ইতিহাসে কোনো হত্যাই সমর্থনযোগ্য নয়: সভ্যতার পরাজয় বনাম রাজনীতির নামে হিংস্রতা
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কারণে বহু মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, তিতুমীর এবং ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড প্রতিটি ঘটনাই নিজ নিজ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে একটি সত্য আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট, কোনো হত্যাই কখনো সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার সম্পদ লুটপাট, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের শোষণের ফলে এখানকার অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর একটি নবজাত রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সীমিত সম্পদ নিয়ে পথচলা শুরু করতে হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ছিল এক কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু সেই বঙ্গবন্ধু সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রের ভেতরে যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দুর্নীতি ও সম্পদ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা বা জবাবদিহি চাওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না।
একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির সন্তান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে তা স্বাভাবিকভাবেই দেশ-বিদেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অথচ আগের আমলের সাধারণ পরিবারেও কয়েক ভরি স্বর্ণের গয়না মা, খালা কিংবা পরিবারের নারীদের কাছে সযত্নে থাকত। যে ব্যক্তি জুলিও-কুরি শান্তি পদকে ভূষিত হয়েছিলেন, তাঁর কি সোনার মুকুটের অভাব ছিল?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে চরম অর্থনৈতিক সংকটে বিদেশে গিয়ে সাহায্য চাইতে হয়েছিল। এমন একটি সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরে যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মী জনগণের সম্পদ লুটপাট করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং জবাবদিহি দাবি করা সম্পূর্ণ ন্যায্য। খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও দুর্নীতি, চোরাচালান ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বারবার বলেছেন।
বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে ইতিহাসে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। বঙ্গবন্ধু এটিকে রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন এবং জনগণ তা গ্রহণ না করলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন, এমন বক্তব্যের উল্লেখ বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় পাওয়া যায়।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, জনগণ যদি সত্যিই তাঁর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণভাবে অবস্থান নিত, তবে কি তাঁকে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হতো না? পরবর্তীকালে যেমন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তেমন কোনো গণঅভ্যুত্থান বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কেন তৈরি হলো না, এ প্রশ্ন ইতিহাসের পাতায় থেকে যাওয়া স্বাভাবিক।
তবে রাজনৈতিক মতবিরোধ বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সমাধান হিসেবে হত্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ভুল, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষোভ, কোনোটিই একজন মানুষকে হত্যা করার কোনো বৈধ বা ন্যায্য কারণ হতে পারে না।
একইভাবে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকেও কোনো রাজনৈতিক যুক্তিতে সমর্থন করা যায় না। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ও মৃত্যুকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস রয়েছে, সেখান থেকেও আমাদের একই শিক্ষা নেওয়া উচিত। মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, তিতুমীর কিংবা ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়কে গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত করেছে।
১৯৭১ থেকে ২০২৪ কিংবা ২০২৬, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও প্রতিহিংসার দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, হত্যা কোনো সভ্য জাতির রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথ হতে পারে না।
কাউকে আমরা রাজনৈতিকভাবে পছন্দ বা অপছন্দ করতে পারি, তাঁর নীতি ও সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করতে পারি; এমনকি কোনো সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটাতে নিয়মতান্ত্রিক গণআন্দোলনও করতে পারি। কিন্তু একটি মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই।
একটি প্রকৃত সভ্য জাতির সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সে বিরোধী মতকে সহ্য করতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে কথা বলতে পারে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে আইন, নির্বাচন ও অহিংস গণআন্দোলনের মাধ্যমে। প্রতিহিংসামূলক হত্যাকাণ্ড সেই সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে।
তাই বঙ্গবন্ধু থেকে জিয়াউর রহমান, সিরাজউদ্দৌলা থেকে মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা থেকে তিতুমীর, কিংবা শহীদ বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসের যেকোনো হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু মানুষ হত্যার পক্ষে কোনো যুক্তিই চিরকাল অগ্রহণযোগ্য।
সহজ কথায়, কোনো হত্যাই সমর্থনযোগ্য নয়। মানুষ হত্যা কোনো রাজনৈতিক বিজয় নয়, এটি মূলত সভ্যতারই চূড়ান্ত পরাজয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



