যেদিন বৃষ্টি হয় সেদিন মঙ্গলবার। যেদিন হয় না সেদিন বৃহস্পতিবার। এমন করে গুনে গুনে মঙ্গলবার ছাতা নেই, বৃহস্পতিবার ঝাড়া হাতপা। কিন্তু ভিজতে হয় ঠিকই, কারণ আমার এ নির্ধারণ মানে না প্রকৃতি। তবে ভেজার জন্য চাই উপলক্ষ্য, আজকে বৃহস্পতি, কি হর্ষ, কি দিন, আহা! ভিজি তাই। মহাতুঙ্গে থাকে গ্রহ, নক্ষত্রের সাথে হৃদয়ের ধুমকেতু। বৃষ্টি হোক বা না হোক হৃদয় ঠিকই ভেজে। পরিকল্পনামাফিক রাস্তায় নেমে দিকজ্ঞান ভুলে থাকি, সময় অসামঞ্জস্যে। দিকের কম্পাস ভেঙে আমি বাসে বাদর ঝুলি। পূর্বপুরুষ নাকি লংকা থেকে এসেছিলো, আর ঐখানে রাবনের সাথে যুদ্ধে কিছুটা ঝুলে গেছিল দম্ভ, হিজরত বঙ্গে বলে ঝুলতে থাকার বিদ্যা মাঠে খোয়া যায়নি।
কি হলো দাদা, আপনি পা মাড়িয়ে দিলেন যে!
কই? ওহ! সরি।
সরি বললে কি আর হয়! দেখে শুনে চলবেন!
ওকে।
তারপরে আবার কেচোঁর মত ঠেউ খেলে দাড়িয়ে থাকি। বাস থামে, আমার কেচোঁমি থামে। নেমে হাত দুই দূরে ফুলের পাচিল, বাহারী ফুলের সজ্জন হাত নাড়িয়ে বলে, স্যার, কি ফুল নেবেন?
গোটা দশেক গোলাপ দে! কত করে সিংগেল?
দশটাকা!
দশটা পঞ্চাশে দে!
না স্যার, দাম বাড়তি!
ঠিক আছে, সিক্সটি!
নেন, স্যার!
গোলাপ কেন কিং ফ্লাওয়ার বা গোলাপ কেন প্রেমের ফুল তার চেয়ে গবেষণা ভাল গোলাপে আভিজাত্য কেন! দুইটাকার বাদাম কিনে পাবলিক লাইব্রেরীর মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ এক নারী অপেক্ষায় থাকার কথা। তার বড় মেয়ে এম এ করেছে, ছেলে দুইটা গ্রাজুয়েশন করছে, আর আমি যাচ্ছি তার সাথে ডেটিং এ। ক্যাচাল লাগে লাগুক পরিবারে, তাতে নস্যি দিয়ে নাক টানবো কেবল, আপাতত তাহসিনা বেগমের শক্ত হয়ে থাকা বলিরেখায় ঠোঁট ছোয়ানো ধর্মের দায়িত্ব।
এই যে এসে পড়েছো?
হ্যা, কতক্ষণ আপনি?
তোমার জন্য আধঘন্টা অপেক্ষায় আছি। বাহ বাহ! ফুল নিয়ে এসেছো দেখছি!
মনে হলো, আপনাকে বোধহয় অনেক বছর কেউ ফুল দেয়নি ভালবেসে, শূণ্যতাটা ঘুচাই!
বেশ বেশ! তবে রওনকের বাবা বিয়ের পরেও কখনও আমাকে ফুল দেয় নাই, একদম পৌঢ় ছিল সেই সাতাশেও!
বিয়ের আগে?
বিয়ের আগে তো দেখাই হয়েছে দুইদিন! একদিন বললো, আমার মাইনে কিন্তু আটশ টাকা। তারপরে জিয়ার সমালোচনা করলো। আরেকদিন দেখা হবার পরে বললো, মশারী কিন্তু আমি খাটাতে পারবো না!
হা হা হা। তবে রশিদ সাহেব কিন্তু আপনাকে টেক কেয়ার করে অনেক বেশী!
তোমার বস বলে বলছো? সে যে কি মানুষ আমি ভাল জানি। কি হয় একটা মানুষ যদি কায়ক্লেশে বড় হয়ে তার অতীতকে মনে রাখে! ভুলতেই হবে কেন?
তা ঠিক, কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?
রশিদ বিয়ে করেছে!
মানে, কবে!
আমাকে জানিয়েই করেছে। বলেছে নিষেধ করলে, ডিভোর্স দেবে আমাকে!
তাহসিনা বেগম চুপ করে বাদামের খোসা ছাড়ে। আমি তার ধনুকের মত বেকে যাওয়া পিঠে ব্রেসিয়ারে স্ট্রিপ শক্ত হয়ে লেগে থাকতে দেখি। কোন কষ্ট আছে বলে বোঝা যাচ্ছে না চেহারাতে।
তার শরীরে যৌবন নাই। শারিরীক সঙ্গের কোন প্রয়োজন নাই। আমাকে সে ডার্লিং মনে করে। আমি তার কুচকে থাকা কপাল, নুয়ে পড়া স্তন, আর হাতের শিথিল মাংসপেশী দেখি। ডাইবেটিসের প্যাশেন্ট। অহরহ কাশে, কিন্তু তার একজন প্রেমিকের বড় প্রয়োজন। সে আমাকে গল্প বলে, শৈশবের, মুন্সীগঞ্জের, তাদের বাড়ীর পাশের নদীর। সে অকপটে বলে, লন্ডনী সেই ছেলেটির কথা যে তাকে ভালবাসার কথা বলে হারিয়ে গিয়েছিল।
আমি তাহসিনার হাত ধরে বসে থাকি। আমি তাকে ভালবাসি। তার বিগত জীবনের গল্প শোনার জন্য তার সঙ্গ প্রত্যাশা করি। আমি কল্পনায় মেতে থাকি তার দূরন্ত অস্পর্শিত হৃদয়ের বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ে, যা কেউ ছুঁয়ে দেখেনি।
তাহসিনা কাশে, আমি ঝুলতে থাকি, পাবলিক লাইব্রেরীর ভেতরে সূর্য ঢলে পড়ে জসিমউদ্দনের পেছনে।
তাহসিনার ঔষধ খাবার সময় হয়। আমি তাকে জরিয়ে ধরে রিকশায় বসি। খসখসে চামড়ার ভেতরে ধলেশ্বরীর ঢেউ জেগে ওঠে। কয়েকটা প্রলম্বিত কাঁশি দিয়ে তাহসিনা আমার হাত চেপে বলে, লাভ ইউ ডার্লিং!
আমার চোখে ঝাপসা হতে থাকে দোয়েল চত্বর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


