যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে দেশে। ৩বছরের মেয়ে আর ৯ মাসের পোয়াতী বউ নিয়ে গ্রামে যাবার সুযোগ পায়নি চাকরী সূত্রে নারায়নগন্জ্ঞে থাকা আবছার উদ্দিন।
রূপগন্জ্ঞ শহরের এই বাসাটিতে বিয়ের পর পরই নতু বউ নিয়ে ওঠেন তিনি। বিয়ের দশ বছর পরে মেয়ের জন্ম। এখনো এই বাসাতেই আছে। বাড়ীওয়ালার সাথে বাড়ীওয়ালা-ভাড়াটিয়া নয় বরং আত্নীয়তার সম্পর্ক হয়ে যায় এক সময়।
==========
দেশের অবস্থা ভাল নয়। শহরে মিলিটারী ক্যাম্প বসেছে। যখন তখন ধরে নিয়ে যাচ্ছে যাকে তাকে। উদ্বেগ উৎকন্ঠায় পার হয় প্রতিটি মুহুর্ত। প্রতিদিন রাতে মনে হয় একটি দিন বেঁচে গেলাম! আবার সকাল শুরু হয় উদ্বেগ দিয়ে। এভাবে বাঁচা যায়!
লাউ শাক দিয়ে কই মাছ রান্না করেছে সালেহা। মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছে। স্বামীর দুপুরের খাবার খেতে কারখানা থেকে ফেরার সময় হয়ে গেছে এরই মাঝে বাড়ীওয়ালা এসে বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ী থেকে পালাতে হবে মহল্লায় মিলিটারি ঢুকে পড়েছে।
বাড়ীওয়ালা আউয়াল মিয়া সালেহাকে নিজের ছোট বোনের মতই মনে করে। সালেহা ও তার মেয়ে এবং নিজের ৩ ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে বিলের ওপারে তার শ্বশুর বাড়ী চলে যেতে বলেন শিঘ্রই। স্ত্রীও নয় মাসের পোয়াতী। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সহ দুই পোয়াতী মহিলাকে একা ছেড়ে দেওয়ায় মন সায় না দিলেও কিছু করার নেই।
সালেহা বলে উঠলো,
= "ভাইজান রুবির আব্বা কই, সে আইলো না যে ?"
=> সে আসতেছে বইন, তুমি দেরী কইরোনা, আমি তারে নিয়া কুমকুমের বাপের বাড়ী আসতেছি। তোমরা তাড়াতাড়ি যাও এখন।
ছোট ছোট চারটা ছেলে মেয়ে নিয়ে নয় মাসের দুই পোয়াতী মহিলা কিভাবে যে অতবড় বিল সাঁতরে পাড়ি দিয়ে ছিল সেদিন তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা-ই জানেন!
========
সালেহা কে তাৎক্ষনিক কিছু বলে বুঝ দিলেও তাদের বিদায় দেবার পরে বুকটা হাহাকার করে ওঠে আওয়াল মিয়ার। কীভাবে সে সালেহাকে বলবে যে আবছার মিয়াকে মিলিটারীরা কারখানা থেকে ফেরার পথে ধরে নিয়ে গেছে, ফুটফুটে রুবি বাবা কাকে ডাকবে, অনাগত সন্তানটা যে দুনিয়ার আলো দেখার আগেই এতিম হয়ে গেল! বাবা শব্দটার সাথে সে পরিচিতই হতে পারবেনা।
এই রুবি, ছোট্ট রুবি, যে কিনা সেদিন দিনের বেলা গুড় খাবে বলে চিৎকার শুরু করলে কেউ থামাতে পারেনি। অবশেষে উপায় না পেয়ে তার বড় কাকা বের হয়েছিল কোথাও পাওয়া যায় কিনা এই ভেবে। গুড় তো পায়-ই নি বরং মিলিটারীদের ধাওয়া খেয়ে কোন মতে জান নিয়ে ফিরে এসেছে। সবার বড্ড আদরের রুবি। বিয়ের দশ বছর পরে "আটকুঢ়া" অপবাদ ঘুচিয়ে আবছার ও সালেহার ঘর আলো করে আসে মেয়েটি।
ভাবতেই পারেনা মেয়েটি আর বাবার কোলে যেতে পারবেনা।
===========
কারখানা থেকে ফেরার পথে মহল্লায় ঢোকার আগ মুহুর্তে আবছার উদ্দিনকে মিলিটারীরা গাড়ী থামিয়ে গাড়ীতে তুলে নিয়ে যায় শীতলক্ষ্যার পাড়ে। সাথে আরো কিছু যুবক, বুড়ো ছিল। সার বেঁধে দাড় করায় সবাইকে। আবছার উদ্দিনের বুকে বন্দুক তাক করেও নেতার আদেশে তা নামায় এক সেপাই। কারন আবছার উদ্দিনের গায়ে একটি পাঞ্জাবি ছিল যা খুবই সুন্দর। দলের নেতার ইচ্ছে ছিল গুলি করার আগে পাঞ্জাবিটি খুলে নেওয়া। তখনকার সময়ে ১১ টাকা দিয়ে পাঞ্জাবি টি বানায় শৌখিন আবছার উদ্দিন। গা থেকে খোলার আদেশ দিলে দুঃসাহসিকের মত একটি কাজ করে বসেন যা কেউই কল্পনা করতে পারেনি। আবছার উদ্দিন ভাবলেন আমি মরে যাবো আর আমার শখের পানঞ্জাবি কিনা পাকিস্থানী জানোয়ার গুলো পড়বে! মুহুর্তের মাঝে এক টানে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললেন গায়ের জামাটি। সবাই স্তব্ধ! ক্রোধে গর্জে উঠলো পাকিস্তানী জানোয়ার নেতা, কিন্তু চোখ পড়ে গেল পাশেই রাস্তা দিয়ে মাথায় টুকরী নিয়ে হেটে যাওয়া এক বালকের দিকে। ছেলেটিকে কাছে ডাকলে দেখা গেলো কিছু বোম্বাই মরিচ টুকরীতে।
এগুলো কী করে দলের নেতা জিজ্ঞেস করলে ছেলেটি উত্তর দেয় "খায়" । দলের নেতা-সৈন্যদের মাঝে আজব এই জিনিস চেখে দেখায় জন্যে হুড়ো হুড়ি পড়ে গেল। কিন্তু পর মুহুর্তেই প্রচন্ড ঝালে বেদিশা হয়ে দৌড়া দৌড়ি পড়ে যায় সবার মাঝে। কেউ নিচেই নদীতে নামে পানি খেতে, যে নদীতে কিছুক্ষনের মধ্যেই কয়েকজন বাংলীর লাশ পড়ে থাকতো! সুযোগ বুঝে আবছার উদ্দিন সহ যাদের ধরে আনা হয়েছিল সবাই মুক্তির স্বাদ নিতে দৌড়ে পালায়।
সেদিন আল্লাহ যে ঐ বালকটিকে সাহায্য স্বরুপ ফেরেশতা রুপে পাঠিয়েছিলেন!
=============
বাসার পথে এসে আউয়াল মিয়ার সাথে দেখা আবছার উদ্দিনের। বাড়ীর লোকজনকে পাঠিয়ে শেষ বারের মতন আশা ছেড়ে দিয়েই আবছার উদ্দিনের খোঁজে যাচ্ছিলেন পথে তাকে পেয়ে নিজেদের স্ত্রী-সন্তানের কাছে যান দুজনে।
ঐদিনের ঘটনার পর থেকে সারা জীবন আবছার উদ্দিন পুলিশ, সেনাবাহিনী দেখলে আঁতকে ওঠেন, আতংকে থাকেন। কিছুতেই ভুলতে পারেন না সেদিনের কথা। ৪৪ বছর আগের হলেও স্মৃতিটি এখনো দগদগে ঘায়ের মতই তার কাছে!
********
আম্মার সাথে বসে 'ওরা ১১ জন' সিনেমাটি দেখছিলাম। এক পর্যায়ে আম্মা বললেন এসব কথা। আগেও শুনেছি নানা ভাই এর মুখে এই কাহিনী। সেদিনের আবছার উদ্দিন আর সালেহা বেগম আমার নানা ভাই এবং নানু।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

