে মিলিত হয়।
-- ঠিক আছে, বস।
-- আচ্ছা, প্রতিটি গাড়ির সামনে ব্যানার লাগানো হয়েছে? কয়টি বাস রিজার্ভ করেছিস? গেইট ও পোস্টারিং কী শেষ?
-- জি, বস। ব্যানারে আপনার ছবি ও নাম বড় করে ছাপিয়ে এনেছি। আপনি আসার আগে সব লাগানো হয়ে যাবে। আর সর্বমোট ৩৫টি বাসের ব্যবস্থা আছে। নেতাকে স্বাগত জানিয়ে ৩০টি গেইট নির্মাণ করেছি। সারা উপজেলায় আপনার নামে পোস্টার বিলি গত রাতে শেষ হয়েছে।
-- ঠিক আছে। আরেকটি কথা, আমি আসার পর সবাইকে সাথে নিয়ে আমার নামে স্লোগান দেবে, সাথে দলীয় স্লোগান। কথাটি যেন মনে থাকে। গাড়িতে মাইকের ব্যবস্থা করেছিস?
-- এটা বলতে হবে না বস। প্রতিবারের ন্যায় এবারও ঝুটনকে ভাড়া করেছি। ঝোটন স্লোগানের আওয়াজে এক্কেবারে ফাটিয়ে দেবে। প্রতিটি গাড়িতে আলাদা আলাদা মাইক আছে।
-- ওকে, অয়েল ডান। শুধু এখানে গলা ফাটালে চলবে? জনসভাস্থলে বেশি করে আমার নামে স্লোগান দিতে হবে। বিশেষ করে জেলা ও কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সামনে।
-- জি, বস। আপনার প্ল্যান মত সব হবে।

৩.
মিছিলে মিছিলে সভাস্থল প্রকম্পিত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতা কর্মীরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে। সুমন দলটির শহরের একটি গ্রুপের উদিয়মান নেতা। তার দৃষ্টি যতটুকু না জনসভায় তার চেয়ে বেশি গ্রুপ লিডারের দিকে। জোরে জোরে নেতার নামে স্লোগান দিচ্ছে আর আঁড় চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে নেতা তাকে মিছিল দিতে দেখছেন কি না। নেতার এ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য গলার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আওয়াজ বের করার চেষ্টা করছে সুমন। কিন্তু ঠান্ডায় গলাটা বসে গেছে। গত রাত সারা শহরব্যাপী লিডারের নামে ফেস্টুন লাগাতে বিজি ছিল সে। তিনিই তার মা, তিনিই তার বাবা। তিনিই তার একমাত্র রাজনৈতিক গুরু।

৪.
মোমিন সাহেব গত ত্রিশ বছর থেকে আমেরিকা প্রবাসী। প্রবাসে থাকলে কী হবে? দেশের রাজনীতির মায়া কখনো ছাড়তে পারেন নাই। এ যেন সুখের নেশা! এক সময় দেশে ছাত্র রাজনীতি করতেন। তবে কখনো বড় নেতা ছিলেন না। উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল ছিলেন। এখন আমেরিকার একটি স্ট্যাটসের দলটি সভাপতি। গত ত্রিশ বছরে আমেরিকায় বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দেশেও তার অঢেল সম্পদ। বউ বাচ্চারা দেশে তেমন আসে না। তিনি আজ দলবল নিয়ে সভায় হাজির হয়েছেন। এছাড়া নিজের বড় ছবি দিয়ে নেতাকে স্বাগত জানিয়ে পোস্টারিং করেছেন। অনেকগুলো গেইট ও তোরণ নির্মাণ করেছেন। শুনেছেন গত নির্বাচনে অনেক প্রবাসী ভাগ্যক্রমে এমপি হয়েছে। জীবনে তো কম টাকা পয়সার মালিক হলেন না। এবার যদি এমপি নামটা লাগানো যায়! এজন্য শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে জনপ্রতি পাঁচশত টাকার চুক্তিতে দুইশত মানুষ ভাড়া করে আজ নিয়ে এসেছেন।


৫.
রোকসানা আপা সকাল থেকে পেরেসান হয়ে দলের দায়িত্বশীল মহিলা নেত্রীদের নিয়ে জনসভার এক পাশে অবস্থান নিয়েছেন। গত কিছু দিন থেকে কেন্দ্রীয় অনেক মহিলা নেত্রী এসেছেন। তাদের থাকা-খাওয়া ও ঘোরাঘুরিতে অনেক সময় দিতে হয়েছে তাকে। বিমানবন্দরে রিসিভ করা থেকে শুরু করে আজকের সভায় উপস্থিতি পর্যন্ত সব কিছু এক হাতে সামলেছেন তিনি। যদিও কেন্দ্রীয় এসব নেত্রীদের জনসভায় নির্দিষ্ট কোন দায়িত্ব নেই। তারপরও উনারা এসেছেন।

হঠাৎ জটলা থেকে এক কর্মী ডাক দিল, রোকসানা আপা। জলদি এদিকে আহেন। আপা দেখলেন তার দুই মহিলা কর্মীর মাঝে মারামারি লেগেছে। একজন আরেকজনের চুল ধরে টানছে। খানকি-বেশ্যা বলে গালি দিচ্ছে।

কাছে গিয়ে অনেক কষ্ট করে আপা তাদের চুলোচুলি থামালেন। কি হয়েছে জানতে চাইলে একজন বল্ল, ম্যাডাম এই ছেমরি হামারে দু'শো টাহা দেবে বলে এখানে এনেছে। এখন কয় একশো টাহা দেবে। এতো কষ্ট করে হেঁটে হেঁটে আইলাম। অনেক সময় থেহে রোদের মাঝে খাড়াই আছি। দু'শো টাহা ছাড়া এখান থেহে একপা নড়ুম না আমি। আমি যে বাসায় কাম করি হেই বাসায় ম্যাডামকে কত কষ্ট করে ম্যানেজ করে আইছি।

মোর কিন্তু পুরা টাহা দিতে অইবে কইলাম।

রোকসানা আপা বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে নিভৃত করলেন। আর আশ্বস্ত করলেন কন্ট্রাকেই দুইশত টাকা ঠিকই দেওয়া হবে। তবে মিটিং শেষ হলে।

মর্জিনাটা আজ আসলে ভাল হতো, রোকসানা আপা স্বরণ করলেন। গত কয়েক বছর সে-ই এগুলো সামলেছে। এসব মহিলাদের খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে পেমেন্ট পর্যন্ত সব কিছু ওর দায়িত্বে ছিল।

ছেমরিটা পুয়াতি হওয়ার সময় আর পাইল না!

৬.
আইজল ও আবুল ছোট বেলার বন্ধু। অনেক বছর থেকে শহরে বসবাস করলেও দেখা সাক্ষাৎ তেমন হয় না বললেই চলে। জনসভার পাশের একটি রাস্তায় হঠাৎ দু'জনের দেখা। কত দিন হল দেখা হয় না দুই দোস্তের। তবে মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়।
-- ওই আবুল, আবুল। দোস্ত, শো-ন।
কে যেন পেছন থেকে ডাক দিচ্ছে। পরিচিত গলা শুনে পেছনে ফিরে দেখে আইজল।
-- আরে দোস্ত, কেমন আছিস তুই? নেতার জনসভায় আইছত? কখন আইলে?
-- আর কইস না। আজ আমার দোকান বন্ধ। গত কাল বলে দিয়েছে ভোর ছয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দোকান খোলা যাবে না। শুনেছি নেতা নাকি মিটিং শেষে এদিকে কোথাও যাইবে। আমার বস্তীর মালিক এই দলের একজন নেতা। তাই উনাকে খুশি করতে জনসভায় আসা।
-- আমারও একই অবস্থা দোস্ত। আমি যে রুটে অটো রিক্সা চালাই হেই রাস্তা দিয়েও নেতা নাকি কই যাইব। এছাড়া আমাদের শ্রমিক নেতাও বলেছেন যেভাবে হোক সভাস্থলে আসতে হবে। আজ সারাদিন আমাদের স্ট্যান্ডে গাড়ি চালাতে নিষেধাজ্ঞা আছে। বন্ধু তোর কিসের ব্যবসা?
-- আরে আমার আবার ব্যবসা। ছোট একটা পান দোকান দেই। বউ বাচ্চা নিয়ে অনেক কষ্ট করে চলি। তোর ভাবী একটা বাসায় কাম করে। একদিন দোকান বন্ধ থাকলে অনেক ক্ষতি হয়ে যায় বন্ধু। কুলাতে পারি না। তোর কথা বল?
-- আমার কথা কী আর বলবো, বন্ধু। তোর ভাবী তো অনেক দিন থেকে অসুস্থ। সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা করাইলাম কিন্তু উন্নতির কোন লক্ষণ নেই। ডাক্তার বলেছে আরো কয়েকটি টেস্ট করাতে হবে। ঢাকায় প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যেতে বলেছে। বউয়ের চিকিৎসা বাবদ কয়েক হাজার টাকা ঋণ হয়ে গেছে। এদিকে বড় মেয়েটা এবার ক্লাস সিক্সে ভর্তি হবে। অনেক টেনশনে আছিরে।
-- কি বলে তোকে সান্তনা দেব বুঝতে পারছি না। ভাবিকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে গেলে আমাকে জানাইস। যতটুকু পারি সহযোগিতা করবো। বুঝলে বন্ধু বড় বড় নেতারা সভা সমাবেশে আমাদের মতো মানুষদের কথা গলা ফাটিয়ে বলে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তেমন কিছুই করে না। তারপরও প্রতিনিয়ত এসব মিথ্যা আশ্বাসে আমরা আশাবাদী হই। এই আশা, এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমরা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখি। হোক তা মিথ্যা তাতে তো কোন ক্ষতি নেই। স্বপ্নের কোন দেয়াল নেই, পরিধি নেই।
-- হো, ঠিক কথা দোস্ত। স্বপ্ন দেখায় উপকার না হলেও ক্ষতি তো নেই। আমাদের মত নিঃস্ব মানুষদের মিথ্যা স্বপ্নই অনেক সময় বাঁচিয়ে রাখে।

আইজলের চোখ দু'টি ছল ছল করছে, গলাটা ভারি হয়ে আসছে। এজন্য আবুল কথা আর আগালো না। শুনতে পেল মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, প্রধান অতিথি এখন দেশের গরীব, দুঃখী ও মেহনতি মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। চারদিকে করতালি আর মিছিলে-মিছিলে সরব হয়ে উঠলো। আবুল লক্ষ্য করলো আইজল আনমনে ভিড় ভিড় করে কি যেন বলছে আর মাথা নাড়াচ্ছে।

কে জানে!! জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাচ্ছে হয়তো।।



ফটো ক্রেডিট,
গুগল।

উৎসর্গ: গল্পটি সামুর সকল সহ ব্লগার/লেখক ও সামুর নিয়মিত পাঠকদেরকে উৎসর্গ করলাম। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

চাইলে পড়তে পারেন-
আমার সবচেয়ে পঠিত, লাইক ও কমেন্ট প্রাপ্ত পোস্ট।
সবচেয়ে পঠিত প্রবন্ধ।
সবচেয়ে পঠিত গল্প।
সবচেয়ে লাইকপ্রাপ্ত গল্প।
ছবি ব্লগ (লন্ডনের ডায়েরি-১)।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:৩৬
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"ধর্ষক ও চরিত্রহীনদের বাঁচাতেই কি ওয়াজের মঞ্চ? সাধারণ মানুষকে আর কত অন্ধ বানিয়ে রাখবেন!"

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:১২


ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্ষক ও ব্যভিচারীদের পাপ ঢাকা এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে রাখার এই ভণ্ডামি আর কতকাল সহ্য করবেন?
পবিত্র ইসলাম আর সাহাবিদের ত্যাগকে কতখানি নামালে এই ভণ্ড মোল্লা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিঃশব্দ প্রহর

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯



খাস খাতার পাতায় কলম চালাচ্ছিলেন ফরিদা বেগম (৪৫)। রাত তখন সাড়ে সাতটা। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে পাশে বসা ছোট ছেলে সিয়ামকে (৯) বললেন, "হাতের লেখা এত দ্রুত শেষ করলে হবে?... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশিরা কেন বিজেপির পতন চায়?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে মনে হয় ভারতের ভাগ্য নির্ধারণের গুরুদায়িত্ব বুঝি এদেশের মানুষের ওপর এসে পড়েছে। ভারতে কোথাও একটু আন্দোলন বা উত্তাপ ছড়ালেই এপারে যেন উৎসবের ধুম পড়ে যায়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক সংকট: মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২

প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর। এই স্তরেই শিশুর ভাষা, গণিত, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, সামাজিকতা ও জীবনদক্ষতার ভিত নির্মিত হয়। যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা যত শক্তিশালী, সেই দেশের অর্থনীতি, সামাজিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রিয়েলিটি আপনারা মাইনে নেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩০



নরেন্দ্র মোদীকে আপনি যতই অপছন্দ করেন না কেন, তার একটা একটা প্রশংসনীয় গুণ আছে। সে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ নিতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের অপছন্দের কাজটা করতেও পিছপা হয় না।
সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×