দক্ষিণ পশ্চিম চীনের ইয়ুননান প্রদেশের দিছিং তিব্বতী জাতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে তিব্বতী , পাই ও লিসুসহ বিশটিরও বেশি সংখ্যালঘু জাতি বাস করে । মনোরম চিনশাচিয়াং নদী এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে দূরদূরান্তে বয়ে গেছে । নদীর তীরে বসবাসকারী তিব্বতী তরুণ ও পাই জাতির তরুণীর বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পর্কে -
তিব্বতী জাতির ঐতিহ্যবাহী সংগীতের তালে তালে ভোরবেলায় তিব্বতী তরুণ ছালাম এঞ্জুরের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি কাজ পুরোদমে চলছিল । বাড়ির প্রাঙ্গণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে , রঙবেরঙের পতাকা বাতাসে পত পত করে উড়ছে । সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দপূর্ণ পরিবেশে ভরপুর । ছালাম এঞ্জুরের বাড়ির বৈঠকখানায় ধানের শীষ , ভুট্টা , আপেল ও আখরোট ইত্যাদি রাশিকৃত অবস্থায় রয়েছে । এতে এ বছর ছেলের বাসায় আরেকবার প্রাচুর্যময় ফলন লাভের প্রকাশ পেয়েছে । বিয়ের অভিনন্দন জানাবার জন্য গ্রামবাসীরা ছেলের বাসায় আসলেন । সবাই তিব্বতী ভাষায় ছেলের প্রতি সুখী জীবনের শুভেচ্ছা জানালেন । ছেলের বাবা মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন । তারা ধন্যবাদ জানাবার জন্য দূর থেকে আসা অতিথিদের শুভেচ্ছামূলক এক ধরনের রেশমী ওড়না উপহার দিলেন । বিয়ের অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি কাজ সাহায্য করার জন্য গ্রামের নারীরাও ছেলের বাড়িতে আসলেন । তাদের মধ্যে কেউ কেউ অতিথিদের চা খাওয়াচ্ছেন , কেউ কেউ বাচ্চাদের মিষ্টদ্রব্য ও জলখাবার বিলি করছেন এবং কেউ বা তিব্বতী জাতির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জলখাবার তৈরী করছেন । ছেলের বাড়ি আনন্দে ভরা ।
ছালাম এঞ্জুর ও তার পরিবারের সদস্যরা দিছিং তিব্বতী জাতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের তেছিং জেলার বেন চি লেন থানায় বাস করেন । প্রাচীনকাল থেকে এই থানা ইয়ুননান থেকে তিব্বতে যাওয়ার একটি সংযোগস্থল । এই থানায় তিব্বতী জাতি ছাড়া পাই জাতি ও নাসি জাতিসহ আরো কয়েকটি সংখ্যালঘু জাতির অধিবাসীরাও থাকেন । ভোর বেলায় নিজেকে আরো সৌন্দর্যময় করে তোলার জন্য বধূ থানার বিউটি স্যালুনে গেলেন । তিনি পাই জাতির ঐতিহ্যিক বিয়ের পোষাক পরলেন ।
সকাল ন'টায় বধূকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আত্মীয় স্বজন সমভিব্যাহারে বর বধূর বাসায় আসলেন । বধূকে বিদায় সংবর্ধনা জানাবার জন্য বধূপক্ষের আত্মীয় স্বজনরা গান গাইছেন । সবাই উত্ফুল্লচিত্তে
বরপক্ষের বাসায় যাচ্ছেন ।
বরের বাড়িতে নতুন দম্পতি উভয় পক্ষের বাবা মাকে হাদা নামে শুভেচ্ছামূলক এক ধরনের শাদা রেশমী ওড়না উপহার দিলেন । তার পর বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয় । বর ছালাম এঞ্জুর বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের প্রতি ধন্যবাদ জানালেন ।
বর ছালাম এঞ্জুরের মা আলিয়ানের বয়স ৬৩ । থানার একজন বিশ্রুত গায়িকা হিসেবে তিনি জাপান সফরে গিয়েছিলেন । ছেলের বিয়ের দিন উপলক্ষে মা আনন্দের সঙ্গে একটি গান গাইলেন ।
গানে বলা হয়েছে , আত্মীয় স্বজন বহু দূর থেকে এসেছেন । সুখী পথ তাদের জন্য সুচনা হয়েছে ।
বৃদ্ধা আলিয়ানের তিব্বতী গান শেষে বধুপক্ষের আত্মীয় স্বজনরা পাই জাতির ভাষায় গান গাইতে লাগলেন । সংগীতের তালে তালে তিব্বতী জাতির তরুণ ছালাম এঞ্জুর ও পাই জাতির তরুণী চাং হোং ইয়ানের বিয়ের অনুষ্ঠানে উত্সাহব্যঞ্জক পরিবেশ বিরাজ করছিল । আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধবী মিলে নতুন দম্পতিকে হাদা উপহার দিলেন , মদ খাওয়ালেন । তারা তাদের সন্তান-সন্ততিসহ সুখী জীবনের শুভ কামনা করলেন ।
বধূ চাং হোং ইয়ান একজন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা । তিনি ও তার স্বামী ছোট বেলা থেকে বেন চি লান থানায় বাস করেন । তারা পরস্পরকে ভালবাসেন । চাং হোং ইয়ান বলেন , তিনি স্বামীকে খুব ভালবাসেন । তরুণটি লম্বা , স্বাস্থ্যবান ও পরিশ্রমী । আজকের বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি খুব খুশি হয়েছেন ।
আজ তাদের যে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে , তাতে সর্বপ্রথমে দু'পক্ষের বাবা মাকে ধন্যবাদ জানাতে হবে । তা ছাড়া তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য আত্মীয় স্বজনকেও ধন্যবাদ জানাতে হবে । তাদের আগমনের জন্য নতুন দম্পতি খুব আনন্দিত হয়েছেন ।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে ভোজের আয়োজন করা হয় । অতিথিরা একদিকে তিব্বতী জাতির মাখন চা ও বিবিধ জলখাবার খাচ্ছেন , অন্য দিকে উত্ফুল্লচিত্তে গল্প করছেন এবং পরস্পরের জন্য সুখ কামনা করছেন । বেন চি লান থানার গেরম নামে একজন বৃদ্ধ বলেন , দিছিং তিব্বতী জাতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে আবহাওয়া উষ্ণ , নদ-নদী বহুল , নদীর স্রোতে বয়ে আসা পলি জমে জমে যে সমতল ভূমি সৃষ্টি হয়েছে , সে সব কৃষি জমিতে ফসল চাষাবাদের জন্য খুব উপযুক্ত । স্থানীয় তরুণ -তরুণীদের বিয়ের অনুষ্ঠান সাধারণতঃ শীতকালে আয়োজন করা হয় । তখন কৃষি কাজ কম । গ্রামবাসীদের আমোদ প্রমোদ ও সমাবেশের আরো বেশি সম্ভাবনা আছে ।
তুষারে আবৃত পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী তিব্বতীরা পশু পালন করে থাকেন । কিন্তু চিনশাচিয়াং নদীর উপত্যকায় বাস করা তিব্বতীরা প্রধাণতঃ ধান , ভুট্টা, মরিচ , চিনা , আখরোট , খুবানি , আপেল ও নাশপাতিসহ নানা রকম ফল , খাদ্য ও অর্থকরী ফসল চাষ করেন । তরুণ-তরুণীদের বিয়ের অনুষ্ঠানে তিব্বতী জাতির চাষাবাদভিত্তিক সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি প্রকাশ পেয়েছে ।
সুস্বাদু সব খাবার খাওয়া শেষে সবাই বরপক্ষের বাসার নিকটবর্তী একটি বিরাট মাঠে এলেন । তারা স্যুয়ান চি নৃত্য নামে তিব্বতী জাতির এক ধরনের প্রাচীন নৃত্য পরিবেশন করলেন । প্রতি বছর যখন গুরুত্বপূর্ণ উত্সব ও উদযাপনী অনুষ্ঠান পালিত হয় , তখন এই ধরনের নাচ পরিবেশিত হয় । তারা একদিকে গান করেন , অন্য দিকে নাচেন । মাঝে মাঝে এই ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য কয়েক শো জনের সমাবেশ হয় । তখন সারা মাঠ আনন্দের সাগরে ডুবে যায় ।
তিব্বতী জাতির তরুণ ও পাই জাতির তরুণীর বিয়ের অনুষ্ঠানে চীনের সংখ্যালঘু জাতির চালচলন ও প্রাণঢালা পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে । আসলে ইয়ুননান প্রদেশের দিছিং তিব্বতী জাতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তুষার পাহাড় , তৃণভূমি ও হ্রদসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ
তিব্বতী জাতির তরুণ ও পাই জাতির তরুণীর বিয়ের অনুষ্ঠান
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত
আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?

বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন
সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান
সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল

সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন
নীল গ্রহের শেষ প্রেম // কেয়া এবং আমি।

আমি ভেসে আছি মহাশূন্যে।
আমার শরীরে রূপালী স্পেসস্যুট।
চারপাশে অসীম অন্ধকার।
আর আমার সামনে দূরে জ্বলছে এক নীলাভ-সবুজ গ্রহ—
Earth-666।
এই গ্রহেই আমার জন্ম।
এই গ্রহেই আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম।
আর এই গ্রহই আমার কাছ থেকে সবকিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”
এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন
=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।
বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।
যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।