কে আমি,
এই বিশাল ভূমিতলে কিই বা আমার পরিচয়? এই জনসমুদ্রের মাঝে আমার অবস্থান অকিঞ্চিতকর - তুচ্ছ। সকলের মাঝে হইচই করিয়া রহি - খেলিয়া কুদিয়া বেড়াই, তথাপি কোথায় যেন একাকীত্বের পরশ সর্বদাই জড়াইয়া থাকে। আমার অবস্থানে যেমন প্রথিবীর কোন কল্যান আনিতেছে না, তেমনি আমার প্রস্থানও কোন অকল্যান আনিবার সামর্থ্য রাখেনা। যদি এক্ষন, এই মূহুর্তে মৃত্যু আসিয়া আমাকে কোলে তুলিয়া লয় তাহাতেও কারো ক্ষতিবৃদ্ধি হইবার বিন্দুমাত্র আশঙ্কাও থাকেনা। বাস্তবিকই তাহাই। ধরনী মাতা আমাকে তাহার বুকে আশ্রয় দিয়া কেবলী তাহার দায় বৃদ্ধি করিয়াছে।
আমি বিলক্ষন বলিয়া দিতে পারি কি হইবে আমার দেহাবসানের পর।
আমার মা’ খুব কাঁদিবেন। কাঁদিতে কাঁদিতে তাহার অশ্র"জল শুকাইয়া পড়িবে তবু তাহার ক্রন্দন থামিবার নহে। আত্মীয়দের মাঝে শোকের ছায়া নামিয়া আসিবে। যাহারা আমাকে বদমেজাজী, অর্বাচীন বলিয়া তীব্র বাক্যবানে জর্জরিত করিতেন তাহারও ছুটিয়া আসিবেন। কে কতখানি মর্মবেদনায় পুরিতেছে তাহা প্রকাশ কিরবার এক খানা ছোটখাট প্রতিযোগীতাও হইলেও অবাক হইবার নয়ে। ইহার মাঝে কেহ আবার খোশ গল্পে মশগুল হইবে আকাঙ্খীত কাউকে পাইয়া। ক্ষনিকের জন্য আমাকে স্মরন হইলেও দ্রুতই তাহা বিস্মিৃতির অতলে মিলিয়া যাইবে।
আমার সহকর্মীগন আফসোস করিয়া বলিবেন, ‘আহা, বড় কাজের লোক ছিল’। বাস্তবিকই তাহাই। আমি কাজ করিতে বড় ভালবাসিতাম এবং ইহার মাঝে আমি আনন্দ পাইতাম। তাহারা আমাকে ভালবাসিত কারন তাহাদের অনেক জটিল কর্ম আমি আপন আনন্দে সমাধা করিয়া দিতাম।
ইহাদের বাহিরেও কেহ থাকিবে যাহারা আমার অতি আপন ছিল। তাহাদের মধ্যে কে নিঃশব্দে, কেহ সশব্দে কাঁদিয়া বুক ভাসাইবে। কেহ আবার স্বগোক্তিতে আপন মনে বলিয়া উঠিবে, ‘আপদ বিদায় হইয়াছে’। ভাবিতেছ তাহাতে আমি দুঃখ পাইব? একদমই নহে। ভালবাসিতে পারা যেমন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা তেমনি করিয়া তা গ্রহন করিতে পারাও এক প্রকার অপার্থিব দান। কাহারো তাহা না থাকিলে সে তাহারই ক্ষুদ্রতা, তাহারই সীমাবদ্ধতা।
ইহাদের বাহিরেও কেহ থাকিবে যাহাদের আমি চিনি বা হয়ত তেমন ভাবে চিনিও না। তেমনি কেহ খুব সন্তর্পনে তাহার অশ্র" সংগোপন করিবে - অন্তরে অন্তরে কাঁদিয়া যাইবে।
আমার মৃত্যুদিন কিংবা আমার জন্মদিন পরবতীতে এক মিলন মেলায় পরিগনিত হইবে। সকলে শোক ভুলয়া একে অপরের সহিত কুশল বিনিময়ে লিপ্ত থাকিবে। ভাবিতে ভালই লাগিতেছে - জীবিতবস্থায় সকলকে একত্রিত করিবাম অদম্য বাসনা অন্তত আমার মৃত্যুর মাঝ দিয়া পূর্নতা পাইল। সেই দিনগুলিতে কোন শোকের ছায়া থাকিবেনা। ততদিনে শোকের উপর পলি জমিতে জমিতে তাহার রঙ নীল হইতে ধুসর হইয়া গিয়াছে।
তথাপি একজনের শোকের চাদরের রঙ কোন কালেই বদলাইবেনা। সকলের মাঝে সে কেবল খুজিয়া বেড়াইবে অস্থির - চঞ্জলমতি আমাকে। হয়ত সেইদন সে কাঁদিবেনা, কিন্তু তাহার অন্তরে বীনার সুর ধ্বনিত - প্রতিধ্বনিত হইয়া বাঁজিতে থাকিবে। তীব্র মর্মবেদনায় তাহার বুক থাকিতে থাকিতে মোচড় দিয়া উঠিবে। অস্ফুট কন্ঠে সে আমার নাম লইবে। মা’ এর সে অস্ফুট আর্তনাদ বিধাতার প্রাসাদ কাঁপাইয়া দিবে। কিন্তু তাহা পৃথিবীর কাহাকেও স্পর্শ করিবেনা।
এরি মাঝে কাহাকে যেনো আমার স্মৃতি তাড়া করিয়া ফিরিবে। হয়ত নির্মল ঠাট্টায়, হয়ত বন্ধু পরিবেষ্টিত কোন আড্ডায়, হয়ত পথিমধ্যে বরফজল লইয়া কাহাকে ছুটিয়া যাইতে দেখিলে, হয়ত কারো নির্বুদ্ধিতায় কিংবা নিছক ছেলেমানুষীতে হঠাৎ করিয়া মনে পড়িয়া যাইবে। বুকের গহীন হইতে একখানা দীর্ঘশ্বাস বাহির হইবে। দ্রুতই ভুলিবার চেষ্টায় রত ফেরারী স্মৃতিগলো এসে জড় হইবে। চাঁদহীন অন্তরীক্ষে অসংখ্য তারার ন্যায় স্মৃতিগলো তাহার অন্তরে জ্বলজ্বল করিতে থাকিবে। চার পাশের বাতার ভারী হইয়া যাইবে। পাখিদের কলতান কোন এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে স্তব্দ হইয়া যাইবে। স্মৃতিগুলান হইতে পালাইবার সকল পথ তখন রুদ্ধ হইয়া যাইবে। চোখের কোনে সিক্ত হইয়া উঠিবে। নির্নিমেষ নেত্রে কোন সুদুর অলক্ষে অজানার উদ্যেশ্যে অভিযোগ করিয়া বলিবে, “এত দ্রুত চলিয়া যাওয়া কি তোর আবশ্যক ছিল?”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

