somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসলামে বহুবিবাহ: একটি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা

০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২৫ রাত ৮:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জনাব আবদুর রব শরীফ সাহেবের একটি পোস্ট পড়ে মনে হলো এবিষয়ে আমি কিছু লিখি। উনার পোস্টের শিরনাম যৌবনে চারটি বিয়ে করা কি সুন্নত? । আচ্ছা আসুন দেখি এটা আসলে ফরজ, সুন্নত নাকি নফল ? কোনটা ?

বহুবিবাহ—এই শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। মুসলিম সমাজে এই প্রথা নিয়ে যেমন আলোচনা-সমালোচনা আছে, তেমনি অমুসলিমদের মধ্যেও আছে অনেক ভুল ধারণা। কেউ বলেন এটা পুরুষের আধিপত্যের প্রতীক, আবার কেউ বলেন এটা রাসুলের (সঃ) সুন্নাহ। কিন্তু প্রকৃত সত্য কী?

কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি:

কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বহুবিবাহের উল্লেখ আছে। আল্লাহ বলেন:

وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا 1 فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا 2

"আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, এতীমদের (সম্পদের ব্যাপারে) সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্যে যাদেরকে তোমাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে কর—দুই, তিন বা চার। আর যদি আশঙ্কা কর যে, তোমরা সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে (বিয়ে কর)। এটাই সঙ্গত, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না কর।" (সূরা আন-নিসা: ৩)

এই আয়াতে ‘সুবিচার’ (عدل) -এর শর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সুবিচার বলতে শুধু ভরণপোষণ বা বাসস্থানের সমতা বোঝায় না, বরং স্ত্রীদের প্রতি সমান ভালবাসা ও মনোযোগ দেওয়াকেও বোঝায়। আর মানুষের পক্ষে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সম্পূর্ণরূপে সমান অনুভূতি বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই অনেক ইসলামী পণ্ডিতের মতে, কুরআনের এই আয়াত মূলত একটি বিয়ের দিকেই উৎসাহিত করে। কারণ সুবিচারের শর্ত পূরণ করা খুবই কঠিন।


নবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবনের প্রেক্ষাপট:

নবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর একাধিক বিবাহের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে তাঁর জীবনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে শুধু এই দিকটি নিয়ে আলোচনা করা সঠিক নয়।

প্রথম বিবাহ: নবী (সঃ) ২৫ বছর বয়সে খাদিজা (রাঃ)-কে বিয়ে করেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় অন্য কোনো বিয়ে করেননি। খাদিজা (রাঃ) এর মৃত্যুর পর তিনি অন্যান্য বিয়ে করেন।
সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ: নবী (সঃ) এর অনেক বিবাহের পেছনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ ছিল। বিধবা নারীদের আশ্রয় দেওয়া, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন, ইসলামের দাওয়াত প্রসারের মতো উদ্দেশ্যও এর সাথে জড়িত ছিল। তৎকালীন আরবের সমাজে বিধবাদের অবস্থা খুবই করুণ ছিল। তাদের আশ্রয় দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব ছিল।

উদাহরণ: নবী (সঃ) তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতেন। তিনি স্ত্রীদের সাথে কেমন আচরণ করতে হয়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

ইসলামী পণ্ডিতদের মতামত:

বহুবিবাহ নিয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কেউ কেউ বিশেষ পরিস্থিতিতে বহুবিবাহকে জায়েজ মনে করেন, তবে সুবিচারের শর্তের উপর জোর দেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিয়েই উত্তম। তবে সকলেই একমত যে, সুবিচার ছাড়া বহুবিবাহ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আধুনিক সমাজের প্রেক্ষাপট:

বর্তমান সমাজে বহুবিবাহের প্রচলন কম দেখা যায়। আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষের সমতা, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় বহুবিবাহের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেয়েছে। তবে কিছু সমাজে এখনো এর প্রচলন আছে। কিন্তু সুবিচারের শর্ত পূরণ না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।


ইসলামে বহুবিবাহ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। শুধু আবেগ বা প্রচলিত ধারণার উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। সুবিচারের শর্ত পূরণ করা কঠিন হওয়ায় একটি বিয়েই উত্তম। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং সুবিচারের নিশ্চয়তা থাকলে বহুবিবাহের অনুমতি আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত ধর্ম এবং মানুষের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিধান দেয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২৫ রাত ৮:৪১
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ম্যাজিস্ট্রেট

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



আমাদের এলাকায় নতুন একটা ওষুধের দোকান হয়েছে।
অনেক বড় দোকান। মডেল ফার্মেসী। ওষুধ ছাড়াও কনজ্যুমার আইটেম সব পাওয়া যায়। আমি খুশি এক দোকানেই সব পাওয়া যায়। আমাদের এলাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌কে কীভাবে দেখা যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

যে কোন কিছু দেখতে হলে, তিনটি জিনিসের সমন্বয় লাগে। সেই জিনিসগুলো হচ্ছে - মন, চোখ এবং পরিবেশ। এই তিন জিনিসের কোন একটি অকেজো হয়ে গেলে, আমরা দেখতে পারি না। চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে জুলাইযোদ্ধাদের উপর পুলিশের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:১৪

জুলাই যারা ঘটিয়েছে, তাদের উপর পুলিশের কী পরিমাণে ক্ষোভ, এটা ইলেকশনে যাস্ট বিএনপি জেতার পরই টের পাবেন।
আমি বলছি না, বিএনপির ক্ষোভ আছে।
বিএনপি দল হিসেবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু জুলাইয়ের উপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাশা : বাংলাদেশের নতুন জাতীয় খেলা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


"ও শ্যামরে, তোমার সনে একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম, এই নিঠুর বনে। আজ পাশা খেলব রে শ্যাম।" প্রয়াত হুমায়ূন ফরীদির কণ্ঠে ছবিতে যখন এই গান শুনেছিলাম ,তখন কেউ ভাবেনি যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহার এবং আমার পর্যবেক্ষণ

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭

বিএনপির প্রতি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা কাজ করে, এবং ভালোবাসা আছে বলেই আমি তার প্রতিটি ভুল নিয়েই কথা বলতে চাই, যাতে সে শোধরাতে পারে। আপনিও যদি সঠিক সমালোচনা করেন, সত্যকে সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×