আগের পর্ব...
মানব জাতির অলৌকিক সৃষ্টি এবং এর অন্যতম বিশেষত্বের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। এগুলোর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মর্মার্থ নিঃসন্দেহে সাদৃশ্যপূর্ণ। শুধু বিষয়বস্ত্ত হ’তে কোন অজুহাত খাড়া করে কেউ সরে না পড়তে পারে, এজন্যেই উপরোক্ত আয়াতগুলো পুনঃপুনঃভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানে দৃশ্যতঃ হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করতে বলা হ’লেও পরোক্ষভাবে মানুষের শ্রেষ্ঠ আত্মাকেই তা বলা হয়েছে এবং সমগ্র মানব মন্ডলীকে বললেও তা অত্যুক্তি হবে না। তাই মহাপবিত্র কুরআনুল করীমের মাহাত্ম্যপূর্ণ আয়াতগুলো যে কোন মানবাত্মাকে মহৎ হ’তে মহত্তর করার এক অব্যর্থ অবলম্বন।
এ পর্যন্ত আলোচিত উপরের আয়াতগুলোতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, মানবসৃষ্টির মূল উৎস বা সূচনার অন্যতম প্রধান উপাদান মাটি। তাই তার স্বভাব ও আচরণের মধ্যে মাটির মানুষ অর্থাৎ অত্যন্ত সহিষ্ণু ও শান্ত প্রকৃতির মানুষের গুণাগুণ বিরাজমান। মানুষের বংশগতি, স্বভাব ও আগমন বার্তায় কোন প্রকারের পঙ্কিলতা নেই। এজন্য মানবকুল শিরোমণি আদম (আঃ) তাঁর সত্য, সরল, সহজ মানবতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইবলীসের নিকট পরাজয় বরণ করেন- যা তাঁর সারা জীবনের জন্য মূল্যবান শিক্ষণীয় ছিল নিঃসন্দেহে। শুধু তাঁর নয়, তাঁর পরবর্তী সন্তানগণের জন্যও ছিল তা উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
পক্ষান্তরে ইবলীস হ’ল আগুনের তৈরী, অর্থাৎ তার সৃষ্টির মূল উপাদান আগুন। আগুন হচ্ছে উত্তপ্ত, উষ্ণ, প্রচন্ড গরম জাতীয় পদার্থ। কাজেই ইহা স্বভাবতঃই দুঃসহ তাপদায়ক, দুঃখদায়ক, পীড়াদায়ক ও যন্ত্রণাদায়ক। হয়ত এই স্বভাবের বশবর্তী হয়েই ইবলীস আদম (আঃ)-এর প্রাধান্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, যা তাকে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলার আদেশ অমান্য করার মত অপরিণামদর্শী স্পর্ধায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। অতঃপর সে তার অসামান্য ভূমিকায় (মানুষকে বিভ্রান্ত করার কাজে) দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে এবং একাজের জন্য আল্লাহ অনুমতি প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তা‘আলা তা অনুমোদন করেন। কারণ মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা‘আলা সবচাইতে ভাল জানেন যে, তাঁর বিশ্বস্ত বান্দাদের ইবলীস কখনও বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি তাঁর সকল বান্দাকে ইবলীসের চক্রান্ত ও প্রতারণা হ’তে মুক্ত থাকার জন্য সকল মানুষের পক্ষে আদি পিতা আদম (আঃ)-কে সিজদার মাধ্যমে বরণ করে নেওয়ার মহৎ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। মানবাত্মার পবিত্র জন্ম ইতিহাসে ইহা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। যারা এসব স্মরণ করে ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখে, তাদের জন্য ইহা নিঃসন্দেহে এক মহাস্মারক।
এই মহৎ অনুষ্ঠানের পর আদম (আঃ) ও ইবলীসের মধ্যে যা ঘটেছিল, তা সূরা আল-আ‘রাফ এর ১৯ হ’তে ২৫ আয়াতে সবিস্তারে লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ বলেন,
‘(আল্লাহ তা'আলা আদমকে বললেন,) তুমি এবং তোমার সাথী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং এর যেখান থেকে যা কিছু চাও তা তোমরা খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছেও যেয়ো না, (গেলে) তোমরা উভয়েই যালেমদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে। অতঃপর শয়তান তাদের দু'জনকেই কুমন্ত্রণা দিলো যেনো সে তাদের নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহ, যা তাদের পরস্পরের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছিলো- প্রকাশ করে দিতে পারে, সে (তাদের আরো) বললো, তোমাদের মালিক তোমাদের এ গাছটির (কাছে যাওয়া) থেকে তোমাদের যে বারণ করেছেন, তার উদ্দেশ্য এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, (সেখানে গেলে) তোমরা উভয়েই ফেরেশতা হয়ে যাবে, অথবা (এর ফলে) তোমরা (জান্নাতে) চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। সে তাদের কাছে কসম করে বললো, আমি অবশ্যই তোমাদের উভয়ের জন্যে (তোমাদের) হিতাকাংখীদের একজন। এভাবে সে এদের দুজনকেই প্রতারণার জালে আটকে ফেললো, অতঃপর (এক সময়) যখন তারা উভয়েই সে গাছ (ও তার ফল) আস্বাদন করলো, তখন তাদের লজ্জাস্থানসমূহ তাদের উভয়ের সামনে খুলে গেলো, (সাথে সাথে) তারা জান্নাতের কিছু লতা পাতা নিজেদের ওপর জড়িয়ে (নিজেদের গোপন স্থানসমূহ) ঢাকতে শুরু করলো; তাদের মালিক (তখন) তাদের ডাক দিয়ে বললেন, আমি কি তোমাদের উভয়কে এ গাছটি(-র কাছে যাওয়া) থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদের একথা বলে দেইনি যে, শয়তান হচ্ছে তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য দুশমন? (নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে) তারা দুজনেই বলে উঠলো, হে আমাদের মালিক, আমরা আমাদের নিজেদের ওপর যুলুম করেছি, তুমি যদি আমাদের মাফ না করো তাহলে অবশ্যই আমরা চরম ক্ষতিগ্রস্থদের দলে শামিল হয়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা বললেন, (এবার) তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও, (আজ থেকে) তোমরা (ও শয়তান চিরদিনের জন্যে) একে অপরের দুশমন, সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকার উদ্দেশে তোমাদের জন্য সেখানে বসবাসের জায়গা ও জীবন-সামগ্রীর ব্যবস্থা থাকবে। আল্লাহ তা'আলা (আরো) বললেন, তোমরা সেখানেই জীবন যাপন করবে, সেখানেই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের (পুনরায়) বের করে আনা হবে।’ {সূরা আল আ‘রাফ, আয়াত ১৯-২৫}।
উল্লিখিত আয়াত কয়’টি হ’তে আমাদের মানব জাতির পক্ষে আদম (আঃ)-এর পৃথিবীতে আগমন বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই প্রতিভাত হয়েছে। আদম (আঃ)-এর ভুলের বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে সমালোচিত হ’লেও এখানে মহান আল্লাহ নিকট তা ছিল স্বাভাবিক। কারণ আদম (আঃ) যে ভুল করেছিলেন সেটা সত্যের অনুসারীই ছিল। ইবলীস যে মিথ্যা কসম খেয়ে মিথ্যার প্রতি আহবান করেছিল, আদম (আঃ)-এর নিকট তা ছিল একান্তই সত্য ও সঠিক। এজন্যই মহাবিচারক আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমা করে দেন এবং ভবিষ্যতে এরূপ কোন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হ’তে হুঁশিয়ার করে দেন। অতঃপর তাঁর ভবিষ্যৎ বংশধরদের নিরলস সতর্ক থাকার জন্য পবিত্র মহাগ্রন্থে পুনঃপুনঃ সতর্ক বাণী অবতীর্ণ করেন।
আদম (আঃ)-এর প্রতি অভিযোগ খন্ডন এর অনুকূলে একটি উল্লেখযোগ্য হাদীছের উদ্ধৃতি দেয়া হ’ল। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। আদম (আঃ) ও মূসা (আঃ) পরস্পর বাক্যালাপ করেছিলেন। মূসা (আঃ) আদম (আঃ)-কে বললেন, হে আদম! আপনি আমাদের পিতা, আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করেছেন ও বেহেশত হ’তে বহিষ্কৃত করেছেন। তখন আদম (আঃ) তাকে বললেন, হে মূসা! আল্লাহ আপনাকে স্বীয় কালাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং তিনি স্বহস্তে (তওরাত কিতাব) আপনাকে লিখে দিয়েছেন। আপনি এমন একটি কাজের উপর আমাকে দোষারোপ করেছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর পূর্বে আল্লাহ নির্ধারিত করে দিয়েছেন। অতঃপর আদম (আঃ) মূসা (আঃ)-এর অভিযোগ খন্ডন করে বিজয়ী হ’লেন। নবী করীম (ছাঃ) একথাটি তিনবার বললেন {বুখারী হা/৩৪০৯; মুসলিম, মিশকাত হা/৮১}।
ইনশাআল্লাহ চলবে ...
রচনাঃ রফীক আহমাদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

