কোন রেস্টুরেন্টের "হ্যাপী আওয়ার" মানে সব ড্রিংকসের উপর পঞ্চাশ শতাংস ছাড়, এবং কোথাও কোথাও এপেটাইজারেও একই ছাড় দেয়া হয়।
মদখোর অ্যামেরিকানরা তাই হ্যাপী আওয়ারের সময়ে রেস্টুরেন্টে ভিড় করে। অর্ধেক মূল্যে মদ্যপানের উদ্দেশ্যে।
'সনিক' নামের একটা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টের হ্যাপী আওয়ারেও অর্ধেক মূল্যে ড্রিংকস বিক্রি হয়। যেহেতু ফাস্ট ফুড শপ, কাজেই মদ বিক্রি করে না। কিন্তু তাতেও এদিক সেদিক হয়না। আমাদের দেশের কাঙ্গালী ভোজে যেমন ভিড় হয়, সাদা কালো অ্যামেরিকানরা তেমনই ভিড় জমায়।
সনিকে আমারও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। আমি ভাবতাম, কেন এই ভিড় হয়!
সনিকে দুই একটা ড্রিংকস বাদে এমন কোন ড্রিংকস নেই যা অন্য দোকানে পাওয়া যায় না। কোক, ডক্টর পেপার, স্প্রাইট....ম্যাকডোনাল্ডস বা অন্যান্য যেকোন দোকানে এই একই জিনিস পাওয়া যায়। এবং কম দামে! তারচেয়ে বড় কথা, বারবার রিফিলও করা যায়। যেখানে সনিকে কোন ড্রিংকস রিফিল করা হয় না। তাহলে কেন শুধু শুধু এই ভিড় ঠেলে, বেশি দাম দিয়ে ড্রিংকস কেনা?
একজন উত্তর দিয়েছিল, "সনিকের ড্রিংকস মজার।"
" সেটা নাহয় চেরি লাইম এইড, অথবা আইস টির ক্ষেত্রে মানলাম, কিন্তু কোক, ডক্টর পেপার তো সব জায়গাতেই এক।"
"হ্যা। সনিকের কোক কেন জানি একটু বেশি মজা লাগে।"
এর উপর আর কোন কথা থাকেনা।
মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে বিচিত্র বৈশিষ্ট্য হলো, এ নিজের ইচ্ছে মতন যুক্তি তৈরী করে নিজের মনকে সন্তুষ্ট করতে পারে। যুক্তি খোড়া না উসাইন বোল্ট - তাতে কিস্যু যায় আসেনা।
সেদিন যেমন একটা ভিডিও দেখলাম কুমিল্লার 'বিড়ি বাবাকে' নিয়ে।
বাংলাদেশে তেলাপোকা আর পীর ফকিরের কোন অভাব নেই। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচন্ড অন্ধ কিন্তু একই সাথে ভীষণ অজ্ঞ বিরাট মানবগোষ্ঠিকে ঠকাতে ‘ফকিরি ব্যবসার’ উপরে আসলে দেশে আর কোন ব্যবসা নাই। এই ব্যবসায় ইনভেস্টমেন্ট বলতে গেলে শূন্য, এবং অতি অল্প সময়েই কোটিপতি হওয়া যায়। আমাদের বিড়ি বাবা সেইরকমই একজন ব্যবসায়ী।
নাম শুনেই বুঝা যায় বিড়ি বাবার চিকিৎসার একমাত্র ওষুধ হচ্ছে বিড়ি। নব্বই বছরের থুত্থুরে বুড়োর বাত রোগ থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের শিশুর ডায়রিয়া - সব রোগীকেই 'বাবা' বিড়ি ফুঁকতে বলে। এমনকি ক্যানসার, যক্ষ্মা রোগীদের হাতেও এই ফাজিল বিড়ি ধরিয়ে দেয়। বাবার বিড়ি ফুকলে নাকি হাতে হাতেই ফল পাওয়া যায়। কথাটা বাবার নিজের না, তার মুরিদদের।
বাবার খাদেমের মতে এই বিড়ি আসলে বিড়ি না - তোবারক। হিন্দু ভাইবোনদের বুঝার সুবিধার জন্য বলছি, আপনারা যাকে ‘প্রসাদ’ বলেন, 'তোবারক' অনেকটা তাই। যদিও ইসলামে 'তোবারক' বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। এটা ধর্ম ব্যবসায়ীদের মস্তিষ্ক প্রসূত একখানা 'প্রোডাক্ট' মাত্র।
তারচেয়েও বড় কথা, ইসলাম ধর্মে বিড়ি-সিগারেট বা যেকোন নেশা জাতীয় দ্রব্য যা মানুষের ক্ষতি সাধন করে, সব হারাম। কোন মোল্লা যদি সিগারেট খায়, তবে সে প্রকৃত মুসলিমই নয়। পীর হওয়াতো বহুদূর!
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বাবার আস্তানায় 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' (লা ইলাহা না কিন্তু) জিকির উঠে। এই লাইলাহার মানেও কিন্তু ভিন্ন।
সারাজীবন ধরে যে শিখে আসলাম "আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইশ্বর নাই," বাবার খাদেমের মতে, এই লাইলাহা মানে 'আমি আমার মধ্যে নাই' আর ইল্লাল্লাহ মানে 'দ্বীন দয়াময়।'
এরা এখানে কলিমাই পাল্টে ফেলেছে। ফাইজলামিরও একটা সীমা থাকা লাগে, নাকি?
বাই দ্য ওয়ে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে বাংলাদেশে যে জিকির উঠে, সেটা কিন্তু আসলেই ভুল। আল্লাহ ছাড়া কোন ঈশ্বর নাই, এই তত্বে খ্রিষ্টান-ইহুদিরাও বিশ্বাসী। আবু জাহেলও মেনে নিয়েছিল এই তত্ব। কিন্তু সে মানতে পারছিল না যে মুহাম্মদ (সঃ) তার নবী। যদি কেউ নবীজিকে(সঃ) নবী হিসেবে স্বীকার না করে, তবে সে মুসলিম হবে না। কাজেই জিকির করলে পুরো কালিমাটাই (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) পড়া উচিৎ। সবকিছুতে 'শর্ট' ফ্যাশন চালু থাকলেও , ইসলামে এই ফ্যাশন চলে না।
বাবার সবচেয়ে বড় গুণ, এখানে বন্ধ্যা মেয়েরা এসে গর্ভবতী হন। শুধু বাবার সাথে নিয়মিত 'কিছু সময় দিতে হবে।'
বাহরে বাহ!
এক মহিলার মতে, "মানুষের আসল শক্তি হচ্ছে ঈমান। আমাকে বিশ্বাস করতে হবে আল্লাহ যা পারেন, মুর্শিদও তাই পারেন।"
এরা এক ভন্ডকে আল্লাহ বানিয়ে ফেলেছে! 'কিছু সময় দিলে' যে কেউ তোকে সন্তান দিতে পারবে রে ছাগী, বিড়ি বাবার কাছে এসে বিড়ি ফুকতে হবেনা।
মজার ব্যপার হচ্ছে - হাজার হাজার মানুষকে বিড়ি খাইয়ে সুস্থ্য করা বিড়ি বাবা, নিজে চিকিৎসার জন্য বড় বড় ডাক্তারের কাছে যায়। তার নিজের ঘরে ওষুধ, প্রেসক্রিপশনের ছড়াছড়ি।
এই কথা ধরিয়ে দেয়া হলে তার মুরিদ বলে, "আমরা পাপী বান্দা, আমাদের চোখে পাপ! তাই দ্যাখতাছি বাবা অসুস্থ। আসলে বাবা অসুস্থ না।"
খাইছে। এ যে 'সনিকের কোক খেতে বেশি মজার' মতন যুক্তি! এর বিপরীতে কিছু বলার আছে? কিছুই বলার নেই।
সবচেয়ে হাস্যকর ফতোয়া শুনলাম আরেক খাদেমের কাছে।
বাবা নাকি চল্লিশ বছর ধরে পানি খায় না। যেখানে পানি ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা একদমই অসম্ভব!
খাদেম বলছে, "পানির অপর নাম জীবন না, আসলে পানির অপর নাম মরণ! আমাদের নবীজির (সঃ) নাতি মারা গ্যাছেন পানি খাইতে না পাইরা, তাই আমাদের পানি খাওয়া নিষেধ!"
এ যে উন্মাদের প্রলাপ! এদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে চিকিৎসা করানোর কথা, আমরা এদের পীর বানিয়ে পূজা করছি!
ঘটনা কুমিল্লার গ্রামে ঘটছে, তাই অনেকেই ভাবতে পারেন গ্রামের কিছু অশিক্ষিত লোকইতো ঠকছে। এটা এমন কোন বড় ব্যপার নয়।
কিন্তু সমস্যা আসলে সেটা নয়। ঢাকা শহরেও এখন এমন কোন মহল্লা নেই যেখানে কোন পীর থাকেন না। ফাজিলগুলি ইচ্ছে মতন ফাইজলামি করে যায়, আমরাও চোখ বন্ধ করে মেনে চলেছি।
দেওয়ানবাগী হুজুর নামে এক বদমাইশ সেদিন দাবী করছে, ফাতেমা (রাঃ) নাকি পুনর্জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন তার স্ত্রী হবার জন্য। সে নিজেকে রাসূল বলে দাবী করছে। এইসব আমি কারও কাছ থেকে শুনিনি, নিজের চোখে ভিডিওতে দেখেছি। তারপরও সে বহাল তবিয়তে ঢাকা শহরে দাপটের সাথে ‘ব্যবসা’ চালিয়ে যাচ্ছে।
তসলিমা নাসরিনকে যদি ইসলামের বিরোধিতা করায় দেশ ছেড়ে থাকতে হয়, তবে এইসব ফাজিলকে আরও বড় শাস্তি দেয়া উচিৎ।তসলিমা আল্লাহ-নবীকে(সঃ) নিয়ে আজেবাজে কথা লিখেছে, কিন্তু এদের দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ তারচেয়ে সহস্রগুণ বেশি। কিন্তু আমরা ধর্মের নামে অন্ধ, বধির এবং অতি মূর্খ্য জাতি, ওদের বিরুদ্ধে কোন অ্যাকশনই নেই না।
একবার এক লোকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ভদ্রলোক বিখ্যাত মাল্টিন্যাশনালে বিরাট পদে চাকরিরত আছেন। আমি যেমন হার্ডকোর পীরবিদ্বেষী, তিনিও তেমনি একজন হার্ডকোর মুরিদ। ফরিদপুরের আট রশি পীরের দরবারে রেগুলার হাদিয়া পাঠান। এইদিকে নামাজ পড়েন না এক ওয়াক্তও।
"ভন্ড পীরে বিশ্বাস করা হারাম। বরং আপনার উচিৎ নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে চাওয়া। এতে ঈমানও নষ্ট হবেনা, পয়সাও বাঁচবে।"
আমি যেন হুজুরের শানে বিরাট 'গোস্তাখি' করে ফেলেছি, এমনভাবে তিনি আমার উপর তেড়ে এলেন।
"তওবা করেন! এখুনি তওবা করেন! আপনি কী বলতে চান? আল্লাহর কাছে আমি ডাইরেক্ট চাব কেন? মুর্শিদের থ্রুতে চাইতে হবে। আল্লাহ আমাকে দেবার কে? আমাকে মুর্শিদ দিবেন। আমি যে আজকে এত সাকসেসফুল, এইটা কার জন্য? মুর্শিদের জন্য!"
আমি আধবুড়ো লোকটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বুদ্ধিহীন একটা মানুষের এইভাবে চুল পাকলো কিভাবে ভেবে পেলাম না।
শুধু দেশেই না, বিদেশে থেকেও অনেকে ঠিক মতন মাথা খাটানো শিখেননি। এখনও কোন বিপদে পড়লে দেশে বিপুল ডলার পাঠিয়ে ফোন করে বলা হয়, "বাবা(নিজের বাবা না, পীরকে বাবা ডাকে)! আমার জন্য দোয়া করবেন!"
"আল্লাহ নিজে বলেছেন আপনার কিছু লাগলে শুধুই তাঁর কাছে চাইতে" বলে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, "বাবা দোয়া করার কে?"
তিনি আমাকে বললেন, "আমার মতন পাপীর কথা কী আল্লাহ শুনবেন? বাবার থ্রুতে যদি কিছু হয়!"
ভাইরে, যদি আল্লাহ কারও কথা শুনে থাকেন, তবে আপনারটাই শুনবেন। মোল্লার কাছে দৌড়াবার দরকার নেই।
এইসব বুঝিয়ে কোনই লাভ হয়না। আবারও বিপদে পড়ে, আবারও ডলার পাঠিয়ে ফোনে কান্না, "বাবা আরও জোর লাগায়ে দোয়া করেন....কিছুই লাভ হচ্ছে না!"
নিজের ধর্ম সম্পর্কে এতটুকু জ্ঞান থাকলেই হাজার হাজার ডলার বেঁচে যেত, মনটাও শান্ত থাকতো! আফসোস! আমরা শিক্ষিতরা নিজেদের সর্বক্ষেত্রেই অতিরিক্ত পন্ডিত মনে করি।
ব্রিটিশ আমলে ফকির সন্ন্যাসীরা মুষ্ঠি ভিক্ষা করতো। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মুষ্ঠি ভিক্ষা চাইতো। ধর্মভীরু এবং তারচেয়েও বেশি ধর্ম অজ্ঞ ভারতীয়রা 'অভিশাপের' ভয়ে নিজে না খেয়ে হলেও এইসব ভন্ড ফকিরদের থলেতে ঠিকই খাবার তুলে দিত। ফকির সন্ন্যাসীরা আবার হালকা অস্ত্রও বহন করতো।
ব্রিটিশ সরকার ফকিরদের এই মুষ্ঠি ভিক্ষা এবং অস্ত্র বহনকে অবৈধ ঘোষণা করলে 'ফকির-আন্দোলন' নামে একটা আন্দোলন হয়েছিল। কী আশ্চর্য্য! আমাদের সাধারণ জনগণও তখন এই ভন্ড ফকির সন্ন্যাসীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল! ব্রিটিশরা হয়তো মনে মনে ভেবেছিল, "যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর!"
ব্রিটিশ সরকারের কারণেই আমাদের দেশ থেকে সতীদাহ প্রথার মতন এক বর্বর প্রথা দূর হয়েছিল। ওদের কারণেই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়েছিল। মুঘল আমলে কিন্তু এসব হয়নি। ডান্ডা না পড়লে মানুষ ঠান্ডা হয়না। এই কথাটা নিপাতনে সিদ্ধ।
ব্রিটিশরা চলে যাওয়ায় এখন দেখা যায় কাশি-হরিদ্বারে দলে দলে ন্যাংটা সাধু সন্ন্যাসীরা ঘুরে বেড়ান। সুনীলের এক লেখায় পড়েছিলাম এরা বেশির ভাগই ফেরারী দাগী আসামী। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতেই 'বাবার' বেশ ধরেছে।
আমাদের দেশের সরকারকেও ব্রিটিশদের মতন শক্ত হয়ে একটা আইন পাশ করতে হবে যাতে এইসব পীর ফকিররা অবৈধ ব্যবসা করতে না পারে। মানুষ গয়না বেঁচে, জমি বেঁচে এইসব পীরদের পায়ে এনে টাকা ফেলছে - একে ডাকাতি না বললে কাকে বলবো?
আপনারা ইউনি পে, ডেসটিনি বন্ধ করে দিয়েছেন, তাহলে এইসব পীরদের কেন ব্যবসা চালিয়ে যেতে দিচ্ছেন? জনগণ আপনাদের বিরোধিতা করবে? সেটাতো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়েও করেছিল। আপনারা যদি জানেন আপনারা সঠিক কাজ করছেন, তাহলে ভয় কিসের? কেউ কী পারবেন সরকারের কানে কথাটা তুলতে?
সম্রাট আওরঙ্গ জেবও নাকি একবার দিল্লীর সব ভন্ড পীরের মাজার ভেঙ্গে গুড়িয়ে সাফ করে দিয়েছিলেন।
তখনকার সময়েও দিল্লি শহরটা মাজারে মাজারে ছেয়ে গিয়েছিল। ভক্তদের বিশ্বাস ছিল, পীরেরা আসলে সেইসব মাজারে জীবিত শুয়ে আছেন। সেখানে ধরনা দিলে 'বাবা' ভক্তদের কথা শুনেন এবং অ্যাকশন নেন।
সম্রাটের পদ্ধতিটা খুব সহজ ছিল। তিনি ঐ সব মাজারে গিয়ে সালাম দিয়েছেন, উত্তরের জন্য অপেক্ষা করেছেন। উত্তর পান নি, কাজেই প্রমাণ হয়ে গেল ঐ কবরের মানুষ 'আসলেই মৃত।' তারমানে ওটাকে মাজার বানাবার কোন মানে হয়না।
তারপর ধামাধাম হাতুড়ি পেটা করে সেসব মাজার ভেঙ্গে ফেলা হলো।
কথা হচ্ছে, আমাদের আওরঙ্গ জেব কে হবেন?
https://www.facebook.com/groups/canvasbd/
ইসলাম নিয়ে আরও পড়তে যোগ দিন:
https://www.facebook.com/groups/shottyanweshi/

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

