somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আট নম্বর হাতের ছায়া

০১ লা জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। গল্পের সমস্ত চরিত্র, নাম, স্থান এবং ঘটনা লেখকের কল্পনাপ্রসূত। বাস্তব কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলে গণ্য হবে।

নাটোরের লালপুরের সেই প্রত্যন্ত গ্রামটার নাম ভবানিপুর। ঠিক এগারো মাস আগে, এক অন্ধকার রাতে, নিজ শোবার ঘরে নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বিধবা সুরাইয়া বানু এবং তাঁর চব্বিশ বছর বয়সী ছেলে ফাহিম মোর্শেদ। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ছিল দুটি শরীর। ঘটনার পরদিন সুরাইয়া বানুর বড় ছেলে থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। লোকাল পুলিশ শুরুতে পাঁচজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করলেও দীর্ঘ জেরার পর দেখা যায়, তারা স্রেফ চুরির উদ্দেশ্যে ওই পাড়ায় ঘুরছিল, এই জোড়া খুনের সাথে তাদের কোনো দূরতম সংযোগও নেই।

মামলাটি যখন সম্পূর্ণ 'ক্লুলেস' হয়ে ফাইলবন্দী হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই তদন্তের দায়িত্বভার দেওয়া হয় পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ানকে। আর মাত্র এক সপ্তাহ পর আদালত এই জোড়া খুনের মামলাটিকে 'অমীমাংসিত' হিসেবে সংরক্ষণ বা ক্লোজ করতে যাচ্ছিল। এই চরম সময়ের চাপ আরিয়ানের টিমের প্রতিটি সদস্যের ঘাড়ে এক অদৃশ্য তলোয়ারের মতো ঝুলছিল।

আজ তেসরা জুন। পিবিআই সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুমে এসি চলছে মৃদু শব্দে। টেবিলের ওপর ক্রাইম সিনের ছবিগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পাশে রাখা নিহত সুরাইয়া বানুর সেই সস্তা বাটন ফোনটি, যা গত এগারো মাসে আটবার হাতবদল হয়ে নেত্রকোনার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উদ্ধার করে এনেছে পিবিআই।

আরিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর চশমার কাঁচের ওপারে চোখ দুটো আজ অদ্ভুত রকমের তীক্ষ্ণ। তিনি ধীরপায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওঁর সামনে ফাইল খুলে পেনসিল হাতে তৈরি হয়ে বসল বর্ষা এবং পরিদর্শক তানভীর।

আটবার হাতবদল হওয়া এই ফোনটাই আমাদের শেষ আলামত, তাই তো স্যার?” তানভীর জিজ্ঞেস করলেন। “আমরা কি এখন এই আটজনের চেইন ধরে ধরে এক নম্বর বিক্রেতাকে খোঁজা শুরু করব? আমাদের হাতে কিন্তু সাতটা দিনও নেই।

না, তানভীর। ওটা প্রথাগত পুলিশিং, যেখানে সময় নষ্ট বেশি হয়,” আরিয়ান টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসলেন। ওঁর কণ্ঠে এক ধরণের সম্মোহনী স্থিরতা। “চলো, একটা খেলা খেলি। অপরাধীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদের নিজেদের টেবিলের ওপারে বসাতে হবে। বর্ষা, তানভীর... ধরি, আমি যদি এই কেসের মার্ডার প্ল্যানার হতাম, আর আমি যদি এই সুরাইয়া বানুকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাইতাম—তাহলে আমি ঠিক কী করতাম?

বর্ষা আর তানভীর একে অপরের দিকে তাকাল। আরিয়ানের এই ‘ক্রিমিনাল রোলপ্লে’ মেথডের সাথে তারা পরিচিত। আরিয়ান চোখ বন্ধ করলেন। ওঁর মগজ এখন ভবানিপুরের সেই অন্ধকার রাতে বিচরণ করছে।

আমি যদি মাস্টারমাইন্ড হতাম, আমি নিজে সুরাইয়া বানুর ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র চালাতাম না,” আরিয়ান চোখ খুললেন। ওঁর দৃষ্টি প্রজেক্টরের স্ক্রিনে। “কারণ আমি স্থানীয় লোক। সুরাইয়া বা ওঁর ছেলে ফাহিম যদি শেষ মুহূর্তে আমার মুখ দেখে ফেলে বা চিনে ফেলে, তবে আমার বাঁচার পথ বন্ধ। তাই আমি এমন খুনি হায়ার করব, যারা এই ভবানিপুর গ্রামের কেউ না। আমি ১৮ কিলোমিটার দূরের শহর বা অন্য কোনো উপজেলা থেকে একটা প্রফেশনাল গ্যাং ভাড়া করব।

তানভীর নোট নিচ্ছিলেন, ওঁর চোখ চকচক করে উঠল। “রাইট স্যার। বাইরের খুনি হলে স্থানীয় পুলিশ তাদের সহজে চিনবে না, আর খুনের পর তারা সহজেই নিজেদের এলাকায় ফিরে মিশে যেতে পারবে।

কিন্তু এখানেই একটা বড় ‘লজিক্যাল লুপহোল’ তৈরি হচ্ছে,” আরিয়ান পেনসিল দিয়ে টেবিলটা আলতো টোকা দিলেন। “আমি প্রফেশনাল গ্যাং ভাড়া করলাম ঠিকই, কিন্তু তারা তো ভবানিপুর গ্রামের গলি চেনে না। সুরাইয়া বানুর বাড়িটা কোন চিপার ভেতরে, ওনাদের শোবার ঘরের জানালা কোনটা—সেটা তো বাইরের খুনিদের জানার কথা না। তাহলে তারা অতর্কিতে এসে নিখুঁতভাবে কাজটা শেষ করে পালাল কীভাবে? তার মানে, ঘটনার রাতে স্থানীয় কেউ একজন মোটরসাইকেল নিয়ে হাইওয়ের মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ওই ভাড়াটে খুনিদের পথ দেখিয়ে একদম সুরাইয়া বানুর বাড়ির দরজায় এনে নামিয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, খুনের সময় সে বাইরে বাইক স্টার্ট দিয়ে পাহারায় ছিল, যাতে ইঞ্জিনের শব্দে ভেতরের কোনো চিৎকার বাইরের মানুষের কানে না পৌঁছায়।

চমৎকার লজিক, স্যার!” বর্ষা উত্তেজিত হয়ে বলল। “তার মানে মাস্টারমাইন্ড নিজে অথবা ওঁর কোনো বিশ্বস্ত লোক ওই রাতে বাইক নিয়ে লাইভ গাইড হিসেবে কাজ করছিল।

এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে—এই সস্তা বাটন মোবাইল ফোনটা,” আরিয়ান ফোনটা হাতে তুলে নিলেন। “আমি যদি প্রফেশনাল খুনি হতাম, আমি এই পাঁচশত টাকার ফোনটা কখনো ছুঁয়েও দেখতাম না। আলমারি ভাঙতাম, সোনা নিতাম। কিন্তু ক্রাইম সিনে সোনা-দানা সব অক্ষত। তাহলে ফোনটা কেন নেওয়া হলো? খুনিরা কি বোকা? না। খুনিরা প্রফেশনাল হলে ওটা হাতও দিত না। কিন্তু ওই যে বললাম, বাইরে একজন স্থানীয় লোক পাহারায় ছিল। কাজ শেষে খুনিরা যখন চলে যাচ্ছে, তখন ওই স্থানীয় লোকটা, যে হয়তো কোনো মাদকাসক্ত বা লোভী চোর, সে লোভসালাতে না পেরে সুরাইয়া বানুর বালিশের নিচ থেকে ফোনটা পকেটে পুরে ফেলেছিল।

তানভীর কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বললেন, “কিন্তু স্যার, এটা তো একটা থিওরি হলো। ওই স্থানীয় লোকটা যে চুরি করে ফোনটা বেচে দিয়েছে, ওটার কোনো অকাট্য লিঙ্ক কি আমাদের কাছে আছে?

আরিয়ান মুচকি হাসলেন। ওঁর চোখ বর্ষার দিকে গেল। “বর্ষা, এবার তোমার জাদুর বাক্সটা খোলো।

বর্ষা ওঁর ল্যাপটপের স্ক্রিনটা প্রজেক্টরে শেয়ার করল। ওঁর মুখে এবার এক আত্মবিশ্বাসী হাসি। “জ্বী স্যার। আপনার থিওরিটা পাওয়ার পর আমি ওই আট নম্বর হাতের চেইনের একদম গোড়ায় হিট করেছি। এই ফোনটি প্রথম যে ব্যক্তির কাছে মাত্র ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সে হলো নাটোর বাজারের এক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী। আর আইনি নথিপত্র ঘেঁটে আমি বের করেছি, সেই ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী অন্য কেউ নয়, আমাদের ভবানিপুর গ্রামের মাদকাসক্ত শওকতের আপন খালাতো ভাই!

তানভীর সোজা হয়ে বসলেন। “তার মানে শওকতই ফোনটা চুরি করে ওঁর খালাতো ভাইয়ের দোকানে ডাম্প করেছিল!

শুধু তাই নয়, স্যার,” বর্ষা দ্রুত আরেকটি ফাইল ওপেন করল। “আমি লালপুর থানার গত তিন বছরের ডায়েরি স্ক্রিন করেছি। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, নিহত সুরাইয়া বানু নিজে থানায় এসে একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করেছিলেন। সেই জিডিতে ওঁর নিজের চাচাতো দেবর এবং স্থানীয় মাতব্বর আবুল হোসেন মাস্টারের নাম সরাসরি উল্লেখ ছিল! সুরাইয়া বানুর স্বামীর রেখে যাওয়া ফসলি জমি জবরদখল করার জন্য আবুল হোসেন মাস্টার ওনাকে প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছিলেন।

আরিয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। ওঁর চোখে প্রশংসার দৃষ্টি। “চমৎকার কাজ, বর্ষা! এবার তানভীর, তোমার মাঠের কাজের সময়। শওকত আর আবুল হোসেন মাস্টারের নাম যখন চলেই এসেছে, তখন খুনের রাতের সেলুলার ডাটা আর লজিস্টিকসটা একটু মিলিয়ে নাও।

তানভীর ওঁর ডায়েরি খুলে বললেন, “স্যার, অলরেডি মিলিয়েছি। খুনের রাতে, অর্থাৎ ঠিক এগারো মাস আগে ২৩শে নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টা থেকে সোয়া ৯টার মধ্যে আবুল হোসেন মাস্টারের মোবাইল লোকেশন ভবানিপুর হাইওয়ের মোড়েই ছিল। শুধু তাই নয়, ওই একই সময়ে দুর্গাপুরের কুখ্যাত গ্যাং লিডার এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য রফিকের ফোন লোকেশনও ওই একই টাওয়ারের অধীনে ছিল। এই রফিক একসময় সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র ও চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনা করত, ও অত্যন্ত বিপজ্জনক লোক। ওঁর সাথে মাস্টারের ওই সপ্তাহে অন্তত ১৪ বার কথা হয়েছিল।

আর কোনো প্রমাণের কি দরকার আছে, তানভীর?” আরিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার বরফের মতো ঠাণ্ডা শোনাল। “মাস্টারমাইন্ড আবুল হোসেন মাস্টার, পথপ্রদর্শক শওকত, আর ভাড়াটে খুনি রফিক। আমরা শুধু অনুমানে নেই, আমাদের কাছে এখন চেইন অফ এভিডেন্স আছে। এদের আজ বিকেলের মধ্যেই তুলে নিয়ে এসো।

রাত আটটা। পিবিআই-এর বিশেষ জেরা কক্ষের একপাশে কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন আরিয়ান আর বর্ষা। ভেতরে ল্যাম্পের তীব্র আলোর নিচে বসে আছেন ভবানিপুর গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর আবুল হোসেন মাস্টার। ওঁর চোখেমুখে ভয়ের বদলে এক ধরণের ধূর্ত অহংকার।

তানভীর টেবিলের ওপর একটা চড় মেরে বললেন, “মাস্টার, এগারো মাস আগে ২৩শে নভেম্বর রাতে তুমি সুরাইয়া বানু আর ওঁর ছেলেকে খুন করিয়েছ। সোজা বাংলায় স্বীকার করো।

আবুল হোসেন একটু বাঁকা হেসে ওঁর সাদা দাড়ি নাড়লেন। “আইন কি মুখের কথায় চলে, তানভীর সাহেব? আমি একজন শিক্ষক, সমাজের সম্মানিত লোক। ওই বিধবা আর ওঁর পোলার খুনের রাতে আমি নিজের ঘরে নামাজ পইড়া ঘুমাইছি। সুরাইয়া বানুর সাথে আমার জমির বিরোধ ছিল সত্যি, কিন্তু তাই বইলা আমি খুন করুম? আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ আছে আপনাদের কাছে?

ঠিক এই মুহূর্তে জেরা কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন আরিয়ান। ওঁর হাতে কোনো ফাইল নেই, কেবল সেই সস্তা বাটন ফোনটি। তিনি ধীরপায়ে মাস্টারের মুখোমুখি চেয়ারটায় বসলেন।

আপনি ঠিকই বলেছেন মাস্টার সাহেব, আইন মুখের কথায় চলে না। আইন চলে প্রমাণের হাত ধরে,” আরিয়ান ফোনটা মাস্টারের চোখের সামনে টেবিলের ওপর রাখলেন। “চিনতে পারছেন ফোনটা? এটা আপনার বড় ভাই মরহুম সোলায়মান সাহেবের ফোন, যা ওঁর মৃত্যুর পর সুরাইয়া বানু ব্যবহার করতেন।

আবুল হোসেনের চোখের পলক এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “গ্রামের কত মানুষের কত ফোন হারায়। এইটার সাথে আমার কী সম্পর্ক?

সম্পর্কটা শওকত তৈরি করে দিয়েছে,” আরিয়ান পকেট থেকে দুটো কাগজ বের করলেন। “শওকত অলরেডি পাশের রুমে ওঁর জবানবন্দি সই করেছে। সে স্বীকার করেছে যে আপনার দেওয়া পাঁচ হাজার টাকার লোভে সে ওই রাতে রফিকের গ্যাংকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল। আর তাড়াহুড়ো করে সুরাইয়া বানুর বিছানা থেকে এই ফোনটা সে-ই চুরি করেছিল, যা পরের দিন ওঁর খালাতো ভাইয়ের ভাঙাড়ির দোকানে মাত্র ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

আবুল হোসেনের কপালে এবার সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করল। ওঁর হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। তবুও সে শেষ চেষ্টা করল, “শওকত একটা নেশাখোর! ওঁর কথার কোনো আইনি মূল্য নাই। ও বানায়া কথা কইতাছে।

কিন্তু এই কল রেকর্ড আর মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন তো বানিয়ে কথা বলছে না, মাস্টার সাহেব,” আরিয়ান এবার বর্ষার প্রিন্ট করা সিডিআর (CDR) রিপোর্টটা মাস্টারের সামনে ছুঁড়ে দিলেন। “খুনের ঠিক আধঘণ্টা আগে এবং আধঘণ্টা পরে—আপনার ফোন এবং সীমান্ত এলাকার কুখ্যাত অস্ত্র চোরাচালানকারী রফিকের ফোন একই সাথে ভবানিপুর মোড়ের টাওয়ারে কানেক্টেড ছিল। রফিকের অ্যাকাউন্টে ঘটনার ঠিক দুদিন আগে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তিন লাখ টাকা ট্রান্সফার হয়েছে। আপনি কি বলতে চান সীমান্ত এলাকার একটা আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারী আপনার ঘরে বসে আপনার সাথে নামাজ পড়ছিল?

অকাট্য প্রমাণ আর ব্যাংক স্টেটমেন্টের কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে আবুল হোসেন মাস্টারের মুখের সমস্ত রঙ এক নিমেষে সাদা হয়ে গেল। ওঁর ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল। ওঁর দীর্ঘ এগারো মাসের তৈরি করা মিথ্যের দুর্গটা আরিয়ানের কয়েকটা লজিক্যাল বোমায় এক নিমিষে গুঁড়িয়ে গেল।

মাস্টার ধপ করে চেয়ারের পেছনের দিকে হেলে পড়লেন। ওঁর গলা দিয়ে আর কোনো আওয়াজ বের হলো না। সে মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে উঠলেন, “জমিটা হাতছাড়া অয়া যাইতাছিল স্যার... শওকত আর রফিকরে আমিই টাকা দিছিলাম...

ভোর ছয়টা।

ভবানিপুরের আকাশে তখন হালকা লালাভ আভা। কোনো এনকাউন্টার হয়নি, কোনো গুলির শব্দে ভোরের নীরবতা ভাঙেনি। পিবিআই-এর লজিক্যাল এবং ডিজিটাল বেষ্টনীতে পড়ে পুরো চক্রের সবাই এখন প্রিজন ভ্যানের ভেতর লকড।

পিবিআই-এর প্রিজন ভ্যানটি যখন আসামিদের নিয়ে আদালতের দিকে রওনা দিল, তানভীর এসে আরিয়ানের পাশে দাঁড়ালেন। ওঁর মুখে গভীর শ্রদ্ধা। “খুনিরা ভেবেছিল ফোনটা আট নম্বর হাতে গিয়ে হারিয়ে যাবে, আর মাত্র এক সপ্তাহ পর মামলাটাও ফাইলচাপা পড়ে যাবে।

আরিয়ান ফোনটা পকেটে পুরতে পুরতে ওঁর সেই পরিচিত শান্ত, গভীর গলায় বললেন, “অপরাধীরা একটা জিনিস ভুলে যায়, তানভীর। খুনিরা ভেবেছিল ফোনটা আট নম্বর হাতে গিয়ে হারিয়ে যাবে। তারা জানত না, সেই আট নম্বর হাতই একদিন ওদের মৃত্যুর ছায়া হয়ে ফিরে আসবে।

আরিয়ান ধীরপায়ে ওঁর প্রিডো জিপের ড্রাইভিং সিটের দিকে এগিয়ে গেলেন। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নিল। নীল আকাশ আর ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ হাওয়াকে সঙ্গী করে জিপটা আবার হাইওয়ের দিকে চলতে শুরু করল।

জিপটা যখন লালপুরের পিচঢালা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে, আরিয়ানের চোখে হঠাৎ ভেসে উঠল ড্যাশবোর্ডের ফাইলে থাকা সুরাইয়া বানুর সেই পুরোনো সাদাকালো ছবিটা। এক সাধারণ, নিরপরাধ গ্রামীণ নারী, যিনি শুধু ওঁর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের জমিটুকু আগলে রাখতে চেয়েছিলেন।

আরিয়ান জানালার কাঁচটা সামান্য নামিয়ে দিলেন। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ওঁর চোখে এসে লাগল। এগারো মাস ধরে এক বুক চাপা কষ্ট আর অপবাদ নিয়ে অপেক্ষা করা একটি অসহায় পরিবারের জন্য আজ অন্তত দূর আকাশের কোথাও থেকে ন্যায়বিচারের এক চিলতে দরজা খুলে গেল।

একটি জটিল রহস্যের সফল অবসান ঘটিয়ে আরিয়ান এগিয়ে চললেন ওঁর পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৩০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বনলতা এক্সপ্রেস আজ থামানো হয়েছে, কাল থামানো হবে নাটক, বই, গান, কবিতা- তারপর থামানো হবে চিন্তা।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩১ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪১



বনলতা এক্সপ্রেস আজ থামানো হয়েছে, কাল থামানো হবে নাটক, বই, গান, কবিতা- তারপর থামানো হবে চিন্তা।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ঘটনায় শুধু একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ হয়নি;... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ক্রিস্টিকে মনে পড়ে

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ৩১ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৬

ক্রিস্টি,
এখন তুমি কেমন আছো, ক্রিস্টি?
কোন ভুবনে বিচরণ করছো তুমি?
কি আছে তোমার মনোলোকে?
কাকে খুঁজে বেড়ায় তোমার দুটো চোখ?
কি ভেবেই বা ক্ষণে ক্ষণে তুমি মুচকি হাসো?

অথচ-
এমনটি তো হওয়ার কথা ছিলনা।
মেধা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্নশুদ্ধির দিনে : পরিবেশ দূষণ কেন ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মে, ২০২৬ রাত ১১:৩৫

আত্নশুদ্ধির দিনে : পরিবেশ দূষণ কেন ?



একজন মুসলমান হিসাবে, জীবনের সারা পথ আত্নত্যাগ ও পরপোকারে লিপ্ত থাকা আবশ্যক ।
ঈদুল আজহা আমাদের জন্য সেই বার্তা নিয়ে আসে, প্রতি বৎসর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের ১০০ দিন কেমন কাটলো ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা জুন, ২০২৬ রাত ২:৫৬


যখন এই ব্লগটি লিখতে বসেছি তার কিছুক্ষণ আগেই সংবাদে দেখলাম সরকার বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির খবর এখন আর নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈদের দিন

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০১ লা জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬


ঐ এক ঝাক শিশুকে দেখলেই-
মনে পরে আমার শৈশবের কথা;
আমি হারিয়ে যাই, চিরচিনা পথের
ধূলি মাঝে- কতই না স্মৃতি! গুমরে
তুলে আমাকে- যার ভাষা হারিয়ে যায়;
লজ্জাবতীর মতো- মুচকি হাসি ফুরিয়ে
যায় অশ্রুসিক্ত নয়ন-... ...বাকিটুকু পড়ুন

×