somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর ৯৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৪ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড একজন বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক। সাহিত্যে ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’ ধারাকে সমৃদ্ধ করা ব্রিটিশ সাহিত্যিকদের মধ্যে স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড অন্যতম পথিকৃৎ। অদ্ভুত সব স্থানে বিচিত্র চরিত্রের সমারোহে রোমাঞ্চকর উপন্যাস রচনায় পাঠককে মুগ্ধ করার পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজত্ব জুড়ে কৃষিকাজে সংস্কারমূলক অবদান রাখেন তিনি। ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যযুগের শেষাংশে তার রচিত গল্প ও উপন্যাস আকাশচুম্বী খ্যাতি লাভ করে, অনুপ্রেরণা যোগায় বহু পাঠক ও সাহিত্যিককে। তিনি ইতিহাস আশ্রিত দুঃসাহসিক কাহিনী নিয়ে উপন্যাস রচনায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এমনসব অঞ্চলের কাহিনী লিখেছেন যেগুলো ইংরেজদের কাছে ছিল অনেকটাই অপরিচিত এবং অদ্ভুত। ভাইয়ের সঙ্গে বাজি ধরেছিলেন হেনরি, বলেছিলেন ট্রেজার আইল্যান্ড এর চেয়ে রোমাঞ্চকর বই লেখার ক্ষমতা তার আছে। “এতই যদি পারো, তা লিখে দেখাও না কেন?” কিছুক্ষণ শান্ত চোখে চেয়ে থাকলেন, তারপর বললেন, “বটে! তবে তাই হোক!” কিং সলোমনস মাইনস বা সলোমানে গুপ্তধন লিখে সত্যিই প্রমাণও করে দিয়েছিলেন তা। বইটি প্রকাশ পাবার পর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। লস্ট ওয়ার্ল্ড ধারার সর্বপ্রথম উপন্যাস ছিল এটি। সলোমনের গুপ্তধন তার সেরা কীর্তি হিসেবে পরিগণিত। এটি সাহিত্য জগতে একটি ক্লাসিক হিসেবে সমাদৃত হয়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই এর মধ্যে আছে মন্টেজুমাস ডটার, মর্নিং স্টার, পার্ল মেইডেন, দ্য ব্রেদরেন, অ্যালান এন্ড দ্য হোলি ফ্লাওয়ার ইত্যাদি। ঔপন্যাসিক স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর ৯৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯২৫ সালের আজকের দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি


হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড ১৮৫৬ সালের ২২ জুন ইংল্যন্ডের নরফোকে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যারিস্টার বাবা স্যার উইলিয়াম হ্যাগার্ড আর লেখক মা এলা ডাভটনসহ বারজনের বিশাল পরিবারের অষ্টম সন্তান ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই তার প্রতি খুব একটা অনুরক্ত ছিলেন না তার বাবা, ফলে অন্যান্য বড় ভাইরা যেখানে ইংল্যান্ডের সব নামীদামী স্কুলে নিজেদের পড়াশোনার পাট চুকালেন, সেখানে হেনরির শিক্ষাদাতা হলেন এক বৃদ্ধ পাদ্রী, নাম রেভারেন্ড গ্রাহাম। এর ছাপ পড়েছিল হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের লেখাতেও, নিজেকে অ্যালান কোয়াটারমেইন হিসেবে কল্পনা করা লেখক নিজের বাবা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এক যাজককে! আর্মি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ফেল করার পর হেনরির বাবা ছেলেকে পাঠিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে হেনরিকে পাড়ি দিতে হয় ইউরোপের এমাথা থেকে আফ্রিকার ওমাথা। নাটালের গভর্নরের কাছে কিছুদিন থাকার পর হেনরির পরবর্তী ঠিকানা হয় ট্রান্সভাল, স্যার থিওফাইলাস শেপস্টোনের স্টাফ হিসেবে। ওখানে থাকার সময়েই ভালোবেসে ফেলেন এক মেয়েকে, নাম মেরি এলিজাবেথ “লিলি” জ্যাকসন! অবশেষে ১৮৭৮ সালের দিকে যখন আয় করা শুরু করেন, বাবাকে চিঠি লিখে জানান ইংল্যান্ডে ফিরে মেরিকে নিয়ে সংসার পাতবেন। কিন্তু বাবা তাকে ইংল্যান্ডে ফিরতে নিষেধ করেন, আগে একটা ভালো ক্যারিয়ার, পরে সংসার। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু মাঝখানে বাগড়া বাঁধালেন মেরির বাবা। মেরিকে বিয়ে দিয়ে দিলেন এক উচ্চশিক্ষিত ব্যাংক কর্মকর্তার সাথে। দুঃখ ভুলতে কঙ্গোতে গিয়ে সিংহ শিকার করলেন, ঘুরে বেড়ালেন আফ্রিকার নির্জন প্রান্তরে, জুলুসহ অন্যান্য উপজাতিদের সাথে ভাব জমালেন। অবশেষে ১৮৮০ সালে কিছুদিনের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে এসে গাঁটছড়া বাধলেন নিজের এক বন্ধুর বোনের সাথে, স্ত্রী মারিয়ানা লুইজার স্থান হলো উপন্যাসের “স্টেলা ফ্রেজেলিয়া” হিসেবে। তারপর স্ত্রীকে আফ্রিকার বন-বাদাড়ের স্বাদ উপহার দিয়ে ১৮৮৩ সালে থিতু হলেন ইংল্যান্ডের ডিচিংহ্যামে। ডিচিংহ্যামের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে একের পর এক লিখে গেলেন, “কিং সলোমন’স মাইন (১৮৮৫)”, “মাইওয়ার প্রতিশোধ (১৮৮৬)”, “শী (১৮৮৬)”, “ক্লিওপেট্রা (১৮৮৭)”, “অ্যালান কোয়াটারমেইন (১৮৮৭)”, “অ্যালান’স ওয়াইফ (১৮৮৯)”- এর মতো জগদ্বিখ্যাত উপন্যাসগুলো। এর মধ্যে “শী” এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছিল এটি নিয়ে বানানো হয়েছিল একেবারে প্রথম যুগের নির্বাক চলচ্চিত্রসহ ৮টি সিনেমা, সাথে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইগুলোর ১২ নম্বর জায়গাটিও দখলে রেখেছে এই বই!


১৮৯১ সালে মেক্সিকো পাড়ি জমিয়েছিলেন হ্যাগার্ড, “মন্টেজুমার মেয়ে” উপন্যাসের জন্য গবেষণা করতে। সেই সময়ই খবর পান তার ছেলে জ্যাক বসন্ত রোগে মারা গিয়েছে। তা শুনেই বেশ কয়েক মাস অসুস্থতায় ভুগে ফিরে আসেন পিতৃভূমিতে। ছেলের মৃত্যুর ছাপ পড়েছিল তার লেখাতেও। “মন্টেজুমার মেয়ে”-উপন্যাসেই নায়ক টমাস উইংফিল্ড-এর ছেলেকে মেরে ফেলেন, এমনকি অ্যালান কোয়াটারমেইনের পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেও উল্লেখ করেন ছেলের মৃত্যুর কথা। “দ্য ব্রেদরেন” উপন্যাসের ক্রুসেডের ঘটনা, “মন্টেজুমার মেয়ে” উপন্যাসের অ্যাজটেক যুদ্ধ বা “ভার্জিন অফ দ্য সান”-এর হেস্টিংসের যুদ্ধ; সবগুলো উপন্যাসেই রোমাঞ্চকর অভিযানের পাশাপাশি ফুটিয়ে তুলেছেন মানবমনের গতিপ্রকৃতি। বিশ্বাসঘাতকতা, আত্মত্যাগ, সংঘাতের মাঝখান থেকে জন্ম দিয়েছেন নিটোল প্রেমের, যার প্রেরণা পেয়েছিলেন লন্ডনের রাজপথে, ডিচিংহ্যামের বাগানে আর আফ্রিকার বুনো প্রান্তরে। ১৯১২ সালে “অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার” নাইটহুড পাওয়ার পর হাত দেন “মেরি” উপন্যাসে, কারণ ততদিনে বাস্তবের মেরি মারা গিয়েছে। মেরির উচ্চশিক্ষিত স্বামী ফ্রাংক আর্চার তার সমম্ত সম্পত্তি কেড়ে নেয় এবং বেহিসেবে খরচের দ্বারা ঋণে জর্জরিত হয়ে স্ত্রী লিলিকে ছেড়েই আফ্রিকা পালিয়ে যায়। লিলি তার স্বামীর খোঁজে আফ্রিকা যান সেখানে তিনি সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। অতপর ১৯০৫ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসলে সিফিলিস আক্রান্ত স্বামীর মৃত্যুর খবরের পাশাপাশি স্বামীর মরণব্যাধিও সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। ততদিনে হ্যাগার্ড নামী দামী লেখকের পরিচয় পেয়ে গিয়েছেন। অনেক বছর পর, লেখক হিসেবে সুপরিচিত প্রাক্তন প্রেমিককে চিঠি লিখে নিজের ও সন্তানের দুরবস্থার কথা জানায় স্বামী পরিত্যক্তা লিলি। ছোটবেলার প্রেমিকাকে সাহায্য করেছেন দু’হাত ভরেই। হ্যাগার্ড তার সকল দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নেন এবং তার ছেলে পড়াশুনার ব্যবস্থা করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিলির দেখাশোনা করে যান লেখক। ১৯০৯ সালের ২২শে এপ্রিল লিলি সিফিলিস রোগে মারা যাওয়ার পর ফ্রাংক আর্চার পরিচিতি পেলেন “মেরি” উপন্যাসের দুশ্চরিত্র ভিলেন হিসেবে। ১৯২৫ সালে ১৪ মে ইংল্যান্ডের ডিচিংহ্যামেমারা যান স্যার হ্যাগার্ড। ডিচিংহ্যামের গির্জায় পুঁতে রাখা হয় তার পোড়ানো মৃতদেহের ছাইয়ের অবশিষ্টাংশ। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর ৯৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:১৪
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাটারিচালিত রিকশা , তিন-চাকার যানবাহন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষা এবং সিসা-দূষণরোধ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮


বাংলাদেশের নগর ও শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি-বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন-চাকার যান ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচের পরিবহন, বিপুলসংখ্যক চালক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নায়িকা যিনি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১২



একদিন যে বিয়েকে ঘিরে ছিল পাঁচতারকা হোটেলের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ আর শত মানুষের করতালি, সেই সংসারের আকাশেই কয়েক বছরের মধ্যে জমেছিল বিচ্ছেদের মেঘ। ১৯৮৭ সালের মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×