somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোনটা ধর্ম বিশ্বাস ও কোনটা কুসংস্কার

১৩ ই মে, ২০২২ রাত ১১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফেসবুকে কিছুদিন পরপর কিছু পোস্ট খুব ভাইরাল হয়। এর মাঝে অনেকগুলোই ধর্মীয় পোস্ট। লোকজন মনে করেন ধর্মীয় পোস্ট ভাইরাল করলেই বুঝিবা বিরাট সোয়াব হবে। সমস্যা হচ্ছে, যেগুলো ভাইরাল করার কথা সেগুলো বাদ দিয়ে আজাইরা এমনকিছু ভাইরাল হয়, যা ধর্মীয় না। কিছু ক্ষেত্রে বাটপারি।
যেমন, নবীর (সঃ) পোশাকের নামে একটা ছবি খুব ভাইরাল হলো। ওটা নবীজির (সঃ) পোশাক হবার কথা না, এর পক্ষে বহু শক্তিশালী যুক্তি দেয়া সম্ভব। সেটা বাদ দিয়ে মূল প্রসঙ্গে আসি, এবং তা হচ্ছে, লোকজন এই ছবি বা এমন পোস্ট বিশ্বাস করাকে ঈমানের অঙ্গ বানিয়ে ফেলছে। এই ছবি ভুয়া না সত্য - এই যাচাই বাছাইয়ে না গিয়ে লোকজন সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে বলে ভাইরাল করায় ব্যস্ত।
বা ধরেন কিছুদিন আগে একটা গাছের ভিডিও পোস্ট করে ভিডিও বানানেওয়ালা শিরোনাম দিলেন, "সাহাবী বৃক্ষ।"
একটা বৃক্ষ কোন লজিকে সাহাবী হবে? মানে, ভিডিওয়ালা কি সাহাবীদের সস্তা বানালো নাকি সামান্য একটা গাছকে মহান বানালো? নবী (সঃ) একটা গাছের নিচে বিশ্রাম নিলেই সেই গাছ "সাহাবী" হয়ে যায়? লোকজনও সেখানে কমেন্ট করছে, "হে আল্লাহ! এই পবিত্র/বরকতময় বৃক্ষ জিয়ারত করার তৌফিক দান করো!"
ইসলামে ধর্মীয় কারনে জিয়ারত করার অনুমতি কেবলমাত্র মক্কা, মদিনা এবং জেরুজালেমের আছে। এই তিন জায়গা ছাড়া অন্য কেউ "ধর্মীয়" কারনে কোথাও যেতে পারবে না। না আজমীর, না সিলেট, না অন্য কোথাও। খোদ নবীজির (সঃ) নির্দেশ এটি।
সেই সাথে যুক্ত করা যাক আরেকটা ঘটনা।
একদিন উমার (রাঃ) দেখেন কিছু নতুন মুসলিম একটা গাছকে ঘষাঘষি করছে। ঘটনা কি জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হয়, এরা জানতে পেরেছে একদিন এই পবিত্র গাছের নিচে নবীজি (সঃ) বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তাই এই বৃক্ষ পবিত্র, এই বৃক্ষ বরকতময়। এবং তাই বরকত নিতে লোকজন এই গাছের "পূজা" করছে।
উমার (রাঃ) সাথে সাথে সেই গাছ কেটে ফেলার নির্দেশ দেন।
উপরের ঘটনার সাথে এই ঘটনার কোন মিল পাচ্ছেন? একশন কি হওয়া উচিৎ তাহলে? গাছ কাটার দরকার নাই, ঐ ভিডিওওয়ালার ভিডিও রিপোর্ট করে বন্ধ করা আগে জরুরি।
লাইক ও ভিউর জন্য লোকজন নিজের ধর্মকে এত সস্তায় বিক্রি করে! সেটা জামার ছবি হোক বা সাহাবী বৃক্ষের ভিডিও!
এইবার আসি সবচেয়ে জরুরি বিষয়ে। সেটা হচ্ছে, "ইসলাম" মিশিয়ে যে যা বলল, যা তা শোনালো, অমনি সেটা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা কি ঈমানের পরিচয় নাকি বোকামির?
যেমন ধরা যাক জ্বিনের প্রসঙ্গ।
কোনই সন্দেহ নেই যে আল্লাহ মানুষের পাশাপাশি জ্বিন ও ফেরেস্তা সৃষ্টি করেছেন। আরও বহু সৃষ্টি আছে তাঁর যা সম্পর্কে আমাদের কোনই ধারণা নাই। পবিত্র কুরআনে বহুবার জ্বিনের প্রসঙ্গ এসেছে, ইবলিস নিজেই ছিল জ্বিন, আমাদের নবীর (সঃ) কাছ থেকে জ্বিনেরা দীক্ষা নিয়েছে এই কথাও সূরা জ্বিনে আছে। জ্বিন (বা এই জাতীয় অদেখা ভুবনের বাসিন্দা), ফেরেস্তা, আখিরাত, বিচার দিবসে বিশ্বাস করা আমাদের ঈমানেরই অঙ্গ। তাই বলে আমাদের দেশে কোন পীর ফকির যদি দাবি করে বসে যে ওর কথায় জ্বিনেরা ডন বৈঠক দেয়, মানুষের নানান সমস্যার সমাধান করে থাকে, তাহলে সেটা বিশ্বাস করাও কি ঈমানের অঙ্গ হবে?
না। বুদ্ধিমান মুসলিম মাত্রই কুরআন হাদিস ঘাঁটবে। তখন সে দেখবে যে শুধুমাত্র আদম (আঃ), সুলাইমান (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সঃ) ছাড়া অন্য কোন নবীর সাথে জ্বিনের সাক্ষাৎ বা কথাবার্তার কোনই রিপোর্ট নেই। না ইব্রাহিম (আঃ), না নূহ (আঃ), ঈসা (আঃ), মুসা (আঃ), ইউসুফ (আঃ) প্রমুখ বড় বড় নবী রাসূল - উনারা জ্বিনের সাক্ষাৎ পেয়েছেন, জ্বিনদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন এমন কোন রিপোর্ট নেই। একজন সাহাবীর জবানীতেও এমন কোন ঘটনা নেই। সাহাবীদের স্থান নবী রাসূলদের পরেই। তাঁদের ঈমানের ব্যাপারে আল্লাহ স্বয়ং সাক্ষ্য দিয়েছেন। নবীজি (সঃ) গর্বিত ছিলেন তাঁদের নিয়ে। তাঁদের যদি জ্বিন দেখার ও পোষার ক্ষমতা না থাকে, তবে কিভাবে, কোন লজিকে আমরা বিশ্বাস করবো একজন সাধারণ মানুষকে আল্লাহ সেই ক্ষমতা দিবেন? তাহলে কি এই লোক সাহাবীদের চেয়ে, এবং তিনজন বাদে বাকি সব নবী রাসূলের চাইতে বেশি স্পেশাল? ইসলামিক লজিক কি বলে? লোকজন তাহলে কিভাবে বিশ্বাস করে অমুক আউলিয়ার জন্মের আগে ডাকাতদের হাত থেকে মাকে রক্ষা করতে বাঘ হয়ে এসেছিলেন? কিংবা ছোট বড় পীর আউলিয়া নিয়ে এমনই সব গল্পগুজব শোনা যায়। এবং না বিশ্বাস করা মানে ওরা ধরে নিবে আপনি মুসলিমই না। এইটা কি ধর্ম নাকি তামিল সিনেমা?
আরেকটা উদাহরণ দেই। সুলায়মান (আঃ) নবীর ঘটনা। তিনি একদিন তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় পিঁপড়ার ঢিবি পড়ে। তাঁর বাহিনীকে দেখে পিঁপড়া নিজের সঙ্গীসাথীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে যে এখনই নিরাপদ স্থানে সরে যেতে, নাহলে কুচলে যাবে।
পিঁপড়ার কথা সুলায়মান (আঃ) বুঝতে পারেন বলে তিনি তাঁর রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করেন, এই চরম ক্ষমতা তাঁকে দান করার জন্য। এই পর্যন্তই কুরআনে আছে। কিন্তু এতে যদি "আলিফ লায়লা" মার্কা মাল মশলা যোগ না হয়, তাহলেতো মানুষের স্বাদ আসবেনা। কাজেই ঢালো মশল্লা। কুরআনের বাইরে গিয়ে এখন কাহিনী যুক্ত হয়, "সুলায়মান নবীর সেনাবাহিনীর জন্য পিঁপড়ার দল ভোজের আয়োজন করে। সবাই মিলে একটাই মুরগির রান তুলে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু এতেই গোটা বাহিনীর পেট ভরপুর হয়ে যায়। কারন খাবার আগে সবাই বিসমিল্লাহ বলে খেয়েছিল। সুবহানাল্লাহ বলবেন না? ঠিক কিনা? কথা বলে না ক্যান?"
নবী (সঃ) হুঁশিয়ার করে বলেছেন তাঁর নামে উল্টাপাল্টা কোন মিথ্যা কথা যেন প্রচার না হয়। অথচ গোটা বিশ্বব্যাপী হাদিসের নামে এইসব আজগুবি গল্প ভরপুর।
এদিকে গাইবান্ধায় এক মহিলা নাকি মৃত্যুর নয়মাস পরে জীবিত হয়ে ফেরত এসেছেন। তিনি তাঁর পরিবারের সবাইকে চিনতে পারছেন, তাঁর পরিবারও তাঁকে আপন করে নিয়েছে। দেশব্যাপী এটি ভাইরাল হচ্ছে "আল্লাহর মোজেজা" হিসেবে।
প্রথম কথা, মৃত্যুর পরে এইভাবে যদি কেউ কবর থেকে উঠে চলে আসতে পারতেন, তবে সেটা হতো আমাদের সব নবী রাসূল ও সাহাবীগণের। একজনও আসেননি। কাজেই গাইবান্ধার মহিলার আসার প্রশ্নই উঠে না। এই মহিলা আসলেই সেই মহিলা কি না, সেটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমান করা আরও সহজ। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ টেস্ট করলে সহজেই বেরিয়ে আসবে এই বাড়ির সন্তানদের মা কি এই মহিলা কিনা। এইটাই সবচেয়ে নির্ভুল পরীক্ষা। কারন, কবর খুঁড়লে যদি লাশ না পাওয়া যায়, চুরি হয়ে থাকতে পারে, অথবা সরিয়ে ফেলাও হতে পারে, তখন এই বিশ্বাস পাকা হয়ে যাবে। মহিলা চিটার বাটপার কিনা, সেটা পুলিশ তদন্ত করে দেখছে। তবে এই ধরনের ভিডিও ভাইরাল করার মানে আপনার ঈমানের দুর্বলতা প্রকাশ করা। এর মানে হচ্ছে, আপনি কিছুতেই আল্লাহর অস্তিত্বে কনভিন্সড না, এখন এইসব মাল মশলাদার ঘটনা বিশ্বাস করে নিজের বিশ্বাসকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছেন।
ঈমানী সমস্যার পাশাপাশি আরেকটা ইহলৌকিক সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেকোন রোগকেই, বিশেষ করে মানসিক রোগকে "জ্বিনের আছর" বলে চালিয়ে দেয়া হয় এবং ভন্ড পীরদের দিয়ে জ্বিন চিকিৎসা করানো হয়। জ্বিন চিকিৎসা আমাদের দেশের শহরাঞ্চলেও হয়, অনেক ডিগ্রিধারী শিক্ষিতরাও করিয়ে থাকেন। এর পরিনাম হয় ভয়াবহ। অনেক স্বল্পশিক্ষিত মানুষ যখন দেখে তথাকথিত সমাজপ্রধানরা এইসব কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তখন ওদের অন্ধবিশ্বাস ও চর্চা আরও বৃদ্ধি পায়। বলিউডের অনেক সেলিব্রেটি, ক্রিকেটার এমন প্রমান স্থাপন করেছেন। মাথা খাটান, হাতে আট দশটা পাথর বসানো আংটি ও গলায়, কোমরে তাবিজ ঝুলানো ব্যবসায়ীকে দেখবেন একটা মুদির দোকানও ঠিক মতন চালাতে পারছে না, এদিকে বিল গেটস, ইলন মাস্কদের কোন আংটি, কোন তাবিজ পরতে দেখবেন না। আর অনেক মানুষের হয়তো সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থতা সম্ভব হতো, যা না হয়ে তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে থাকে।
ব্যাপারটা আসলেই সিরিয়াস।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০২২ রাত ১১:৫৬
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ বিকাল ৩:২৪

দুঃখ কষ্ট যশ খ্যাতির আর এক নাম চার্লি চ্যাপলিন...

চার্লি চ্যাপলিন। পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন মহান হৃদয়ের মানুষ আর আসেননি। স্বয়ং সত্যজিত রায়ের মতে- "পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পূর্ণদৈর্ঘ্য মরিয়ম মান্নানের মা (ফান ফটো পোস্ট)

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:৫৩

সোশ্যাল মিডিয়ায় গত কয়েক দিন মরিয়ম মান্নান নামটি খুব দেখা গেছো। আজ তার একটি রফা হলো-


টানা ২৯ দিন আত্মগোপনে থাকা রহিমা বেগমকে অবশেষে ফরিদপুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙলা সাহিত্যের বহুমুখী অনন্য প্রতিভাধর সাহিত্যিক ' আবদুশ শাকুর'

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ৮:৩৬


আবদুশ শাকুর
প্রথমে ইংরেজী সাহিত্যে মাস্টার্স করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যের( প্রথমে ঢাকা কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েঃ ১৯৬৫-৬৭) শিক্ষকতা দিয়ে শুরু পরে পরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে সচিব হিসেবে অবসর নেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

'যৌন কর্মীর ছেলে'

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ১১:১০


আমার বয়সে যারা আছেন তারা এই বাক্যটির সাথে পরিচিত। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যে আসলেই প্রশ্নফাঁস জেনারেশন তা পোস্টটি পড়লে আরেকটু নিশ্চিত হওয়া যাবে সম্ভবত। স্টুডেন্ট লাইফে 'ব্যাচেরল' নামক একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অহনাকে যে গানটি অহরহ শোনাতাম

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ১১:৩৯

আমার ল্যাপটপ অন থাকা মানে অবিরাম গান বাজতে থাকা। গান বাজে ল্যাপটপে, গান ঝরে কণ্ঠে, একটা কনসার্টেড সুর-মূর্ছনার তালে তালে ল্যাপটপের বাটনগুলোর উপর অনবরত আমার আঙুলগুলো খেলতে থাকে।

অহনার সাথে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×