somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রনির বাচ্চাদের সমাজচ্যুত করা

১২ ই জুন, ২০১৮ রাত ১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কিছুদিন আগে মাশাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে ছবিসহ একটা পোস্টে জানিয়েছিলাম যে আপনাদের সবার সহযোগিতায় আরেকটি শিশুর হৃদপিন্ডে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে, হার্টের ছিদ্রটি বন্ধ হয়েছে, এবং সে এখন সুস্থ আছে।
এক আপু ইনবক্সে জানালেন তাঁর বাচ্চারও ছোটবেলায় এই সমস্যা ছিল। দুই বছর বয়সে অপারেশন হয়েছিল, এবং ছেলেটি এখন সুস্থ আছে। তবে নিজের বুকে সেলাইয়ের দাগটির কারনে সে খুব হীনমন্যতায় ভোগে। কারোর সাথে সহজভাবে মিশতে চায়না, এবং এই দাগের কারনে প্রায়ই ডিপ্রেসড থাকে।
আমি তাঁকে জানালাম যে আমার নিজের গালে একটা জন্মদাগ আছে, এটি মানুষ দেখতে পারে, এবং এই কারনে আমাকে অনেক কথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমার জীবন সেজন্য থেমে থাকেনি। বললাম শিশুটিকে বুঝাতে যে জীবন অনেক বড়, অনেক ব্যাপক এবং মহান - তুচ্ছ দাগ নিয়ে চিন্তা করে নষ্ট করার মতন সময় নেই।
তিনি বললেন, "ঠিক আছে, আমি তাঁকে বলবো আপনার কথা।"
তারপর মহিলা বোমা ফাটালেন।
"ওর বন্ধুর মায়েরা প্রায়ই ওকে বলে বুকের জামা সরিয়ে অপারেশনের দাগ দেখাতে। এই বিষয়টাই ওর পছন্দ না, কিন্তু কেউই বুঝতে চায় না।"
আমি বুঝতে পারলাম সমস্যাটার মূল কোথায়। এই মহিলাদের আলগা কৌতূহল। কেনরে বাপ, তোর বাপের কী? ঐ ছেলের বুকে অপারেশনের দাগ দেখে গবেষণা করে তুই কী এমন নোবেল পুরষ্কার জিতে যাবি? উল্টা তোর মুখভঙ্গি এমন হবে যে শিশুটি ধরেই নিবে সে আর আট দশটা বাচ্চা থেকে ভিন্ন। নাহলে সবাই তাঁর দাগ দেখতে আগ্রহী কেন? নিশ্চই দাগটা খারাপ। ক্ষেত্রবিশেষে ধরে নিবে সে অভিশপ্ত।
ভদ্রমহিলা ক্যান্টনমেন্টে থাকেন। আমরা জানি যে অলি গলি বস্তির মানুষ ক্যান্টনমেন্টে থাকেনা। কাজেই ধরেই নেয়া যায় সমাজের একটি শিক্ষিত, সভ্য, ভদ্রপল্লীতে শিশুটি বড় হচ্ছে। সেখানেই তাঁর সাথে চলছে এই মানসিক বর্বরতা, এই শিশু যাবে কোথায়?
হুমায়ূন আহমেদের দুই ছেলেকে নিয়ে শাওন এসেছিল ডালাসে বেড়াতে। উঠেছিল আমাদের ফরহাদ ভাইয়ের বাসায়। শাওনকে বললাম তাঁর দুই সন্তানের সাথে ছবি তুলতে চাই। প্রিয় সাহিত্যিকের রক্ত বইছে দুই শিশুর শরীরে, বাপের সাথে না হোক, ছেলের সাথেই স্মৃতি ধরে রাখা যাক।
তিনি জানালেন, লোকজনের ভিড় ওদের পছন্দ নয়। মাঝে মাঝেই ওরা আতঙ্কিত হয়ে যায়, বিশেষ করে ছোটটা তাঁর মাকে প্রশ্ন করে, "আমিতো ওদের চিনিনা, ওরা কেন আমার সাথে ছবি তুলতে চায়? ও কিভাবে আমাকে চেনে?"
মা তখন বুঝান তাঁর বাবা কী ছিলেন। কিন্তু শিশুটি বুঝতে চায়না। বুঝতে চাইবার কথাও নয়। ওর মাথায় কিছুতেই ঢুকে না, কেন ওর বন্ধুদের সাথে লোকজন ছবি তুলে না? কেন তাঁকেই সবাই আলাদা করে দেখে?
আমরা কত সহজেই একটি শিশুর কাছ থেকে তাঁর শৈশব কেড়ে নেই। এবং অল্পের জন্য সেই অপরাধের ভাগিদার আমিও হতে যাচ্ছিলাম।
লোকজনের প্রাইভেসি লঙ্ঘনে আমাদের কাজকারবার লেজেন্ডারি পর্যায়ের।
কিছুদিন আগে প্রিয়াংকা চোপড়ার সাথে সেলফি তোলার জন্য লোকজনের বর্বরতা সেইরকম ছিল। গায়ের সাথে গা লাগিয়ে ছবি তুলতে হবে। তারকাদের শরীর না ছুঁলেতো চলবেই না। কিছু বললে বলবে, মিডিয়া তারকা? তারাতো পাবলিক প্রপার্টি।
কোন বলদই বুঝতে আগ্রহী নয় ওদেরও ব্যক্তিগত জীবন থাকে। স্বামী/স্ত্রীর ঝগড়া হয়, বাচ্চাকাচ্চাদের বড় করতে গিয়ে নানা টেনশনের মধ্য দিয়ে যান।
একবার ক্যাটরিনা কাইফ প্লেনে করে যাচ্ছিলেন। এক মেয়ে জেদ ধরলো তাঁর সাথে ছবি তুলতে হবে। ক্যাটরিনা কয়েকবার নিষেধ করার পর মেয়েটা বিরক্তিকর কান্নাকাটি শুরু করলে এয়ারহোস্টেজকে দিয়ে মেয়েটিকে বিদায় করা হয়েছিল। ব্যস, নিউজ হেডলাইন হয়ে গেল ক্যাটরিনা একজন অতি অহংকারী বেয়াদব নায়িকা। এক অবুঝ শিশুর মন ভেঙেছে।
আরে বাবাজি, সেই অবুঝ শিশুর কী অধিকার আছে তাঁর মন ভাঙার? সে কোন পরিস্থিতিতে ছিল এইটা কেউ বিবেচনায় নেয়? হয়তো সেইদিন তাঁর পরিবারের কোন সদস্য অসুস্থ ছিলেন। হয়তো সেইদিন তাঁর বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকাপ হয়েছে। আরও কত কিছুইতো হতে পারে।
কথা হচ্ছে, আপনার জীবনে যেমন অনেককিছুই চলে, তেমনি আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু না কিছু চলে। আপনার জীবনে যেমন এমন অনেক কিছুই আছে যা নিয়ে আপনি সবার সাথে আলোচনা করতে আগ্রহী নন, তেমনি প্রত্যেকের জীবনেই কিছু না কিছু থাকে যা নিয়ে তাঁরা সবার সাথে আলোচনা করতে আগ্রহী নয়।
কারোর ডিভোর্স হলো, সে হয়তো নিজের মনকে হালকা করার জন্য কাউকে খুঁজছে, কিন্তু সেটা যে আপনি, এই তথ্য আপনি কোথায় পেলেন?
"কেন, কী হয়েছিল? আমাকে বল। আমি জানতে আগ্রহী। কারন কারোর পেটের খবর না জানা পর্যন্ত আমার পেটের ভাত হজম হয়না। গুড়গুড় করে।"
তখন বলা উচিৎ, "আপনার জামাইর সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়ে হাতে নাতে ধরে ফেললাম। শালার ব্যাটা, তুই পরকীয়া করতে চাইলে ভাবীর সাথে কর, ভাবীর মেয়ের সাথে কর, তার জামাইর সাথে করবি ক্যান? বিবাহিত জীবনে ফ্রাস্ট্রেটেড এক ব্যাটা তোকে ইশারা দিল, আর তুই দৌড় দিলি?" তারপর মহিলার দিকে ফিরে বলুন, "ভাল করেছি না ভাবি? আচ্ছা, আপনার স্বামীর সমস্যা কী? সব ঠিক আছেতো? তাহলে এইভাবে বাইরে মুখ মারতে চায় কেন?"
মুখ খারাপ করতে চাইলে আরও করুন। এরা যদি তারপরে গিয়ে কিছুটা হলেও শুধরে।
এই যে রনি নামের লোকটা ধর্ষণ করতে গিয়ে ধরা খেল। পুরো বাংলাদেশ নেমে এসেছে তার বৌ বাচ্চাকে নসিহত দিতে।
"বৌ কেন নিজের স্বামীকে কন্ট্রোল করতে পারেনা।"
"বিবাহিত জীবন নিশ্চই সুখী নয়, নাহলে এমন সুন্দর বৌ রেখে কেন রাস্তার বেটির সাথে শুইতে চাবে?"
"আহারে অমন সুন্দর সুন্দর বাচ্চারা! এই বাবু, তোমার আব্বুর সাথে তোমার আম্মুর কী রোজ ঝগড়া হতো?"
আমাদের এলাকায় Rab এর তালিকাভুক্ত এক বিরাট সন্ত্রাসীর বৌ বাচ্চা থাকতো। বাপ জেলে, মা দুই শিশু নিয়ে এপার্টমেন্টে থাকে। দেবশিশুর মতন দেখতে ঐ দুই বাচ্চার সাথে কেউই মিশতো না। এবং কোন এক বিচিত্র কারনে ঐ দুই বাচ্চা আমাকে খুব পছন্দ করতো। রাস্তায় দেখা হলে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে হাতছানি দিয়ে বলতো, "রাজীব ভাইয়া! রাজীব ভাইয়া!!"
আমার বন্ধু তখন মজা করে বলতো, "ব্যাপার কী? ওদের এত মোহাব্বত ক্যান তোমার প্রতি? ওদের খালা কিন্তু সুন্দর আছে। ওদের খালু হয়ে যাও। হিহিহি।"
একদিন তাঁদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি আমি ছাড়া এবং তাঁদের আত্মীয়দের কয়েকজন ছাড়া বলতে গেলে কেউই আসেনি। বাচ্চাগুলো আমাকে দেখে কী যে খুশি! শেরাটন থেকে কেক আনা হয়েছিল, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি। তৃপ্তির সাথে খেয়েছিলাম।
ভদ্রলোকেদের বিশ্বাস এই শিশুদের সাথে তাঁদের বাচ্চারা মিশলে বাচ্চারাও বিগড়ানোর সুযোগ আছে। পুরোটাই Pre-assumption. কিন্তু এই গ্যারান্টি কে দিচ্ছে যে তাঁদের বাচ্চারা বাইরে নষ্ট হচ্ছেনা? এবং এই শিশুগুলো ভাল হবেনা?
আগে দেখুন এই বাচ্চাগুলোর মধ্যে তাদের বাপের কোন কোয়ালিটি আছে কিনা। শুরুতেই কেন ধরে নিচ্ছেন ব্রাক্ষণের পুত্র ব্রাক্ষণ হবে এবং শূদ্রের পুত্র শূদ্র?
পিতার অপরাধে এদের সমাজচ্যুত করে দিয়ে সমাজই এদের অপরাধী করে গড়ে তুলছে। ওরা কেন সমাজকে ভালবাসবে যেই সমাজ তাঁদের ওদের অংশ হিসেবে মনে করে না?
আমি কিন্তু নিজের মতবাদ দিচ্ছি না। সাইকোলজি এবং ক্রিমিনোলজির আলোকেই বলছি। এছাড়া সোশ্যাল স্টাডিজও আমার পক্ষ্যেই কথা বলবে।
অপরাধ সাধারণত বস্তিতেই কেন হয় বলে আপনার ধারণা? একটি ছেলে যখন ভদ্র সমাজের কারোর পেটে ছুরি চালায়, এই ভেবেই চালায় যে ঐ লোকটা তার কেউ নয়, বরং তাকে ঘৃণা করে। অতএব একে মারা জাস্টিফাইড।
আমার এইসব কথাবার্তায় অনেকেই মাইন্ড করেন। অনেকের সাথেই মতবিরোধ হয়। প্রায় সবাইই তিরষ্কার করেন। কিন্তু যুক্তি প্রমান দিয়ে কেউ কাউন্টার করতে পারেন না।
রনির বাচ্চাদের সাথে এমন আচরণ করতে থাকুন। যদি এরা বড় হয়ে অপরাধী হয়, তারপরে ওদের নিয়ে ছিঃছিঃ করার আগে পারলে নিজেকে দোষ দেয়ার চেষ্টা করবেন। আপনারা এমন আচরণ করেছিলেন বলেই সেদিনের সেই বাচ্চারা আজকে এমন অপরাধী হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১৮ রাত ১:৫৭
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: আরও একটি প্রশ্ন

লিখেছেন মুনতাসির, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫০

প্রথম আলোতে মুনির হাসানের ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন’ লেখাটি পড়লাম। পাকিস্তানে Google-এর নিজস্ব অফিস চালু হওয়াকে সামনে রেখে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একসময় খুব বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×