somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চাকর থেকে হিন্দু 'জমিদার'.........

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ১২:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৭১২ খৃষ্টাব্দে ভারতের সিন্ধু প্রদেশে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ বিন কাসিম আগমন করেন বিজয়ীর বেশে এবং এটা ছিল ইসলামের বিরাট রাজনৈতিক বিজয়। তাঁর বিজয় সিন্ধুপ্রদেশ পর্যন্তই সীমিত থাকেনি। বরঞ্চ তা বিস্তার লাভ করে পাঞ্জাবের মূলাতন পর্যন্ত।

"মুসলমানগণ বিজয়ীর বেশে এ দেশে আগমন করার পর এ দেশকে তাঁরা মনে প্রাণে ভালোবাসেন, এ দেশকে স্থায়ী আবাসভূমি হিসাবে গ্রহণ করেন এবং এ দেশের অমুসলিম অধিবাসীর সাথে মিলে মিশে বাস করতে চেয়েছেন। শাসক হিসাবে শাসিতের উপরে কোন অন্যায়-অবিচার তাঁরা করেননি। জনসাধারণও তাঁদের শাসন মেনে নিয়েছিল। মুহাম্মদ বখতিয়ার বাংলা বিজয়ের পর অভ্যন্তরীণ আইনশৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মুসলমানাদের জন্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ও মাদ্রাসা স্থাপন করলেও অমুসলিমদের প্রতি উদানীতি অবলম্বন করেন। তিনি ইচ্ছা করলে পলাতক লক্ষ্মণ সেনের পশ্চাদানুসরণ করে তাকে পরাজিত করতে পারতেন। কিন্তু সে কথা তিনি মনে আদৌ স্থান দেননি। "যদুনাথ সরকার তাঁর ‘বাংলার ইতিহাসে’ বলেনঃ“……কিন্তু তিনি রক্তপিপাসু ছিলেন না। নরহত্যা ও প্রজাপীড়ন তিনি পছন্দ করতেন না। দেশে এক ধরনের জায়গীর প্রথা বা সামস্ততান্ত্রিক সরকার কায়েমের দ্বারা আভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও সামরিক প্রধানদের সন্তুষ্টি সাধন করতেন”।…-(History of Bengal Vol. 2,Mislim periodp. 9)"

একসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর এই উপমহাদেশে আগমন ঘটে। ইংরেজগণের শতাধিক বৎসরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ব্যবসায়ী থেকে শাসকে পরিণত হয়েছিল, সাড়ে পাঁচশত বৎসর ব্যাপী প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসনের মূলোৎপাটন করে এ দেশবাসীকে গোলামীর শৃখলে আবদ্ধ করেছিল॥ অকৃতজ্ঞ ক্ষমতালিপ্সু ইংরেজগণ ও তাদের দালাল হিন্দু প্রধানগণ সিরাজদ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করে চিরদিনের জন্যে মুসলিম শাসন বিলুপ্ত করার যে ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করে তা চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয় –পলাশীর ময়দানে।

পরবর্তীতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে এই বাংলায় অনেক বিদ্রোহ হয়েছে। যেমন সিপাহী বিদ্রোহের বিষয়ে তৎকালীন বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশেন এবং বাঙালি ব্যক্তিত্বদের মধ্যে কিশোরী চাঁদ মিত্র, শম্ভু চন্দ্র মুখোপাধ্যায়,হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ প্রকাশ্যেই মন্তব্য করেছেন যে, ‘সিপাহী বিদ্রোহ হচ্ছে সিপাহীদের ব্যাপার এবং এর সংগে জনসাধারণের (অর্থাৎ হিন্দুদের) কোনই সম্পর্ক নেই।’ আশ্চার্যের বিষয় এই যে, ঊনবিংশ শতব্দীর শেষ ভাগপর্যন্ত কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী মহলের কেউই এমনকি পরোক্ষভাবেও সিপাহী বিদ্রোহের পক্ষে কোনও কথাই বলেননি। আধুনিক যুগের ভাষায় এঁদের ‘হিন্দু রাজাকার’ নামে আখ্যায়িত করা যায়। (এম আর আখতার মুকুল - কোলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণী: সাগর পাবলিশার্স, ঢাকা, পৃঃ ৩৩, ১৯৮৮)"

এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কারণে এই বাংলায় চাকর থেকে হিন্দুদের জমিদার হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। প্রায়ই হিন্দুদের বলতে শোনা যায় যে, এই বাংলাদেশের সব জমি নাকি হিন্দুদের। তারা মুসলমানদের ওপর হিন্দুদের জমি কেড়ে নেয়ার অপবাদ দেয়। অথচ ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে মুসলমানদের জমিগুলো কেড়ে নিয়ে হিন্দুদের দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, সেসব জমি ব্রিটিশরা দেয় তাদের কিছু চাকর শ্রেণীর হিন্দুদের। এই চাকর শ্রেণীর হিন্দুদের মধ্যে রবীন্দ্র নাথের পূর্বপুরুষও রয়েছে। এসব চাকর থেকে জমিদার হওয়া হিন্দুদের তালিকা ইতিহাসে আজও সংরক্ষিত আছে।

(১) ভাওয়াল এস্টেট পরিধি এবং আয়ের দিক থেকে পূর্ব বাংলায় নওয়াব এস্টেটের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি। ভাওয়াল জমিদার বংশের পূর্ব পুরুষগণ মুন্সিগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানা যায়। এই বংশের জনৈক বলরাম সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে ভাওয়াল পরগনার জমিদার দৌলত গাজীর দীউয়ান হিসেবে কাজ করতেন। বলরাম এবং তার পুত্র শ্রীকৃষ্ণ তৎকালীন বাংলার দীউয়ান মুর্শিদকুলী খানের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন এবং কৌশলে গাজীদের বঞ্চিত করে জমিদারি হস্তগত করেন। [ তথ্যসুত্র - উইকিপিডিয়া]

(২) মতিলাল শীল প্রথমে ছিল খুব গরীব। ইংরেজের সহযোগী হওয়ার ফলে এত জমি ও জমিদারির মালিক হল যে তার থেকে বার্ষিক আয় হতো ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

(৩) মুর্শিদাবাদের কান্দি ও পাইকপাড়ার জমিদার রাধাকান্ত সিংহ ছিল সিরাজউদ্দৌলার একজন কর্মচারী মাত্র। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে দলিলপত্র পাচারের জন্য কোম্পানী তাকে বিশেষভাবে পুরষ্কৃত করে জমিদার বানায়।

(৪) কান্তমুদি প্রকৃত অর্থেই ছিল মুদির দোকানদার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রণেতা হেস্টিংসের অত্যাচারের সহযোগিতায় সে ও তার পুত্র লোকনাথ নন্দী ‘রাজা’ পদ পেয়েছিল। বহু জমিদারির মালিক হয়েছিল তারা। যার বার্ষিক জমার মোট পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ১০৫ সিক্কা টাকা।

(৫) হাওড়ার আন্দুল রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা রামচরণ রায়। গভর্নর ভান্সিটার্ট ও জেনারেল স্মিথের অধীনে চাকর থেকে, তাদের অত্যাচারের সহযোগী হয়ে সেও তার আখের গুছিয়ে নিয়েছিল।

(৬) খিদিরপুর ভুকৈলাশ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। সেও মিস্টার ভেরেলস্টের দেওয়ান বা চাকর ছিল। শেষে সন্দ্বীপের জমিদারিটি গুছিয়ে নিয়েছিল।

(৭) কালীশংকর রায় গুণ্ডা বা লাঠিয়াল ছিল। ইংরেজদের গোলামি করে জমিদারির মালিক হয়ে ‘রাজা’ বলে বিখ্যাত হয়েছিল সে।

(৮) দিনাজপুরের রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মানিকচাঁদ ছিল মি. জন ইলিয়টের চাকর। তার পৌত্র ফুলচাঁদ ইংরেজদের দেওয়ানী পদ পেয়ে কিনে নিয়েছিল দিনাজপুরের জমিদারি।

(৯) রানাঘাটের কৃষ্ণপাল ও শম্ভুপাল ছিল পান ব্যবসায়ী। ইংরেজের গোলামি করে বিরাট ধনী হয়েছিল তারা।

(১০) সিঙ্গুরের দ্বারকানাথের বাবা প্রথমে গৃহভৃত্যের কাজ করত। ১৮০৭ সালে দ্বারকানাথ ইংরেজদের নজরে পড়ে হয়ে যায় বিরাট ধনী। উল্লেখ্য, এই দ্বারকানাথই রবীন্দ্রর দাদা।

(১১) হরিঘোষ ইংরেজদের অধীনে মুঙ্গের দুর্গের চাকর ছিল। সে এত বড় ধনী হয়েছিল যে ‘হরিঘোষের গোয়াল’ প্রবাদটি তার নামেই প্রচলিত হয়।

(১২) এমনিভাবে ধনী হয়েছিল জোড়াসাঁকোর সিংহপরিবার। শান্তিরাম সিংহ মিডলটন ও স্যার টমাস রামবোল্ডের চাকর ছিল। (তালিকাটি গোলাম আহমাদ মোর্তজার ‘বজ্রকলম’ বই থেকে নেয়া। বইয়ে দেয়া তালিকাটি আরও বড়ো, পাঠকের সুবিধার্থে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হয়েছে)

প্রকৃতপক্ষে হিন্দুরা কখনোই উচ্চশ্রেণীর ছিল না॥ ব্রিটিশ আমল ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল একটি দুর্ঘটনা, যার ফলে কিছু চাকর শ্রেণীর হিন্দু 'জমিদার' সাজতে পেরেছিল।

১৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চন্দ্রপ্রভা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

চন্দ্রপ্রভা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তোমাকে দেখে মোহিত হই চন্দ্রপ্রভা
রোদ পড়লে চকচক করে
এতই সুন্দর লাগে
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
কিন্তু পাই না যে সাহস।
তুমি নাই বলে কি এত ঝড়?
তুমি পাশে নাই বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কি পেলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



বাংলার দুই নোবেল জয়ী রবি ঠাকুর আর ডঃ ইউনুসের পিছনে অনেক কথাই তো বললেন।
ব্লগ লেখায় ভরিয়ে ফেললেন!
খোদা তাঁদেরকে যে জায়গা দিয়েছেন, তা থেকে এক চুল কি নিচে নামাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমরা নেহা বোরা কে বাংলাদেশের কথা বোলো না

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২


নেহা বোরাকে তোমরা বাংলাদেশের কথা বোলো না। বোলো না যে, তিনি যখন বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, তখন বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনেরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে জেয়াফত খাওয়ার আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×