
মিথিলার থমথমে চেহারাটা যেন যে কোনো মুহূর্তেই শুরু হতে যাওয়া ঝরের পূর্বাভাস। রেস্টুরেন্টে মুখোমুখো বসে থেকে ইফতি সভয়ে আড়চোখে তাকায়। মিথিলার মনের ভাষাটা বুঝার চেষ্টা করছে।
একদিকে রেস্টুরেন্টের নরম আলোয় গোলাপ হয়ে ফুটে থাকা মিথিলার মায়াকাড়া অভিমানী মুখ, আরেকদিকে মৃদু লয়ে বাজতে থাকা বাবুল সুপ্রিয়ের "ও যে মানে না মানা..." গানটি যেনো সমুদ্রের তীরে আছড়ে পরা ঢেউয়ের মতই ইফতির করুণ হৃদয়ে একটা শূণ্যতার হাহাকার তুলে দিচ্ছে থেকে থেকে। মনে মনে সে বলছে, "মিথিলা এইবারের মত আমাকে মাফ করে দাওনা প্লিজ, প্লিইইজ। জানোই তো আমি গুছিয়ে কিছুই বলতে পারিনা। বোকামো গুলো করে ফেলার পর বুঝতে পারি যে তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। অথচ দোষ স্বীকার করে নেওয়ার গুণটিও যে প্রচন্ড অভিমানী এই হতভাগার মধ্যে কখনোই গড়েই উঠেনি তুমি তো সেটাও বোঝো। কিন্তু এটা তো সত্যি যে আমি তোমাকে খুব খুউউব ভালোবাসি মিথিলা।"....
"এই যে এগুলো তোমার কাছেই রেখে দাও ইফতি। আমার আর দরকার হবে না।" মিথিলার কথায় সম্বিৎ ফিরে ইফতির। হাতব্যাগ থেকে ছোট্ট দুটো টেডি পুতুলের চাবির রিং বের করে টেবিলে রাখে মিথিলা। ইফতির ভেতরটায় আচমকা একটা ঘূর্ণি যেনো সমস্তটা লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। মিথিলাকে দেওয়া তার একমাত্র উপহার! হ্যাঁ, সাত বছরের প্রেমে এই একমাত্র উপহার যেটা নিতে মিথিলা কোনো আপত্তি করে নি। হাতের তালুয় এঁটে যাওয়া তুলতুলে এই পুতুল দুটি। কি অদ্ভুত মেয়েটা! উপহার দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটাকে কখনোই প্রশ্রয় দেয়নি এতটা দীর্ঘ সময়েও। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কোনো উপহার নিতেই সে নারাজ। বিয়ের পর নাকি সুদে আসলে সবটা আদায় করে নেবে! মিথিলার কিছু কিছু ব্যাপার ইফতির কাছে বড্ড বাড়াবাড়ি মনে হয়। অথচ এই ব্যাপারগুলোই হয়ত কোনো না কোনো ভাবে ইফতির নিকট মিথিলাকে আকর্ষণীয় করে রেখেছে, খুব গোপনে।
মিথিলার আরেকটি গুণ হল সে সহজে রাগে না। তবে সঙ্গত কারণে যদি একবার রেগেই যায় তখন এই প্রচন্ড আত্মসম্মানি মেয়ের সামনে দাঁড়ানোটা ইফতির কাছে খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে উঠে। মিথিলা চেঁচিয়ে রাগ ঝাড়ে না কখনই। তার সামনে চোখের জলও ফেলেনি কোনোদিন। কিন্তু স্থির দৃষ্টিতে যখন দৃড়ভাবে ইফতির দিকে তাকিয়ে থাকে, ইফতি সে চোখে চোখ রাখতে পারেনা। তখন তার ভেতরের সমস্ত অপরাধগুলো নির্লজ্জের মত অট্টহাস্যে তাকে তিরস্কার করতে থাকে যেন। ইফতির মনে হয় মিথিলা বুঝি সবটা দেখতে পায়।
ইফতি জানে তার আর কিছুই করার নেই। মিথিলা ঝোঁকের বসে তাকে ছেড়ে যাবার মেয়ে নয়। সে যদি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে তবে অনেক ভেবেই নিয়েছে। আর তাই আজ সরাসরিই এখানে ডেকেছে। আজ ইফতির শত অনুরোধও হয়ত আর ফেরাতে পারবে না তাকে। হয়ত এইবার ইফতি একটু বেশিই করে ফেলেছে। হয়ত এইবার আর ইফতিকে ক্ষমা করতে পারেনি মিথিলা। ইফতিকে প্রায়ই মেয়েটা রোবট বলে সম্বোধন করলেও এই মুহূর্তে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ইফতি বুঝতে পারে তার ভেতরটায় তীব্র একটা কষ্টের অনুভূতি বারবার পাক খেয়ে উঠছে। একটা অস্বস্তিকর যন্ত্রণায় তার চোখ দুটি জ্বালা করছে। সে মিথিলাকে কোনোভাবেই হারাতে চায়না। অথচ মিথিলা তো খুব সহজেই সব হিসাব নিকাশ মিটিয়ে দিচ্ছে। পুরোনো স্মৃতিগুলো ইফতির হৃৎপিন্ডে পাথর অনুভব হয়ে চেপে বসে। তার এত কষ্ট হচ্ছে অথচ সে মিথিলাকে একবারের জন্যেও 'স্যরি'ও বলতে পারছেনা। নিজের এই স্বভাবটা ইফতিকে খুবই অবাক করে মাঝে মাঝে। এখন এই দুঃখের মাঝেও নিজের অসহায়ত্বে হাসি পাচ্ছে তার।
"নাও এটা পড়"। টেবিলে রাখা ইফতির হাতের কাছে একটা চিঠি ঠেলে দেয় মিথিলা। "বাহহ আর কি লাগে!" মনে মনে নিজেকে আবারো উপহাস করে ইফতি। সে জানে এই চিঠি দেওয়াটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়। মিথিলা ইফতিকে সরাসরি কোনো কথা বলে কষ্ট দেয়নি আজ পর্যন্ত। খুব রেগে গেলে মাঝে মাঝে ফোনে কিছু টেক্সট করে। সেসব টেক্সটের সরল ভাষায়ও কোথায় যেন একটা নিষ্ঠুরতা লুকানো থাকে। ঠিক ঠান্ডা মাথার খুনিদের মতই মিথিলা যেন ১৬ আনা প্রতিশোধই নিয়ে নেয় তখন। এখন তো আর টেক্সট করার সময় নয়। তাই হয়ত এই চিঠিটা দিচ্ছে, যেটায় লিখা আছে ঠিক কি কি কারণে ইফতিকে আজ এই মাশুল দিতে হচ্ছে। বা মিথিলাকে ছেড়ে সুখে থাকার জন্যে লাইন দুয়েক পাষাণ শুভকামনা। অথবা ইফতি নিজের প্রতি খেয়াল রাখার জন্যে কিছু নির্মল উপদেশ যেটা এখন পড়ে দেখা ইফতির পক্ষে কোনোভাবেই আরামদায়ক নয়। সে যাই হোক, এই মুহূর্তে চিঠিটা খুলতেও ইচ্ছে করছে না ইফতির। সব যখন শেষই হয়ে যাচ্ছে তবে আর কাটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটে খেয়ে কি লাভ?
তবুও কি মনে করে ইফতি খামটা হাতে নেয়। সত্যিই অদ্ভুত এই মেয়ে! ইচ্ছে করেই শেষ চিঠিটাকে, যেটা কিনা কোনো একটা হত্যার সাক্ষী হয়ে আছে, সুন্দর করে বানানো নীল খামে মুড়িয়ে দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে মিথিলার সারল্যের পেছনেও পৈশাচিক ভাবটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একেই বলে প্রতিশোধ! ইফতি আড়চোখে একবার তাকায় মিথিলার দিকে। হুম, মেয়েটার স্থির দৃষ্টিতে এখন একটা শান্ত খুনীর ছাপ স্পষ্ট। খাম খুলে চিঠিটা বের করে ইফতি। নিজের অজান্তেই একটা তিরস্কারের হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটে। চিঠিটা গোলাপী কাগজে লিখা। "নাও নাও... বেশি করেই মজা নাও মিথিলা" ইফতির অভিমানী সত্ত্বা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।
সব অস্বস্তি চেপে রেখে চিঠির ভাঁজ খোলে ইফতি। সেখানে রঙিন কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা-
"এই যে গাধা, আমার ট্যাঁও ট্যাঁও গুলার বাবা হবে তো তুমি? তাহলে বলো কবে বিয়ে করছ?"
প্রচন্ড স্নায়ুচাপে ভুগতে থাকা ইফতি বেচারার অনুভূতিটা তখন কেমন হয়েছিল আর মন মত শোধ তুলতে পেরে মিথিলাও কতটা পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিল তা নাহয় পাঠক নিজেরাই ভেবে নেবেন।
ছবি সূত্র- ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১৭ সকাল ১১:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


