হোলি নিয়ে অনেক ধর্ম টানাটানি হচ্ছে। হাস্যকর থেকে শুরু করে মেজাজ খারাপ করার মতন মন্তব্যও করছেন অনেকে। তাই কিছু বলাটা এখানে অত্যন্ত জরুরি।
তবে তার আগে দুইটা ঘটনা দ্রুত বলে নিতে চাই। রেফারেন্স হিসেবে।
আমার বৌ তখন মাত্রই অ্যামেরিকায় এসেছে। কাজের সহকর্মীদের পটলাক পার্টি হচ্ছে। সে নিজের হাতে একটা ডেজার্ট বানিয়ে নিয়ে গেছে। অন্যান্য সহকর্মীরাও যে যার মতন এনেছে।
গোল বাঁধলো খাবার সময়ে। আমার বৌ নিজের প্লেটে খাবার তোলার জন্য যেই না চামচে হাত দিয়েছে, অমনি পাশ থেকে একজন মহিলা হায় হায় রব তুললো।
"উসনে ছু দিয়া। আব ম্যায় কেইসে খা'উ?" (ও ছুঁয়ে ফেলেছে - আমি এখন কিভাবে খাবো?)
মহিলার গলার টোন শুনে মনে হচ্ছিল যেন গু মাখা হাতে কেউ তার খাবার স্পর্শ করেছে। ব্যাপারটা খুবই বিব্রতকর, অস্বস্তিকর এবং বিরক্তিকর।
ভারতীয়দের মধ্যে আবার খুউব ঐক্য। দেখা গেল নর্থ ইন্ডিয়ান এই মহিলার পাশে আরও দুই ভারতীয় মহিলা যুক্ত হয়ে গেলেন। তাদেরও দাবি - যেহেতু ওদের খাবার (চামচ ছুঁয়েছিল, খাবার নয়) একজন মুসলিম (ডিরেক্ট বলেনি, কেস খেয়ে যেত তাহলে, তবে বুঝিয়ে দিয়েছে) স্পর্শ করে ফেলেছে - কাজেই ওটা তারা খেতে পারবে না।
এই অবস্থায় পার্টি জমে না। পেটে খাওয়াও যায় না। আমার বৌ সেদিন কোন লাঞ্চ করেনি।
চিন্তা করেন, একবিংশ শতাব্দীর অ্যামেরিকাতে বসেও ওরা ছোঁয়া ছুঁই খেলা খেলে।
এমন অনেকেই আছেন।
তিন্নি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিল চাকরি ছেড়ে দিবে। আমি বললাম, টেক ইট ইজি। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। ওদের শাস্ত্রে যদি নিষেধ থাকে - তাহলে সাবধানে ওদের স্পর্শ এড়িয়ে চলো।
এইবার আসি আরেক ঘটনায়।
আমার বাবার কলেজ জীবনের বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলেন একজন হিন্দু। একাত্তুরে পাক বাহিনীর হাত থেকে তাঁদের পুরো খানদানকে বাঁচিয়েছিল আমাদের পরিবার। এতে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। দেখা যেত প্রতিটা কোরবানির ঈদে তিনি আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। গরুর মাংসের কাবাব, ভুনা, রেজালা খেয়ে যেতেন। কোন হিন্দুকে গরুর মাংস খেতে দেখে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না। আংকেল তখন বলতেন মহাভারতের ভীম নাকি গোমাংস খেতেন। স্বামী বিবেকানন্দ নাকি বলে গেছেন যে গোমাংস খায় না, সে খাঁটি হিন্দুই নয়।
আংকেল ছিলেন ডাক্তার, এবং নাস্তিক। তাঁর কথার উপর ভিত্তি করে হিন্দু শাস্ত্র বিচার করতে যাওয়া উচিৎ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমারও বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল একজন হিন্দু। আমাদের বন্ধুত্ব দারুন গভীর ছিল। আমি বহুরাত তাঁর বাড়িতে কাটিয়েছি। বহু কুকর্মের সাক্ষী সে আমার। বন্ধু মহলে প্রচন্ড জনপ্রিয় সেই যুবকের একটি স্বভাবে সবাই খটকা খেত। সে কারোর বাড়িতেই ভাত (অন্ন) খেত না। কিছুতেই না।
যার যার সংস্কার ভাই! এতে আমাদের বন্ধুত্বে বিন্দুমাত্র দাগ পড়েনি।
তো যা বলছিলাম। ফেসবুকে লোকজন ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছে, হোলি খেললেই সবাই অমুসলিম হয়ে যাবে।
আমি যতদূর জানি, ইসলামে ফতোয়ার ব্যাপারে অনেক অনেক অনেক কোয়ালিফিকেশনের দরকার লাগে। অগা মগা যে কেউ ফতোয়া জারি করতে পারেনা। কাউকে অমুসলিম/কাফির/মুনাফেক বানিয়ে দেয়া এক্সট্রিম পর্যায়ের ফতোয়া। ডেথ পেনাল্টি ঘোষণা করার পর্যায়ের। আমি জানিনা, যারা বলছেন, তাঁরা উপলব্ধি করতে পারছেন কিনা।
আমার কোনই যোগ্যতা নেই এই নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করার। নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে নিজের উপলব্ধির কথা লিখতে যাচ্ছি। কেউ ফতোয়া হিসেবে ট্রিট করবেন না, আল্লাহর দোহাই! এবং কেউ যদি অসম্মত হন, তাহলে অবশ্যই আপনার অধিকার আছে। আবারও বলছি - আমার জ্ঞান একেবারেই শূন্য এই ব্যাপারে।
যতদূর জানি, আমাদের ধর্মে (আল্লাহ বলেছেন নাকি নবী ভুলে গেছি, খুব সম্ভব কুরআনের বাণী) এমন একটা নির্দেশ আছে যে "যুদ্ধক্ষেত্রে যদি তোমার শত্রু তোমাকে সালাম দেয় - তাহলে তাঁর ঈমান নিয়ে সন্দেহ করো না।" (ভাবানুবাদ করলাম।)
এইবার আসি নবীজির (সঃ) জীবিনীতে। উসামা বিন যায়িদ (রাঃ) নবীজির (সঃ) বাড়িতে জন্ম নেয়া শিশু। তাঁর অতি অতি অতি আদরের, স্নেহের, কাছের প্রিয়জনদের একজন। সেই উসামা (রাঃ) এক যুদ্ধে এক শত্রুর বুকে তলোয়ার চালানোর ঠিক আগমুহূর্তে সে কলিমা পাঠ করেছিল।
নবীজি (সঃ) প্রচন্ড মর্মাহত কণ্ঠে বললেন, "তুমি তাহলে তাঁকে কেন হত্যা করলে?"
উসামা (রাঃ) বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ (সঃ)! ওতো প্রাণ রক্ষার জন্য কাজটা করেছিল।"
এইবার মর্মাহত নবী ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, "তোমাকে তাঁর মনের কথা বোঝার ক্ষমতা কে দিয়েছিল তখন?"
উসামা (রাঃ) পরবর্তীতে বলেন, "আমার মনে হয়েছিল তখন আমি যদি নতুন মুসলিম হতাম, তাহলে হয়তো আমার ভুল ক্ষমা করা হতো! নবীজিকে (সঃ) এইভাবে বিক্ষুব্ধ হতে দেখতাম না!"
তো যা বলছিলাম।
মুসলিমরা দোল খেলায় অংশ নিলেই অমুসলিম/কাফির/মুনাফেক ঘোষণা দেয়াটা ভুল। ওদের বেশিরভাগই কেবল খেলার ছলে, আনন্দের উদ্দেশ্যে গিয়েছে। কেউ পূজায় অংশ নিলে, মনে মনে শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার ঘটনার পুনরাবৃত্তি করলে ডেফিনিটলি কাফির বলা যাবে। কিন্তু হোলির কোন ইতিহাস না জেনেই, স্রেফ আনন্দের জন্য গিয়েছে - এই ক্ষেত্রে বিচারটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই ভাল বলে আমার বিশ্বাস।
এখন আসি মহাগুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে।
হোলি খেলা কী ইসলামে এলাউড। হেল নো! নো সুগার কোটিং, কেউ খুশি হলে হবে, না হলে নাই - ইসলামে অনেক রেস্ট্রিকশন আছে যা মেনে চলতে হবে। নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, যেখানে গায়ে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার আছে - সেটা ইসলামে কোন কালেই এলাউড না। উপরে যেমন উদাহরণগুলোতে দিলাম। মুসলিমদের স্পর্শ করা চামচে খেলে কারোর ধর্ম বিনাশ হয়, গোমাংস ভক্ষণ করলেতো কথাই নাই। তেমনি আমাদেরও এসব ব্যাপারে স্ট্রিক্ট ইন্সট্রাকশন আছে। তবে তা করলে কী কেউ কাফির হয়ে যাবে? না। চুরি, ডাকাতি, ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি যেমন নিষিদ্ধ - এটিও তেমন নিষিদ্ধ। বরং কেউ যদি মাজারে গিয়ে বা পীরের দরবারে গিয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত করে - সেটা স্পষ্ট কুফর - সেটা করলে মানুষ কাফির হয়ে যাবে।
ধরা যাক একদল বান্ধবী একসাথে কারোর বাড়ির উঠানে রঙ মাখামাখি খেলছে, সেখানে কোন পুরুষের একসেস নেই। এবং ওদের মনে কোন পূজারও ইনটেনশন নেই। এই ক্ষেত্রে ইসলাম কী বলে আমার জানা নেই। তবে আমার বিশ্বাস, এবং যতদূর পড়াশোনা করেছি এসব বিষয়ে, তা হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের যেকারোর চেয়ে বেশি জানেন। তিনি মানুষের ইনটেনশন এবং কর্ম দুইটা দেখেই বিচার করবেন। এবং তিনি পরম ক্ষমাশীল। সুরা ফাতিহা থেকেই আমরা জানি তিনিই বিচার দিনের মালিক। মাআলিকাও মিদ্বীন। আমরা কেউ না।
কাজেই কাউকে হুট হাট করে কাফির মাফির ডাকাডাকি বন্ধ করা উচিৎ। এই অধিকার আমাদের দেয়া হয়নি। নবীজির স্পষ্ট নির্দেশ, কারোর সত্তুরটা দোষ চোখে পড়লেও তাঁর একটা গুণ খুঁজে বের করে সেটা নিয়েই প্রশংসা করতে।
আমরা আধুনিকমনা/মুক্তমনা মানুষেরা কারোর সত্তুরটা গুণ থাকার পরেও রিসার্চ করে একটা দোষ খুঁজে বের করি - এবং সেটাকেই ফোকাস করে বেলেল্লেপনা করি।
হোলি খেলার চেয়ে অনেক অনেক বড় অপরাধ নামাজ ছেড়ে দেয়া। যাকাত না দেয়া। রোজা না রাখা। মানুষ হয়ে অপর মানুষের সামান্যতম ক্ষতি করা। প্রতিবেশী/আত্মীয়স্বজনের হক আদায় না করা। আমরা নাহয় আগে সেসব শুধরাই। হাশরের ময়দানে প্রতিটা আত্মা "ইয়া নফসি" পড়বে, যে যার কর্মফলের জন্য দায়ী থাকবে। আমার সন্তান কী করলো, আমার দোস্ত কী করলো সেটার উপর ভিত্তি করে আমার বেহেস্ত দোজখ নির্ধারিত হবেনা। আমরা নাহয় নিজেদের নিয়েই ভাবি।
গতরাতেই সূরা বাক্বারার ১৭৭ নম্বর আয়াতটি পড়লাম। দুর্দান্ত! কিভাবে "মুসলিম" হতে হবে সেটাই মাত্র এক লাইনে আল্লাহ বলে দিয়েছেন। শেয়ার করেই আজকের লেখার ইতি টানি।
"সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে (কাবার দিকে বা বিপরীত দিকে), বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান (বিশ্বাস) আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই (আল্লাহর) মহব্বতে আত্নীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা অঙ্গীকার রক্ষা করে (কথা দিয়ে কথা রাখা) এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্য ধারণকারী - তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।"
প্রতিটা বাক্য নিয়ে আলাদা আলাদা আর্টিকেল লেখা সম্ভব। কিন্তু আশা করি সবাই বুঝতেই পারছেন আল্লাহ কি বলেছেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে জ্ঞান দিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ১০:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


