দেশ থেকে কেউ আসার সময়ে যদি আমার কাছে “কী উপহার আনতে হবে” জানতে চায়, আমি প্রথমেই বলি, "এক কেজি মিষ্টি!"
"ডলার দিয়ে সব কেনা গেলেও দেশের মিষ্টির স্বাদ কেনা যায় না" - এই চৌধুরী সাহেব কথাটা ভালই জানেন।
তাই বাঙ্গালি দাওয়াতে গেলে পোলাও কোর্মা বাদ দিয়ে আমি বেশি বেশি করে ঘরে তৈরী মিষ্টি খাই।
তেমনি গতমাসের শেষের দিকে এক নৈশভোজের দাওয়াতে সুইট কর্নারে মিষ্টির জন্য ভিখারীর মতন থালা হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। চোখের সামনে শোভা পাচ্ছে ঘরে তৈরী দৈ, কালোজাম এবং কাঁচা গোল্লার মতন দেখতে আরেকটা মিষ্টি। কোনটা কয়টা করে নিব মনে মনে হিসাব কষছি, তখন পেছন থেকে ফরহাদ ভাই এসে বললেন, "তোমার PK দেখা উচিৎ!"
ফরহাদ ভাই হচ্ছেন ডালাস প্রবাসী বাঙ্গালি নাট্যকার। আমরা হচ্ছি তাঁর 'আপনার লোক।' নতুন কোন প্রজেক্ট হাতে নিলেই তিনি আমাদের ডাক দেন। আজকে দেখা হওয়ায় না কোন হাই, না কোন হ্যালো, প্রথমেই তিনি বললেন PK'র কথা।
আমি বললাম, "আমিও অপেক্ষায় আছি দেখার। কেমন লাগলো আপনার?"
ফরহাদ ভাই বললেন, "প্রতিটা সীন দেখেছি, আর তোমার কথা মনে করেছি। এই সিনেমাটা তোমার ইমিডিয়েটলি দেখা উচিৎ! ধরে নাও আগামী একমাসের জন্য লেখালেখির ম্যাটেরিয়াল তুমি এই এক মুভিতেই পেয়ে যাবা!"
কথাটা শুনে ধন্য হলাম।
যাক, কিছু মানুষ তাহলে আছেন যাঁরা সত্য কথনকে appreciate করতে জানেন। এঁদের জন্যই লিখতে ভাল লাগে।
আমরা জানি রাজকুমার হিরানী একটা করে সামাজিক ইস্যু বেছে নেন, এবং সেই থিমেই সিনেমা বানান।
তিন্নি ছিল পাশেই। সে জানতে চাইলো, "এইবারের মুভির থীম কী?"
ফরহাদ ভাইর চেহারা দেখে মনে হলো, তিনি বলতে চাইছেন না। বলে দিলেইতো মুভির মজা শেষ হয়ে যায়! একজনের ডিরেক্টর হিসেবে এই কাজ তিনি কিভাবে করবেন?
তারপরেও বলে দিলেন।
"ধর্ম ব্যবসা।"
আমার জিভে জল চলে এলো। আমার সবচেয়ে প্রিয় টপিক!
"ধর্ম ব্যবসায়ীদের একেবারে বাঁশ মেরে দিয়েছে!"
সাথে সাথে তিন্নির দিকে ফিরে ঘোষণা দিলাম, "ক্রিসমাসের পরের সপ্তাহেই আমরা PK দেখতে যাব। টপিক ইজ ওভার!"
যথাসময়ে PK দেখেও ফেললাম।
সত্যি বলতে "সিনেমা" হিসেবে PK আমার কাছে আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড মনে হয়নি। স্ক্রিপ্টে কোথাও যেন কিছু একটার কমতি মনে হয়েছে। থ্রী ইডিয়টস এবং রং দে বাসান্তি এরচেয়েও ভাল লেগেছিল, কারণ স্ক্রিপ্ট ছিল একদম পরিপূর্ণ!
তবে এইটা ঠিক, এই সিনেমার ম্যাসেজ অন্য যেকোন সিনেমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ন। সিনেমা দেখে তাই মনে হয়েছে, দলটি আসলে কাহিনী বলার চাইতেও ম্যাসেজ ডেলিভারীকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
কেবল যদি "কন্টেন্ট" তুলনা করি, তবে নিঃসন্দেহে এইটিই আমির খানের সেরা সিনেমা! এবং এই ধরণের সিনেমা বলিউডে আরও বেশিবেশি করে বানানো উচিৎ। হ্যাপী নিউ ইয়ার, কিক বা ব্যাংব্যাং টাইপ ননসেন্সতো অনেক হলো।
শুধু ভারতেই নয়, বাংলাদেশেও এই এটেম্পট নেয়া উচিৎ। আমাদের দেশেও সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ের নাম "ধর্ম" কিনা!
হিন্দু মৌলবাদীরা এর বিপরীতে কট্টর অবস্থান নিয়েছে। আমি হিন্দু ধর্ম নিয়ে কিছু বলতে চাইছি না। সেটা আবার অন্য ইস্যু হয়ে যাবে।
তবে আমি যেহেতু মুসলিম, কাজেই আমি মুসলিম ধর্ম ব্যবসায়ীদের "প্রোডাক্ট" নিয়ে কিছু বলার অধিকার রাখি বলেই দুয়েকটা কথা বলতে চাই।
PK একটা কথা চমৎকার বলেছে, "তোমরা বল ভগবান একজন। কিন্তু আমি বলি ভগবান আসলে দুইজন। এক যিনি আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন - এবং দুই, যাঁকে তোমরা সৃষ্টি করেছ।"
অতি অতি গুরুত্বপূর্ন ডায়লগ!
আমরা মুসলিমরা যতই "এক আল্লাহতে বিশ্বাস করি" বলে ফালাফালি করিনা কেন, আমরা আসলে নিজেদের মতই আরেক "আল্লাহ" সৃষ্টি করে ফেলেছি। যেই আল্লাহর সাথে কোরআনের আল্লাহর কোনই সম্পর্ক নেই।
নাহলে যেই আল্লাহ কোরআন শরীফের মাধ্যমে সরাসরি আমাদের সাথে কথা বলেন, নামাজের মাধ্যমে আমাদের সাথে সাক্ষাত করেন, তাঁর কথা আমরা মানিনা কেন?
তিনি কখনও কী বলেছেন "আমার কাছে কিছু চাইতে হইলে হযরত শাহজালালের(রঃ) মাজারে এসে চেয়ো, নাহলে আমি দোয়া কবুল করবো না।"
অথবা, "অমুক বাবা মোনাজাতে হাত না তুললে আমি তোমার দোয়া কবুল করবো না!"
আল্লাহ এবং নবীজি (সঃ) সরাসরিই বলেছেন, প্রতিটা মানুষ আল্লাহর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ন। কারও কিছু চাইতে হইলে সে নিজেই চাইতে পারে, এবং সেটা নামাজের মাধ্যমে চাওয়াটাই সর্বোত্তম!
কিন্তু আর সবকিছুর মতই, আমাদের শর্টকাট পছন্দ। নিজের উপর আস্থা নেই, "সাজেশন" পেয়ে পাশে বিশ্বাসী।
"পীরের মাজার" হচ্ছে ধর্মব্যবসায়ীদের সবচেয়ে চালু প্রোডাক্ট, মাল্টি বিলিয়ন ডলার বিজনেস। একটা সফল "মাজার" একটা শহরের ইকোনমি বদলে দিতে পারে। বিশ্বাস না হলে আজমীর গিয়ে দেখতে পারেন।
আমাদের দেশেও কম কিসের?
আমরা পীরের মাজারকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি। কেন ভাই? মৃত পীরের কী কবরের ভিতর ঠান্ডা লাগে যে শরীরে চাদর না দিলে সর্দি লেগে যাবে?
সেই চাদর আবার গোলাপ জলে ভিজিয়ে চুপচুপে করে দিচ্ছি।
আগরবাতির ধোঁয়ায় সেখানে চোখ খুলে রাখা দায়, কিছু আহাম্মক আবার সেই ধোঁয়ায় হাত সেকে মুখে ঘষে - কোন আল্লাহর ইবাদত করে তারা?
মাজারের দেয়ালে স্পষ্ট লেখা আছে, "সিজদাহ দেয়া হারাম।"
তারপরেও বেকুবের দল ভক্তির সাথে সিজদাহ দিচ্ছে। কোরআনের আল্লাহ যে বারবার বলেছেন "আমি ছাড়া আর কারও কাছেই মাথা নত করবে না (মহানবীর (সঃ) সামনেও না)" - কথাটির গুরুত্বটা তাহলে থাকে কোথায়?
মাজারে বাতি জ্বালানো হারাম - লেখা থাকে স্পষ্ট করে। তারপরেও আমরা কয়েক লক্ষ টাকার মোমবাতি সেখানে পুড়িয়ে ফেলি!
এছাড়াও ইসলামে মদ গাঁজা সহ সবধরনের নেশা জাতীয় পণ্য সেবন হারাম থাকলেও কিছু মাজারে ঢুকা যায়না "ভক্তদের" গঞ্জিকা সেবনের দুর্গন্ধে।
কোন আল্লাহর ইবাদত করে তারা?
শাহজালাল দরগায় আমার দাদীর কবর, আমার বাবার কবর। দেশে গেলে সেখানে অবশ্যই যাওয়া হয়, প্রতিদিন আসরের নামাজ সেখানেই জামাতে পড়া হয়।
সেখানে একদিন এক লোককে দেখি দোয়া করছেন, "বাবা, তুমি আমার সাথে হাত ওঠাও বাবা! আমার মনের ইচ্ছা তুমি সব জানো, তুমি পূরণ করো!"
কয় কি! বাবা ইন্তেকাল করেছেন কয়েকশো বছর হয়ে গেছে, তিনি আপনার সাথে হাত তুলবেন কিভাবে? একজন মরা মানুষই বা একজন জীবিত মানুষের মনের কথা জানবেন কিভাবে? ধর্মান্ধ নাকি নিজের চোখে কিছু দেখতে পারেননা, এরা দেখি "ধর্মাহম্মক!" নিজের ব্রেইন দিয়ে কিছুই চিন্তা করতে পারেননা!
আল্লাহ এদের বুদ্ধি দিক!
একেকটা মাজার, পীরের আস্তানা ইত্যাদি জায়গায় গেলে তাজ্জব হয়ে ভাবি, কে বলেছে বাংলাদেশের মানুষ গরিব? সফল ব্যবসায়ীরা মানত করেন অমুক প্রজেক্টে সফল হলে বাবার দরবারে অত টাকা দিব।
ফেলটুস ব্যবসায়ীরা মানত করেন, "বাবার দরবারে এত টাকা দিলাম, আল্লাহ আমার ব্যবসা সফল করো!"
দুই ক্ষেত্রেই বাবার "ব্যবসা" রমরমা!
ইসলাম কী এই কথা বলে?
ইসলামের সম্রাট, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কারও দান গ্রহণ করতেন? তিনি কিভাবে জীবন যাপন করতেন? খেজুর পাতার বিছানায় ঘুমাতেন। তাঁর বানানো মসজিদ কেমন ছিল? খেজুর পাতার ছাদ ছিল।
সেইদিক দিয়ে আমাদের পীরদের অফিস দেখেছেন কেউ? দেড় দুইটনের এসি ফিট করা থাকে। ভক্তদের উপহার! গ্রীষ্মকালেও সোয়েটার না পড়ে গেলে নির্ঘাত নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। পীরের হাদিয়ার কথা না হয় নাই বললাম।
হেফাজতে ইসলাম নাস্তিক নিধনে মতিঝিল ঘেরাও করেছিল। আরে বেকুবের দল, নাস্তিকদের চেয়েও এইসব পীর ফকির, মাজারগুলি ইসলামের ক্ষতি করছে বেশি। পারিস না একটা মুভমেন্ট করে দেশের সবক'টা মাজার একসাথে ভেঙ্গে দিতে?
বাংলাদেশের "সুপারকপ" মাশরুফ হোসেন ক্যানভাসে আমার লেখা পড়েন। তাঁর কাছে আমার প্রশ্ন, একজন ছিনতাইকারী, চোর বা ডাকাত যে অপরাধ করে, একজন পীর কী সেই একই অপরাধে দুষ্ট না? তাহলে আইনের কোন ধারায় এদের দোষী দেখিয়ে গ্রেফতার করা যায়?
এদের গ্রেফতার করলেও সমস্যা, বেকুব আহাম্মক মুরিদের দল থানা আক্রমণ করে বসতে পারে। দেশে রায়ট লাগিয়ে দিতে পারে। নিরীহ মানুষের গাড়ি পুড়িয়ে দিতে পারে।
"আমাদের বাবার উপর 'নাস্তিকদের' আঘাত! বাবাকে অসম্মান! জ্বালাও, পোড়াও, ভাঙ্গ!"
বেকুবেরা বুঝতেই পারছে না এই বাবাই তাদের ঠকিয়ে তাদেরই বেশি ক্ষতি করছে।
অবশ্য এদের থেকে আর কিই বা আশা করা যেতে পারে? ইন্ডিয়াতেতো এইটিই ঘটছে।
এক বন্ধু কিছুদিন আগে দেশ থেকে ফিরেছে।
তার আত্মীয়ার সাথে বিরাট ঝগড়া বাঁধিয়ে এসেছে। আত্মীয়া তাকে বারবার কনভিন্স করার চেষ্টা করেছে একজন পীরের ক্ষমতার ব্যপারে। আমার বন্ধু প্রতিবার উড়িয়ে দিয়েছে।
"বাবার দোয়াতেই কাজটা হয়েছে।"
"শুধু বাবাই দোয়া করেছিল, তোমরা কেউ করোনি?"
"আমরাও করেছি, কিন্তু বাবার দোয়া পাওয়ারফুল বেশি। তাছাড়া বাবা ফিউচার প্রেডিক্ট করতে পারে।"
"তাই নাকি! ভালইতো, বাবাকে এনএফএলের ফিকচার দিয়ে দেব, তিনি প্রেডিক্ট করে বলবেন কোন কোন দল প্লে অফে যাবে, এই বছর সুপার বল কে জিতবে - তাহলে আমি বেট ধরে পয়সা জিতে যাব!"
আত্মীয়া একটা রাগী দৃষ্টি দিয়ে তাকালেন।
জ্বী না, আমার বন্ধু নাস্তিক না। সে সঠিক কথাই বলেছে। "অতিরিক্ত আস্তিক" আত্মীয়াই উল্টো ইসলাম থেকে বহুদূর সরে গেছেন।
বুঝতে পারছেন না, "রং নম্বরে কেউ তাঁর সাথে ফির্কি নিচ্ছে।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


