
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ল্যাবে তখন রাত একটা। অর্গানিক কেমিস্ট্রির অধ্যাপক রেহান আশরাফ ওঁর টেবিলের ওপর রাখা দুটি আলাদা উপাদানের বিক্রিয়া দেখছিলেন। একটি অ্যাসিড, অন্যটি ক্ষার। দুটি একা শান্ত, কিন্তু মিশে গেলেই তীব্র দহন। রেহান ওঁর নিজের ভেতরেও ঠিক এই দহনটাই টের পাচ্ছিলেন।
ছয় মাস আগের সেই রাতটা রেহানের জীবনকে ওঁর ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডের মতোই ধূসর করে দিয়েছিল। ওঁর পঁচিশ বছরের ছোট বোন, তানিয়া, একটি বেসরকারি ওষুধ কারখানার বিষাক্ত গ্যাস লিক হয়ে মারা যায়। ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ঢাকা পড়ে গেল ক্ষমতার দাপটে। রেহান যখন বিচারের দাবিতে লড়ে যাচ্ছিলেন, তখন ওঁর সহকর্মীরা আড়ালে হাসত, উপহাস করত। সমাজ ওনাকে বোঝাল—নিরীহ মানুষের কান্নার কোনো বাজারমূল্য নেই।
কিন্তু রেহান কোনো জন্মগত অপরাধী ছিলেন না। ওঁর ভেতরে তখনো একজন শিক্ষক বেঁচে ছিলেন। ল্যাবের ডায়েরিতে ওঁর খসড়া করা ‘প্রজেক্ট জিরো’-র নকশার দিকে তাকিয়ে ওঁর হাত কাঁপছিল।
“আমি কি ঠিক করছি?” আয়নায় নিজের ক্লান্ত, চশমা পরা চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করলেন রেহান। ওঁর মনের এক অংশ বলছিল, তুমি শিক্ষক, তুমি জীবন গড়তে শেখাও। অন্য অংশ ফিসফিসিয়ে উঠছিল, যে সমাজ তানিয়াকে কেড়ে নিয়েছে, সে সমাজকে সুস্থ রাখার দায় তোমার নয়।
এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ওনাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। তিনি কয়েকবার ডায়েরিটা পুড়িয়ে ফেলতে চাইলেন, ম্যাচবক্স হাতে নিয়েও থমকে গেলেন। কিন্তু পরদিনই যখন খবরের কাগজে দেখলেন সেই ফ্যাক্টরি মালিক, মন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছেন, রেহানের ভেতরের মানবিক অংশটা চিরতরে হেরে গেল। তিনি বুঝলেন, এই পচা সিস্টেমের ভাষা সরলতা নয়, এর ভাষা হলো চরম আতঙ্ক।
রেহান বুঝতে পেরেছিলেন, ওঁর এই প্রতিশোধের থিয়েটারে ওঁর এমন কিছু চরিত্র প্রয়োজন যারা ওঁর মতোই সমাজের অবহেলায় তৈরি হওয়া এক একটা তীব্র ক্ষোভের বারুদ।
ওঁর প্রথম পছন্দ ছিল আরিফ। আর্কিটেকচারের চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র, যার নকশা করা বহুতল ভবনের ব্লু-প্রিন্ট এক নামী বিল্ডার চুরি করে তাকে ইউনিভার্সিটি থেকে ড্রপ-আউট করিয়ে দিয়েছিল। ল্যাব রুমে আরিফের হাত যখন কাঁপছিল, রেহান ওঁর কাঁধে হাত রাখলেন।
“ওরা তোমার স্বপ্ন চুরি করেছে, আরিফ। তুমি কি চোরদের তৈরি করা দালানে দাস হয়ে বাঁচবে, নাকি সেই দালানের ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে চাও?” রেহানের শান্ত, সম্মোহনী কণ্ঠ আরিফের ভেতরের ট্রমাকে এক ভয়ংকর মতাদর্শে রূপ দিল।
এরপর এলেন সোবহান। কম্পিউটার সায়েন্সের এক অন্তর্মুখী জিনিয়াস। ওঁর মা হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে মারা গিয়েছিল, কারণ ওঁর কাছে ঘুষ দেওয়ার মতো টাকা ছিল না। সোবহানের গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অনলাইন আসক্তিকে রেহান ওঁর মূল অস্ত্র বানালেন।
মফস্বলের এক নির্জন পাহাড়ি খামারে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু সেখানে কোনো ধর্মীয় উন্মাদনা ছিল না, সেখানে ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক ল্যাবরেটরি। রেহান ওদের শেখালেন সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক চরমপন্থী যুদ্ধের কৌশল।
তবে আরিফের ভেতরেও দ্বন্দ্ব ছিল। একদিন রাতে আরিফকে একা বসে কাঁদত দেখে রেহান ওঁর পাশে গিয়ে বসলেন। আরিফ বলল, “স্যার, যারা মারা যাবে, তারা তো নির্দোষও হতে পারে।”
রেহান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। ওঁর নিজের মেন্টর সত্তা ওনাকে নাড়া দিল। তিনি আরিফকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বললেন, “অস্ত্রোপচারের সময় কিছু সুস্থ কোষও মারা যায়, আরিফ। এই সমাজকে বাঁচাতে হলে এই নির্মমতাটুকু আমাদের সইতেই হবে।” রেহান আরিফকে নয়, আসলে ওঁর নিজের বিবেককেই সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
কোনো উৎসব বা বিশেষ দিন নয়, রেহান বেছে নিলেন অক্টোবরের এক সাধারণ বিষণ্ণ বৃহস্পতিবার। স্থান—শহরের কূটনৈতিক জোন থেকে দূরে, উত্তর প্রান্তের লেকের ওপরে অবস্থিত এক বহুতল কাচের রেস্তোরাঁ ও আর্ট গ্যালারি, ‘দ্য গ্লাস হাউজ’।
এখানে প্রতি বৃহস্পতিবার লাতিন আমেরিকার দূতাবাসের কর্মকর্তা, শহরের শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং বুদ্ধিজীবীরা এক ছাদের নিচে জড়ো হতেন এক বিলাসী সান্ধ্যকালীন আড্ডায়।
রেহান ওঁর মাস্টারপ্ল্যান এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যাতে কোনো প্রথাগত গোয়েন্দা সংস্থা ওঁর নেটওয়ার্ক ধরতে না পারে। সোবহান ডার্কনেটের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন চ্যানেল তৈরি করল, যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেবল রেহানের ডেক্সটপে।
“কোনো রক্তপাত আমাদের মূল লক্ষ্য নয়,” রেহান ওঁর শিষ্যদের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাপের ওপর আঙুল রাখলেন। ওঁর কণ্ঠস্বর তখন বরফের মতো শীতল। “আমাদের লক্ষ্য হলো এই শহরের প্রিভিলেজড ক্লাসের আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেওয়া। ওদের বোঝানো যে ওদের টাকা বা নিরাপত্তা—কোনো কিছুই ওদের বাঁচাতে পারবে না।”
ক্লাইম্যাক্সের মাত্র তিন দিন আগে, রেহান আবার থমকে গিয়েছিলেন। ডেক্সটপে আরিফ ও সোবহানের নিষ্পাপ হাসিমুখের প্রোফাইল পিকচার দেখে ওঁর মনে হয়েছিল—আমি এই তরুণদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি না তো? তিনি মাউস থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই ওঁর ড্রয়ারে রাখা তানিয়ার শেষ ব্যবহৃত চশমাটার দিকে চোখ পড়তেই ওঁর চোখ আবার পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। ওঁর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর সম্পূর্ণ হলো।
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে নয়টা। ‘দ্য গ্লাস হাউজ’ তখন আলো আর মৃদু মিউজিকের আড়ালে মগ্ন। দামী পারফিউম আর এলিট ক্লাসের হাসির শব্দে মুখরিত চারপাশ।
হঠাৎ মূল ফটকের কাচের দেয়ালটা ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। সোবহানের তৈরি করা ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামারে পুরো রেস্তোরাঁর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। ব্যাকআপ জেনারেটর যখন চালু হলো, অতিথিরা দেখলেন প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন মুখোশধারী তরুণ। ওদের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।
“সবাই শান্ত হয়ে বসুন,” আরিফের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু ওঁর হাতের রাইফেলটা স্থির ছিল। “আজ রাতে আপনাদের ভাগ্য আপনাদের টাকা নির্ধারণ করবে না।”
শুরু হলো এক দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি দশা। রেহান রেস্তোরাঁ থেকে বহু দূরে ওঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসে ল্যাপটপের লাইভ অডিও ফিড শুনছিলেন। প্রতিটা আর্তনাদ, প্রতিটা বুলেটের শব্দ ওঁর কানের ভেতর বাজছিল। ওঁর হাত কাঁপছিল, তিনি টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করলেন। ওঁর ভেতরে কোনো পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিল না, বরং এক গভীর, অন্তহীন বিষাদ ওনাকে গ্রাস করছিল। তিনি বিড়বিড় করলেন, “আমি সমাজকে এটাই দেখাতে চেয়েছিলাম।”
পুলিশ ও সোয়াত টিম যখন প্রথম দফায় পেছনের লেক দিয়ে স্পিডবোটে ঢোকার চেষ্টা করল, সোবহানের আগে থেকে পাতা থার্মাল মাইনগুলো বিস্ফোরিত হলো। পুরো লেকের জল আগুনের কুণ্ডলীতে রূপ নিল। দুই পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারালেন। চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল বারুদ আর পোড়া মাংসের গন্ধ। নিরপরাধ মানুষের এই চরম পরিণতি পুরো শহরের নিরাপত্তাহীনতাকে নগ্ন করে দিল।
ভোর চারটে। পুরো গ্লাস হাউজ অবরুদ্ধ। সামরিক কমান্ডোরা চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সোবহান ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখল ওঁর তৈরি করা জ্যামিং কোডগুলো একে একে ক্র্যাশ করছে। ও রেহানকে এনক্রিপ্টেড লাইনে বলল, “স্যার, ওরা মেইন গেট ভাঙছে। আমাদের সময় শেষ।”
রেহান ওঁর কোয়ার্টার থেকে রেডিওতে আরিফ ও সোবহানের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করেছ। এবার নিজেদের বাঁচাও। পেছনের ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে যাও।”
কিন্তু চরমপন্থার মনস্তত্ত্ব এমনই ধ্বংসাত্মক, যা একবার তৈরি হলে তা স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণও মানে না। আরিফ ওঁর মুখোশটা খুলে ফেলল। ওঁর চোখে তখন এক অদ্ভুত, উন্মাদ আলোর বিচ্ছুরণ। ও বলল, “না, স্যার। আপনিই তো বলেছিলেন, অস্ত্রোপচারের সময় কিছু সুস্থ কোষও মরে। আজ আমরাও মরব। কিন্তু এই শহর আমাদের ভুলবে না।”
আরিফ ও সোবহান ইমার্জেন্সি এক্সিট লক করে দিল। ওনারা আত্মসমর্পণ করলেন না। সকাল ৫টা ১৫ মিনিটে যখন কমান্ডোদের সাঁজোয়া যান রেস্তোরাঁর কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকল, ওনারা শেষ বুলেট পর্যন্ত লড়াই করলেন। তীব্র গুলির লড়াইয়ে আরিফ ও সোবহানের নিথর দেহ কাচের টুকরো আর রক্তের ওপর লুটিয়ে পড়ল। ওনাদের সাথে মারা গেলেন ভেতরে থাকা তেরোজন নিরীহ জিম্মিও।
রেহান ওঁর ল্যাপটপের ওপারে শুধু লাইনের ওপ্রান্তের নীরবতাটুকু শুনতে পেলেন। ওঁর তৈরি করা ক্যাটালিস্টরা ধ্বংস হয়ে গেছে, সাথে নিয়ে গেছে একঝাঁক নিরপরাধ প্রাণ। রেহান ওঁর চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। ওঁর গাল বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এই চরমপন্থার পরিণতিতে কেউ জেতেনি; সমাজ হারিয়েছে ওঁর সন্তানদের, আর রেহান হারিয়েছেন ওঁর মানবিকতার শেষ অংশটুকু।
হামলার ঘটনার তিন মাস কেটে গেছে।
গ্লাস হাউজের সেই রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডির তদন্ত এখনো চলছে। আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর ওপর দায় চাপিয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওনাদের ফাইল বন্ধ করে দিয়েছে। আসল মাস্টারমাইন্ডের কোনো সুতোও ওনারা ছুঁতে পারেননি।
সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানিক কেমিস্ট্রির ক্লাসরুমে। গ্যালারি ভর্তি ছাত্র-ছাত্রী খাতা-কলম নিয়ে বসে আছে।
ফ্রন্ট ডেস্কে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক রেহান আশরাফ। ওঁর পরনে সেই ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা ক্যাটালিস্ট অ্যাপ্রন। চোখে নতুন ফ্রেমের শান্ত চশমা। ওঁর মুখে কোনো অট্টহাসি নেই, কোনো উন্মাদনা নেই। তিনি অত্যন্ত সংযত, মৃদু এবং সাবলীল গলায় চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডে একটি রাসায়নিক সমীকরণ লিখছিলেন।
তিনি ক্লাসের দিকে তাকালেন। ওঁর চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু ওঁর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর, বরফশীতল শূন্যতা।
“রসায়নে একটা নিয়ম আছে,” রেহান ওঁর শান্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, “কিছু উপাদান বাইরে থেকে দেখতে ভীষণ নিষ্ক্রিয় মনে হয়। এদের দেখে বোঝার উপায় থাকে না এদের ভেতরে কতটা বিষ লুকিয়ে আছে। কিন্তু সঠিক উদ্দীপক পেলে ওনারা পুরো পরিবেশকে ধ্বংস করে দিতে পারে।”
পুরো ক্লাস মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওঁর লেকচার শুনছিল, ওঁর জন্য নোট নিচ্ছিল। কেউ জানত না, ওনাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই হাসিমুখের প্রিয় শিক্ষকটিই এই শহরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতটির স্থপতি।
রেহান চকটি টেবিল ডাস্টারের পাশে রাখলেন এবং ওঁর ঠোঁটের কোণে এক সুক্ষ্ম, শীতল ও প্রায় অদৃশ্য অনুভূতির রেখা ফুটে উঠল। তিনি আবার ডাস্টার তুলে বোর্ড মুছতে লাগলেন। সমাজ ওনাকে দেখতে পায়নি, আর তিনিও ওঁর গোপন অন্ধকার নিয়ে মিশে রইলেন এই সমাজেরই ভিড়ে।
[ সমাপ্ত ]
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



