somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিন্দি গল্প: নেকড়ে - ২

০৭ ই মে, ২০০৮ ভোর ৪:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নেকড়ে
মূল: ভুবনেশ্বর (भूवनेश्वर)
রূপান্তর(হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী


প্রশংসা শুনে বুকের ছাতি বড়ো হয়ে গেল আমার। যাক, যা বলছিলাম, নেকড়ের দল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। কারণ তারা সঙ্গীদের লাশগুলো পেয়ে গিয়েছিলো খাবার হিসেবে।
হঠাৎ করে গরুগুলোর গতি বেড়ে যাওয়ায় বুঝতে পারলাম নেকড়েগুলো আবার কাছে এসে পড়েছে।
দুশো গজের মতো আসার পর বাবা বললেন,‘‘ জিনিসপত্র বের করে ফেলে দে,গাড়ি হালকা কর।’’
বেদেদের মধ্যে আমাদের গাড়িটি ছিলো সবচে’ সেরা। গৃহস্থালি জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে গাড়িটি হালকা করার পর আরো দ্রুত ছুটতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে মনে হলো নেকড়ের দল পিছু ফেলে আমরা অনেকদূর চলে এসেছি। কিন্তু একটু পরই সেই ভুল ধারণার অবসান হলো।
বাবা বললেন,‘‘এবারতো মনে হয় একটা গরুই ছেড়ে দিতে হবে,খারু !’’
‘‘কী বলছো, বাবা ?’’ চমকে উঠলাম আমি।‘‘দু’টা গরু কি গাড়িটাকে জোরে টেনে নিয়ে যেতে পারবে ?’’
‘‘তাহলে একটা বাঈজিকে ফেলে দে,’’ নির্বিকার গলায় বললেন বাবা।
চাচা আপন প্রাণ বাঁচা! আমি তিনজনের মধ্যে সবচে’ মোটা মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম।
মেয়েটা প্রথমে গাড়ির পিছুপিছু দৌড়ে আসার চেষ্টা করলো কিছুক্ষণ, কিন্তু যখন বুঝতে পারলো দৌড়ে কোনো লাভ নেই,তখন মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ালো নেকড়েগুলোকে মোকাবেলা করতে। সামনের একটা নেকড়ের পা ধরে, মাথার উপর উঠিয়ে ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করলো, কিন্তু পেছনের নেকড়েগুলো একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার যুদ্ধংদেহী ভাবের অবসান ঘটিয়ে দিলো মুহূর্তে।
ওজন কমে যাওয়ার ফলে গাড়ি আরো জোরে ছুটছে। তবে তাতেও কোনো ফললাভ হচ্ছিলোনা।
‘‘আরেকটা ফ্যাল,’’ বললেন বাবা।
এবার আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, বললাম,‘‘মানুষের চেয়ে গরু কি বেশি দামি হয়ে গেল ? একটা গরুই না হয় এবার ছেড়ে দাও।’’
ছেড়ে দিলাম একটা গর“। লেজ উঁচিয়ে,হাম্বা-হাম্বা চিৎকার করতে করতে গর“টা মোড় ঘুরে আরেকদিকে ছুটতে শুর“ করলো। নেকড়ের দলও ছুটলো গর“টির পিছুপিছু। বাবা কেঁদে ফেললেন গর“ হারানোর দুঃখে।
কাঁদতে-কাঁদতে বললেন,‘‘বড়ো প্রিয় গর“ ছিলো রে,খার“ !’’
‘‘জীবনের চেয়ে তো আর বেশি প্রিয় নয়,’’ বললাম আমি। ‘‘আমরা তো বেঁচে গেছি।’’
কিš‘ কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শোনা গেল সেই অমানুষিক গর্জন।
‘‘কেয়ামত মনে হয় আজই হয়ে যাবে !’’ বিড়বিড় করে বললাম।
সর্বশক্তি প্রয়োগ করে গর“গুলো আরো জোরে ছোটানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো এটুকু, হাতের চামড়া ছিলে গিয়ে রক্ত গড়াতে শুর“ করলো। বেনোজলের মতো নেকড়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
‘‘আরেকটা মেয়ে ফেলে দে, খার“,’’ চিৎকার করে বললেন বাবা।‘‘আর কোনো রাস্তা নাই রে ,বাপ!’’

আমি কিছু বলার আগেই, দুজনের মধ্যে মোটা মেয়েটা কাঁপাকাঁপা হাতে রূপার নোলকটা খুলতে শুর“ করলো। তোমাকে হয়তো বলিনি,মেয়েটা আমার বড়ো পছন্দের ছিলো। তাই তাকে বাদ দিয়ে অন্য মেয়েটাকে বললাম,‘‘তুই বেরো !’’
কিš‘ মেয়েটা যেন বেহুঁশ হয়ে গেছে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পরও যেভাবে পড়েছিলো সেভাবেই পড়ে রইলো। গাড়ি আরো হালকা হয়ে যাওয়ায় গতি আরো বেড়ে গেল। কিš‘ পাঁচ মিনিটের মধ্যে নেকড়ে আবার আমাদের নাগাল পেয়ে গেল।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,‘‘আল্লাহ, এ তোর কেমন বিচার ! অভাব-অনটনের বেদেজীবন শেষ করে ধনী হতে যাচ্ছিলাম,সব শেষ করে দিলি !’’
যে-মেয়েটাকে আমি ফেলি নি, তার দিকে তাকিয়ে বললাম,‘‘ তুই নিজে লাফ দিবি, না আমি ধাক্কা দেবো ?’’
মেয়েটা নাকের নোলকটা খুলে আমার হাতে দিলো, তারপর দু’হাতে চোখ চেপে ধরে লাফ দিলো গাড়ি থেকে।
গাড়ি এখন হাওয়ায় উড়ছে। গর“গুলো ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে,কিš‘ তারপরও ছুটছে মরিয়া হয়ে।এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে,বস্তি আরো ত্রিশ মাইল দূরে।
আর কোনো উপায় না দেখে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে নেকড়েগুলোর মাথায় মারতে শুর“ করলাম। কিš‘ তাতে কোনো হেরফের হ”িছলো না । বাবাকে দেখলাম ঘেমেনেয়ে একেবারে একাকার হয়ে গেছেন। শেষমেষ বাবা বললেন,‘‘ গর“ আরো একটা খুলে দে,খার“ !’’
‘‘পাগল হয়েছো, বাবা ? সেধে মৃত্যু ডেকে আনার কোনো মানে আছে !’’ চিৎকার করে বললাম আমি। ‘‘ আমাদের একজনকে তো অন্তত বেঁচে থাকতে হবে। একটা গর“ কি গাড়িটাকে টেনে নিয়ে যেতে পারবে ?’’
‘‘ঠিক বলেছিস,’’ বাবা বললেন।‘‘ আমি বুড়ো হয়ে গেছি, ক’দিন আর বাঁচবো, তোর বেঁচে থাকা জর“রি। আমি লাফিয়ে পড়ে কিছুক্ষণ নেকড়েগুলোকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।’’
চমকে উঠলাম আমি ! কিš‘ নির্মম সত্যটাকে না মেনে উপায় নেই বলে কথা বাড়িয়ে আর সময় নষ্ট করলাম না।
‘‘মন খারাপ কোরো না ,বাবা,’’ বললাম আমি। ‘‘আমি বেঁচে থাকলে একটা নেকড়েকেও রেহাই দেবো না।’’
‘‘তুই আমার বড়ো আদরের ধন রে, খার“,’’ কান্নাভেজা গলায় আমার দু’গালে চুমু খেতে খেতে বললেন বাবা। তারপর দু’হাতে দুটো বড়ো ছুরি তুলে নিলেন, এবং গলায় ভালো করে কাপড় পেঁচিয়ে নিলেন। লাফ দিতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বাবা বললেন,‘‘দাঁড়া, আমার পায়ের জুতাগুলো একেবারে নতুন, ভেবেছিলাম কমসেকম দশবছর পরবো,’’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন,‘‘দেখিস তুই এগুলো আবার পরিস না যেন, মরা মানুষের জুতা পরতে নেই। তুই জুতাজোড়া বেচে দিস কারো কাছে।’’
জুতাজোড়া খুলে গাড়ির ভেতরে ছুঁড়ে মারলেন বাবা। তারপর লাফ দিয়ে পড়লেন গাড়ির পেছন পেছন দৌড়ুতে থাকা নেকড়েগুলোর একেবারে মাঝখানে।
পিছু ফিরে চাইতে মন সায় দিলো না। বাবা লাফ দিয়ে পড়ার সাথে সাথে শুধু তার চিৎকার শুনতে পা”িছলাম : আয় ! আয়, হারামজাদা নেকড়ের বা”চারা ,আয় !
বাবার সাহসিকতায় সেদিন বেঁচে গেলাম। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে, অনেকগুলো নেকড়ে মেরে আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন বাবা।’
এইটুকু বলে খার“ আমার দিকে তাকালো। ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে যাওয়া আমার মুখের তাকিয়ে হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠলো সে। খকখক করে কেশে মাটিতে থুথু ফেললো একদলা। তারপর বললো, ‘এর পরের বছর অইপথে যাওয়ার সময় আরো ষাটটা নেকড়ে মেরেছি আমি।’
বলতে বলতে শীতল চোখজোড়া ধক করে জ্বলে উঠলো তার। তারপর হাসতে হাসতে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত,ক্ষুধার্ত,জোড়াতালি দেওয়া কাপড় পরা খার।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০০৮ বিকাল ৫:২৪
১৪টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রিয় নয়ন ভাই ( ব্লগার নাঈম জাহাঙ্গীর নয়ন )

লিখেছেন মোস্তফা সোহেল, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৩ সকাল ১০:৪০

নয়ন ভাই দেখতে দেখতে একটা বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে আপনি আমাদের মাঝে নেই।যেদিন জানতে পেরেছিলাম আপনি মারা গেছেন,সত্যি বিশ্বাস করতে পারিনি।বার-বার মনে হয়েছে এই খবর মিথ্যা। কিন্তু তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদের গন্ধ বহুদুর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৩ সকাল ১১:১৫



বামনের সাদা ঘরে- চাঁদ কেনো
যে খেলতে না রাজি-তবু ঝিলমিল
জোছনাময় যত কষ্ট, ব্যর্থতায়
মেঠোপথে হেঁটে যায়- মন মরা
ধানশালিক; কোন এক সময় চৈত্রের
ধূলি উড়ে যায়-কালো ধোঁয়া উড়ানো
চাঁদের সাথে ছায়া চলে একাকী!
যত সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যস্ত নরকে নাগরিক আমি ...

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১:৩৯




পাশের সিটে বসে থাকা লোকটার হাতে মোবাইল। স্কিনে বেশ ভয়াবহ একটা খবর।
সেন্ট মার্টিনে দেড় কিলোমিটারে তিন মণ প্লাস্টিক, চিপসের খালি প্যাকেট - চোখ আটকে গেল। ভয়াবহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর বেড়ে ওঠা (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৩ বিকাল ৩:০৯



'প্রাক্তন' মুভিতে প্রসেনজিৎ ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ঋতুপর্ণাকে বলেছিলো-
'তারপর আমার সন্তানের জন্ম হয়। জানো, নিজের সন্তানের থেকে এতো সুন্দর পৃথিবীতে অন্য কিছু হয় না'।
একটা মুখ দেখে একসাথে অনেকগুলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

অগ্নিকণা

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৩ সন্ধ্যা ৬:০০



সেদিন দুপুরের পরে আমার নির্মাণাধীন বাড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ দেখছিলাম। হঠাত কিছু রড কাটার প্রয়োজন পরায় একজন কর্মী (যাকে সকলে মামু ডাকে, বলতে পারেন সরকারী মামু) রড গুলি কাঁটতে শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×