somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অদৃশ্য তরঙ্গের জাল

০৬ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

“স্যার, আমরা একটা দেয়ালে এসে ধাক্কা খেয়েছি। খুনিরা আমাদের চেয়ে এক কদম এগিয়ে।”

পরিদর্শক তানভীরের কপালে চিন্তার ভাঁজ। পিবিআই সদর দপ্তরের বিশেষ সেলে এসি চলছে, কিন্তু ঘরের পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে ২৩ বছর বয়সী সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাদমান ফাহিম-এর ছবি। হাসিখুশি, দীর্ঘদেহী এক তরুণ। কিন্তু ওঁর পাশের ছবিটা বিভীষিকাময়—হবিগঞ্জের এক নির্জন ঝোপ থেকে উদ্ধার হওয়া ফাহিমের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ।

“কীসের দেয়াল, তানভীর?” আরিয়ান চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। ওঁর চোখে চিরচেনা সেই শীতল ও স্থির চাউনি।

“লোকেশন ট্র্যাকিং, স্যার,” বর্ষা ওঁর ল্যাপটপ ঘুরিয়ে আরিয়ানকে দেখাল। “মামলার মূল পরিকল্পনাকারী শাফকাত এবং ওঁর স্ত্রী রিনতি গা ঢাকা দিয়েছে। তারা অত্যন্ত চতুর। নিজেদের কোনো বাংলাদেশি সিম কার্ড তারা অন রাখেনি। শাফকাত ওঁর সহযোগীদের সাথে যোগাযোগ করছে বিদেশি আইপি-ভিত্তিক ভার্চুয়াল হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে। ফলে বিটিআরসি বা আমাদের লোকাল টাওয়ার ডাটা দিয়ে ওঁর জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

আরিয়ান ছবিগুলোর দিকে তাকালেন। ফাহিমকে ওঁর বোনের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ওঁরই এক সহপাঠী এবং ‘বন্ধু’ আসিফ। ঢাকার আফতাবনগরের একটি ফ্ল্যাটে আটকে রেখে রাতভর দফায় দফায় পিটিয়ে খুন করা হয়েছে ছেলেটিকে।

“আসিফ তো আমাদের হেফাজতে, তাই না?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করলেন।

“জ্বী স্যার। আসিফ আদালতে দোষ স্বীকার করেছে। সে জানিয়েছে, শাফকাত ওঁর প্রথম স্ত্রীর দায়ের করা একটি নির্যাতন মামলায় ফাহিম সাক্ষী হওয়ার কারণে এই প্রতিশোধ নিয়েছে। খুনের পর শাফকাত আসিফকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিল। কিন্তু স্যার, মূল খুনি শাফকাত আর ওঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রিনতি যদি এই আন্তর্জাতিক নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, তবে তাদের ধরা তো দূর, তারা দেশ ছেড়ে পালালেও আমরা জানতে পারব না। আর মাত্র চার দিন পর আদালত এই কেসের চার্জশিট দাখিলের ডেডলাইন দিয়েছেন। এরপর মামলাটি কোল্ড কেসে চলে যাবে।”

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঘরের এক কোণায় ফাহিমের বড় বোন নার্গিস বেগম ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আরিয়ান ওঁর দিকে তাকালেন। “আপনার ভাই কি শাফকাতের প্রথম স্ত্রীর কোনো ব্যক্তিগত গোপন নথিপত্র বা প্রমাণ নিজের কাছে রেখেছিলেন?”

নার্গিস বেগম চোখ মুছে বললেন, “বাবা, শাফকাত একটা পশু। ও মেয়েদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য গোপনে নোংরা ভিডিও বানাত। ফাহিম ওঁর প্রথম স্ত্রীকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরায় ওঁর বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল এবং কোর্টে গিয়ে শাফকাতের এই কুকীর্তির সাক্ষী হয়েছিল। শাফকাত আমার ভাইটাকে জবানবন্দি দেওয়ার নাম করে রড দিয়ে পিটিয়ে মেরেছে... ও এখন আমাকেও ওই বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি দিচ্ছে!”

কনফারেন্স রুমে নীরবতা নেমে এল। আরিয়ান ধীরপায়ে বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ওঁর হাতে একটা মার্কার পেন।

“তাহলে শাফকাত কোনো সাধারণ খুনি নয়,” আরিয়ান বোর্ডে শাফকাতের নাম লিখলেন। “সে একজন সাইকোপ্যাথ এবং অত্যন্ত টেক-স্যাভি। সে জানে পুলিশ কীভাবে লোকেশন ট্র্যাক করে, তাই সে প্রক্সি নেটওয়ার্ক আর বিদেশি ভার্চুয়াল নম্বর ব্যবহার করছে। তানভীর... বর্ষা... চলো, আবার আমরা অপরাধীর মনস্তত্ব দিয়ে চিন্তা করি। আমি যদি শাফকাত হতাম, আর পুলিশ যদি আমার পেছনে লাগত, তাহলে আমি কী করতাম?”

“শাফকাত এখন ঢাকাতেই আছে,” আরিয়ান বোর্ডের ওপর একটা নির্দিষ্ট জোনে টোকা দিলেন। “ওঁর ইগো খুব হাই। ও ফাহিমের বোনকে ঢাকা থেকে বসেই থ্রেট করছে ওঁর ক্ষমতা দেখানোর জন্য। তানভীর, আজমপুর আর বাড্ডা এলাকার সমস্ত ক্লোজড-সার্কিট ক্যামেরা আর ড্রপ-বক্সগুলো চেক করো। ও ঢাকা ছাড়েনি।”

আরিয়ানের এই প্রথম অনুমানের ওপর ভিত্তি করে পুরো টিম চব্বিশ ঘণ্টা বাড্ডা আর উত্তরার অলিগলিতে তল্লাশি চালাল। তানভীরের মাঠ পর্যায়ের সোর্সরা প্রতিটি সম্ভাব্য আস্তানায় হানা দিল, কিন্তু ফলাফল শূন্য। শাফকাতের কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না।

পরদিন সকালে আরিয়ান টেবিলে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। ওঁর চশমাটা পাশে রাখা। ওঁর নিখুঁত ডিডাকশন মেথড এবার ব্যর্থ হয়েছে।

“স্যার, আমার মনে হয় আমরা ভুল লাইনে এগোচ্ছি,” বর্ষা ধীরপায়ে ঘরে ঢুকল। ওঁর সাইবার ফরেনসিক লগের দিকে চোখ। “শাফকাত টেক-স্যাভি। ও ঢাকাতে বসে এত বড় ঝুঁকি নেবে না। ও অলরেডি মুভ করেছে। ও আমাদের বোকা বানানোর জন্য একটা ভার্চুয়াল স্মোক-স্ক্রিন তৈরি করেছে। ওঁর ইগো নয় স্যার, এখন ওঁর অবচেতন মনে তাড়া করছে তীব্র ভয়।”

আরিয়ান সোজা হয়ে বসলেন। ওঁর চোখে পরাজয়ের গ্লানি নেই, বরং নতুন করে শুরু করার একটা জেদ ফুটে উঠল। “ইউ আর রাইট, বর্ষা। থ্যাংক ইউ। ওঁর ইগো নয়, ওঁর ভয়টাই ওঁর সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ও পালিয়ে গেছে। ও যদি প্রযুক্তির জালে আমাদের আটকাতে চায়, আমরা ওকে ওঁর নিজের প্রযুক্তির জালে জড়াব। ওঁর প্রধান ভয় কী? ওঁর সেই অপরাধের ভিডিওগুলো। ও যদি জানতে পারে ওঁর সেই অন্ধকার অতীত অন্য কারও হাতে, ও নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।”

আরিয়ান বর্ষার দিকে তাকালেন। “বর্ষা, ফাহিমের বোনের অ্যাকাউন্ট থেকে শাফকাতের ওই বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফাহিমের অন্য এক কাল্পনিক বন্ধুর পরিচয় দিয়ে টেক্সট করো—‘শাফকাত ভাই, ফাহিম কোর্টে সাক্ষী দেওয়ার আগে ওঁর ল্যাপটপে তোমার তৈরি করা সেই গোপন ভিডিওগুলোর একটা ব্যাকআপ ফোল্ডার রেখে গিয়েছিল। তুমি যদি আমাকে পাঁচ লাখ টাকা না দাও, আমি ওটা পিবিআই-কে দিয়ে দেব।’”

প্রথম দিন: শাফকাত মেসেজটি দেখল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। সে চতুর। সে বুঝতে চেষ্টা করল এটা পুলিশের কোনো ফাঁদ কি না। সে ওঁর প্রক্সি নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে দিল।

দ্বিতীয় দিন: শাফকাত অবশেষে টেক্সট করল—‘ফাহিমের ল্যাপটপ পুলিশের জিম্মায়। তুই ফালতু কথা বলছিস। আর কোনো মেসেজ দিলে তোকেও ফাহিমের কাছে পাঠিয়ে দেব।’

আরিয়ান হাসলেন। “টোপ কাজ করছে। ও ভয় পেয়েছে, তাই হুমকি দিয়ে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে। বর্ষা, পাল্টা লেখো—‘পুলিশ ওঁর পার্সোনাল ল্যাপটপ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ও এই ভিডিওগুলো ওঁর ওয়ানড্রাইভ ক্লাউডে আপলোড করে ওটার পাসওয়ার্ড ওঁর বোনের ডায়েরিতে লিখে রেখেছিল। আমি ডায়েরিটা সরিয়েছি। বিশ্বাস না হলে এই লিংকে ঢুকে ভিডিওর ফাইলনেম আর স্ক্রিনশট দেখে নাও।’

তৃতীয় দিন: শাফকাত কয়েক ঘণ্টা নীরব রইল। ওঁর ভেতর তখন তুমুল ছটফটানি। বিকেল ৪টার দিকে সে আবার মেসেজ দিল—‘আমি তোকে দুই লাখ টাকা দেব। কিন্তু আগে প্রমাণ কর ভিডিওগুলো আসলেই তোর কাছে আছে। লিংকে কী আছে আমি জানি না, স্ক্রিনশট চ্যাটে পাঠা।’

“ও ভয়ংকর চালাক, স্যার। ও সরাসরি লিংকে ক্লিক করছে না,” তানভীর বললেন।

“বর্ষা, শেষ পুশ-টা দাও,” আরিয়ান বললেন। “লেখো—‘আমার চ্যাটে কোনো স্ক্রিনশট যাবে না। পুলিশ আমার ওপর নজর রাখছে। লিংকের ফাইলটা ডিক্রিপ্ট করা আছে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে না দেখলে আমি লিংক ডিলিট করে পিবিআই অফিসে চলে যাব। তোমার ক্যারিয়ার তুমি বাঁচাও।’

এই চূড়ান্ত সময়ের চাপ আর সন্দেহ শাফকাতের সাইবার নিরাপত্তার অহংকারকে চূর্ণ করে দিল। বিকেল ৪টা বেজে ১৭ মিনিটে, শাফকাত ওঁর কৌতূহল ও ভয়ের কাছে হেরে গিয়ে সেই লিংকে ক্লিক করল।

ল্যাপটপের স্ক্রিনে লাইভ ট্র্যাকার অন ছিল। কিন্তু কোনো জাদুকরি ম্যাপ বা জিপিএস কো-অর্ডিনেট ভেসে উঠল না।

“স্যার, ও লিংকে হিট করেছে!” বর্ষা উত্তেজিত হয়ে কিবোর্ডে টাইপ করতে লাগল। “তবে ও যথারীতি কমার্শিয়াল ভিপিএন অন করে রেখেছে। সরাসরি কোনো আইপি এড্রেস বা ভৌগোলিক লোকেশন পাওয়া যাচ্ছে না।”

“বাস্তব ডেটা কী আসছে বলো, বর্ষা? মেটাডাটা কী বলছে?” আরিয়ান ঝুঁকে এলেন।

“আমরা ওঁর ডিভাইসের ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ পেয়েছি স্যার,” বর্ষা স্ক্রিন দেখিয়ে ব্যাখ্যা করতে লাগল। “ও উইন্ডোজ ১১ এবং ক্রোম ব্রাউজার ব্যবহার করছে। ওঁর সিস্টেমের লোকাল ল্যাঙ্গুয়েজ ‘বাংলা’ সিলেক্ট করা এবং ওঁর হার্ডওয়্যার ক্লক অনুযায়ী টাইমজোন দেখাচ্ছে +০৬:০০ জিএমটি। তবে সবচেয়ে বড় ক্লু হলো ওঁর নেটওয়ার্কের ‘প্যাকেট ডিলে’ (Packet Delay) এবং ল্যাটেন্সি বিহেভিয়ার। ও যে কমার্শিয়াল ভিপিএন ব্যবহার করছে, ওটার নোড রেসপন্স টাইম এবং ব্যান্ডউইথ ক্যাপাসিটি অ্যানালাইসিস বলছে ওঁর মূল ইন্টারনেট সোর্সটি কোনো মোবাইল ডেটা নয়, এটি একটি ফিক্সড ব্রডব্যান্ড লাইন। আর সেই লোকাল আইএসপি (ISP) সার্ভারের নোড রেসপন্স ব্যাক-ট্রেস করে দেখা যাচ্ছে ওঁর গেটওয়ে রিকোয়েস্ট আসছে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এরিয়া থেকে!”

তানভীর সোজা হয়ে বসলেন। “সিলেট? তার মানে ও জকিগঞ্জ বা তামাবিল বর্ডার দিয়ে ওপারে পার হওয়ার চক্করে আছে!”

“ঠিক তাই,” আরিয়ানের কণ্ঠে এবার আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। “বর্ষা, ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার ওই নির্দিষ্ট আইএসপি-র আন্ডারে গত এক ঘণ্টায় কোন কোন রিসোর্ট বা গেস্টহাউস সচল আছে, ওটার লগ ফিল্টার করো।”

“পেয়েছি স্যার! ফেঞ্চুগঞ্জের ‘অরণ্য কুঠির’ রিসোর্টের লোকাল রাউটার নোডের সাথে এই নির্দিষ্ট প্যাকেট বিহেভিয়ার ম্যাচ করছে। ওই রিসোর্টে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে যাওয়া এক দম্পতি ভুয়া নামে রুম বুক করেছে।”

আরিয়ান ওঁর জ্যাকেটটা তুলে নিলেন। “লোকেশন লকড। তানভীর, সিলেটের লোকাল পিবিআই এবং থানা পুলিশকে ব্যাকআপের জন্য রেডি করো। আমাদের হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় আছে।”

রাত ৩টা বেজে ২০ মিনিট। ফেঞ্চুগঞ্জের হাকালুকি হাওড় ঘেঁষা ‘অরণ্য কুঠির’ রিসোর্টটি কুয়াশায় ঢাকা। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বৃষ্টির শব্দের মধ্যে পিবিআই এবং স্থানীয় পুলিশের তিনটি টিম পুরো রিসোর্টটি চারপাশ থেকে নিঃশব্দে ঘেরাও করে ফেলেছে। তানভীরের ফিল্ড ফোর্স প্রতিটি এক্সিট পয়েন্ট ব্লক করে পজিশন নিয়েছে।

আরিয়ান, তানভীর এবং চারজন সশস্ত্র পুলিশ অফিসার রিসোর্টের পেছনের গলির কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে ওপরে উঠলেন। ২১০ নম্বর ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে।

আরিয়ান তানভীরকে ইশারা করলেন। তানভীর দরজায় প্রচণ্ড জোরে লাথি মারলেন—ঠাস!

“পিবিআই! কেউ নড়বেন না!” তানভীরের গগনবিদারী চিৎকারের সাথে সাথে পুলিশ ঘরে ঢুকল।

ভেতরে শাফকাত আর ওঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রিনতি খাটের ওপর বসে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিল। দরজা ভাঙার শব্দে রিনতি এক তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন। শাফকাত এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল, তারপর ওঁর পাশেই থাকা টেবিলের ওপর থেকে ওঁর ফোন আর ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে জানালার কাঁচ ভেঙে নিচে ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা করল—ডিজিটাল এভিডেন্স ধ্বংস করার শেষ চেষ্টা!

“শাফকাত, নো!” আরিয়ান চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে শাফকাতের কবজি চেপে ধরলেন। শাফকাত ওঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলার চেষ্টা করল। কাঁচের জানালা ভেঙে শাফকাতের হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে ছিটকে পড়ল, কিন্তু স্ক্রিনটা ভাঙেনি।

তানভীর আর দুই কনস্টেবল মিলে শাফকাতকে মেঝেতে চেপে ধরে পিঠের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। ক্লিক! ধাতব হাতকড়ার শব্দে ভোরের নীরবতা ভেঙে গেল।

শাফকাত মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে হাপাচ্ছিলেন। ওঁর চোখ দুটো রাগে আর ভয়ে লাল। সে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর তো বিদেশি ছিল! তোরা আমার লোকেশন পেলি কীভাবে? পুলিশ এত বুদ্ধি কই পায়?”

আরিয়ান মেঝে থেকে ওঁর ফোনটা তুলে নিলেন। ফোন স্ক্রিনে শাফকাতের সেই বিদেশি ভার্চুয়াল নম্বরটি তখনো লগ-ইন করা। আরিয়ান ওঁর সেই পরিচিত শান্ত, গভীর গলায় বললেন, “অপরাধীরা একটা জিনিস ভুলে যায়, শাফকাত সাহেব। প্রযুক্তি অপরাধকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু অপরাধীর মনস্তত্বকে নয়। আপনি ভেবেছিলেন ফোনটা বিদেশি নম্বরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি জানতেন না, আপনার মনের ভেতর যে ভয়টা ছিল, সেই ভয়টাই আপনাকে আজ আমাদের এই খাঁচায় টেনে এনেছে।”

পাশেই রিনতি তখন খাটের কোণে বসে কাঁপছিলেন, ওঁর সমস্ত অহংকার আর চতুরতা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।

পরদিন সকাল।

সিলেটের আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামছে। পিবিআই-এর কালো জিপটি যখন মূল আসামিদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, ফাহিমের বোন নার্গিস বেগম আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেললেন। তবে এবার ওঁর চোখে শুধু শোক ছিল না, ছিল এক ধরণের পরম স্বস্তি।

তানভীর গাড়ির গিয়ার শিফট করতে করতে বললেন, “স্যার, আপনি প্রথম দিন ঢাকাতে বসার যে প্রেডিকশনটা করেছিলেন, ওটা যদি আমরা আরও দুদিন ধরে রাখতাম, তবে শাফকাত আজ সকালে বর্ডার পার হয়ে যেত। আপনার ওই ভুলটা স্বীকার করে বর্ষার সাইবার অ্যানালাইসিসকে ব্যাকআপ দেওয়াটাই আমাদের বাঁচিয়ে দিল।”

আরিয়ান জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকালেন। ওঁর চোখে ভেসে উঠল সেই ২৩ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ সাদমান ফাহিমের হাসিমুখের ছবিটা। বন্ধুত্বের নামে যে নৃশংস বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিল, যে একটা অসহায় মেয়ের সম্মান বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছিল।

“তদন্তকারী কোনো ঈশ্বর নন, তানভীর। ভুল আমাদেরও হতে পারে,” আরিয়ান ওঁর ডায়েরিটা বন্ধ করতে করতে বললেন। “কিন্তু ভুল শুধরে নিয়ে যে লজিক আর টিমওয়ার্কের ওপর ভরসা রাখে, শেষ হাসিটা সে-ই হাসে। আজ অন্তত ফাহিমের সেই পবিত্র বিশ্বাসের একটা মর্যাদা মিলল। এতো দিন পর ওঁর পরিবার আজ শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।”

জিপটা বৃষ্টির জল কেটে হাইওয়ে ধরে ঢাকার দিকে ছুটে চলল। একটি নির্মম এবং জটিল হত্যাকাণ্ডের সফল অবসান ঘটিয়ে আরিয়ান প্রস্তুত হচ্ছিলেন ওঁর পরবর্তী মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সকল মানুষই খোদার প্রতিনিধি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০

আল্লাহ মানুষকে প্রতিনিধি বানিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। প্রতিটি মানুষই যদি আল্লাহর 'প্রতিনিধি' হয়ে থাকে, তাহলে কাদের কাছে এই প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়েছে? এই পৃথিবীতে প্রথম দুইজন প্রতিনিধি ছিলেন - হযরত আদম... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব মাছে গু খায় দোষ হয় ঘাউড়্যা মাছের

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৯


হাসনাত আবদুল্লাহ। বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন। জেনারেশন জেড আর আলফার চোখে তিনি একজন সুপারহিরো। মার্ভেলের ছবিতে যেমন একজন সাধারণ মানুষ হঠাৎ পোশাক পরে আকাশে উড়তে থাকে, হাসনাতও যেন সেরকমই—ধুলোমাখা বাস্তবতার মাঝে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৬

ফারাজা, প্রিয় কন্যা আমার-
আজকে বাংলা ২০শে 'জ্যৈষ্ঠ' ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। আজকের দিনটি হলো বুধবার। 'জ্যৈষ্ঠ' মাসের আরেক নাম হলো মধুমাস। এই মাসে আম, জাম লিচু, কাঠাল পাওয়া যায়। ফাজ্জা আম,... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ঐ যে নদী, পাহাড় গিরি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯



চলো বন্ধু দাঁড়াই গিয়ে
স্রোতস্বিনী নদীর কোলে
যেখানটাতে আছে ভরা
লাল গোলাপী বুনোফুলে।

চলো দাঁড়াই যেথায় পাহাড়
সবুজ রঙের আলো উড়ে
আজ বিকেলে সেখান হতে
একটু না হয় আসি ঘুরে।

চলো না যাই ঝর্ণা ধারায়
যেথায় জলের বইছে হাওয়া
যেখানটাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতকে যা দিয়েছি, তা সারাজীবন মনে রাখবে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৯


১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছিল অনস্বীকার্য। এটা এমন এক ঐতিহাসিক সত্য যাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আওয়ামী লীগকে বিপুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×