somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেবদ্রোহ

০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১০:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নৃপতি বেণ, পুরাণের একজন প্রতিনায়ক এবং সনাতন ধর্মবিশ্বাসী যেসব মানুষ তাঁর সম্পর্কে জানেন, তাদের কাছে তিনি ঘৃণিত এক চরিত্র। কিন্তু কেন তিনি ঘৃণিত? কী তাঁর অপরাধ? তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ঈশ্বরের আরাধনা কিংবা দেবতাদেরকে উৎসর্গ করে যজ্ঞ করে কোনো ফল লাভ হয় না, প্রকৃতি ঈশ্বর কিংবা দেবপতি ইন্দ্র বা অন্য কোনো দেবতার নিয়ন্ত্রণে নয়; ঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, দাবানল ইত্যাদি দূর্যোগ প্রকৃতির আপন খেয়ালেই হয়; এসবের ওপরে কারো হাত নেই। একারণে দেবতা এবং ব্রাহ্মণদের অনুশাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে তিনি তাঁর ‘ব্রহ্মাবর্ত’ নামক সাম্রাজ্য শাসন করতে চেয়েছিলেন। আর এজন্য তিনি ব্রহ্মাবর্তের মানুষের জন্য ক্ষতিকর মনুর বিধানসমূহ, বেদ, যজ্ঞ ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছিলেন; যা ছিল দেবতা ও ব্রাহ্মণদের জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেবতাদের নির্দেশে এবং ব্রাহ্মণদের তত্ত্বাবধানে সারা বৎসর ব্রহ্মাবর্তে অশ্বমেধ, কারীরী ইষ্টি, পুণ্ডরীক, সর্প ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞ করা হতো; এসব যজ্ঞের হব্যি পেতেন দেবতা এবং ব্রাহ্মণগণ। এছাড়াও দেবতা এবং ব্রাহ্মণদেরকে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে প্রাপ্ত করের ভাগ দিতে হতো। ফলে বেণ বিদ্রোহ করে মানুষের স্বার্থবিরোধী মনুর বিধানসমূহ এবং সকল প্রকার যজ্ঞ নিষিদ্ধ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হন দেবতা ও ব্রাহ্মণরা। তারা বেণকে বিদ্রোহের পথ থেকে সরে আসার নির্দেশ দিলেও বেণ তা মান্য করেননি। ফলে দেবতা এবং ব্রাহ্মণরা নৃপতির পদ থেকে বেণকে উৎখাত করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সেই সমাজে দেবতা এবং ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নৃপতি হিসেবে দীর্ঘদিন টিকে থাকার মতো যথেষ্ট শক্তি হয়ত বেণের ছিল না; এছাড়া দেবতা এবং ব্রাহ্মণরা ঈশ্বর, পরকাল, শাস্ত্র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করে বেণের বিরুদ্ধে খেপিয়েও তোলে। ফলে স্বাধীনভাবে সাম্রাজ্য শাসন করা বেণের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
কালের আবর্তে নৃপতি বেণের শাসনকালের অনেক অনেক শতাব্দী পরে মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে এইসব বৃহৎ যজ্ঞ করে সত্যিই কোনো ফল লাভ হয় না, তখন ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে যজ্ঞ। মনুর বিধানেও আজকের সমাজ-দেশ পরিচালিত হয় না। যার অর্থ এই দাঁড়ায় যে- নৃপতি বেণ তাঁর সমকালের চেয়ে চিন্তায়, দর্শনে ও কর্মে অনেক এগিয়ে ছিলেন; তিনি কোনো ভুল কিংবা অপরাধ করেননি। তারপরও বেণ পুরাণে প্রতিনায়ক হয়েই আছেন এবং আজকের সমাজের মানুষ পুরাণ পড়ে তাঁকে ঘৃণা করে। সুদীর্ঘকাল যাবৎ বেণের নামটি ঘৃণিতভাবে বন্দী হয়ে আছে শাস্ত্রের কারাগারে, বন্দী করেছেন তৎকালীন শাস্ত্রকারগণ। বেণের সম্পর্কে জানার পর অনেক চিন্তা-ভাবনা করে আমার এই উপলব্ধি হয়েছে যে- বেণ নিরপরাধ, সাহসী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক চরিত্র। প্রতিনায়ক নয়, বেণ তাঁর সময়ের নায়ক। বর্তমান কালের একজন লেখক হিসেবে দায়বোধ করেছি শাস্ত্রের কারাগার থেকে বেণকে মুক্তি দেবার জন্য; সেই দায়বোধ থেকেই লিখেছি উপন্যাস-‘দেবদ্রোহ।’
এই আখ্যান ইতিহাস নয়; পুরাণ থেকে কেবল বীজটি নিয়ে বেণকে কাণ্ডারী করে তৎকালীন সময়ের মানুষ, প্রকৃতি, ধর্ম ও সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, দণ্ডনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়সমূহ নিয়ে আমি ভাসিয়েছি আমার কল্পনার ভেলা। এই ২০২২ সালে বসে আমি আর্য-অনার্য বিতর্ক উসকে দিতে চাইনি, জাতিগত বিভাজন করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কেননা হাজার হাজার বছর ধরে আর্য-অনার্য রক্তের সংমিশ্রণ যেমনি হয়েছে, তেমনি হয়েছে ধর্ম ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বর্তমানে যে ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে তা নিখাঁদ আর্য কিংবা নিখাঁদ অনার্য ধর্ম ও সংস্কৃতি নয়, অনেক জাতি-গোষ্ঠীর মিলিত ধর্ম ও সংস্কৃতি। আমি কেবল শাস্ত্রের কারাগার থেকে নৃপতি বেণকে মুক্তি দিতে চেয়েছি, এবার পাঠকের পালা।

মিশু মিলন
ঢাকা।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ৩:২৪
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: আরও একটি প্রশ্ন

লিখেছেন মুনতাসির, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫০

প্রথম আলোতে মুনির হাসানের ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন’ লেখাটি পড়লাম। পাকিস্তানে Google-এর নিজস্ব অফিস চালু হওয়াকে সামনে রেখে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একসময় খুব বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×