somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবনানন্দ দাস

১০ ই মে, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিচের কবিতার স্তবক দুটি লক্ষ্য করুন।প্রথমটি এক নবীন কবির।দ্বিতীয়টি একজন বিখ্যাতের।

১) বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের
কিনারায়
মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের
কুয়াশায়
ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার
ক্ষোভে,-
সে কোন বোঁটের ফুলের ঠোটের মিঠা
মদের লোভে
বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে
অবেলায়।

২) কে বাঁধে শিথিল বীণার তন্ত্র
কঠোর যতন ভরে
ঝংকারি উঠে অপরিচিতার
জয় সঙ্গীত স্বরে।
নগ্ন শিমুল কার ভান্ডার
রক্ত দুকূল দিল উপহার
দ্বিধা না রহিল বকুলের আর
রিক্ত হবার তরে।

স্তবক দুটির প্রতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর সমালোচনাঃ
""বলাই বাহুল্য,প্রথম স্তবকটি অতি দুর্বল,নিরেস।প্রায় অকবিতাই বলা যায়।বনের চাতক,মনের চাতকের তুলনা নেহাতই অকিঞ্চিতকর,ছন্দ এবং মিলেও বেশ দোষ আছে।যারা কবি,তারা জানে 'কুয়াশার' এর সঙ্গে 'অবেলায়' সঠিক মিল হয় না।অন্তমিল মানে দুই পঙক্তির শুধু শেষ অক্ষরের মিল নয়,পুরো শব্দটির ধ্বনি গত মিল থাকা আবশ্যিক তো বটেই,অন্য অক্ষরগুলির বর্গ গত মিল থাকলেও ভালো হয়।মাঝখানে একটি অকারণ মিলের লোভে ভুল শব্দও প্রয়োগ করা হয়েছে।'বোঁটের' মানে কী?'ঠোটের' সঙ্গে মেলাবার জন্য 'বোঁটার' থেকে 'বোটের করা হয়েছে, এটা অসঙ্গত।যতি ব্যবহারও ত্রুটিপূর্ণ,ষষ্ঠ লাইনে ক্ষোভের পর কমা এবং ড্যাশ দুটোই দেবার কোন প্রয়োজন ছিল না।'ফুলের ঠোটের মিঠা মদের লোভে', এতে কোন কবিত্ব নেই,অনায়াসে বলা যেতে পারে ক্লিশে।দ্বিতীয় অন্য কবির স্তবকটি নিখুঁত। মাত্রা ও মিল সম্পর্কে কোন প্রশ্নই নেই,অনুপ্রাসে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।কারণ অনুপ্রাস উচ্চাঙ্গের কবিতার রস নষ্ট করে,কিন্তু অনেকগুলি 'র' ও 'ল' - এর ব্যবহারে ধ্বনি মাধুর্য পাওয়া যায়।সমস্ত শব্দই অতিসাবলীল।বোঝা যায় বহুদিনের অভিজ্ঞতার ফসল।""

এখন বলি প্রথম স্তবকটির কবি হলেন-একটু এটে বসুন- রূপসী বাংলার জীবনান্দ দাস।এবং দ্বিতীয় স্তবকটির কবি হলেন গীতাঞ্জলীর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।(দুই একজনের অন্তত ইনাকে চেনার কথা)
যাইহোক সুনীলের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেকালের নবীন কবি জীবনান্দের দাসের তুলনা দেওয়ার কারণ সেকালে অন্য সাধরণ কবিদের মত জীবনানন্দ দাসও ছিলেন প্রাণ পণে রবীন্দ্র অনুসারী।এবং কবিতায় ছিলেন প্রবল কাচা।
জীবনানন্দের এই স্তবকটি ছিল ১৩৩৪ সালে(বয়স সম্ভবত তিরিশের কোটায়) তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরাপালক' এর 'বনের চাতক মনের চাতক' কবিতার শুরু।(এবংএকই সালেই রবীন্দ্রনাথের উক্ত স্তবকটি মহুয়া কাব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশ পায়।)
এখানে বিস্ময়ের ব্যপার হল খুব অল্প সাময়ের ব্যবধানেই প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাসের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'ধূসর পান্ডুলিপি'।'ঝলা পালক' এর লেখক এবং 'ধূসর পান্ডুলিপির লেখক যে একি ব্যক্তি তা যেন বিশ্বাস হতে চায় না।হঠাৎ যেন কোন মায়া সরোবরে ডুব দিয়ে আবির্ভূত হলেন নতুন জীবনানন্দ দাস।তার হাতে সৃষ্টি হতে লাগল সম্পূর্ণ নতুন কাব্যভাষা যা পূর্ববর্তী কবিদের থেকে একদম আলাদা।শব্দ ব্যবহারে তিনি বেপরোয়া।অক্লেশে আনছেন জাদুকরী রহস্যময় শব্দ।চাক্ষুষ দৃশ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছেন রহস্য।
কবির 'ঝরাপালক' থেকে 'ধূসর পান্ডুলিপি'তে এমন চমকপ্রদ উত্তরণ বাংলা সাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনাতো বটেই, আজও রহস্যময় মনে হয়।

"পাড়াগাঁর গায়ে আজ লেগে আছে
রূপশালি ধানভানা
রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ
আমি সেই সুন্দরীরে দেখে লই,-নুয়ে
আছে নদীর এপারে
বিয়োবার দেরি নাই,- রূপ ঝরে পড়ে" ----------------(ধূসর পান্ডুলিপির অন্তর্গত কবিতাংশ)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশভাগের পর-

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৮



সময় তখন ১৯৫০ সাল।
ওমর আলীর জ্বর এসেছে। জ্বর নিয়েই তিনি পত্রিকা পড়ছেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। টারজান গিয়েছে বাজার করতে। এর আগেও টারজান বেশ কয়েকবার বাজার করেছে। বাজার করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হায়ার সেলফ্‌

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪১


শীতের সময়ে রাত ১০ টা অনেক রাত। আর তা যদি হয় শহর থেকে দূরে শহরতলীতে,আবাসিক এলাকার আশপাশে,তাহলে তো কথাই নেই। রাত আটটা বাজতে না বাজতেই পাড়ার সকলে সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এফএম রেডিও

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২০

২০০৯ সাল। একটি ছেলে। সে তার নানা নানীর সাথে মুন্সীগঞ্জ এ থাকতো। নানা তার নাতিকে একটি মোবাইল উপহার দেয়। নকিয়া ১৬৬১। সেই মোবাইলে এফএম রেডিও ছিলো। সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রীয় সফর, আম তারেক আর চার সিটের দূরত্ব!

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৪

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নেপালে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন। সস্ত্রীক আমন্ত্রণ পেয়েছেন তিনি। তখন কিশোর তারেক রহমানেরও শখ জাগল—তিনিও নেপাল যাবেন।

বাবা বুঝিয়ে বললেন, রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ মানেই পরিবারের সবাইকে রাষ্ট্রীয় টাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন কার ভয়ে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৮


থাপ্পড়-কাণ্ডের পর দেশ ছেড়েছেন শাহজালাল রুমি। টঙ্গীতে নিজের মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জন্য। গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি, ব্যক্তিগত বার্তায় ভয়ভীতি প্রদর্শন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×