রিকশায় উঠে কিছুদূর এগুতেই মনে হলো আমার নাম ধরে কেউ ডাকছে। কিন্তু এদিকেসেদিকে কাউকে খুঁজে না পেতেই ফোন বেজে উঠলো। ভাস্করদার ফোন। কই যান? আমার পাল্টা প্রশ্ন, আপনি কি ডাক দিলেন? কই যান আপনি? ভাস্কর দা জানালো যে সে এইমাত্র আমাকে ক্রস করেছে, টুটুলের ফ্লাটে যাচ্ছে, আমি যাব কিনা! আমি বনবাতাসীর কাছে যাচ্ছিলাম। কাজিনের বাসায় মিলাদ, সেখানেও আল্লাবিল্লা করতে হবে। বললাম, বনবাতাসীকে নিয়ে আসি! ভাস্কর দা বললেন, চলে আসেন!
বনবাতাসীর ঘরের দুয়ারে পৌঁছতেই ঝুপ বৃষ্টি। পিংকশাড়ী আর ঝুপবৃষ্টি, সাথে আটঁসাটো রিকশা নিয়ে চললো টুটুলের ফ্লাটে। ভাস্করদার ইন্টারপ্রিটেশন, লিটনের ফ্লাট! একটা মাইক্রোক্রেডিট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তার স্টাফদের জন্য ফ্লাটের বন্দোবস্ত করেছে। হাউস রেন্ট কাটা যাবে আঠারো বছর, বিনিময়ে মালিক হবে বারোশ স্কয়ার ফিটের একটা ওয়েল ইনটেরিয়রের ফ্লাটের! মাইক্রোক্রেডিটের ব্যবচ্ছেদ করতে করতে আমরা তখন কিছু কিছু এনজিওর কর্মকান্ড নিয়েও লেগে পড়েছি। ভাস্কর দা জানালেন তার মজার একটা অভিজ্ঞতার কথা। পাবনার কোন এক এনজিও একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে শুকর ব্রিডিং এর। ত্রিশটা পরিবারকে দিয়েছে দুটো শুকর, আর সেগুলোর খাদ্য বাবদ আরো কিছু অর্থ। সব মিলে পাঁচহাজার টাকা। আর সংশ্লিষ্ট এনজিওর কর্মকর্তা এ প্রজেক্ট থেকে মাসে বেতন পান দশহাজার টাকা! স্পাইরাল করা বিশাল প্রজেক্ট রিপোর্ট জমা পড়ে দাতাদের টেবিলে। তারা খুশী, এনজিও খুশী, ব্যাংকে পড়ে ডলারের অনুদান!
বৃষ্টি থামলে আমরা আর থেমে থাকি না। ভাস্কর দা চলে গেলেন তার বোনের বাসায়। আমি ও বনবাতাসী গতি পছন্দ করি। আমাদের দুজনের হাতে বড়ই অল্প সময়। অচিরেই দু'জন দুদিকে চলে যাবো। হয়তো কখনও দেখাও হবে না। খুবই স্বাভাবিকভাবে এমন একটা গন্তব্যে দু'জন ধেয়ে চলেছি। সেজন্য এখন এই নিস্তরঙ্গতায় যতটুকু নিজেরা নিজেদের সময় দিতে পারি সে চেষ্টাই করে চলেছি। এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে উওরা লেকের পাশে চটপটি খেয়ে আবার যখন বাড়ীর পথে তখন মাত্র দেড়ঘন্টা পেড়িয়েছে। এত অল্প সময়। এতটুকুই আমাদের বরাদ্দকৃত সময়।
বনবাতাসীর বাসার খানিক দূরেই কাজিনের বাসা। গ্যারেজে মিলাদের মাহফিল। একজন বৃদ্ধ হুজুর ইংরেজী বাংলা আরবী উর্দু মিশিয়ে ওয়াজ করছেন। বললেন, নবীকে সালাম জাননোর সময় অবশ্যই দাড়াতে হবে, এটা সম্মানের জন্য। যারা একে বিদআত বলে তাদের তো উড়োজাহাজে চড়ে হজ্বেও যাওয়া ঠিক না, কারণ নবীজী কখনও প্লেনে চড়েন নি। মিলাদের সময় দাড়ানোতে, নাথিং রং ইন ইট! ভদ্রলোক আরো বললেন, সুরা ফাতিহাতে একশ চব্বিশটা অক্ষর আছে। একবার ফাতিহা পড়লে প্রতি অক্ষরের জন্য একহাজার নেকী পাওয়া যায়। তারমানে একলাখ চব্বিশ হাজার নেকী হয়। এতে এক লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের নাম নেয়া হয়। আমার এত হাসি পেল যে ফিক করে তার একটু বের হয়ে গেল। পাশে বসা কাজিন আমার দিকে তাকিয়েও একটু মুচকি হাসলেন। কি আর করা, ধর্মীয় ওয়াজ বলে কথা, সব কিছু শুনে একটু মুচকি হাসি দেয়া পর্যন্তই আমাদের দৌড়াত্ব।
ফেরার পথে বনবাতাসীর বাসার সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন ফোন করলাম, বললাম, তোমার বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছি! বনবাতাসী বললো, তোমাকে আমি বিষ দিয়ে মেরে ফেলবো, আমার সামনে থেকে কোথাও যেতে পারবে না, কেবল থাকবে আমার কাছেই!
বনবাতাসী জানলো কিভাবে, মনে মনে আমি তো বিষই খুঁজে বেড়াই!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



