somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেখান কোন অন্ধকার ছিলনা, কিন্তু কিছুটা সল্পতা ছিল।

২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পর্ব-২

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা। রূপগঞ্জ হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীরা টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। যিনি টিকিট দিচ্ছেন তিনি হাসপাতালের সুইপার। সারা হাসপাতাল ঘুরে ২৮ জন চিকিৎসকের জায়গায় আটজনকে উপস্থিত পাওয়া গেল। বাকি ১৯ জন অনুপস্থিত। হাসপাতালের উপস্থিত রোগীরা জানাল ভোগান্তির নানা অভিযোগ। সত্তরোর্ধ্ব রজব আলী এসেছেন দাউদপুর ইউনিয়নের পলখান এলাকা থেকে। শ্বাসকষ্টের রোগী। লাইনে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে শেষে মাটিতে বসে পড়েন। তিন টাকার টিকিট নিতে হয়েছে ২০ টাকায়। রজব আলী দুঃখভরে বলেন, 'কেমন দেশ বাপু এইডা। হাসপাতালে আইয়া ঠিকমতন চিগিস্যা পাই না।'
রূপগঞ্জ উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে সরেজমিনে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে নানা তথ্য। বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে রয়েছেন ভেষজ গার্ডেনার মোস্তফা মিয়া। তিনি কালেভদ্রেও হাসপাতালে আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দায়িত্ব পালন করেন সুইপার নুরু মিয়া। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সুইপার নুরু মিয়া টিকিট দিচ্ছেন। টিকিট দেওয়া তাঁর কাজ কি না- এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে নুরু মিয়া বলেন, 'মোস্তফা স্যারে আমারে বুঝাইয়া দিছে দায়িত্ব। আমার কাম এইডা না স্বীকার করি।' ভেষজ গার্ডেনার মোস্তফা মিয়া হাসপাতালের চিকিৎসা সহকারী কর্মকর্তা হানিফ মিয়ার ভাই হওয়ার সুবাদে তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
চিকিৎসা সহকারী হানিফ মিয়া মাসে একবার হাসপাতালে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান বলে হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়। তিনি তাঁর ভুলতার সোবানিয়া মেডিক্যাল হলে বসে সময় কাটান।
হানিফ মিয়ার সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমার পরীক্ষার ডিউটি থাকে। তাই হাসপাতালে আসতে পারি না। কর্তৃপক্ষ এটা জানে।' তাঁর ভাইয়ের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'সমস্যা তো থাকতেই পারে। সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।'
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের ২৮ জন চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও প্রতিদিন আসেন বড়জোর ১০ থেকে ১১ জন। কয়েকজন কনসালট্যান্ট ছাড়া অনেকেই ঠিকমতো আসেন না। কয়েকজন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) দোহাই দিয়ে কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকেন। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় হাসপাতালের রেজিস্টার খাতায় ৯ জন চিকিৎসকের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার ডাক্তারদের উপস্থিতি ছিল ১৩ জন। অ্যাডহক ভিত্তিতে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্য থেকে ডা. নুরুউদ্দিন রনি ছাড়া আর কেউ ঠিকমতো আসেন না বলে জানা যায়।
হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রতিবছর হাসপাতালে প্রায় সাত লাখ টাকার ওষুধ আসে সিভিল সার্জন অফিস থেকে। হাসপাতালের এসব ওষুধ ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার রেবতী মোহন তরফদার গোপনে ফার্মেসিগুলোতে বিক্রি করে দেন বলেও অভিযোগ আছে। এ ছাড়া হাসপাতালের সার্টিফিকেট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। মজার বিষয় হচ্ছে, ২৩ বছর ধরে তিনি ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। রেবতী মোহন তরফদারের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওষুধ বাইরে পাওয়া গেলে তো আমার কিছু করার নেই।' সার্টিফিকেট বাণিজ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ষাটোর্ধ্ব এন্তাজুদ্দিন এক মাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'বাবা, আমরা গরিব মানুষ। এহানে আইছি বিনা পয়সায় চিহিস্যা নিতে। এহন দেহি ঠিকমতন ডাক্তর আহে না। রাইতে মশার কামড় খাওন লাগে। ডাক্তর না আইয়া আহে সুইপারে।' কাঞ্চন চরপাড়া এলাকার শ্বাসকষ্টের রোগী আবদুল হাই মিয়ার স্ত্রী চেহারুন নেসা। চেহারায় হতাশার ছাপ। জিজ্ঞেস করতেই হাউমাউ করে কেদে ওঠেন। বলেন, 'বাজান, আমরা গরিব মানুষ। এহানে আইছি ডাক্তরের কাছে। হেরা কয় ডাহা (ঢাকা) যাইতে। কন টেহা থাকলে এহানে আয়ি? ডাক্তররাও আইয়ে না। আমার হেতায় (স্বামী) মনে অয় বাঁচব না।'
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নেই আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি মেশিন। টয়লেটগুলো থাকে অপরিষ্কার। বিছানাগুলো থাকে নোংরা। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়ায় চালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে তেলাপোকা আর বিড়ালের উৎপাত। অনেক বিছানা ভাঙাচোরা। প্রতি রোগীর খাবারের জন্য ৭৫ টাকা বরাদ্দ থাকলেও খাবারের মান নিম্ন। খাবারের ঠিকাদার নজরুল ইসলাম ও ইয়াছিন মিয়া দুর্নীতি করে থাকেন বলে হাসপাতালের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়। এ ব্যাপারে তাঁরা বলেন, 'বিষয়টি মিথ্যা। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি রোগীদের খাবার ভালো দিতে।'
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. গোলজার হোসেন চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির বিষয়ে বলেন, 'এটি দেখার বিষয় আমার নয়।' উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নাহিদ আরা বেগম বলেন, 'আমি সবেমাত্র যোগদান করেছি। আমি কিছু কিছু বিষয় জানতে পেরেছি। আমাকে একটু সময় দিলে ব্যবস্থা নেব।'
নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. দুলাল চন্দ্র চৌধুরী বলেন, 'ডাক্তার এত অনুপস্থিত থাকে আমার জানা নেই। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।' এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'সুইপার টিকিট কাটবে, এটা তো হতেই পারে না। আর একজন স্টোরকিপার দীর্ঘ এত বছর ধরে থাকছে এটা সত্যি ভাবার বিষয়। আমি প্রতিটি বিষয় নিজে দেখব।'



প্রত্যক্ষদর্শী রাসেল আহমেদ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুন, ২০১২ সকাল ৯:১৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×