কোনো একদিন কোনো এক সময়ে এসে কোনো এক চেনা-জানা মানুষকেও বড়ো অচেনা মনে হয়।একটা প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ককেও বড়ো ঠুনকো লাগে।দেখতে না দেখতেই পর হয়ে যায় সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে আপন প্রিয় মানুষটি।চাইলেও তাকে আর আগের মতো আপন ভাবা যায় না।ভাবলেও সে আর আগের মতো আপন হয় না।আপনের ভেতর যে আপনত্ব থাকে সেটা দিয়েও তাকে আগের মতো নিজের করে রাখা যায় না।অথবা সে আর আগের মতো নিজের হয় না।কিংবা হলেও করা যায় না।আর বাঁধন খুলে দিয়ে বাঁধন দিতে যাবারই বা মানে কি?
যাইহোক অনেকতো বলা হলো এবার সত্যের ভেতরে চাপা পড়া সত্যটা বলি।যা এর আগে কোনোদিন বলা হয়নি।সত্যি বলতে কি বলার সাহস পাইনি।কারণ যদি আরেকটা ‘প্রতিষ্ঠিত’ সম্পর্ক ভেঙে যায়।মানুষতো সবসময় বর্তমান দিয়ে অতীতকে আড়াল করতে চায়।আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি অথবা ঘটাতে পারিনি।আমিও চেয়েছিলাম বর্তমান ‘সুখ’ দিয়ে অতীতের দুঃখটাকে আড়াল করে রাখবো।কিন্তু পারলাম কই।আর পেরেই বা লাভ কি? সেওতো একদিন আমারই ছিলো।তার সুখে-দুঃখে আমার মন না কাঁদলেও আমিতো তার দুঃখগুলো সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছি।আমি তাকে না বুঝলেও সেতো আমকে বুঝতো।সে আজ কোথায় সেটা আমার জানার বাইরে।তবে এটুকু জানি যার নিঃশ্বাস সবসময় আমাকে ছুঁয়ে যেতো সে আজ আমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাকে এর আগে বহুবার আমি কবিতায় বিভিন্ন নামে ডেকেছি।তবে আজ আর প্রতীকি নামে নয় তার নিজের নমটা ধরেই ডাকতে বড়ো ইচ্ছে করছে। আর তার এতো সুন্দর একটা নাম থাকতে আমি তাকে কেনোই বা অন্য নামে ডাকবো।
সে আর কেউ নয় সে আমার হারিয়ে যাওয়া সেই অলিখিত প্রিয় মানুষ। যার রিনিক-ঝিনিক শব্দ এখনো আামার কানে বাজে। সে আমার হারিয়ে যাওয়া নয় হারিয়ে ফেলা নূপুর।যাকে আমি ইচ্ছে করেই পথের ধূলায় ছুড়ে ফেলেছি।তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পরতাম।আর নূপুর দশম শ্রেণিতে।বাংলা সিনেমার কাহিনীচিত্রের মতো সে আমার পাশের বাড়িতে থাকা ছোট্ট মেয়েটি নয়। যাকে আমি ছোটো বেলা থেকে দেখে দেখে তার গুণে অথবা রূপে মূগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়বো।অথবা সে আমার ছোটো বেলার খেলার সাথীও নয় যে তাকে মনের অজান্তেই ভালোবাসে ফেলবো। কিংবা এক বিদ্যালয়েও একসাথে পড়িনি কোনোদিন।তবে বাংলা সিনেমার সাথে এখানে খানিকটা মিল যে সে আমার ছোটো মামীর বোনের মেয়ে।মামা বাড়ী বেড়াতে গিয়েই তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়।সে যখন তার খালার অর্থাৎ আমার ছোটো মামীর সাথে আসলো।তখন তাকে দেখে আমার খুব রাগ হয়েছিলো।তবে কেনো রাগ হয়েছিলো তার কারণটা আজও খুঁজে বের করতে পারিনি।হয়তো কোনোদিন পারবোও না।কারণ এটাও হতে পারে এক পাগলেতো আর অন্য পাগলকে সহ্য করতে পারে না।সেও অতিথি আমিও তাই। সে জন্যই হয়তো রাগ হয়েছিলো।তবে সে রাগটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মানে সে স্থায়ী হতে দেয়নি।তাকে আমি যতো দেখতে লাগলাম তার চালচলনে আমি ততোই মুগ্ধ হতে লাগলাম।অচিরেই সব রাগ দূর হয়ে সে জায়গায় ভালোলাগার উদ্রেক হতে শুরু করলো।তাকে ভালোবাসতে শুরু করলাম। তবে সে ভালোবাসা ‘ভালোবাসার’ নয়। অর্থাৎ প্রেমের ছিলো না।ছিলো নিছক বন্ধুত্বের।দিন দুয়েকের মধ্যেই সে আমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠলো।সে বয়সে দুবছরের বড়ো হলেও আমাদের বন্ধুত্বে বয়স কোনো বাধা হয়ে দাড়ায়নি।ধীরে ধীরে আমি তার কাছ থেকে আরো কাছে আসতে শুরু করলাম।সেও আমার অনেক কাছে চলে এলো।এভাবে কাটলো দিন দশেক।
তার হাতের আলতো ছোঁয়া আমাকে শিহরিত করতে লাগলো।তবে জানি না আমার হাতের প্রথম ছোঁয়া তাকে শিহরিত করেছিলো কিনা? তবে আমার ছোয়ায় পরে যে সে শিহরিত হতো সেটা সেদিন না বুঝতে পারলেও আজ ঢের বুঝতে পারছি।তার দেহের অদ্ভুত অথচ মায়াবি গন্ধে আমি মাতাল হতাম প্রায়ই।সে গন্ধ তাকে মনে পড়তেই আজও খানিকটা পাই। ঠিক আগের মতো।তার চোখে নিজেকে খুঁজে না পেলেও নিজের আবছা অস্পষ্ট ছবিটা দেখতে শুরু করেছিলাম।তাতে কোনো ভুল নেই।এভাবে কাটলো আরো কয়েককটা দিন।আমাদের সম্পর্কটা এরই মধ্যেই আর একটা নতুন রূপ নিলো।আমি শুধু তার হাত ধরেই ক্ষান্ত থাকতে পারলাম না জড়িয়ে ধরে চুমুও খেয়ে বসলাম কোনো একদিন সন্ধ্যা বেলায়।কখন চুমু খেয়েছিলাম সেটা মনে থাকলেও কবে খেয়েছিলাম সেটা আদৌ মনে নেই। মাইরি বলছি মনে থাকলে বলতাম।জীবনে প্রথম চুমু খাওয়ার আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম।সে আনন্দ গোটা বিশ্ব জয় করার আনন্দের চেয়েও ঢের বেশি।তবে আমি আনন্দে আত্মহারা হলেও নূপুর কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলো।নূপুর আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলো কিনা জানি না তবে তার লজ্জাটাই আমার বেশি চোখে পড়েছিলো।এরপর আমি নূপুরকে কম করে হলেও একশত বার চুমু দিয়েছি কিন্তু সে একবারও আমাকে স্বেচ্ছায় চুমু খেতে দেয়নি।প্রতিবারই আমি ঝোর করে চুমু খেয়েছি।যতোবার আমি তাকে চুমু দিতে গিয়েছি সে ততবারই তার মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে চেষ্টা করেছে।তবে একবারও সফল হয়নি।আমাকে চুমু খাওয়া থেকে একবারও বিরত রাখতে পারেনি।বিরত রাখতে মন থেকে একবারও যে চেষ্টা করেনি। সেটা আমি হলফ করে বলতে পারি।এতো কিছু হওয়ার পরেও নূপুর আর আমার সম্পর্কটা বেশি দূর আগায়নি।বন্ধুত্বের ঘন্ডিতেই ঘুরপাক খেয়েছে।তখনও আমি জানতে পারিনি নূপুর আমাকে কি ভাবতো। তবে নূপুরকে আমি বন্ধুই ভাবতাম।তারপর হঠাৎ করেই নূপুর বাড়ি চলে গেলো।নূপুর চলে যাওয়ার পর আমারও ভালো লাগলো না আমিও বাড়ি চলে এলাম।ও বলাইতো হয়নি যে নুপুরের সাথে আমার মাত্র দুবার দেখা হয়েছিলো।এতক্ষণ যা বললাম তা প্রথম বারের কথা।
দ্বিতীয় বার দেখা হয়েছিলো বড়ো মামার চোখের কর্নিয়া যে বার অপারেশন হয়েছিলো্ সে বার।সে বার ঈদে মামা বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে শুনলাম বড়ো মামার চোখ অপারেশন হবে ঈদের দুদিন পর।তাই বাধ্য হয়ে মামাবাড়িতে কয়েকটা দিন থাকতে হলো।ঈদের পরের দিন ছোটো মামীর সাথে নূপুরও এলো।নূপুরকে দেখে অনিচ্ছায় থেকে যাওয়াটা ইচ্ছায় পরিণত হলো। ভাবলাম ভালোই হলো।আবার কয়েকটা দিন ভালোই কাটবে।কাটছিলোও তাই। দুজনে মিলে হসাহাসি মাতামাতি করে কবে যে কখন বিশটা দিন পার হয়ে গেলো তা টেরও পেলাম না।মাঝখানে একদিন নূপুর প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। বিশ দিনের মধ্যে ওই দিনটাই খারাপ গিয়েছিলো।বাকি প্রত্যেকটা দিন ছিলো জীবনের স্মরণীয় দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম।তারপর বড়ো মামা হাসপতাল থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো।সঙ্গত কারণেই আমারও বাড়ি ফেরার সময় হয়ে এলো।তবে নূপুরকে ছেড়ে আসতে সেদিন বড়ো কষ্ট হয়েছিলো।বাড়ি ফেরার দিন নূপুরকে বলতে গেলে, কেঁদে ফেলেছিলো মেয়েটা।সে কান্নার মানে আমি সেদিন না বুঝলেও আজ ভালোভাবেই বুঝি কেনো সে কেঁদেছিলো।তবে আজ কিছুই করার নেই শুধু হাহাকার ছাড়া।
বড়ো মামীর কাছে শুনেছি আমি আসার পর নাকি নূপুর আরো বেশ কয়েকদিন ছিলো।তবে বড়ো মামী আমি চলে আসার পর নাকি নূপুরকে আর একদিনও হাসতে দেখেনি।কেনো হাসেনি নূপুর? সে কারণটা আর কেউ না জানলেও আজ আমি জানি।সেই যে দ্বিতীয়বার নূপুরের সাথে দেখা হয়েছিলো তারপর আজ অবধি নূপুরে সাথে আমার আর দেখা হয়নি।ইচ্ছেও হয়নি একবার খোঁজ নিয়ে দেখি মেয়েটা কেমন আছে।কারণ মানুষ সহজে যা পায় তার মূল্য সে বোঝে না অথবা মুল্য দিতে জানে না।আমার বেলায়ও তাই হয়েছিলো নূপুরের মূল্য আমি সোদিন দিতে পারিনি আজি ই বা দিচ্ছি কই?তবে আমি যখন দ্বাদশ শ্রেনিতে পড়ি তখন মামীর কাছে শুনেছি নূপুরের নাকি বিয়ে হয়েছে।এখন আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি।মধ্যে আবার লেখা-পড়া থেকে এক বছর অবসরেও ছিলাম।বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া নূপুর কম করে হলেও এখন এক সন্তানের জননী।থাক না ও সব কথা।সব চেয়ে বড়ো কথা হলো নূপুরে স্বামী আছে সংসার আছে,নিজের মতো করে গড়া একটা নিজস্ব ভুবন আছে।হয়তো সে সুখেও আছে।জানি না নূপুর একবারও ভুল করে হলেও আমায় নিয়ে ভাবে কিনা? তবে আজ এ সময়ে এসে নূপুরকে আমার বেশ মনে পড়ছে।সময়ের কাজ সময়ে না করলে যা হয় আমার বেলায়ও তাই হয়েছে।থাক ভেবে আর লাভ কি? যে চলে গেছে অবথা যাকে আমি চলে যেতে বাধ্য করেছি তাকে শুধু শুধু নিজের মধ্যে টেনে আনার কোনো দরকার আছে কি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



