ছোটবেলা থেকেই নদী আমার খুব প্রিয়। জানি না কেন,তবুও মনের মধ্যে সব সময়ই অনুভব করি নদীর হাতছানি।শীতলক্ষ্যা পারের মেয়ে আমি।নদী থেকে ইকটু দূরেই আমার বাড়ি।কিন্তু মাঝখানে বেড়ে ওঠা রাস্তা-বাড়িঘরগুলো নদী ও আমার মাঝে যেন দেয়ালের মত দাড়িয়ে আছে।রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরটা যখন ঘুমিয়ে পরে তখন রাত্রীর নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎ হঠাৎ শোনা যায় লঞ্চের শব্দ; স্টিমারের সাইরেন।তৃষিতের মত তাই আমি কান পেতে শুনি।আর বর্ষায় নদীর রূপটাই যেন বদলে যায়। যদিও নদীর দুই পারে কলঙ্কের মত বেড়ে ওঠা কল-কারখানাগুলোর চেষ্টার কমতি নেই শীতলক্ষ্যার রূপহরনে।তারপরও নদী যেন অপরূপা!
নৌকায় ঘুরে বেড়ানোটাও আমার ভারি পছন্দের।একটা সময় ছিল যখন আমরা বান্ধবীরা একসাথে হলেই বেড়িয়ে পরতাম নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য।পন্ঞাশ টাকায় এক ঘন্টা। এমনো হয়েছে, স্যারের বাসায় পড়তে গিয়েছি, হঠাৎ মনে হল নৌকায় ঘুরবো।ওমনি স্যারের পড়া বাদ দিয়ে দেছুট,,,,,,,।
একদিনতো আমরা নৌকায় ঘুরছি, মাঝনদীতে হঠাৎ ঝুমবৃষ্টি।নৌকার ভিতরে বসেও আমরা ভিজে যাচ্ছি ,মাঝিভাই বেচারাও আর ভিজতে না পেরে আমাদের সাথে এসে বসে আছে।আমরাতো ভয়ে শেষ, আবার ভালও লাগছিল। হঠাৎ করেই একজনের মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল।আর তার আইডিয়া মত আমরা আমাদের সবার নাম একটা কাগজে লিখে একটা বোতলে ভরে নদীর পানিতে ফেলে দিলাম আর কথা দিলাম আমরা পাঁচ বান্ধবী সবসময় একে অপরকে মনে রাখব আর আমাদের সবার যখন বিয়ে হয়ে যাবে তখন আমরা সবাই আমাদের জামাই নিয়ে এভাবেই একসাথে নৌকায় ভেসে বেরাবো।যে বয়সের যে ভাবনা। আহারে...... সেইদিনগুলো....!
আর একদিনের কথা।আমরা নৌকায় ঘুরছি, আমাদের এক বান্ধবী আপন মনে নদীর পানিতে হাত বুলাচ্ছে। হঠাৎ দেখি ওর হাত থেকে ইকটু দূরেই মানবসৃষ্ট স্পেসিয়াল বর্জপদার্থ ভেসে বেরাচ্ছে।যেই না ওকে দেখালাম ওমনি ওর চক্ষু চরকগাছ ।আর আমাদের কথা না হয় নাই বললাম; ভাবলে এখনো হাসি পায়।এমন কতই না আনন্দস্মৃতি জড়িয়ে আছে নদীটাকে ঘিরে।
ছোটবেলায় আমরা গ্রামে বেড়াতে যেতাম লঞ্চে করে।নদীর পারের মানুষের সেই ব্যস্ততা, কাশফুলের ছড়াছড়ি, গাঁয়ের দুরন্ত বালকের নদীতে ঝাপ দেয়া,গ্রাম্য বালিকাদের লঞ্চের মানুষগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা, সব কিছুই মনে দোলা দিয়ে যেত। আর লঞ্চের সেই ঝালমুরি....এখনো তার স্বাদ ভোলা যায় না। নদীর দুপারের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যেত।শহরের কাঠখোট্টা জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে এ যেন মুক্তির খোলা হাওয়া। এখনতো গাড়ি করেই গ্রামে যাওয়া যায়। কিন্তু লঞ্চের সেই আনন্দ কি আর গাড়িতে হয়! সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।যে দিন যায় সেই দিন কি আর ফিরে আসে?
আজও প্রতি বর্ষায় ভাবি,নৌকায় ভেসে বেরাবো, দুচোখ ভরে নদী দেখবো। বর্ষা আসে বর্ষা যায়।মনের এই ছোট্ট সাধটুকু কিন্তু অপূর্ণই থেকে যায়।আজ কতদিন হয়ে গেলো,আমার প্রিয় নদীটাকে দেখি না। যাকে পাই তাকেই বলি, চল না নদী দেখে আসি- কিন্তু শহরের ব্যস্ত মানুষের সময় কোথায় নদী দেখার! আজকে কালকে করে দিন কেটে যায়; আমারো আর নদী দেখা হয় না। তাই আজ মনে মনেই নদীর ছবি আঁকি।আর মাঝরাতে ভেসে আসা স্টিমারের সাইরেন শুনে মনে মনে ভাবি- 'কবে আবার দেখা হবে আমার প্রিয় নদীটার সাথে......'

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

