আজকে একটা বিষ্ফোরণ ঘটাবো।
যে ঘটনা বলতে যাচ্ছি তা পড়ার পর একদল মানুষ চোখ বন্ধ করেই লাফালাফি শুরু করে দিবেন। আমাদের দেশে এই ধরনের লোকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। আফসোস!
একদল মানুষ কিছু না বলে ঝিম মেরে বসে থাকবেন। তাঁরা কথাটা ঠিক বিশ্বাসও করবেন না, আবার অবিশ্বাসও করবেন না। "ধরি মাছ না ছুই পানি" আর কি। এইটাও সমস্যা। তাহলে আপনার জেনে লাভটা কী হলো যদি আরেকজনকেই না জানালেন?
আরেকদল লোক যুক্তি মেনে নিবেন। তাঁরা তাঁদের আশেপাশের লোকজনদেরও ঘটনাটা বলবেন। এই ধরনের লোকেরই সংখ্যাধিক্যের বেশি প্রয়োজন ছিল। আফসোস, এই ধরনের লোকের সংখ্যাই কম।
তাহলে গল্প শুরু করা যাক।
আমরা সবাই জানি, পৃথিবীর আর অন্যান্য সবকিছুর মতই নবীজির (সঃ) হাদিসেরও নকল বের হয়েছে। পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ ভুয়া হাদিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইসলাম ধর্মে ছয়টি হাদিস গ্রন্থকে বিশুদ্ধতম ধরা হয়ে থাকে। তাদের মাঝে তিরমিদি অন্যতম।
সেই তিরমিদি শরীফে উল্লেখ আছে, পিতা মাতা হারা নবীজির (সঃ) বয়স তখন একদম কম। বাল্যকাল বলা চলে। সদ্যই তাঁর দাদাজানও মারা গেছেন। চাচার কাছে বড় হচ্ছেন। চাচা তাঁকে ব্যবসায়িক সফরে সিরিয়া (অঞ্চলটার নাম ছিল "শাম," বর্তমানের সিরিয়াসহ আশেপাশের বেশ কিছু অঞ্চল ছিল এর অন্তর্গত) নিয়ে গেছেন। সঙ্গে গেছেন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এবং বিলাল(রাঃ)।
রাস্তায় বুহায়রা নামের এক মহাজ্ঞানী ধার্মিক স্কলারের সাথে তাঁদের দেখা হয়। তিনি নবীজিকে (সঃ) দেখেই তাঁর চাচা আবু তালিবকে ডেকে বলেন, "এই ছেলে বড় হয়ে একজন নবী হবে। এর যত্ন নিও।"
আবু তালিব বলেন, "কিভাবে বুঝলেন যে এ নবী হবে?"
বুহায়রা তখন বলেন, "চেয়ে দেখ, একটা মেঘ তাঁকে সর্বদা ছায়া দিয়ে যাচ্ছে।"
শিশু নবীজি (সঃ) তখন একটি গাছের নিচে বসে ছিলেন। তিনি যখন নড়াচড়া করছিলেন, তখন গাছের শাখাও তাঁর সাথে নড়াচড়া করে তাঁকে ছায়া দিয়ে যাচ্ছিল।
এই দেখে বুহায়রা আরও নিশ্চিত হয়ে বলেন, "নিশ্চিত থাকো এ বড় হয়ে একজন নবী হবে। রোমান সিপাহিদের থেকে একে বাঁচিয়ে রেখ। ওরা জানতে পারলে ওকে হত্যা করবে।"
একেক বইয়ে একেকভাবে বর্ণিত হলেও মূল ঘটনা মোটামুটি এই। মানে নবীজি (সঃ) যেখানে যেতেন, একটা মেঘ তাঁকে সর্বদা ছায়া প্রদান করতো। গাছও তাঁকে ছায়া দিত।
এখন কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে জাগা উচিৎ। "আস্তিক-নাস্তিক" ইস্যু এখানে ব্যপার না, সাধারণ মানুষের মনের কথাই বলছি।
"হযরত আবুবকর (রাঃ) তখনও নিতান্তই শিশু, আবু তালিব কেন তাঁকে নিয়ে সফরে যাবেন? তাঁরাতো আত্মীয় ছিলেন না।"
"হযরত বেলাল(রাঃ) আরেকজনের ক্রীতদাস ছিলেন যখন আবুবকর (রাঃ) তাঁকে কিনে মুক্ত করেন, এবং সেটা আরও তিরিশ পয়ত্রিশ বছর পরের ঘটনা! তারচেয়ে বড় কথা, হযরত বেলালের তখনও জন্মই হয়নি। তাহলে বিলাল(রাঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন কিভাবে? "
"যদি একটি মেঘ ইতিমধ্যেই তাঁকে ছায়া দিয়ে আসছিল, তবে বাড়তি ছায়া দিতে গাছের কী দরকার ছিল?"
"আবু তালিব যদি বুহায়রার কাছ থেকে জেনেই থাকেন যে ইনিই আখিরী জমানার নবী হতে চলেছেন, তাহলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি কেন?"
"যখন আবু তালিব তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছিলেন না, তখন কেন নবীজি (সঃ) বুহায়রার ঘটনাটা তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন না?"
"নবীজি(সঃ) যদি জেনেই থাকেন যে তিনি নবী হতে চলেছেন, তাহলে জিব্রাইল (আঃ) যখন ওহি নিয়ে আসলেন, নবীজি (সঃ) কেন তাঁকে দেখে ভয় পেলেন?"
এমন হলে হেরা পর্বতের গুহায় জিব্রাইলকে (আঃ) প্রথম দেখেই তিনি সরাসরি বলতেন, "তোমার জন্য তিরিশ বছর ধরে অপেক্ষা করছি, তুমি আসতে এত দেরী করলে কেন?"
"বুহায়রা যদি ভবিষ্যতবাণী করেই থাকতো, তবে মক্কার কোরাইশরা তাঁর এত বিরোধিতা করলো কেন?"
"ওহি নাজিলের পরে তিনি যখন কি ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছেন না, তখন হযরত খাদিজা (রাঃ) তাঁকে ওরাকা ইবন নওফলের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। যখন ওরাকা তাঁকে জানালেন 'এই সেই entity যে ঈসার (আঃ) কাছে এসেছিল, মূসার (আঃ) কাছে এসেছিল, এবং পূর্ববর্তী সব রাসূলের কাছে এসেছিল - নিশ্চই তুমিই আখেরী জমানার নবী।' তখন নবীজি (সঃ) কেন খুব অবাক হয়েছিলেন?"
কথা হচ্ছে, আমরা সবকিছুতেই অতিরঞ্জন পছন্দ করি।
সাহিত্যিকেরা যখন কোন নায়কের চরিত্র আঁকেন, তাঁকে সবকিছুতেই শ্রেষ্ঠ দেখাতে চান। সিনেমার নায়কদেরকেই দেখুন না। তিনি অতি অবশ্যই একজন সুদর্শন ব্যক্তিত্ব। অতি দরিদ্র ঘরেও যদি তিনি জন্মান, তাঁর চমৎকার সুন্দর স্বাস্থ্য হতেই হবে। একই লোক এলাকার গরিবের বন্ধু, গরিবের হক আদায়ে যিনি সর্বদা প্রতিবাদী চরিত্র। আবার একই সাথে অতি বড়লোক কন্যার সাথেও তিনি প্রচন্ড রোমান্টিক তরিকায় প্রেম করছেন। তিনি চমৎকার গাইতে পারেন, দুর্দান্ত নাচতে পারেন এবং অতি অবশ্যই মারামারি করে একাই বিশ তিরিশজন ভিলেনকে কাত করে দিতে পারেন। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে তিনি একশো দুইশোজন ভিলেন মেরে ফেললেও আইন তার কিছু করেনা। এবং সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এতকিছু করেও তিনি ঠিকই পরীক্ষায় "ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট" হয়ে যায়!
আমরা পড়তে পড়তে জিহ্বা বের করে ফেলি, তারপরেও টেনেটুনে A পেলে (হয়তো সাড়ে উননব্বই পেয়েছিলাম, স্যারের দয়ায় নব্বই হয়ে গেছে) আনন্দে দিশাহারা হয়ে যাই।
ওরা নায়ক বলে কথা!
কিছু সাহিত্যিক আরও বেশি পারফেক্ট নায়ক সৃষ্টি করেন। এভাবেই জন্ম হয় সুপারহিরোদের। যাদের কেউ কেউ উড়তে পারেন, কেউবা হাত থেকে মাকড়সার জাল বের করতে পারেন। কারও আছে আরও অনেক সুপার কুল সব ক্ষমতা!
কথা হচ্ছে, আমাদের নবীজি (সঃ) এমনিতেই সুপারহিরো। তাঁকে নিয়ে অতিরঞ্জনের কোনই দরকার নেই।
তিনি একজন ইয়াতিম ছিলেন, একজন "স্বেচ্ছা-দরিদ্র" (অকাতরে দান খয়রাত করতেন, পার্থিব কোন সম্পদে তিনি আগ্রহী ছিলেন না) ব্যক্তি ছিলেন এবং অক্ষরজ্ঞানহীন মানব ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট। কোন মেঘ অথবা বৃক্ষ তাঁকে ছায়া দিল কিনা সেটার উপর তাঁর মহত্ব নির্ভর করে না। সেটা করলে তাঁকে উল্টো ছোট করা হবে।
কিন্তু পোলাপান সেটাই বুঝে না। অতিরঞ্জন কথাবার্তা লিখবেই।
"নবীজি (সঃ) যেহেতু নূরের তৈরী, তাই তাঁর কোন ছায়া ছিল না।"
ভাই, কোরাইশরা যদি দেখতো একজন লোকের ছায়া মাটিতে পড়ছে না, তাহলে তারা কখনই বলতো না, "তুমি আমাদের মতই ভাত খাও, বাজারে যাও - তুমি নবী হও কিভাবে?"
নিশ্চই তিনি আর সাধারণ আট দশটা মানুষের মতনই "মানুষ" ছিলেন। তিনিও ভাত খেতেন, বাথরুমে যেতেন, স্ত্রী সন্তান নিয়ে সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। চরিত্রই তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে।
"নবীজি (সঃ) ছোটবেলায় আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতেন, আর চাঁদ তারা সূর্য তাঁর ইশারায় নড়াচড়া করতো। তিনি ছোটবেলায় ওসব নিয়ে খেলতেন।"
ভাই, "সুবহানাল্লাহ" বলার আগে এইরকম হাস্যকর তথ্য আপনি কোথায় পেয়েছেন সেটা বলবেন? নবীজি (সঃ) নিজে বলেছেন এই কথা? তাহলে এইটাও বাদ!
এখানে বলে রাখা ভাল, একবার চাঁদ তাঁর ইশারায় ভাগ হয়েছিল। সেটা কোরআনেই উল্লেখ করা আছে। এবং চাঁদে এখনও সেই ফাঁটল বিদ্যমান। এবং এইটা দেখার পরে কুরাইশরা তাঁকে জাদুকর বলে ডাকা শুরু করেছিল।
তবে সেটা ছিল তাঁর একটি মোজেজা, আল্লাহর ইশারায় ঘটনা ঘটিয়েছেন। দৈনন্দিন জীবনে এমনটা তিনি করতেন না।
কথা হচ্ছে, নবীজি (সঃ) বারবার সাবধান করে দিয়ে গেছেন তাঁকে উপাসনা না করতে। তাঁর জীবনের শেষ খুৎবাতেও তিনি একই কথা বলেছিলেন, "তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাঁদের নবী রাসূলদের কবরকে ইবাদতের স্থান বানিয়ে ফেলেছিল। তোমরা এই কাজটি করোনা।"
বারবার বলে গেছেন "আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আল্লাহর দাস!"
তবুও মানুষ তাঁকেই পূজা করা শুরু করে দেয়!
একটা কথা প্রচলিত আছে, কেউ শুনেছেন কিনা জানিনা, "একজন দাস, সে যত উপরেই চলে যাক না কেন, সে দাসই থাকে। আর প্রভু যতই নিচে নেমে আসুক না কেন, প্রভুই থাকেন।"
মেরাজের ঘটনা প্রাইম এক্সাম্পেল।
নবীজি (সঃ) এমন স্থানে গিয়েছিলেন যেখানে জিব্রাইলেরও (আঃ) প্রবেশাধিকার নেই, তারপরেও তিনি আল্লাহর একজন দাস!
আবার আল্লাহ যদি আজকে পৃথিবীতে নেমে আসেন, তবুও তিনি আল্লাহই থাকবেন। সবার মালিক!
ভক্তি অবশ্যই ভাল, তবে সেটারও একটা সীমা থাকা জরুরী।
খ্রিষ্টানরা যে হযরত ঈসার (আঃ) উপাসনা করেন, সেটাও এই অতিভক্তির কারনেই।
সমস্যা হচ্ছে আমরাও একই কাজ করছি। নবীজি (সঃ) এমনিতেই শ্রেষ্ঠ মানব। তাঁকে মহান দেখাতে এতটুকুও অতিরঞ্জনের সাহায্য নিতে হবে না। উল্টো অতিরঞ্জনের ফলে মানুষ আমাদের ধর্মকেই হাস্যকর ভাবতে পারে।
অনেকেই ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে যখন দেখেন এইসব আজগুবি বিষয় ইসলামের সাথে মিশে আছে, তখন একে রূপকথার সাথে তুলনা করে সটকে পড়েন।
আমাদের দেশে প্রকাশিত প্রায় সবক'টা জীবনী গ্রন্থেই উপরের ঘটনার উল্লেখ আছে। আশংকার কথা, গোটা বিশ্বে যে কোটি কোটি জীবনী গ্রন্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রকাশিত হয়েছে, প্রায় নব্বই ভাগেরও বেশি গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।
একটা ভুল তথ্য এইভাবে প্রচলিত হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে। অনেক স্কলারও এইটাকে অথেন্টিক রেফারেন্স হিসেবে জাস্টিফাই করেন।
এইটা খুবই দুঃখজনক।
সেদিন এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি না নবীজির (সঃ) জীবনী লিখতে চেয়েছিলে? কতদূর এগিয়েছ?"
তাঁকে জানালাম, "এইটিই আমার জীবনের ড্রিম প্রজেক্ট! সময় লাগবে।"
একটা কথা সবাইকে বুঝতে হবে, নবীজির (সঃ) জীবনী রচনা আর আমাদের দেশের কোন প্রয়াত প্রেসিডেন্টের জীবনী রচনা এক জিনিস না। দ্বিতীয়টিতে যা খুশি বানিয়ে বানিয়ে লেখা গেলেও বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের জীবনীতে একটা লাইনও ভুল লেখা যাবে না। পরিনাম কী হতে পারে, সেটাতো উপরের ঘটনাতেই বুঝতে পারছেন।
তারপরেও আমরা মানুষ। ভুল আমাদের হবেই।
আল্লাহ পরমকরুনাময়, তিনি আমাদের মাফ করুন।
এবং অতি অবশ্যই আমাকে যেন তিনি সাহায্য করেন, সামর্থ্য দান করেন, আমি যেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, "দ্য মাস্টার পিসের" সঠিক জীবনী সবার কাছে পৌছে দিতে পারি।
আপনারা জোরে বলেন, আমীন!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





