somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবা , তোমাকে বলছি……

০৫ ই জুন, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাবা,
একা থাকাটা বড় কষ্টের, বেদনার । তবুও তুমি একা থাকতে ভালোবাস । পছন্দ কর আমাদের এরকম একা ফেলে যেতে । তাই না ?

আমি আর আপু । খুব ছোট ছিলাম তখন । বয়স কত হবে – ৪ কি ৫ । মনে পরে বাবা , আমরা সবাই এক রিকশায় উঠে বসতাম ? আমি , আপু , মা আর তুমি । তোমার দু’পায়ে দুই ভাই- বোন বসতাম । কী যেন এক নির্ভরতা ছিল সেই ভ্রমণ গুলোতে । তখন বুঝিনি । ছোট ছিলাম যে । টগবগ টগবগ শব্দে কল্পনায় ঘোড়া চড়তাম দুই ভাই বোন । ছোটবেলার সেই কল্পনার ঘোড়ার শব্দ এখনো আমার কানে বাজে - টগবগ টগবগ …।

মাঝে মাঝে বিকেল বেলা তুমি আমাদের তোমার বুকে আকড়ে ধরে শুয়ে থাকতে, ঘুম পাড়ানোর জন্য । কিছুটা ডানপিটে ছিলাম তখন । খেলার সময় চলে গেল বলে আমরা আস্থির হয়ে থাকতাম ; তারপর ঘুমিয়ে যেতাম । বাবা, বিশ্বাস কর । এখন মাঝে মাঝেই গভীর রাতে আমি সেই ছোট্টটি হয়ে যাই । তোমার বুকের ওম পাবার জন্য মরিয়া হয়ে যাই আমি । পাশের খালি বিছানায় হাতড়ে বেড়াই পাগলের মত । এখন আর ঘুম আসে না । শূন্য দৃষ্টি উপরের ছাঁদ ভেদ করে চলে যায় ঐ তারার দেশে । শূন্যতার হাহাকার । এই আমার ভেতরে আর ওই আকাশে ।অস্থিরতা কান্না হয়ে ঝড়ে পড়ে ।
আমাদের পড়ালেখা নিয়ে খুব সিরিয়াস ছিলে তুমি । কোন পরীক্ষায় খারাপ করলে খুব বকা ঝকা করতে । মা যে কয়বার তোমার বকা ঝকা থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার হিসেব নেই । ভীষণ ভয় পেতাম তোমাকে ।এখন বুঝি তোমার ওই কড়া শাসনে না থাকলে খুব ক্ষতি হয়ে যেত আমাদের । আশপাশের অস্থির সমাজে নিজেকে একা সামলে এতদূর চলে আসা আমাদের পক্ষে কখনও সম্ভব হত না । এখন বুঝি । তখন বুঝি নি কেন ?

বড় অসময়ে চলে গেলে তুমি । আর একটু সময় দিলে না ।

তোমার ছেলে মেয়েদের নিয়ে তোমার গর্বের সীমা ছিল না । স্বপ্নেরও ।আমি যখন কোনো পরিক্ষায় ভাল রেজাল্ট করতাম , তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারতাম; কী অদ্ভুত পরিতৃপ্তির ছায়া ছড়িয়ে থাকত তোমার চোখে মুখে । আনন্দে দিশেহারা ছোট্ট ছেলের মত সবাইকে নিজ থেকে তোমার ছেলের কৃতিত্ত্বের কথা বলে বেড়াতে । খুব লজ্জা পেতাম আমি । তোমাকে পরে বলতাম ; “এইভাবে কেউ বলে।”
তুমি হাসতে । চোরা চোখে এক ঝলক আমি তোমার হাসিটা দেখে নিতাম । আমি জানি তুমি টের পেতে না । তোমার এরকম হাসির উপলক্ষ্য তৈরী করতে আমি মরিয়া ছিলাম । বিশ্বাস করো ।
ঐ বার । ঐ যে আমি যখন খুব অসুস্থ হয়ে গেলাম । হাসপাতালে ভর্তি হতে হল ।ডাক্তার বিপদ মুক্তির ঘোষণা দিতে চায়নি । রাত জেগে তুমি আমার পাশে শুয়ে ছিলে ।আমি তোমার ফুঁপিয়ে কান্না মাঝে মাঝে টের পেয়ে যেতাম ।খুব অপ্রস্তুত লাগত নিজেকে । এখন যখন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি । এই ভার্সিটির হলে।
রাত জেগে কেউ আমার জন্য কাঁদে না ।কিংবা ধমক দিয়ে কেউ বলে না , ঔষধ খাস নি কেন ? কেন রোদে গেলি ? বাবা , একবার এসে এই বকা গুলো দিয়ে যেতে পারবে আমায় । খুব প্রয়োজন যে বাবা । আর একবার । ।

সেদিনটা তো ভুলতে পারছি না ।সকালবেলা কোর্টে গেলে তুমি ।আমি বাড়ি ছিলাম না তখন । দুপুরে খবর পেলাম তুমি হাসপাতালে । দৌড়ে গেলাম । সি.সি.ইউ, আই.সি.ইউ. তে তোমাকে না পেয়ে স্বস্তি পেলাম । হয়ত তেমন কিছু হয় নি বলে বাসায় চলে গেছ ।ইমার্জেন্সির কাছে গিয়ে শুনতে পেলাম আম্মুর গগনবিদারী চিতকার । ধ্বক করে উঠল বুকটা । গিয়ে দেখি স্ত্রেচারে শুয়ে আছ তুমি । সেই সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। নির্জীব । বাবা , আমার মনে নেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম কি না । তবে হ্যাঁ , তোমার ঠোঁটের দিকে আমি অনেক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম । আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম তুমি আমাকে ডাকছো । ভিতরে তোলপাড় হয়ে আছড়ে পড়লাম আমি তোমার উপর ।কান্নারা তখন বাঁধ্ন হারা । আমার মাথায় হাত বুলিয়ে তখন অনেকে সান্তনা দিচ্ছিল । কই তুমি তো একবারও আমার মাথায় হাতটা রাখলে না । কষ্ট বাবা । বড় কষ্ট। পরে জ়েনেছি , দু’টো মামলার এজলাস শেষে বের হয়ে তুমি বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ো । তারপর…।
তুমি কি সে সময় মনে মনে আমার নাম ধরে প্রচুর ডেকেছিলে ? আমি শুনতে পাই নি যে ।

বাবার লাশের গোসলে নাকি সন্তানকে থাকতে হয় । আমার সামনে অরা তোমার গায়ে সাবান মেখে দিল, গরম জলে গোসল করালো তোমায় । তুমি নিশ্চল । সন্তান হয়ে এই দৃশ্যটা আমার জন্য কতটা সহ্য করা যায় বলো ? ব্যাথা । বড় ব্যাথা বাবা এই বুকটায় । কান্নারা জমে যেন পাথর হয়ে বসে আছে বুকে। বড় ব্যাথা ।
ছোট মেয়েটার কথা কি তোমার এখন মনে পড়ে না ? যাকে এক নজর দূরে রাখতে চাইতে না । যার সাথে ছোট্ট বাচ্চার মত খুনসুটি করতে । আবার ও যখন অভিমানে কেঁদে বুক ভাসাতো ; ‘আম্মু, আম্মু’ বলে বুকে জ়ড়িয়ে রাখতে । চোখের জলে একাকার মেয়েটির ঠোঁটের কোণে হঠাত করে হাসির ঝিলিক দেখা দিত । অদ্ভুত সুন্দর লাগত মুহূর্তটা ।এই মেয়েটা এখন কার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে হঠাত করেই হেসে ফেলবে ? বলো ? বাবা, আমি তোমাকে বলছি ।

বাড়ির আলমিরাতে এখনও সেই ক্রেস্টগুলো সাজানো আছে ।
ভালো রেজাল্ট এর জন্য আমি বিভিন্ন সময় পেয়েছিলাম ।তুমি যখন অসুস্থ ছিলে তখন নাকি প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চুপি চুপি কাঁদতে । আমি বাড়ি গেলে তুমি বুঝতে দিতে না কিছুই ।এত্ত ভালোবাসতে কেনো আমায় ? বাবা, আমি ঐ ক্রেস্ট গুলোর দিকে এখন তাকাতে পারি না । কেন যেন ।
নিষ্ঠুর এই শহরে এখন নিজেকে বড় অসহায় লাগে । মনে হয় আমার ভেতরে কোথাও কোন জরুরী অঙ্গ এখন নেই । বড় শূন্য লাগে সবকিছু । এই চিঠি লিখতে গিয়ে কতবার যে কাগজগুলো কান্নার পানিতে ভিজিয়েছি তার হিসেব নেই ।মাত্র তো চার বছর হল তুমি নেই ।সারা জীবন ই যে কষ্ট গুলো বয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাকে । কেমন করে সইবো বলো ?
-তোমার ছেলে
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×