somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্য আনএক্সপেক্টেড ব্রাইড (শেষ পর্ব)

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পর্ব এক পর্ব দুই পর্ব তিন পর্ব চার পর্ব পাঁচ পর্ব ছয়



শেষ পর্ব

নোরার দিকে তার চেয়ারম্যান ম্যাডাম আরেকবার সরু চোখে তাকিয়ে বলল, আদনান চৌধুরী আসবে তো? না আসলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে নোরা?

নোরার খুব করে বলতে ইচ্ছে হল, ম্যাডাম আমি বললে কেবল আদনান চৌধুরী নয়, তার বাপ, তার শ্বশুর সব চলে আসবে।
লাইনটা মনে হতেই ওর খুব হাসি চলে এল খুব। কথাটা কিন্তু মিথ্যা না। নোরা বললে আদনান তো আসবেই, নোরার শ্বশুর মশাই অর্থাৎ আদনানের বাবাও চলে আসবে।

অনেকদিন আগেই আদনানকে সেমিনারে আনার একটা চেষ্টা চলছিল। কিন্তু তার এপোয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাচ্ছিলো না কিছুতেই। তারপর দায়িত্ব এসে পড়ে নোরার উপর। তখনও আদনানের সাথে নোরার বিয়ে হয় নি।

মাঝে কয়েকটা দিন এই সেমিনারের কথা নোরার একদমই মনে ছিল না। রেবেকাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় আনার দুইদিন পরে ও যখন ক্যাম্পাসে এসে হাজির হল, সেদিনই ওর ডাক পড়লো চেয়ারম্যান ম্যাডামের ঘরে। সেমিনারটার কথা মনে বলতেই নোরার মনে একটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছিল। তবে ম্যাডামকে আশ্বাস দিয়েছিল যে আদনান চৌধুরী রাজি হয়েছে আসতে। দিন তারিখ তাকে জানিয়ে দিলেই হবে।
ম্যাডামের মুখে খানিকটা অবিশ্বাস দেখা দিয়েছিল তখন। নোরার দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছিল, সত্যিই তো?
নোরা একটু হেসে উত্তর দিয়েছিল, আপনি চিন্তা করবেন না মোটেও।

চিন্তা করার কিছু নেই। আদনান ঠিকই চলে আসবে। কিন্তু আদনানদের বাসায় গিয়ে জানতে পারলো যে আদনান ব্যবসার কাজে কয়দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে। নোরার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন। ম্যাডামকে সে কথা দিয়ে এসেছে যে আদনানকে নিয়ে যাবে। এখন যদি আদনান চলে যায় তাহলে?

নোরা সোজা তার ঘরে গিয়ে হাজির হল। আদনান তখন নিজের কাপড় গোছাতে ব্যস্ত। নোরাকে ঘরে ঢুকতে দেখে মুখ তুলে তাকালো। চোখে কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রইলো। নোরা কি বলবে বুঝতে পারলো না প্রথমে। আদনানই বলল, কিছু বলবা?
নোরা প্রথমে মাথা নাড়ালো। কিছু বলবে না। এখনই চলে যেতে মন চাইলো। ব্যবসার কাজে সে যখন বাইরে যাচ্ছে তার মানে ব্যাপার টা জরুরি। ওর ডিপার্টমেন্টের সেমিনার থেকে তো অবশ্যই জরুরি।
আদনান বলল, তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলতে চাও? বলে ফেলো।
-আপনি কবে আসবেন?
-এক দুই সপ্তাহ। কেন?
-খুব জরুরি?
-হ্যা একটু তো জরুরি। তুমি জানো খুব দরকার না পড়লে আমি সাধারণত মাকে একা রেখে যাই না।
-হ্যা। তাই তো। আচ্ছা যান।

নোরা আর দাড়ালো না। ওর কেন জানি মন খারাপ হল খুব। কাল সবার আগে ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ম্যামকে সরি বলতে হবে। এছাড়া আর কোন উপায় নেই।

পরদিন ক্যাম্পাসে গিয়ে যখন ম্যাডামকে বলতে যাবে যে আদনানকে সে আনতে পারবে না, তখনই নোরার ফোন বেজে উঠলো। ম্যাডাম তখন কি একটা ফাইল দেখছিল বলে ওকে ভাল করে লক্ষ্য করে নি। চুপচাপ ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আদনানের আওয়াজ শুনতে পেল। আদনান বলল, আমার কেন জানি মনে হচ্ছিলো তুমি কাল আমাকে কিছু বলতে চাচ্ছিলে। কেন জানি মনে হচ্ছিলো তুমি চাইছিলে আমি যেন না যাই। এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে এসেছি। তোমার বান্ধবীকে ফোন দিয়ে জানতে পারলা আসল কথা। আমাকে বলা যেত না যে যেও না, আমি জোর গলায় কথা দিয়েছি তোমাকে নিয়ে যাবো।

নোরা কেন জানি হঠাৎ করেই মনটা একদম ভাল হয়ে গেল। আনন্দে মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হল না। ম্যাডাম ততক্ষণে ওকে দেখেছেন ভাল ভাবে। বললেন, নোরা কিছু বলবে?
নোরা একটু হেসে বলল, জি ম্যাডাম। বলতে এসেছি যে আদনান চৌধুরী সামনের শুক্রবার সময় দিয়েছেন।
আদনান তখনও ফোনের ওপাশে। শুনতে পাচ্ছে নোরার কথা।

আজকে সব কিছু সেই মোতাবেক ঠিক করা হয়েছে। ব্যবসা সম্পর্কিত সেমিনার গুলোতে সব সময়ই বেশ ভাল মানুষই হয় কিন্তু আজকে আদনান চৌধুরী আসবে শুনে অডিটোরিয়ামটা একেবারে ভরে গেল সময়ের আগেই। সেমিনার শুরু হওয়ার কথা তিনটায়। তিনটা বাজার দশ মিনিট আগে এসে চেয়ারম্যান ম্যাডাম জানতে চাইলো নোরার কাছে যে আদনান চৌধুরী কত দুর। আসবে তো সে?

তখনই নোরার এই কথাটা মনে হল। সে চাইলে আদনানের বাবা শ্বশুর সবাই চলে আসবে।

ঠিকঠিক তিনটার সময় আদনান প্রবেশ করলো অডিটোরিয়ামে। এবং নোরাকে অবাক করে দিয়ে আদনানের বাবাও সাথে আছে। আদনানের চোখ পুরো অডিটোরিয়াম ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। নোরা জানে ওকেই খুজছে সে। এক সময় দেখতেও পেল। একটু চোখাচোখি হল ওদের।

একটু পরেই সেমিনার শুরু হয়ে গেল। নানা কথা বার্তা আলাপ আলোচনা চললো। আদনান নিজে এই ধরনের সেমিনারে অনেক কথা বলে। নানান টিপস দেয়। কিভাবে ব্যবসা শুরু করতে হবে, কি কি ব্যাপার গুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তারপর শিক্ষার্থীদের নানান প্রশ্নের জবাব দেয়। আজকেও সেটার করছিল। এমন সময় হঠাৎ করেই একটা প্রশ্ন করলো, স্যার আমরা জানি প্রতিটি সফল পুরুষের পেছনে একজন নারীর অবদান থাকে। আপনার আছে কি? কাউকে ভালবাসেন আপনি?

প্রশ্নটা শুনতেই নোরার চোখ চলে গেল আদনানের দিকে। আদনানও তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা মুহুর্ত কেটে গেল। তারপর আদনান বলল, হ্যা অবশ্যই আছে। একজন না তিন জন মেয়ে আছে আমার জীবনে।

কিছু সময় দম নিয়ে তারপর বলল, প্রথমজন হচ্ছে আমার মা। তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন এতো দিন তবে এখন ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। তারপর আবদান আছে আমার প্রথম স্ত্রীর।

স্ত্রীর কথা শুনে অডিটোরিয়ামে যেন বোমা পড়লো। আদনান যে বিবাহিত এই কথা খুব কম মানুষই জানে। কিছু গুঞ্জন সৃষ্টি হল। আদনান বলল, এই গল্পটা আমি কখনো করি না কারো কাছে। এতোদিন এড়িয়েই যেতাম। আজকে বলি সবাইকে।

আদনান নোরার দিকে আরেকবার তাকালো । নোরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে লাগলো । হঠাৎই একটা তীব্র অনুভূতি হতে লাগলো ওর মাঝে !

আদনান মাইক হাতে নিয়ে কথা শুরু করলো আবার । এখনও চোখ নোরার দিকেই রয়েছে ।

আমার মায়ের এনজাইটি ডিস-অর্ডার আছে । অল্পতেই সে প্যানিকড হয়ে যেত খুব বেশি । তখন তাকে সামালো মুশকিল হয়ে যেত । এই জন্যই আমি খুব কম বয়সে বিয়ে করে ফেলি । আমি সব সময় বাসায় থাকতে পারতাম না । বাবা তখন সবে নতুন ব্যবসাতে হাত দিয়েছে । সেও খুব ব্যস্ত ।

বিয়ের কিছুদিন পরেই লক্ষ্য করা শুরু করলাম যে আমার মা আগের থেকে বেশ শান্ত হয়ে গেছে । সব কৃতিত্ব নিতুর । আমার মাকে যে সে কি পরিমান ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখতে শুরু করলো আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম । এই মেয়েটা কেমন কে আমার জীবনেও গাঢ় আসন নিয়ে বসলো সেটা আমি নিজেও জানি না ।

কিন্তু ......

কিন্তু বলে আদনান কিছুটা সময় থামলো । আবারও তাকালো নোরার দিকে । পুরো অডিটোরিয়াম একেবারে নিশ্চুপ হয়ে শুনছে আদনানের কথা । আদনান আবার তার বক্তব্য শুরু করলো ।

সব কিছু ভাল চলছিলো । বাবার ব্যবসাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে । আমি ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বাবার অফিসে গিয়ে হাজির হই । কাজ করি । একদিন বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল । মা সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় খুব আঘাত পেয়ে গেল । তখন আসলে যোগাযোগ ব্যবস্থা এতো ভাল ছিল না । মোবাইল ছিল না এভাবে । বাসায় ল্যান্ড ফোন ছিল তবে কোন কারনে সেই ফোন এসে পৌছায় নি । বাসায় একটা গাড়ি রাখা থাকলেও সেখানে কোন ড্রাইভার ছিল না । নিতু অল্প অলপ ড্রাইভিং শিখেছিলো । আমি ওকে শিয়েছিলাম । মাকে নিয়ে গাড়ি বের হতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল । কি হয়েছিলো আমরা এখনও জানি না ।

তারপর থেকে মা প্রায় দুই বছর কোমাতে ছিল । তারপর জ্ঞান ফিরলেও সে কোনদিন কথা বলে আর !
আমি সম্ভবত সেই শোক ভোলার জন্য বাবার অফিসে খুব বেশি পরিশ্রম করতে শুরু করলাম । গাধার খাটুনি যাকে বলে । আসলে প্রিয়জনকে হারানোর কষ্টের থেকে বড় কষ্ট আর কিছু নেই । দুনিয়ার সব কিছু অর্জন করে ফেললেও যদি সেটা প্রিয়মানুষ গুলোর সাথে ভাগ করে নেওয়া যায় তাহলে সেই অর্জনের কোন মূল্যই নেই । আমি দুই দুইজন কাছের মানুষকে হারিয়েছিলাম । না ঠিক দুই জন না । তিনজন !

লাইনটা শোনা মাত্রই নোরা কেঁপে উঠলো । ওর বুকের ভেতরে কেমন ধকধক করতে লাগলো ।
আদনান বলল, ঐ সময়ে নিতু দুই মাসের প্রেগনেন্ট ছিল । অটোপসি তে এই তথ্য আমি জানতে পারি !

নোরা কেবল অনুভব করলো ওর চোখ বেয়ে পানি বের হয়ে এসেছে । আপনা আপনা আপনি ! সামনে দাড়ানো এই শক্ত আর কঠিন হৃদয়ের মানুষটা এতোটা তীব্র কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে

আমি ভেবেছিলাম হয়তো এই ভাবেই জীবন কাঁটবে । তাই কাজের ভেতরে ব্যস্ত রাখলাম নিজেকে । তারপর আবার জীবনের ছন্দপতন হল । তবে এইবার বলা যায় একটা ভাল হল । আরেকটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হল । এবং আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে এই মেয়েটি কি তীব্র ভালবাসা নিয়ে আমার মাকে সামলে নিলো । এতো মায়া ভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার মায়ের দিকে তাকালো যে আমার কেবল মনে হল যে এই মেয়েটাকে কোন ভাবেই দুরে রাখা যাবে না ।
যেই আমি কোন দিন ভাবিও নি যে অন্য কোন মেয়ের প্রেমে পড়বো সেই আমি আবারও প্রেমে পড়লাম । গভীর ভাবে পড়লাম ।

সো যেটা বলছিলাম । তিনজন মেয়ের আমার জীবনে খুব বড় অবদান রয়েছে । একজন তো ছেড়ে চলে গেছে । অতীতের । আমার মা এখনও রয়েছে আমার কাছেই । আর সামনের জন্য হচ্ছে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য ।

আদনান যখন কথা শেষ করলো পুরো অডিটোরিয়াম কিছু সময়ের জন্য চুপ করে রইলো । কারো মুখে কোন কথা যেন নেই । আদনান আবার বলল, সরি যে ব্যক্তিগত কথা বলে ফেললাম । এই রকম সেমিনারে কেবল এসব বলা ঠিক না । আমি জানি । তবুও চলে এল । আবারও সরি ।

সেই মেয়েটা কাছে এখনও মাইক রয়েই গেছে । সে মাইকটা হাতে নিয়ে বলল, আপনার সম্পর্কে এতো কিছু জেনে সত্যিই ভাল লাগলো। আমরা কি জানতে পারি সেই মেয়েটি কে ? মানে যাকে আপনি বিয়ে করেছেন ?

আদনান হাসলো একটু । তারপর বলল, হ্যা জানতে পারেন । সে এখন এই অডিটোরিয়ামের ভেতরেই আছে !

কথাটা শুনেই পুরো অডিটোরিয়ামে হইচই পড়ে গেল । কে কে সবাই চিৎকার করে উঠলো !
আদনান সবাইকে হাতের ইশারায় থামতে বলে বলল, বলাই যায় তবে বলল সে খুব লজ্জায় পড়ে যাবে । তাকে আপাতত লজ্জাতে ফেলতে চাচ্ছি না । তবে একদিন জেনে যাবেন অবশ্যই !


সেমিনার শেষ করে বের হতে হতে আরও সময় লাগলো একটু । এই পুরো সময় নোরা একবারও আদনানের সামনে গেল না। নোরার কেমন যেন একটা লজ্জার অনুভূতি হচ্ছে । ঐদিন রাতে ভুল দিয়ে ওর পুরো ঘর সাজানোর পরে নোরা কেবল অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে ছিল । জীবনে এতোটা আনন্দিত সে আর কোন দিন হয় নি । কোন দিন কল্পনাও করে নি কেউ ওর জন্য এমন কিছু করতে পারে । আর আজকে সবার সামনে অকপটে সব কিছু বলে দিল । এমন একটা মানুষকে ছেড়ে সে কিভাবে চলে যাবে ?
কোন ভাবেই কি যেতে পারবে !

-যাবে না ?

নোরা খানিকটা চমকে উঠলো । আপন মনেই ও কি যেন ভাবছিলো । পাশে যখন যে আদনান এসে দাড়িয়েছে সেটা লক্ষ্য করে নি । সবার চোখ এড়িয়ে চলে এসেছে ওর কাছে ।
নোরা এদিক ওদিক তাকালো । ও নিজের ক্লাস রুমে এসে বসে ছিল । সেমিনার শেষ করে আদনান আর ওর বাবা গিয়েছিল চেয়ারম্যান ম্যাডামের অফিসে । সেখান থেকে আদনান ওকে খুজে বের করেছে ।
নোরার হঠাৎ খুব লজ্জা লাগলো । পুরো ক্লাস রুমটাই ফাঁকা হয়ে আছে । আজকে ছুটির দিন । কেবল সেমিনারের জন্য ক্যাম্পাসে ওরা এসেছিললো । সেমিনার শেষ হতে সবাই চলে গেছে যে যার মত । ক্লাস রুমের দিকে আর কেউ আসে নি ।

আদনান বলল, কি হল যাবা না ?
-যাবো । ম্যাডামের সাথে কিছু কাজ ছিল ।
-কাল কর । আজকে চল আমার সাথে ।
নোরা একটু হাসলো । তারপর বলল, আমি আসছি । আপনি যান ।
আদনান কিছু সময় নোরার দিকে তাকিয়ে থেকে এক পা এগিয়ে এল ওর দিকে । তারপর বলল, সবার সামনে তোমার নাম বলে দিলে কি রাগ করতে ?

নোরা চট করেই প্রশ্নটার জবাব দিতে পারলো না । সবার সামনে যদি নামটা বলে দিতো তাহলে নিশ্চিত ভাবেই নোরা লজ্জা পেত । তবে ও কোন অন্যায় তো করে নি । বিয়ে করা নিশ্চয়ই অন্যায় কোন কাজ নয় । নোরা মাথা নাড়ালো । সে রাগ করতো না ।
আদনান বলল, আমি চাচ্ছিলাম যে আমাদের বিয়ের তো কোন অনুষ্ঠান হয় নি । একটা রিসিপশন করা যাক ।
নোরা বলল, এতো তাড়াহুড়া কেন করছেন ?
আদনান বলল, কারন আমি সবাই কে জানাতে চাই যে তুমি আমার বউ !

কথাটা আদনান এমন ভাবে বলল যে নোরার হাসি চলে এল । নোরা হাসি থামিয়ে বলল, কেন ? এখন কেন জানাতে চাচ্ছেন ? বিয়ের সময় তো কোন আগ্রহ দেখান নি ।
আদনান আরেক ধাপ এগিয়ে এল নোরার দিকে । তারপর ওর হাতটা ধরলো । কিছু সময় নোরার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, কারন আমি সবাই যখন জেনে যাবে তুমি আমার বউ তখন আর আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না । মনে নেই সেদিন আমাকে ভয় দেখিয়েছিলে যে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে !
নোরা কি বলবে বুঝতে পারলো না । সেদিন সে আসলেই রাগের মাথায় কথাটা বলেছিলো । খুব অভিমানও হয়েছিলো আদনানের উপর । সে কেন বলে নি নিতুর নামের মেয়েটার কথা ! ওর যে আগে একটা বিয়ে হয়েছিলো এটা কেন লুকিয়েছিলো ওর কাছে ।
আদনান যেন বুঝতে পারলো নোরা মনে মনে কি ভাবছে । আদনান বলল, আমি খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম । ভেবেছিলাম যে তুমি হয়তো সত্যটা জানলে আর বিয়েতে রাজি হবে না । আমি তোমাকে হারাতে চাই নি । কিন্তু দেখো তোমাকে ধরেও রাখতে পারছি না । এতো এতো ক্ষমতা আমার ! কত টাকা ! কিন্তু প্রিয় মানুষের কাছে কত অসহায় ! নিতুও চলে গিয়েছিলো তুমি তো চলে যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছো !

আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে নোরার কি হল নোরা বলতে পারবে না । এক পলকে নোরা আদনানের কাছে চলে এল । হাত দুটো দিয়ে আদনানের দুই কানের কাছে আলতো করে চেপে ধরলো । তারপর আদনানের ঠোঁটে গভীর ভাবে চুমু খেল ।

নোরা চুমু খাওয়ার পরে যখন আদনানের চোখের দিকে তাকালো, দেখতে আদনান খানিকটা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । নোরার কেন জানি লজ্জা করলো না মোটেও । আদনানের চোখের দিকে চোখ রেখে বলল, আমি যাচ্ছি না কোথায় ! আম্মু আর আর আম্মুর ছেলেকে ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না !

নোরা তখনও আদনানকে খানিকটা জড়িয়েই ধরে আছে । এমন সময় পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল । কেউ যেন দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে । নোরা আদনানকে ছেড়ে একটু দুরে সরে দাড়ালো । তারপরই দরজায় কামালকে দেখা গেল ।
-স্যার আপনি এখানে । আমাদের এখনই যাওয়া দরকার । নয়তো ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে !
নোরা কামালের দিকে কৌতুহল চোখে তাকিয়ে বলল, ফ্লাইট !
-হ্যা ! আজকে স্যারের জার্মানি যাওয়ার কথা । এমনিতেও প্রথম মিটিং টা স্যার কোন কারন ছাড়াই ক্যান্সেল করেছে । এবারও যদি ক্যান্সেল হয়ে যায় তাহলে এই ডিলটা হাত ছাড়া হয়ে যাবে ।
আদনান কামালের দিকে তাকিয়ে বলল, হয়ে যাক । এই ডিম আমি করবো না । এখন আমি কোথাও যাবো না ।

নোরা আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল, এমন বা্চ্চামী কেন করছেন ? ঘুরে আসুন ।
-না আমি এখন তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না ।
-আচ্ছা ! আমি যদি এখন না যাই ?
-ইস বললেই হল ! জোর করে নিয়ে যাবো !
-যদি আপনি না যান তাহলে আমি কিন্তু যাবোই না আর ঐ বাড়ি । দরকার হলে আম্মুকে নিয়ে চলে আসবো ! আমি কিন্তু খুব জেদি মেয়ে বলে দিলাম ।

আদনান কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই কামাল বলল, ম্যাম আপনি বরং স্যারকে কিছু অগ্রিম চুমু খেয়ে নিন । স্যার মনে হয় তাতে রাজি হবে ! আদনান কামালের দিকে চোখ গরম করে তাকাতে যাবো কিন্তু নোরার দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল যে কামালের পরামর্শ ওর পছন্দ হয়েছে । নোরা কামালের দিকে তাকিয়ে বলল, ট্যুর কদিনের ?
-বেশি না । মাত্র তিন দিনের । যাওয়া আসা নিয়ে আরও দুইদিন ।
-আচ্ছা পাঁচ টা ওকে ! চলবে ?
কালাম বলবে খুব চলবে ম্যাম !
আদানান কামালকে ধমক দিয়ে বলল, তুমি যাও !
কামাল যেন আশা করেছিল চুমু পর্বটা ওর সামনেই হবে । কিন্তু এমন কিছুই হল না । ওকে চলে যেতেই হল ।


পরিশিষ্টঃ

এয়ারপোর্টের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার আগে আদনানের খুব ইচ্ছে হল নোরাকে আরেকবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে । কিন্তু আশে পাশে অনেক মানুষ রয়েছে । ওর বাবা সোবাহান চৌধুরীও রয়েছে । নোরা একা একা আবার বাসায় ফিরে যাবে এই জন্য সেও এসেছে সাথে । নোরার দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা আমি যাই তাহলে । পৌছে ফোন দেব !
-আচ্ছা ।
নোরা হাসলো। তারপর বলল, নিশ্চিন্তে ডিল টা করে ফিরে আসুন । আম্মুকে নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না । আমি আছি ।

সব লজ্জার ঝেড়ে ফেলে নোরার কপালে একটা চুমু খেয়েই ফেলল । তারপর বলল, আমি চিন্তা করছি না ।

শ্বশুর মশাইয়ের সামনে যে এই ভাবে আদনান ওকে চুমু খাবে সেটা ও ভাবতেই পারে নি । লজ্জায় লাল হয়ে গেল ও । আর কোন কথা বেরুলো না মুখ দিয়ে । মনে মনে ঠিক করে নিল এমন লজ্জায় ফেলার জন্য একটা শোধ সে নিবেই । আগে আসুক !

আদনান যাওয়ার সময় কত বার যে পেছন ফিরে চাইলো সেটার কোন হিসাব নেই । নোরার এতো সময় কিছু মনে না হলেও যখনই আদনান চোখের আড়াল চলে গেল কেমন একটা মন খারাপ অনুভূতি এসে ভর করলো ! কি অদ্ভুত ভাবে সে আদনানের বউ হয়ে গিয়েছিলো আর আজকে কেমন করে ওকে ভালও বেসে ফেলেছে । জীবনে এই রকম কত অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে । কিন্তু নোরা কি কখনই ভেবেছিল এমন আনএক্সপেক্টেড মধুর জীবন তার জন্য অপেক্ষা করছে !!
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:০৯
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাইয়েমা হাসানের ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ৮:২৯



এদেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে সরকার সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে দশদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। যেহেতু কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস জনিত রোগ তাই দশদিনের সাধারণ ছুটির মূল উদ্দেশ্য জনসাধারণ ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বের রাজধানি এখন করোনার রাজধানি।( আমেরিকা আক্রান্তের সংখ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে প্রথম অবস্থানে চলে এসেছে)

লিখেছেন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৪৫



যে শহর ২৪ ঘন্টা যন্ত্রের মত সচল থাকে।করোনায় থমকে গেছে সে শহরের গতিময়তা।নিস্তব্দ হয়ে গেছে পুরো শহরটি।সর্ব বিষয়ে প্রায় প্রথম অবস্থানে থেকেও হিমশিম খাচ্ছে সাস্থ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো লেখায় মন্তব্যে করার নৈতিক মানদন্ড। একটু কষ্ট হলেও লেখাটি পড়ুন।

লিখেছেন সৈয়দ এমদাদ মাহমুদ, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:০২

সম্মানিত ব্লগারদের দৃষ্টি আকর্শন করে বলছি ব্লগারদের লেখা পড়ে মন্তব্য করবেন শিষ্টাচারের সঙ্গে। মন্তব্য যেন কখনো অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য না হয়। মন্তব্য হবে সংশোধনের লক্ষ্যে। কারো কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনাময় পৃথিবিতে কেমন আছেন সবাই?

লিখেছেন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:২৪



পোষ্ট লিখলাম একটা ক্ষুদ্র কিন্তু প্রথম পাতায় এলোনা ।সেটা জানতে এটা পরিক্ষামূলক পোষ্ট।সব সেটাপ'তো ঠিকই আছে তাহলে সমস্যা কোথায় ? আমি কি সামুতে নিষিদ্ধ নাকি?

ধন্যবাদ। ...বাকিটুকু পড়ুন

পোষ্ট কম লিখবো, ভয়ের কোন কারণ নাই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ সকাল ৮:০১



আপনারা জানেন, নিউইয়র্কের খবর ভালো নয়; এই শহরে প্রায় ৫ লাখ বাংগালী বাস করেন; আমিও এখানে আটকা পড়ে গেছি; এই সময়ে আমার দেশে থাকার কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×