বই— দ্য স্পাই
লেখক— পাওলো কোয়েলহো
রূপান্তর— ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশনী— আদী প্রকাশন

'স্পাই' শব্দটার প্রতি আগ্রহ জাগে না, শব্দটা টানে না এমন কোন বইপড়ুয়া খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তার ওপর মাসুদ রানা, জেমস বন্ড—এরকম কিছু ক্যারেক্টারের কারণে স্পাইদের ওপর, তাদের কাজ-জীবনীর ওপর সীমাহীন আগ্রহ অনেক পাঠকের মতো আমারও। বইয়ের পাতায়, সিনেমার পর্দায় যেমন পড়া যায়, দেখা যায় একজন স্পাইয়ের কি বাস্তব জীবনেও তেমনই নায়কোচিত চলাফেরা? কেমন তার জীবনধারা। এসব নিয়ে তাই সাধারণ পাঠকের মনে অনেক জল্পনা-কল্পনা-প্রশ্ন। আর সেই স্পাই যদি হয় আবার মহিলা, তাহলে তো আগ্রহ আরও তুঙ্গে!
তাই, যখন জানতে পারি মহিলা স্পাই, মাতা হারি'কে নিয়ে বই বেরোচ্ছে তখন প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। একে স্পাই, তার উপরে লেখক আবার পাওলো কোয়েলহো—তাই আগ্রহ আরও উত্তুঙ্গে। অনুবাদ প্রকাশ পেতে ঝটপট পড়ে ফেললাম কোয়েলহো'র লেটেস্ট বই 'দ্য স্পাই'-এর অনুবাদ।
পাওলো কোয়েলহো সচরাচর যে ধরনের বই লিখেন, 'দ্য স্পাই' তা থেকে অনেকটাই ভিন্ন ধরনের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক আলোচিত চরিত্র মাতা হারি। সেই মাতা হারি'কে এ বইয়ের কাহিনি।
১৯১৭ সালে ফ্রান্সের এক কাক-ডাকা ভোরে ফায়ারিং স্কোয়াডে মাতা-হারি'র প্রাণদণ্ডের মধ্য দিয়ে শুরু বই। সেই প্রাণদণ্ডের টানটান উত্তেজনা দিয়ে যে পড়তে শুরু করলাম, তারপর একটানে পড়ে গেছি শেষ পর্যন্ত।
জাতিতে ওলন্দাজ মাতা-হারি প্যারিসে এসেছিল কপর্দকহীন অবস্থায়। সেখান থেকে সে ধীরে ধীরে নিজের রূপ আর নৃত্যশৈলী দিয়ে পুরুষদের হৃদয়ে আলোড়ন তুলে জায়গা করে নেয় দর্শক-শ্রোতার মনে। দেহের জাদুতে জয় করে নিয়েছিল বিত্তশালীদের হৃদয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই আকালের সময়ে মাতা-হারি'র রাজসিক জীবনযাপন সন্দেহ জাগায় সবার মনে। অবশেষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে হোটেল-রুম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে ১৯১৭ সালে।
মাতা-হারি'র সেই গ্রেপ্তার এবং প্রাণদণ্ড কিছু প্রশ্ন তুলে দেয় সবার সামনে। তুলে ধরে ক্ষয়-ধরা সমাজের কিছু নগ্ন সত্য।
নারী হয়েও স্বাধীনচেতা, উচ্চাভিলাষী হবার কারণেই কি পুরুষতন্ত্রের অহমে ঘা মেরেছিল মাতা-হারি? সেজন্যই কি পুরুষতন্ত্রের যূপকাষ্ঠে নিজের প্রাণ দিতে হলো তাকে? কিংবা আদতেই সে কি গুপ্তচর ছিল?
বেশ চমৎকারভাবে রিসার্চ করে কিছুটা সত্য, কিছুটা কল্পনার মিশেলে মাতা-হারি'র জীবনালেখ্য তুলে এনেছেন কোয়েলহো।
মাতা-হারি'র প্যাশন, উদ্যম, একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা, লজ্জা, গর্ব, বিশ্বাসঘাতকতা এবং বিষণ্ণতা সফলভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখনীর জোরে।
নিজের লেখা শেষ চিঠিতে মাতা হারি'র নিজের জবানীতে বর্ণিত 'দ্য স্পাই' এমন এক মহিলার জীবনের গল্প যে নারী সমস্ত প্রচলিত প্রথা ভেঙে ফেলতে পেরেছিল প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে এবং সেই প্রথাভঙ্গের মূল্য তাকে চুকাতে হয়েছিল নিজের জীবন দিয়ে।
সব মিলিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানে পড়ে ফেলার মতো এক বই 'দ্য স্পাই'। তবে রয়ে গেছে কিছু কিছু অতৃপ্তি-ও। বইটা আরেকটু বড় হতে পারত। বইয়ের আকৃতি কমিয়ে আনার কারণে ঠিকমতো হয়নি মাতা-হারি'র ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট।
কোয়েলহো'র বই মূল রস ঠিক রেখে সুখপাঠ্য অনুবাদ করা বেশ কঠিন একটা কাজ। তবে সেই কাজে খুব ভালোভাবেই উৎরে গেছেন অনুবাদক। কোয়েলহোর কাব্যিক এবং গুরুগম্ভীর ভাবটা সফলভাবে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন অনুবাদক। ভাষাশৈলীর ওপর চমৎকার দক্ষতা দেখিয়েছেন।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ১০:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


