১৯৯৫ সনের সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসে একবার বিরোধী দল টানা চারদিনের জন্য হরতালের ডাক দিয়েছিল। তখনকার দিনে হরতাল এত ঘন ঘন ডাকা হতো না, কাজেই আজকের মতন বহু ব্যবহারে তা ভোতা হয়ে যায়নি।
ছিয়ানব্বই ঘন্টার জন্য পুরো দেশ বন্ধ হয়ে থাকবে। গৃহবন্দী থাকার চেয়ে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন শিলং ভ্রমনের। আমরা তখন সিলেটে, জাফলং বর্ডারের ওপারে পাহাড়ের উপরেই শিলং। সাথে মেঘালয় এবং আসাম রাজ্যগুলোও একটু ঘুরে আসা।
আমাদের জীবনে প্রথম বিদেশ ভ্রমন। খুবই উত্তেজিত। পরম উৎসাহে ব্যাগ গোছানো হলো। চার-পাঁচ দিনের জন্য যাচ্ছি, আসা যাওয়াতেই এক দুইদিন কেটে যাবে, তবু একেকজন যা কাপড় নিলাম পুরো দুই সপ্তাহ চালানো যাবে।
আরামসে তামাবিল বর্ডার পার হয়ে গেলাম। ডাউকি বাজারে অপেক্ষা করছি; যদি ট্যাক্সি বা মাইক্রোবাস বা কিছু একটা পাওয়া যায়! কিন্তু সেদিন ছিল রবিবার। ভারতের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এইদিন ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ঘরে বসে মদ্যপান করেন। জানা ছিল না।
দোকান থেকে "আঙ্কেল চিপস" কিনে খেলাম। তখন ডিশের বদৌলতে ভারতীয় প্রতিটা পণ্য অত্যন্ত লোভনীয় ঠেকত। খেয়ে বুঝলাম আমাদের মিস্টার টুইস্টের ধারে কাছে স্বাদ না। বিজ্ঞাপন দেখিয়া বেকুব না হইবার সেটাই প্রথম শিক্ষা।
হঠাৎ আমাদের জুনায়েদ চাচার সাথে দেখা হয়ে গেল। আমার বাবার খালাত ভাই। তাঁদের সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই শিলংয়ে চার পাঁচটা বাড়ি আছে। প্রতি বছর তিনি সেখানে যান, ভাড়া আদায় দেখভাল করে আবার নিচে নেমে আসেন।
আমাদের দেখে প্রথমেই মাকে বললেন, "ওদের জন্য স্যুয়েটার নিয়েছ?"
বাংলাদেশে তখন কাঠ ফাটা গরম। বাজারে ঝুড়িতে রাখা মুরগির ডিম ফেটে বাচ্চা বেরিয়ে যায় এমন অবস্থা। সেখানে মাত্র কয়েক মাইল দূরের শিলংয়ে কতই বা ঠান্ডা পরবে? আমরা একটাও গরম কাপড় নেইনি শুনে চাচা বললেন, "শিলং পৌছেই যত তারাতারি সম্ভব স্যুয়েটার কিনে নিবে। নাহলে প্রত্যেকের নিউমোনিয়া হয়ে যাবে।"
চাচা মাত্রই নেমে এসেছেন। তারপরেও তাঁর কথা বিশ্বাস করলাম না। এত গরমে গায়ে স্যুয়েটার চরায় কোন পাগলে?
এবং শিলং পৌছেই বুঝলাম জুনায়েদ চাচাই সত্য বচন করেছেন।
আমরা উঠেছিলাম শিলং ক্লাবে। রুমের ভিতর ফায়ার প্লেস, এতদিন কেবল সিনেমাতেই যা দেখে এসেছি। হিটারও চলছে, আমরা তারপরও লেপের ভিতরে। পুরো রাত সেভাবেই কাটল। স্যুয়েটার কেনা হলো পরের দিন সকালে। তাও আব্বু আম্মু গিয়ে কিনে এনেছেন। আমরা তিন ভাইবোনের কেউ লেপের বাইরেও বেরোতে পারিনি।
আগে জানা ছিল না, শিলংয়ের কোন হোটেলেরই ছাদে ফ্যান ঝুলে না। দরকার পরেনা। "আমুল বাটার" কিনেছিলাম, ফ্রিজে রাখার প্রয়োজন হয়নি, এমনিতেই জমে শক্ত হয়ে ছিল। যতদিন ছিলাম, মনে হচ্ছিল ফ্রিজের ভিতরে আছি। কিন্তু জায়গাটা আসলেই সুন্দর। মানুষগুলোও দারুন!
এখন আসল কথায় আসি।
ধর্ম বিশ্বাসের পক্ষ্যে বিপক্ষে নানা জনে নানা কথা বলছেন। এইসব ব্যপারে আমি কোন তর্ক করিনা। আমার কাছে ব্যপারটা ছোটবেলার সেই বিদেশ ভ্রমনের মতই ঠেকে।
"শিলংয়ে সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসেও হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পরের" মতন আমি পরকালে বিশ্বাস করি। কাজেই নিজের স্যুটকেসে দুই একটা গরম কাপড়ের মতন কিছু পুণ্য কর্ম নিয়ে যেতে চাই। কথা হচ্ছে, ধর্মে বিশ্বাস করি বা না করি, এমনিতেও আমাকে মরতে হবে ওমনিতেও হবে। এখন যদি আসলেই পরকাল বলে কিছু না থাকে, তাহলেও আমার কোন লস নেই। বাড়তি কিছু গরম কাপড় নিয়ে গিয়েছিলাম, এই যা।
কিন্তু যদি মেঘালয়ের তুষার হীম হাওয়ার মতন কবরে মুনকার নাকির এসে হাজির হয়, তখন আমি সহজেই ব্যাগ খুলে স্যুয়েটার পরে ফেলতে পারবো। আর যদি ব্যাগে কিছু না থাকে, তখন কিন্তু আমার খবর আছে। মনে রাখতে হবে, ওখানে কিন্তু কোন মার্কেট নাই যেখান থেকে আমি স্যুয়েটার কিনে গায়ে চরাতে পারবো। এক দুইটা গরম কাপড় সাথে রাখা তাই দোষের কিছু না।
সবাই যে যার বিশ্বাসে সুখী হোক। বেস্ট অফ লাক টু অল!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১৬ সকাল ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



