somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ব্লাউজের পিছনে কী আছে, ব্লাউজের পিছনে কী?"

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"এই, 'চোলি' মানে কী বলতো!"
"জানি না। চোলি মানে কী?"
"ব্লাউজ। চোলি মানে ব্লাউজ।"
"ও আচ্ছা।"
"আরে বুঝলি না.....'চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়, চোলি কে পিছে!' হিহিহি।"
উপরের কথোপকথন ক্লাস থ্রি/ফোরে পড়া দুইটি ছাত্রের। বয়সের হিসাবে ওদের শিশু বলাই যায়।
বলিউডে 'খলনায়ক' তখন বিরাট ব্লক বাস্টার। স্যাটেলাইট টিভি তখনও সেইরকম সহজলভ্য না হওয়ায় বলিউডি জোয়ারে বাংলাদেশ ডুবতে একটু সময় লাগতো। তবে ডুবতো ঠিকই। বাংলাদেশের প্রতিটা ক্যাসেটের দোকানে তখন এই গান বাজতো।
সুরটা আকর্ষনীয় হওয়ায় সহজেই মাথায় ঢুকে যেত এবং কিছুতেই বেরুতে চাইতো না।
কাজেই বাচ্চারাও তখন বুঝে না বুঝে গুনগুন করে একটা প্রশ্ন করতো, "চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়, চোলি কে পিছে?"
গীতিকার যদিও পরের লাইনেই উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু গানটা যে 'দিলের' জন্য হিট করেনি সেটা গ্রীষ্মের দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে জাবর কাটতে থাকা অতি নিরিহ গবাদি পশুও দিব্বি বলে দিতে পারবে।
এর কিছুদিন পরে এলো "সেক্সি, সেক্সি, সেক্সি মুঝে লোগ বোলে, হাই সেক্সি, হ্যালো সেক্সি কিউ বোলে...."
লিরিক এখানেই থামলো না। এলো "কাভি মেরে সাথ, কোই রাত গুজার, তুঝহে সুবহা তাক ম্যায়, কারু পেয়ার!"
একবার এক কমেডিয়ান মজা করে বলেছিলেন, "ভিডিওতে পোলার চেহারা দেখে কিন্তু মনে হচ্ছিল না মাইয়াটারে পাইলে দুই তিন রাতের আগে ছাড়ার কোনরকম নিয়্যত তার আছে!"
যেকোন কিছুকে দ্রুত জনপ্রিয় করার সবচেয়ে সহজতম উপায় হচ্ছে সেটাকে অশ্লীল করে ফেলা। আদি রসে ডুবিয়ে দাও, তাহলেই দর্শক খাবে।
চলচ্চিত্রে আমরা এর অব্যর্থ প্রয়োগ দেখতে পাই। অনেক লেখককেও দেখেছি এই কাজটি করে অতি দ্রুত জনপ্রিয় হবার চেষ্টা নিতে।
অপ্রয়োজনে একটা সেক্স/রেপ সীন বর্ণনা করতে শুরু করে দেন। একজন লেখিকা তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের যে ঘিনঘিনে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা পড়ে তাঁর প্রতি এতটুকুও সিম্পেথিতো জন্মায়ইনি, বরং সন্দেহ জেগেছিল, উনি এঞ্জয় করেননিতো?
ব্লগাররাও তাই করছেন। এতে গল্পের মূল বক্তব্য কোথায় হারিয়ে যায়, সেদিকে বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই। জয় অশ্লীলতা!
বলিউডি উদাহরণই দেই।
কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বলিউডের সর্বকালের সর্বসেরা সিনেমা কোনটা - বেশির ভাগই উত্তর দিবেন, "দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে।"
বলিউডের ইতিহাস পাল্টে দেয়া একটি চলচ্চিত্র। তিনশো সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হলে চলেছে। এক বছর সমান বাহান্ন সপ্তাহ। তার মানে ছয় বছর ধরে দর্শককে হলে টেনে এনেছে এই ছবি। অথচ একটিও অশ্লীল দৃশ্য নেই। কিভাবে হলো?
স্ক্রিপ্ট রাইটার/ডিরেক্টর কেবল মাথা খাটিয়েছেন গল্পের মূল বক্তব্য বর্ণনার দিকে। নায়িকার গোসলের দৃশ্য কিংবা নায়কের সাথে বেড সীন নিয়ে ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করেননি।
এই বিষয়ে সালমান খানের একটা কথা বলতেই হয়।
সালমান খান জীবনেও কোন নায়িকাকে চুমু দেন নি। মানে অন স্ক্রীন চুমুর কথা বলছি আর কি। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "একটি চুমুর দৃশ্য একটি স্ক্রিপ্টের জন্য এতটা জরুরি হতে পারেনা যে সেটাকে রাখতেই হবে। আর যদি সেটা হয়, তবে সেটা অত্যন্ত দূর্বল স্ক্রিপ্ট।"
সালমানের যুক্তি পরিষ্কার, তাঁর সিনেমা পরিবারের সবাই মিলে দেখতে যায়। কাজেই তিনি এমন কিছু রাখতে চাননা যেখানে কারও অনুভূতিতে বিন্দুমাত্র আঘাত লাগতে পারে।
পর্দার সালমানের চেয়েও বাস্তবের সালমান তাই অনেক বড় নায়ক!
টাইটানিকের সেই বিখ্যাত ছবি আঁকার দৃশ্য বাদ দিলে কী খুব একটা ক্ষতি হয়ে যেত? নাহ। সিনেমা সেরকমই অমর হতো।
মাঝে দিয়ে ক্লাস নাইনে পড়া আমার এক সহপাঠি যখন চোখ টিপে বলেছিল, "টাইটানিক দেখেছিস? দেখিস, খুব মজা পাবি!" তখন তার উপর এত রাগ লেগেছিল! একটি দুর্দান্ত প্রেমের গল্পের এমন ট্র্যাজিক ক্লাইমেক্সের কিছুই তার মাথায় ঢুকেনি। সে তখনও ছবি আঁকার দৃশ্যেই আটকে আছে। আহারে!
সেদিন এখানকার হিন্দি রেডিওতে এক বাবা ষ্টুডিওতে ফোন করে তাঁর মেয়ের জন্মদিনে "শিলা কী জাওয়ানি" গানটি উৎসর্গ করলেন। মেয়ের নাকি সেটা ষষ্ঠ জন্মদিন ছিল।
ধন্য হে পিতা-এ-হিন্দ! তুমি ধন্য!
ঐ একই রেডিওতে বাচ্চাদের অনুষ্ঠানেও 'শিলা কী জাওয়ানি' সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। বাচ্চারা ফোন করলেও এই গানটা বাজে, না করলেও বাজে। মা বাবা ষ্টুডিওতে ফোন করে বলেন, এই গানটা শুনলে তাঁদের বাচ্চারা নাচতে শুরু করে।
এ যেন আমাদের সেই গুনগুনিয়ে "ব্লাউজের পিছনে কী আছে, ব্লাউজের পিছনে কী?" গানের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
আমি বুঝিনা, ওরা কী হিন্দি না বুঝে গানটাতে নাচে গায়? নাকি আমার দূষিত মনই চমৎকার একটি হিন্দি গানের অশ্লীল মানে খুঁজে বের করে?
আরেকবার আরেক অনুষ্ঠানে দেখি বাচ্চারা নাচছে আরেক গানে।
"গোরে গোরে নটি, নটি, রাউন্ড রাউন্ড টুং!"
যাহার বাংলা করিলে আক্ষরিক অর্থ দাঁড়াইবে, "ফর্সা, ফর্সা, দুষ্টু দুষ্টু, গোল গোল পাছা!"
চোখ কপালে উঠে গেছে?
কিন্তু সেদিনতো দেখি দর্শকরা খুব মজায় তালি বাজাচ্ছিলেন। দর্শক মানে ঐ বাচ্চাদেরই মা বাবা - কাকা কাকিরা। হিন্দি যাঁদের মাতৃভাষা!
এরপরে কোন একদিন যদি আপনার টিনেজ কন্যা হঠাৎ করেই বমি করতে শুরু করে, তখন যেন আবার আপনি তাকে পেটাতে পেটাতে প্রশ্ন না করেন, "What did I do wrong?"
সে কিছু বলুক কী না বলুক, দোষটা আসলে শুধুই আপনার।
আপাতত হিন্দি কমিউনিটি নিয়ে লেখাটি লিখলেও আমাদের দেশী ভ্রাতা ভগিনীদের ক্ষেত্রেও কিন্তু কথাগুলো ১০০% প্রযোজ্য! ভুলে যাবেন না, এখন স্যাটেলাইট যুগ। বলিউডের জোয়ারে আমাদের দেশ ইতিমধ্যেই একশো হাত গভীর জলে নিমজ্জিত।
সেদিন শুনলাম দেশের একটি স্কুলের ক্লাস থ্রীর বাচ্চা মেয়ের উপর attempt to rape হয়েছে। যে ছাত্র কাজটি করেছে, সে নিজেই ক্লাস ফাইভে পড়ে। বয়স খুব বেশি হলে এগারো হবে।
তাজ্জব হয়ে গেলেন? সেই উনিশশ তিরানব্বই সালে যদি একটি দেশের ক্লাস থ্রীর বাচ্চা ছেলে তার সহপাঠিকে দাঁত কেলিয়ে "চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়" গানের তর্জমা ডিটেইলে বয়ান করে, তাহলে তার একুশ বছর পর সেই দেশে এরকম ঘটনা ঘটাইতো স্বাভাবিক হবার কথা।
https://www.facebook.com/groups/canvasbd/
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝর্ণা জল

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২১


আমি ব্যস্তবতা দেখি
পানকৌড়ির সাঁতার-
কল্পনায় শুধু স্বপ্ন আঁকি,
মধ্যবিকাল ঢেউ তোলা সাগর
হতাশা ডিঙিয়ে যায়- নিরিবিলি
রাত দুপুরের বাসর।

উড়ে ধোয়া, নিঃশ্বাসে সাদা বক,
খেলা করে যে, প্রণয়ের চক-
নীল মেঘ ভীর জমায়, বর্ষা কাঁদাময়,
ভোরের ক্লান্তি দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রচন্ড রোদে

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০০

প্রচন্ড রোদে
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

রূপসী এদিক ওদিক কী খুঁজো
মনের মতো কাঙ্ক্ষিত পুরুষ
এভাবে সোনালি কতোদিন বিনষ্ট করবে
আমায় একটু ভেবে দেখো।
শূন্য হৃদয় নিয়ে কেঁদে মরি
কেউ নেই পাশে, গেছে সবাই ছাড়ি।
দরিদ্র বলে জুড়েনি তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×