
ঊনবিংশ শতাব্দীর সর্ব শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৯৯ সালে টাইম সাময়িকী আইনস্টাইনকে শতাব্দীর সেরা ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়া বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীদের এক ভোটগ্রহণের মাধ্যমে তাকে প্রায় সবাই সর্বকালের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ‘ধর্ম ছাড়া যে বিজ্ঞান সেটা হল পঙ্গু আর বিজ্ঞান ছাড়া যে ধর্ম সেটা হল অন্ধ’ - বিখ্যাত উতক্তিটি আলবার্ট আইনস্টাইনের। আইনস্টাইন বিজ্ঞান জগতে এক মহাবিপ্লব রচনা করেন। বিশ্ব ও জগৎ সম্পর্কে নিউটনের ধারণা যা প্রচারিত হয়ে আসছিল তা ভেঙে দেন। আবিষ্কার করেন ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ বা ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’। তিনি বলেন, এই যে চোখের সামনে আমরা বস্তুর গতি ও শক্তি, ‘টাইম’ ও ‘স্পেস’ অর্থাৎ সময় এবং স্থানকে দেখছি, কোনোটাই ‘অ্যাবসলিউট’ বা অপরিবর্তনীয় নয়, অর্থাৎ কোনোটাই ধ্রুব নয়, সবই আপেক্ষিক। বিষয়টা তখনকার বিজ্ঞানীদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। কারণ দৃশ্যমান জগতের দিকে সরাসরি আঙ্গুল তুলে আইনস্টাইন বলছেন, যা দেখছ তা সত্যি নয়। যা দেখছ না তাও সত্যি নয়। আবার কোনো কিছুই অসত্য নয়। বিষয়টা অনেকটা এমনই। বস্তুর গতি আর তার সঙ্গে পর্যবেক্ষকের অবস্থানের পরিবর্তনে বদলে যায় সবকিছু। শুধু বদলায় না আলোর গতিবেগ। মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তো তত্ত্ব দিয়েই শেষ। কিন্তু তার প্রমাণ করে যাচ্ছেন সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা। তার তত্ত্ব প্রমাণ করে নোবেল পাচ্ছেন বর্তমান সময়ের বিজ্ঞানীরা। তার বুদ্ধির প্রখরতার কারণে বুদ্ধিসম্পন্ন কাউকে বা কোনো কিছুকে বুঝাতে মানুষ ‘আইনস্টাইন’ শব্দটি ব্যবহৃত করে। আজ পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ৬৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫৫ সালের আজকের দিনে নোবেলজয়ী এ মহাবিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রর নিউ জার্সিতে মৃত্যুবরণ করেন। সর্বকালের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আইনস্টাইন ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির এক মফস্বল শহরে ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হেরম্যান আইনস্টাইন ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা পলিন আইনস্টাইন গৃহিণী। আলবার্টের ছেলেবেলা কেটেছিল মিউনিখেই। খুব ছোট থেকেই ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন আইনস্টাইন। আইনস্টাইনকে প্রথম স্কুলে পাঠানো হয় পাঁচ বছর বয়সে। কিন্তু স্কুলের ধরা-বাধা পড়াশোনা তার কখনোই ভালো লাগেনি। স্কুলের পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলেন না। ক্যাথলিক স্কুলের অতিরিক্ত কড়াকড়িও তার ভীষণ অপছন্দ ছিল। আইনস্টাইন আসলে স্বাধীনচেতা ছিলেন। স্কুল জীবনে আইনস্টাইনের প্রতিভার কোনো প্রতিফলনই দেখা যায়নি। আইনস্টাইনের পাঁচ বছর বয়সে তার বাবা একটি ছোট কম্পাস এনে দেন। শিশু আইনস্টাইন সেটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যত দেখে ততই মুগ্ধ হয়। যন্ত্রটি যে দিকেই ঘোরানো হোক না কেন কম্পাসের কাঁটা উত্তরমুখী হয়ে যায়। শিশু আইনস্টাইন এতে বিস্ময়াভূত হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমেই প্রথম সৃষ্টি জগতের রহস্য নিয়ে চিন্তার বীজ বপন হয়ে যায় তার মধ্যে। ভাবিয়ে তোলে আইনস্টাইনকে। তাই ছোট বয়স থেকেই তাকে বলা হয় ভাবুক প্রকৃতির। আর বড়বেলায় এসেও আইনস্টাইন তার বড় আবিষ্কারগুলোর নেপথ্যে হাতে-কলমে গবেষণার চেয়ে চিন্তা করতেন বেশি। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এ চিন্তা-গবেষণার একটা সুন্দর নাম রয়েছে। আর তা হলো ‘চিন্তা-পরীক্ষা’। ছয় বছর বয়সে একরকম জোর করেই মা তাকে বেহালা শেখানোর ব্যবস্থা করেন। নেহাত অনিচ্ছার সঙ্গে শুরু করলেও একসময় এই বাজনাটার প্রতি আইনস্টাইন আকৃষ্ট হন। বেহালা হয়ে ওঠে তার আজীবনের সঙ্গী।

শৈশবের আরেকটি ছোট ঘটনা আইনস্টাইনের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কৈশোর থেকেই গণিতের প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন আইনস্টাইন। বীজগণিতে তার আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন কাকা জ্যাকব। মজা করে জ্যাকব বলতেন, আমরা এমন একটি ছোট্ট জন্তু শিকারে বেরিয়েছি, যার নাম জানা নেই। তাই তার নাম দেওয়া হলো ‘ক’। চলো এবার তাকে ধরি, তারপর ঠিক নামটি বের করি। কাকা জ্যাকবের আনন্দদায়ক পাঠদানে আইনস্টাইনকে বীজগণিতের প্রতি আকৃষ্ট করে। যুবক বয়সে সুইজারল্যান্ডের বার্নে পেটেন্ট অফিসে আইনস্টাইন একটি চাকরি পান । তার কাজ ছিল পেটেন্ট সংক্রান্ত আবেদনগুলো পরীক্ষা করা। আইনস্টাইন সুইস পেটেন্ট অফিসে ছিলেন ১৯০২ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত। ১৯০৯ সালে আরও দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। প্রথমটিতে তিনি বলেন, ম্যাক্স প্লাংকের শক্তি-কোয়ান্টার অবশ্যই সুনির্দিষ্ট ভরবেগ থাকতে হবে এবং তা একটি স্বাধীন বিন্দুবৎ কণার মত আচরণ করবে। এই গবেষণাপত্রেই ফোটন ধারণাটির জন্ম হয়। অবশ্য ফোটন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন গিলবার্ট এন লুইস ১৯২৬ সালে। তবে আইনস্টাইনের গবেষণায়ই ফোটনের প্রকৃত অর্থ বোঝা যায় এবং এর ফলে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানে তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা বিষয়ক ধারণার উৎপত্তি ঘটে। তার অন্য গবেষণাপত্রের নাম ছিল "Über die Entwicklung unserer Anschauungen über das Wesen und die Konstitution der Strahlung" (বিকিরণের গাঠনিক রূপ এবং আবশ্যকীয়তা সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন) যা আলোর কোয়ান্টায়ন বিষয়ে রচিত হয়।

১৯১১ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন আইনস্টাইন। অবশ্য এর পরপরই চার্লস ইউনিভার্সিটি অফ প্রাগে পূর্ণ অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করেন। প্রাগে অবস্থানকালে আলোর উপর মহাকর্ষের প্রভাব বিশেষত মহাকর্ষীয় লাল সরণ এবং আলোর মহাকর্ষীয় ডিফ্লেকশন বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেন। এর মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যগ্রহনের (Solar eclipse) সময় আলোর ডিফ্লেকশনের কারণ খুঁজে পান। এ সময় জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Erwin Freundlich বিজ্ঞানীদের প্রতি আইনস্টাইনের চ্যালেঞ্জগুলো প্রচার করতে শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে এডলফ হিটলার জার্মানিতে ক্ষমতার সময় আইন্সটাইন বার্লিন একাডেমি অব সায়েন্সের অধ্যাপক ছিলেন। ইহুদী হওয়ার কারণে আইনস্টাইন সে সময় দেশত্যাগ করে আমিরেকায় চলে আসেন এবং আর জার্মানিতে ফিরে যান নি। আইনস্টাইন পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ দার্শনিক বার্টান্ড রাসেলের সঙ্গে মিলে আণবিক বোমার বিপদের কথা তুলে ধরে রাসেল-আইনস্টাইন ইশতেহার রচনা করেন। ১৯৫৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড স্টাডির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ল্যাবরেটরিতে প্রথাগত গবেষণা আইনস্টাইন কখনই করেননি। মস্তিষ্কই ছিল তার ল্যাবরেটরি। আর যন্ত্রপাতি ছিল পেন্সিল আর খাতা। তার পরীক্ষা সবই চলত চিন্তার অসীম জগতে। একে বলা হয়, ‘চিন্তা-পরীক্ষা’ বা ‘থট এক্সপেরিমেন্ট’। জার্মান ভাষায় পর পর আইনস্টাইনের কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ছিল ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য থিসিস, ‘ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্ট’ অর্থাৎ আলোক তড়িৎ প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ‘স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ বা ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনস্টাইনকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। ১৯২১ সালে ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্টের কাজের জন্যই নোবেল পুরস্কার পান। তবে ১৯০৫ সালে তার প্রকাশিত বিশেষ আপেক্ষিকবাদ বিজ্ঞানী মহলে আইনস্টাইনকে রাজার আসনে বসায়। খ্যাতি এনে দেয় বিশ্বজুড়ে। এসব গবেষণাপত্র অতি উচ্চগণিতের ভাষায় লেখা, গণিতের বিশেষ জ্ঞান ছাড়া যা বোঝা সম্ভব নয়। তবে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের মূল কথাটি হলো- আলোর গতিবেগই চরম এবং ধ্রুব। আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের অবস্থান ও গতিবেগ বদলালেও আলোর বেগ একই থাকে। ১৯২১ সালে ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্টের কাজের জন্য আইনস্টাইন নোবেল পুরস্কার পান।

(স্ত্রী মিলেভা মেরিক এবং আইনস্টাইন)
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯০৩ সালে টেকনিক্যাল স্কুলের সহপাঠিনী মিলেভা ম্যারিকে বিয়ে করেন আইনস্টাইন। বার্নেতে সংসার শুরু করেন তারা। আইনস্টাইনের দুই সন্তান হ্যান্স আলবার্ট আইনস্টাইন ও এডওয়ার্ড আইনস্টাইন। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। অথচ স্ত্রী মিলেভা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘মিলেনা এমন এক সৃষ্টি যে আমার সমান এবং আমার মতই শক্তিশালী ও স্বাধীন।’ ১৯১৯ সালে আইনস্টাইন আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তার চাচাতো বোন এলসা আইনস্টাইনের সঙ্গে। কথিত আছে আাইনস্টাইন কথা বলতে শুরু করেন চার বছর বয়সে। আর পড়তে শেখেন আরও পরে; সাত বছর বয়সে। চার বছর পর্যন্ত যখন তিনি কথা বলছিলেন না তখন বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সবাই চিন্তিত তখন হঠাৎ একদিন খাবার টেবিলে আইনস্টাইন বলে ওঠেন, ‘স্যুপটা খুবই গরম’! তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘এতদিন কেন কথা বলোনি? আইনস্টাইন উত্তর দেন, ‘এতদিন তো সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল।’ এটি ছিল তার জীবনের দ্বিতীয় বাক্য! বিশ্বখ্যাত এ বিজ্ঞানী ছিলেন একটু ভোলাভালা ! একবার আইনস্টাইন ট্রেনে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। চেকার টিকিট দেখতে চাইলে আইনস্টাইন কিছুতেই টিকিট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুধু বিড়বিড় করছিলেন, ‘কোথায় যে রাখলাম টিকিটটা!’ চেকার বললেন, ‘স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই টিকিট কেটেই উঠেছেন। আপনাকে টিকিট দেখাতে হবে না।’ আইনস্টাইন তখন চিন্তিত মুখে বলেন, ‘না না! ওটা তো খুঁজে পেতেই হবে! না পেলে জানব কী করে, আমি কোথায় যাচ্ছিলাম!’ এই হলো আইনস্টাইন! ভোলাভালা নোবেলজয়ীএই মহাবিজ্ঞানী ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রর নিউ জার্সিতে মৃত্যুবরণ করেন। আজ পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ৬৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। সর্বকালের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০২০ বিকাল ৫:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




