
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কৃষিভিত্তিক থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে রূপান্তর ঘটেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এসব বিকাশমান অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনমুখী শিল্প। অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরও, নানা কারণে শিল্পশ্রমিকের জীবনমান ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বারবার। ঘটছে শিল্প দূর্ঘটনা। বিভিন্ন দেশের শিল্প দুর্ঘটনার ভয়াবহতার পেছনে, সরকারি নজরদারি ও তদারকিতে সামর্থ্যের ঘাটতিকেই মূল কারণ মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও এজন্য দায়ী। ইতিহাসের পাতা থেকে বিশ্বের বৃহত্তম কয়েকটি দূর্ঘটনা।

ভোপাল শহরে ইউনিয়ন কার্বাইড দুর্ঘটনা
১৯৮৪ সালের দোসরা থেকে তেসরা ডিসেম্বরের রাত্রে ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের ভোপাল শহরে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড'এর কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে হাজার-হাজার মানুষ হতাহত হন: এটি ছিল বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার রাত্রে একটি এমআইসি ট্যাঙ্কে পানি ঢুকে গ্যাস নির্গত হয়৷ এই গ্যাস এবং অপরাপর কমবেশি বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস প্রায় এক ঘণ্টা ধরে নির্গত হয়ে কারখানার কাছের বস্তিগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে: বিষাক্ত গ্যাসের প্রকোপে পড়েন পাঁচ থেকে সাত লাখের বেশি মানুষ৷ মধ্য প্রদেশ রাজ্য সরকারের এফিডেভিট অনুযায়ী গ্যাসের প্রকোপে প্রাণ হারান ৩,৭৮৭ জন মানুষ - যদিও অন্যান্য সূত্র ১৬ থেকে ২৫ হাজার অবধি মানুষের প্রাণহানির দাবি তুলেছে৷ আহতের সরকারি সংখ্যা ৫ লাখ ৫৮ হাজার একশো পঁচিশ৷

নেদারল্যান্ডসেও আতশবাজি ডিপোর দুর্ঘটনা
২০০০ সালে নেদারল্যান্ডসেও আতশবাজির একটি ডিপোতে আগুন লেগে মারা যায় ২৪ জন। আহত হয় ৯৪৭ জন।
এর আগে ১৯৯৩ সালের ১০ মে, থাইল্যান্ডের একটি খেলনা কারখানায় মারা যান ২১০ জন শ্রমিক। সিঁড়ি তালাবদ্ধ থাকার কারণে শ্রমিকরা বের হতে না পারায়, এতো বিপুল প্রাণহানি।

কিংহে স্পেশাল স্টিল করপোরেশন লিমিটেড এর দুর্ঘটনা
২০০৭ সালে চীনের কিংহে স্পেশাল স্টিল করপোরেশন লিমিটেড এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩২ জন। তদন্তে দেখা যায়, কারখানাটির নিরাপত্তা মান ছিল দুর্বল। ঘাটতি ছিল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থায়ও। এ দুর্ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চীনের পুরো ইস্পাত শিল্পেই।

ইস্তানবুলের আতশবাজির কারখানার দুর্ঘটনা
২০০৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সরকারি নিবন্ধনহীন একটি আতশবাজি কারখানায় পর পর দু’টি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আংশিকভাবে ধসে যায় ভবনটি, আর মারা যান ২২ জন কর্মী।

পাকিস্তানের আলি এন্টারপ্রাইজে অগ্নিকাণ্ড
পাকিস্তানের করাচিতে আলি এন্টারপ্রাইজ নামের পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে ২০১২ সালে। শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। আহত হন ৬শ’ জনের বেশি। দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা।

(তাজরীন পোশাক কারখানায় স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড)
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন পোশাক কারখানায় স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে মোট ১১৭ জন পোষাকশ্রমিক নিহত হয় ও ২০০ জনের অধিক আহত হয়। ভয়ানক এই দুর্ঘটনায় ঐ পোশাক কারখানার নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোষাকশ্রমিক ও আগুন থেকে রেহাই পেতে ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরও ১০ জনের। তবে লাফিয়ে পড়া অনেকে আহত হলেও প্রাণে বেঁচেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে এর আগে বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকান্ড ঘটলেও এতো বেশি প্রাণহানি আর কখনো ঘটেনি। আর এমন এক এলাকায় এই ঘটনা ঘটলো, যেখানে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ অবস্থিত।
বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের অভিযোগ, আগুন লাগার পর সতর্ক সঙ্কেত বাজলেও কর্মকর্তারা তাদের বের হতে না দিয়ে উল্টো কলাপসিবল গেইটে তালা লাগিয়ে দেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা এত বেশি। কারখানার মালিকরা কেউ ঘটনাস্থলে না থাকায় এই বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এই কারখানার পরিবেশ নিয়ে তাদের পোশাকের আমদানিকারক ওয়াল-মার্টের অসন্তোষের প্রমাণ মিলেছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ‘তাজরীন' ফ্যাশনের মালিক দেলোয়ার হোসেনের সাথে মুঠোফোনে বার কয়েক যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ওই প্রান্ত থেকে মুঠোফোনের কলগুলো রিসিভ করা হয়নি।

( রানা প্লাজা ভবন ধস)
৪ এপ্রিল ২০১৩ সকাল ৮:৪৫ এ সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। ভবনের কয়েকটি তলা নিচে দেবে যায়। কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। এ দূর্ঘটনায় এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয় যা বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সাধারণ জনগণ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজ চালায়। ভবনটিতে পোশাক কারখানা, একটি ব্যাংক এবং একাধিক অন্যান্য দোকান ছিল, সকালে ব্যস্ত সময়ে এই ধসের ঘটনাটি ঘটে।ভবনটিতে ফাটল থাকার কারণে ভবন না ব্যবহারের সতর্কবার্তা থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছিল। এর মাত্র পাঁচ মাস আগে ঢাকা পোশাক কারখানায় একটি বড় অগ্নিকান্ডের পর এই দুর্ঘটনাটি হয়, যেটি বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল দুর্ঘটনা। এই ঘটনার ১৭ দিন পর ১০ মে ধ্বংসস্তূপ থেকে রেশমা নামের এক মেয়েকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ইতিহাসের ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধস।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০২০ বিকাল ৩:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



