somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিহারী পাকিস্তানি থেকে বাঙ্গালী পাকিস্তানি............

৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পূর্ব পাকিস্তানে আগত বিহারীরা ছিলো ভারতের বিহার রাজ্যে জন্মগ্রহণ করা দরিদ্র মুসলিম।

তারা বিহার থেকে দেশান্তরি হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো ১৯৪৭ এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার আগুন থেকে বাঁচতে।

দেশ ভাগের সময়ে বেশ কয়েকটি নির্মম বাস্তবতা, যেমন:
/প্রতিনিয়ত চলমান হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় নিজের ও নিজের পরিবারের জীবন রক্ষা করাটাই ছিলো বিহারী মুসলিমদের সে সময়কার প্রথম করণীয়।
/দাঙ্গার ক্ষত নিয়ে আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম চেনা পরিচিত একটি এলাকা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত।
/পরিবার পরিজনসহ জন্মস্থান ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত।
/পৈতৃক সম্পত্তি বিসর্জন দিয়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমানো।

এসব কিছু মেনেই বিহারীরা তাদের জন্মভূমি বিহার থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছিলো। উপরোল্লিখিত এতগুলো মানসিক ক্ষত আর অন্যদিকে মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত একটি ভূখণ্ডে নিরাপদে বসবাস করার আশা এই দুইয়ের টানাপোড়েন নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয় সংখ্যা গরিষ্ঠ বাঙ্গালী অধ্যুষিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।

বিহারীরা ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক ও সংস্কৃতিতে পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালীদের থেকে সম্পূর্ণই আলাদা ছিলো।

তবে বিহারীরা যখন দেখল যে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি তাদেরকে তৎকালীন শাসক অবাঙ্গালী উর্দুভাষী পাকিস্তানিদের সুনজরে এনেছে, তাদের কাছে এনেছে, তাদের জীবিকা অর্জনের পথ অনেকাংশেই নিষ্কণ্টক করেছে, তখন তারা পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী অধ্যুষিত জনপদে স্থানীয় বাঙ্গালীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা বা তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার নূন্যতম প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। উল্লেখ্য যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালী মুসলমানদের সক্রিয় অবদান থাকা সত্ত্বেও তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই অবাঙ্গালী পাঞ্জাবি শাসক কর্তৃক বিবিধ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিলো।

সম্পূর্ণ নতুন একটা জনপদে বিহারীরা যে অবাঙ্গালী পাঞ্জাবী শাসকদের থেকে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছিল, তারা তাদের ওয়াফাদারি করবে না তো কার করবে? স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ মেয়াদে ফলাফল যা দাঁড়ালো, তা হল অবাঙ্গালী পাঞ্জাবি শাসকদের আনুকূল্য পাওয়া বিহারী আর বঞ্চিত বাঙ্গালীদের মধ্যে প্রায়শই সংঘটিত দাঙ্গা। আবার দাঙ্গা পরবর্তী সময়েও তৎকালীন অবাঙ্গালী পশ্চিমা শাসকদের একতরফা সহযোগিতা ও সহানুভূতি পেতো পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রিত বিহারীরা।

১৯৪৭ এর আগে পূর্ববঙ্গে এমন কোন উল্লেখযোগ্য একক শিল্প কারখানা ছিল না যা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। কৃষি প্রধান পূর্ববঙ্গে একমাত্র পাটের ব্যবসা থেকেই টাকা পয়সা আসতো। তাও পাটজাত দ্রব্য বিক্রি করে নয়, কেবলমাত্র কাঁচা পাট পশ্চিমবঙ্গে সরবরাহের মাধ্যমে। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালীদের সক্ষমতা পাট উৎপাদন করা আর সেই কাঁচা পাট পশ্চিমবঙ্গের মিল মালিকদের কাছে সরবরাহ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

মূল্য সংযোজন এর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা ভোগ করতো পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা। এসব মিল থেকে উৎপাদিত চট, সুতা প্রভৃতি পাটজাত দ্রব্য বিক্রি করে তারা ব্যাপক মুনাফা করতো। মূলতঃ সেখানকার পাটকল গুলো গড়েই উঠেছিল পূর্ববঙ্গ থেকে সরবরাহ করা পাটের উপর নির্ভর করে।

অবশ্য ৯১৪৭ এর পর পূর্ব পাকিস্তানে, পশ্চিম পাকিস্তানের আদমজী, বাওয়ানি ও ইস্পাহানি পরিবারের স্থাপন করা পাটকল গুলো পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের জীবনে গুণগত মানের বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনেনি। কাঁচা পাট সরবরাহ করার গন্তব্যস্থল পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। পশ্চিমবঙ্গের কুলীন হিন্দু ব্যবসায়ীদের জায়গায় স্হান করে নিয়েছিল কুলীন পশ্চিমের পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা। কলকারখানায় শ্রমিক ও কর্মচারী হিসেবে কাজ করার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এবং সেই সাথে ভাষা ও সংস্কৃতিগত সুবিধার বদৌলতে বিহারীরা অচিরেই পাটকল ও রেলের মত বিভিন্ন ভারী শিল্পে দ্রুত জায়গা করে নিল। আর বাঙালিরা ১৯৪৭ এর আগে যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই পড়ে রইল।

টানা ২৪ বছরের এমন সুখ স্মৃতি বিহারীরা উপেক্ষা করতে পারেনি। তারা যে কোন মূল্যেই হোক, দখলদার পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয় মাস যাবত মুক্তি সংগ্রামী বাঙালিদের সমানে কচুকাটা করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি পাঞ্জাবি শাসকদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি ভারতের বিহার রাজ্য থেকে আগত এই বিহারী পাকিস্তানিরা।

ইসলাম, ইসলামী মূল্যবোধ, মুসলিম ভাতৃত্ব ইত্যাদি নিয়ে যতো তত্ত্বকথাই চলুক না কেন, বাস্তবে ওসব কেউ কখনো বিবেচনায় আনেনি। ওই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্তই ছিল সেসব তত্ত্বকথার উপযোগীতা। বরং সেসব ছাপিয়ে মানুষের মাঝে গভীর ভাবে শেকড় গেড়েছিল পাঞ্জাবি জাত্যভিমান। মানে একজন পাঞ্জাবে জন্ম নেয়া একজন মানুষ যতটা না মুসলমান তার চেয়ে বেশি সে পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির সাথে নিত্য ওঠাবসা করা বিহারীরাও নিজেদের সেরকম জাতে উঠিয়ে ফেলেছিলো। স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন বাঙ্গালীরাও তাদের জাতিসত্তার পরিচয়ের ব্যাপারে সচেতন হতে বাধ্য হয়েছিলো।
১ম পর্ব শেষ

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?
আমরা বাংলাদেশী‌~বাঙ্গালী/(প্রযোজ্য জাতিসত্তা সমূহের নাম)
৭১ নিয়ে বানিজ্য করা খুব খ্রাপ....কিন্তু তার পরিবর্তে ইসলাম/ধর্ম নিয়ে বানিজ্যে নেমে পড়া কি সমিচিন?
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪১
২টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×