somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্য আনএক্সপেক্টেড ব্রাইড (পর্ব চার)

২২ শে জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ১০:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পর্ব এক পর্ব দুই পর্ব তিন

সাত

অরিন কিছু সময় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো নোরার দিকে । ওর ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না নোরার কথা । অবশ্য এমন কথা যে কারো বিশ্বাস হওয়ার কথা না । অরিন নোরার দিকে তাকিয়ে বলল, তুই সত্যি বলছিস ?
নোরা নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ছিল । ফেসবুকের টাইম লাইন চেক করছিলো । অরিনের দিকে না তাকিয়েই বলল, তোকে মিথ্যা বলে আমার কি লাভ ? আর আমি এতো বড় একটা মিথ্যা কেন বলবো শুনি ?

অরিন আরও কিছু সময় নোরার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো জোরে ! এতো জোরে যে পাশের ঘর থেকে দু তিন জন মেয়ে ছুটে এল !

-কি হয়েছে কি হয়েছে ?

নোরা বিরক্ত হয়ে একবার অরিনের দিকে তাকালো । তারপর মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল , আরে কিছু না । এই গাধাটা তেলাপোকা দেখে ভয় পেয়েছে । মেয়ে দুটো হাসতে হাসতে চলে গেল । অরিন এরপর নোরাকে চেপে ধরলো । তারপর বলল, বল বল ! কিভাবে হল এসব ! আমি তো কিছুই জানি না এসবের !
নোরা মনিরট থেকে মুখ তুলে অরিনের দিকে তাকালো । তারপর বলল, আমি নিজেই কিছু জানি ? আমার নিজেরই এখন বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমার বিয়ে হয়ে গেছে তাও আবার আদনানের সাথে !

দুইদিন আগে নোরার সাথে আদনানের বিয়ে হয়েছে । নোরা এই ভাবে কারো বউ হয়ে যাবে সেটা নোরা কোন দিন ভাবে নি । তাও আবার আদনানের বউ যে হবে সেটা তো কোন দিন ভাবেই নি । কিন্তু বউ হয়ে গেছে এটাই হচ্ছে সব থেক বড় কথা । এটা এখন আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই । অবশ্য এতে নোরা যে অখুশি সেই কথা সে বলতে পারবে না । নিজের মনের কাছেই প্রশ্ন করে দেখেছে । কোন উত্তর সে পায় নি । তার মানে এই না যে সে আদনানকে বিয়ে করতে পেরে খুব আনন্দিত হয়েছে । আসলে ওর নিজের ভেতরে এমন কিছুই অনুভূত হচ্ছে না । কেবল অবাক হয়েছে খুব । এমন ভাবে কেন সে আদনানের বউ হয়ে গেল । কেবল মাত্র ঐদিন ওর মাকে সাহায্য করেছে বলেই । মায়ের প্রতি ছেলের এতো ভালবাসা ! এটা অবশ্য নোরাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে । মা ভক্ত ছেলে !

কিন্তু সব থেকে অবাক হওয়ার ব্যাপার হচ্ছে বাসর রাতে আদনান এভাবে অজ্ঞান হয়ে গেল কেন ?
কি হাস্যকর একটা ব্যাপার !
এভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার কি কোন কারন আছে ?

নোরা একবার শুনেছিলো ওর এক বান্ধবীর বড় বোন নাকি এই ভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো বাসর রাতে । অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিলো । বর যখন কাছে আসতে যাচ্ছিলো তখন নাকি ভয় পেয়ে চিৎকার করেছিলো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো । পরে সেটা নিয়ে কি হাসাহাসি । বেচারি সেই ঘটনা নিয়ে এখনও লজ্জায় লাল হয়ে যায় !

আদনান যখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো নোরা প্রথমে ভেবে পায় নি কি করবে ! প্রথমেই মনে হয়েছিলো তখনই দৌড়ে যায় বাইরে । কাউকে ডেকে নিয়ে আসে ! কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল । এই ঘটনা যদি বাইরে কেউ জানে তখন বেচারা সারা জীবন লজ্জা পেয়েই কাটাবে । এতো বড় কোম্পানীর মালিক এতো মানুষ তাকে চেনে । যদি এই ব্যাপারটা কোন ভাবে মানুষের সামনে প্রকাশ পেয়ে যায় তাহলে আদনান লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবে না কাউকে ।

এটা ভেবেই আবার দরজা থেকে ফিরে এল । কিছু সময় আদনানের দেহটা বিছানায় তোলার চেষ্টা করলো । কিন্তু কোন লাভ হল না । ওর নিজের এতো শক্তি নেই যে আদনান কে খাটের উপর তুলবে । অবশ্য যেখানে ও ছিল সেখানে নরম কার্পেট দিয়ে মোড়া । তাই খুব বেশি চিন্তিত হল না । বিছানা থেকে একটা বালিশ নিয়ে এসে আদনানের মাথার নিচে দিয়ে দিল । তারপর নিজেও আদনানের পাশে বসে পড়লো । কিছু সময় তাকিয়ে রইলো আদনানের ঘুমন্ত চেহারার দিকে ।
নিজেও ভেবে পাচ্ছিলো না যে এই সুদর্শন মানুষটা ওর স্বামী হয়ে গেছে !
কিভাবে স্বামী হয়ে গেল !

এটাই বুঝি লেখা থাকে কপালে ! কিভাবে আর কার সাথে যে মানুষের বিয়ে হয়ে যায় সেটা কেউ বলতে পারে না । নোরা কি সত্যিই কোন ভেবেছিলো এই মানুষটার সাথে ওর বিয়ে হবে ?
নাহ কোন দিন ভাবে নি !

এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো সেটা নিজেও জানে না । সকালবেলা যখন ঘুম ভাঞ্গলো অবাক হয়ে দেখলো ও খাটের উপর শুয়ে আছে । ওর স্পষ্ট মনে আছে যে আদনানের পাশেই বসে ছিল সে । কোন ভাবেই খাটের উপরে আসে নি । আদনানকে নিচে রেখে ও কোন ভাবেই খাটের উপর এসে ঘুমাতে পারে না ! তার মানে আদনান নিজে ওকে এখানে নিয়ে এসেছে ?

এই অনুভূতিটা মনে আসতেই একটা লজ্জা লজ্জা অনুভব হল । ঘরে অবশ্য তখন কেউ ছিল না । আদনান ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে চলে গেছে ।

সকালে নাস্তার টেবিলে অন্য সবাই হাজির থাকলেও আদনান ছিল না । জানা গেল সে নাকি সকাল বেলাতেই বেরিয়ে গেছে । তার অফিসে জরুরী কাজ আছে । সোবাহান চৌধুরী খানিকটা বকাবকি করলেন এই ভাবে সকালে চলে যাওয়ার জন্য । সকালের নাস্তাটা অন্তত এক সাথে খাওয়ার দরজার ছিল । তবে নোরার বাবা বলল যে সকালে যাওয়ার আগে নাকি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেছে । এটা শুনে সোবাহান চৌধুরী খানিকটা শান্ত হলেন । তবে নোরার মনে তখন চলছে অন্য কথা । নোরা নিশ্চিত ভাবেই জানে যে আদনান ওর সামনে না পড়ার জন্য ওভাবে সকাল বেলাতেই বেরিয়ে গেছে । মনে মনে হাসলো কেবল ।

নোরার বাবা মা আরও একদিন ছিল আদনানদের বাসায় । তারপর ওকে রেখে ওরা বিদায় নিল । নোরা তারপরের দিন হলে ফিরে এল । এই দুইদিনে আদনান একবারও বাসায় আসে নি । ওর নাকি বিশেষ কাজ পরে গেছে । ঐদিন রাতেই চট্টগ্রাম যেতে হয়েছে ওকে ! নোরা এবার নিশ্চিত হয়ে গেল যে আদনান লজ্জায় নোরার সামনে আসছে না। নোরা যত সময় আদনানদের বাসায় থাকবে তত সময় আদনান বাসায় আসবে না । নিজের হলে ফেরৎ চলে এল !



***

-স্যার বাসায় যাবেন তো ?
কামালের কথা শুনে আদনান যেন বাস্তবে ফিরে এল । তাকিয়ে দেখলো গাড়িটা ওদের বাসার পথ ধরেছে । সকাল বেলা সব গাড়ি গুলো অফিস পাড়ার দিকে যাচ্ছে । আদনান বলল, না আগে অফিসে চল ! ওখানে কিছু কাজ আছে !

তারপর খানিকটা ইতস্ততঃ ভাবে কামালকে জিজ্ঞেস করলো, বাসায় কি নোরা আছে এখন ?
কামাল সাথে সাথেই বলল, না স্যার ! ম্যাডাম গতকালকে তার হলে ফেরৎ গেছে । তার নাকি কি একটা পরীক্ষা আছে ।
-আচ্ছা ।

আদনান কি যেন ভাবলো । তারপর বলল, আচ্ছা আগে তাহলে বাসার দিকে চল । তারপর না হয় অফিস যাওয়া যাবে ।

কামালের দিকে তাকিয়ে আদনানের মনে হল কামাল হয়তো কিছু আচ করতে পেরেছে । একটা অস্বস্তি বোধ কাজ করতে শুরু করলো । কালাম কি জেনে যাবে সব ! বাড়ির অন্য সব মানুষ যদি জেনে যায় ?
আর নোরা যদি রাতের কথা ওর বন্ধুদের কাছে বলে ?
এই ব্যাপারটা ভাবতেই ওর মুখটা খানিকটা লাল হয়ে গেল । এই চিন্তাতে ওর গত দুই দিন ঠিক মত ঘুম হয়নি । ওর বাবা ওকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে বকাবকি করেছে । বারবাই আদনানের মনে হচ্ছিলো যে ওর বাবা হয়তো এখন বলবে যে তুই গাধা বাসর রাতে ঐভাবে অজ্ঞান কেন হয়ে গেলি !

সত্যিই কেন এভাবে অজ্ঞান হয়ে গেল ?
নোরার ঐভাবে বসে থাকতে থেকে অতীতের ঐদিনের কথাটা এইভাবে মনে পড়ে যাবে সেটা আদনান বুঝতে পারে নি । সে কোন দিন এমন একটা দিনের সম্মুখীন হবে সেটাও সম্ভবত ওর ধারনা ছিল না । অন্য কেউ তার বউ হবে এটা ওর অবচেতন মন ঠিকঠাক মেনে নিটে পারে নি । তাই হয়তো এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ।

সকাল বেলা যখন আদনানের ঘুম ভেঙ্গেছিলো দেখেছিল যে ও সেই নিচেই শুয়ে আছে । ওর মাথার নিচে একটা বালিশ দেওয়া । ঠিক ওর পাশেই গুটুসুটি মেরে নোরা শুয়ে আছে । নোরার দিকে তাকিয়ে আদনানের একটা অন্য রকম অনুভূতি হল । দশ এগারো বছর পরে কারো জন্য এই অনুভূতি সে অনুভব করলো । খুব সাবধানে নোরাকে কোলে তুলে নিয়ে সে বিছানাতে শুইয়ে দিল । তারপরই ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল ! আজকে ফেরৎ আসছে ।

বাসায় এসে আদনান আরেকটা কথা জানতে পারলো । সোবাহান চৌধুরী প্রথমে ওকে একটু বকাবকি করলো বটে । তবে শেষে যে কথাটা বলল সেটাতে ওর মনটা আসলেই ভাল হয়ে গেল । এই দুইদিন নোরা নাকি প্রায় পুরোটা সময়ই ওর মায়ের কাছে ছিল । মায়ের ঘরেই সময় কাটিয়েছে । নিজে হাতে আদনানের মা কে গোসল করিয়েছে, খাইয়ে দিয়েছে । এবং সব থেকে অবাক করার ব্যাপার যে ও খুব শান্ত ভাবেই নোরার প্রতিটি কথা শুনেছে ।

এতোদিন আদনানের মা রেবেকাকে তার ঘরের ভেতরেই খাওয়ানো হত । এই দুইদিনে রেবেকাকে নোরা ডাইনিং রুমে এনে খাইয়েছে । বিকেলে তাকে নিয়ে লনে হাটাহাটি করেছে । সারাটা সময় নোরার হাত ধরেছিল সে ।
সোবাহান চৌধুরী হঠাৎ বলল, তুই কি রাগ করেছিস আমার উপরে ?
আদনান বলল, কেন রাগ করবো কেন ?
-এই যে এই ভাবে তোকে বিয়ে দিলাম !
আদনান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল । কি যেন ভাবলো । সোবাহান চৌধুরী বলল, আমি জানি তুই নীতুকে খুব বেশি ভালবাসতি । এখনও বাসিস কিন্তু এইভাবে আর কতদিন! তোকে মা কে দেখ নোরাকে কিভাবে আপন কে নিয়েছে এক নিমিশেই । আমার কি মনে হয় জানি ? তোর মা খুব জলদি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে !
আদনান বলল, নোরাকে সব কিছু বলেছো কি ?
-না কিছুই বলি নি !
-এটা তাকে বলা দরকার ছিল না কি ?
-হয়তো ছিল ?
-এখন সব শুনে যদি সে চলে যায় ? তখন ?
-যাবে না । দেখিস এই মেয়ে যাবে না ! ওকে ঠিকঠাক মত বুঝিয়ে বলতে পারলে এই মেয়ে ঠিকই বুঝবে !

আদনান আর কিছু বলল না । নিজের ঘরের দিকে রওয়ানা দিল ।


আট

নোরার ইনকোর্স পরীক্ষা শেষ হল বিকেল বেলা । হল থেকে বের হয়েই কামালকে দেখতে পেল ডিপার্টমেন্টের সামনে দাড়িয়ে থাকতে । ওকে দেখার সাথে সাথে মুখে ৬০ পাওয়ারের আলো জ্বলে উঠলো । দ্রুত এগিয়ে এল ওর দিকে ।
-পরীক্ষা ভাল হয়েছে ম্যাম ?
কামালের বলার ভঙ্গিটাই এমন ছিল যে নোরা হেসে ফেলল । তারপর বলল, এটা কে জানতে চাচ্ছে ? আপনি নাকি আপনার স্যার ?
কামাল বলল, স্যার আসলে কিছুই জানতে চাচ্ছেন না । না মানে আপনি এমন করে বিয়ের পরদিনই হলে চলে এলেন পরীক্ষার কারনে । আমি ভাবলাম যে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ন কোন পরীক্ষা হবে । তাই নিজ থেকে জানতে চাইলাম আর কি ?
নোরা বলল, এমন কোন গুরুত্বপূর্ন পরীক্ষা না । না দিলেও কোন সমস্যা হত না ।
-তবুও চলে এলেন !
-হ্যা । আমি যে চলে এসেছি শক দুর করার জন্য !
নোরার কথা শুনে কামাল বেশ অবাক হল । তারপর বলল, শক মানে ? আপনি কি বলছেন ? বিয়ে করে আপনি শকে আছেন ?
নোরা আবারও হাসলো । তারপর বলল, আমি না, আপনার বস !
কামাল যেন এবার আকাশ থেকে পড়ল । অবাক চোখে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো নোরার দিকে । নোরা সেদিকে লক্ষ্য না করে বলল, কেন আপনি খেয়াল করে নি ? আমি নিশ্চত জানি যে আপনার বস আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে । দেখলেন না বিয়ের পরদিন সকালেই কেমন করে চট্টগ্রাম পালিয়ে গেল । আমি যদি তার বাসা থেকে না আসতাম তাহলে বাসাতেই আসতো না ।

কামাল প্রতিবাদ করতে গিয়েও করলো না । কিছু যেন তার মনে পড়ে গেল । সত্যিই কিছু সময় সে ভেবে ভেবে দেখলো । আদনান চৌধুরী জরূরী ভিত্তিতে যে চট্রগ্রাম চলে গেল সেই কাজটাতে তার না গেলেও চলতো । কামালকেই পাঠানো যেত । কিংবা জিএম সাহেব কে পাঠালেই কাজ হয়ে যেত । কিন্তু তার বস নিজে নিজে চলে গেল । এমন কি কামাল নিজেও জানতো না । একটু য অবাক হয় নি সেটা সে বলতে পারবে না !

কালাম কোন কথা খুজে পেল না । কি বলবে বুঝতে পারছে না । নোরা বলল, এখন কি জন্য এসেছেন বলুন দেখি ।
কামাল আর কথা না বলে হাতের ছোট প্যাকেট টা নোরার দিকে বাড়িয়ে দিল । নোরা বলল, এটা কি ?
-স্যার পাঠিয়েছে আপনার জন্য ।
-আপনার স্যার কোথায় ?
-স্যার অফিসে !

নোরার একবার মনে হল প্যাকেট টা কামালকে ফেরৎ পাঠিয়ে বলে যে একজনের উপহার সে অন্যের কাত থেকে নেয় না । কিন্তু কি মনে হল সেটা করলো না । হাত বাড়িয়ে প্যাকেট টা নিল । ভেতরে কি আছে সেটা আন্দাদ করতে ওর খুব একটা অসুবিধা হল না । সেটা হাতে নিয়ে নিজের হলের দিকে হাটা দিল ।
কামাল ওর পিছু পিছু আসতে লাগলো । নোরা যখন বুঝতে পারলো যে কামাল পেছন পেছন আসছে নোরা দাড়িয়ে বলল, আরও কিছু বলতে চান ?
-জি।
-স্যার আপনার ব্যবহারের জন্য একটা গাড়ি পাঠিয়েছে !
-কি ?
-হ্যা । ঐ যে লাল রংয়ের প্রিমিও গাড়িটা দেখছেন গেটের সামনে ওটা আপনার জন্য !
নোরা অন্তত এটা আশা করে নি । নোরা বলল, আমি গাড়ি নিয়ে কি করবো ? আমি গাড়ি চালাতে জানি নাকি ?
কামাল সাথে সাথে বলল, গাড়ির সাথে ড্রাইভার আছএ । সে ২৪ ঘন্টা থাকবে ।
-২৪ ঘন্টা কিভাবে থাকবে । তার খাওয়া ঘুম লাগবে না ।

কামালের চেহারা দেখে মনে হল এটা যেন সে ভেবে দেখে নি । কিছু সময় ভাবলো । তারপর বলল, সেটার সমাধান করা যাবে । দুইজন ড্রাইভার রেখে দিবো তাহলে । ওরা সিফট অনুয়ায়ী ডিউটি দিবে । ১২ ঘন্টা ১২ ঘন্টা !
নোরা বলল, তো ওরা কোথায় থাকবে ? আমার হলের সামনে ? আমি যখন ফোন দিবো এসে হাজির হবে !
-জি । আপনার এক ফোনেই হাজির হবে । এক মিনিটের বেশি সময় নিলে চাকরি নট !

নোরা বলল, শুনুন চাকরি নট করতে হবে না । আপনার বসকে বলে দিন যে গাড়ি লাগবে না । ওটাকে নিয়ে যান ।
-কিন্তু ম্যাডাম .....
-কোন কিন্তু এই গাড়ি নিয়ে যান । আমার গাড়ি পছন্দ হয় নি । লাল রং আমার পছন্দ না !
কামাল বলল, তাহলে কি অন্য .....।
নোরা হাতের ইশারায় কামালকে চুপ করতে বলল। তারপর হাতের ইশারায় গেটের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিল । তারপর নিজে হাটতে লাগলো হলের দিকে । কামাল খানিকটা বোকা আর অসহায়ের মত দাড়িয়ে রইলো । কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না । আদনান ওকে খুব ভাল করে বলে দিয়েছে গাড়িটা যেন নোরা নেয় এই ব্যবস্থা করতে । এর অর্থ হচ্ছে যে কোন ভাবেই হোক তাকে রাজি করাতে হবে । কিন্তু সে তো সেই সুযোগই পেল না । ও তো ভেবেছিলো গাড়ির কথা শুনে নোরা ম্যাডাম লাফাতে লাফাতে রাজি হয়ে যাবে নিতে । আস্ত একটা গাড়ি আবার কে না নিতে চায় ! আজিব এই মেয়ে গুলো ! এমন কেউ করে নাকি !
এখন সে কি করবে !


কামালের মতই অরিন যেন আকাশ থেকে পড়লো যখন শুনলো যে নোরা আদনানের দেওয়া গাড়িটা ফিরিয়ে দিয়েছে । রাতের বেলা দূজন বসে গল্প করছিলো । নোরার হাতে নতুন ফোনটা দেখেই জানতে চাইলো কবে কিনলো ! নোরা জানালো যে কিনে নি । আদনান পাঠিয়েছে । সেই সাথে যখন বলল একটা গাড়িও পাঠিয়েছিলো । সে ফেরৎ পাঠিয়েছে !
অরিন কিছু সময় চিৎকার চেঁচামিচি করলো । তারপর বলল, শোন এখন আদনান হচ্ছে তোর স্বামী । তার সব কিছুর উপর তোর অধিকার রয়েছে । ক্ষেত্র বিশেষে আদনানের থেকে বেশি রয়েছে !
নোরা বলল, তার জিনিসের উপরে তার থেকে বেশি অধিকার ?
-অবশ্যই । তোর কিছু দরকার হলে সে দিতে বাধ্য ! নিজের জন্য না কিনলেও তোর জন্য সেটা সে কিনে দিবে । বুঝেছিস ?
-না বুঝি নি । বুঝতে চাই ও না !

অরিন বলল, ইস ! এখন গাড়িটা থাকলে কত ভাল হত । আমি গাড়িতে করে এই রাতের বেলা ঘুরে বেড়াতে পারতাম !
-তা কিভাবে বের হতাম শুনি !
-সেটা শুনে আর লাভ কি ! গাড়ি তো নাই ।
নোরার হঠাৎ কি মনে হল । সে বলল, আমি গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারি । তুই বল কিভাবে হল থেকে বের হব !
অরিন বলল, তুই গাড়িটা আনা । আমি বের করছি তোকে !

নোরার নিজের মোবাইল বের করে আদনানকে ফোন দিল । একটু যে সংকোচ লাগছিলো না সেটা বলবে না । তবে এই রাতের বেলা গাড়িতে করে করে ঘুরে বেড়ানোটা আসলে অন্য রকম একটা ব্যাপার হবে ।

ওদের ক্লাসে আরিয়ানা নামে একটা মেয়ে পড়ে । প্রায়ই দেখা যায় রাত দুই টা কি তিনটার সময় সে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভে বের হয়েছে । ঢাকা শহরের বেশ কিছুদিন সে আছে তার পরেও কখনও রাত করে বের হয় নি । এমন কোন সুযোগই আসে নি ।
ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হল । কিন্তু কোন আওয়াজ হল না । নোরাও কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, গাড়িটা কি আমার হলের সামনে পাঠানো যাবে এখন ?
নোরা ফোনের ভেতরে একটা নিঃশ্বাস পড়ার আওয়াজ শুনলো । আদনান বলল, আমি বলে দিচ্ছি !

ফোন রেখে অরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়ি আসছে ! চল দেখি কিভাবে বের হস !
অরিন বলল, চল দেখাচ্ছি ।

বারান্দায় বের হল নোরার মনে হল যেন পুরো হলটা ঘুমিয়ে পড়েছে । তবে ও জানে যে বলতে গেলে প্রায় সবাই জেগে আছে । কেউ কেউ পড়াশুনা করছে নয়তো বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছে । এদের ঘুমাতে ঘুমাতে ভোর হয়ে যাবে । তার কোন আওয়াজ না করেই ওরা হাটতে শুরু করলো সিড়ি দিকে । প্রধান গেটের কাছে আসতেই দেখলো গেটের দারোয়ান নিজের মোবাইল কি যেন দেখছে গভীর মনযোগ দিয়ে ।
নোরা অবাক হয়ে দেখলো অরিক একটা ১০০ টাকার নোট দারোয়ানের পকেটে ঢুকিয়ে দিল । দারোয়ানের সামনেই একটা ছোট টেবিলের উপরে চাবির গোছা ছিল । সেটা নিয়ে ছোট গেট টার তালা খুলে ফেলল । তারপর চাবিগোছাটা আবার আগের স্থানে রেখে দিল । দারোয়ান তখনও মনযোগ দিয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখছে । ওরা সামনে দিয়ে পার হল সেটা যেন দেখলোই না ।

গেটের বাইরে বের হতেই নোরার মনে হল যেন অন্য জগতে চলে এসেছে । রাতের ঢাকা এরকম লাগে ?
প্রতিদিন এই গেট দিয়ে যে ভেতরে ঢোকে । এই রাস্তায় হাটে অথচ এখন এই রাস্তাটা কেমন অপরিচিত মনে হচ্ছে । আশ্চর্য !
অরিন বলল, গাড়ি কোথায় ?
নোরার কিছু বলতে হল না । দেখতে পেল একই সাথে তিনটা গাড়িটা সারি বেধে ঠিক ওদের সামনে এসে থামলো ।
নোরা আর অরিন কিছু সময় একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ী করলো । একজন ড্রাইভার দরজা খুলে হয়ে বের হয়ে বলল, ম্যাডাম, আপনি বলেছিলেন লাল রং পছন্দ নয় তাই এই তিনটা রংয়ের গাড়ি পাঠিয়েছে । নীল, কালো আর সাদা ! আপনি যেটা পছন্দ হবে সেটা আপনার জন্য রাখা হবে !
নোরা কিছু বলতে যাবে তার আগে অরিন বলল, আর যদি তিন টাই পছন্দ হয় ।
ড্রাইভার দাঁত বের করে বলল, তাহলে তিনটাই আপনার ! এখানেই থাকবে !
অরিন বলল, চল এখন কালোটাতে উঠি । কাল সকালে নীলটা চড়া যাবে । আর দুপুর বেলা আমরা চড়বো সাদাতে । আরেকটা গাড়ি থাকলে ভাল হত । বিকেলে চড়তে পারতাম !
নোরা অরিনকে বলল, চুপ থাক তো !
তবে অরিনের ইচ্ছে অনুযায়ী ঠিকই কালো গাড়িতেই উঠলো ।

নোরার কেন জানি অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে শুরু করলো । ওর জীবনটা কি আসলেই এমন হওয়ার কথা ছিল ? এতো সৌভাগ্য ওর জন্য অপেক্ষা করছিলো ?
এতো এতো ভাল ভাল সব কিছু ঘটছে এরপরই খারাপ কিছু ঘটবে না তো ? নোরা জানে না । তবে নোরা এসব নিয়ে আর ভাবার সময় পেল না । অরিন ততক্ষণের ছাদের উপরের কাঁচ খুলে ফেলেছে । নিজের শরীরের অর্ধেকটা বাইরে বের করে দিয়ে চিৎকার করা শুরু করেছে । গাড়ি চলছে খুব দ্রুত ! নোরা কাঁচ নামিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো । ঢাকা শহরটা ওর কাছে অন্য রকম লাগছে । ওর পুরো জীবনটাই অন্য রকম হয়ে গেছে । সামনে হয়তো আরও অন্য রকম হবে !


মোবাইল লিংকঃ
পর্ব এক পর্ব দুই পর্ব তিন

ছবি গুগল
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ১০:৪৩
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রম্যরচনা : ইয়ে

লিখেছেন গেছো দাদা, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১:১৪

এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক সহজাত হাসি দিয়ে বললেন - আজ্ঞে আমার ইয়েতে একটু সমস্যা আছে!!
বাঙ্গালী এখনো এঁটো আর যৌনতা নিয়ে পুরোপুরি সাবলীল হয় নি। তবু বিশদে জানতে জিজ্ঞেস করলাম -... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান ভ্রমণের শতবর্ষ পর নীলসাধু জাপান পৌঁছলেন

লিখেছেন নীলসাধু, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ১১:৪২











কিছুক্ষণ আগে আমার প্রকাশিতব্য বই নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছি। এই বইমেলায় আমি ব্লগে কম আসছি। তাই ভাবলাম স্ট্যাটাস নিয়েই সহ ব্লগারদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমলা শ্রেণীকে গাড়ি, বাড়ি, মোটা বেতনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে জনগণকে আরো কঠিন অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে

লিখেছেন সাখাওয়াত হোসেন বাবন, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১:১৯

সঞ্চয় পত্রের সুদের হার কমানোর অর্থ হচ্ছে, মানুষকে সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত করে সঞ্চয়পত্র কেনা টাকাগুলোকে বাজারে নিয়ে আসা । ইতিমধ্যে নানা অকার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে সঞ্চয়পত্র কেনা থেকে নিরুৎসাহিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

জ্বীনের ক্ষমতা- ২

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৩:৩৬



খিলগাঁও, বাগিচা এলাকায় আমরা আড্ডা দিতাম।
বাগিচা মসজিদের ঠিক উলটো পাশেই চুন্নুর চায়ের দোকান। এই চায়ের দোকানে একসময় রোজ আড্ডা দিতাম, আমরা চার পাচজন বন্ধু মিলে। বিকাল থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেগম জিয়াকে ছেড়ে দেয়ার কথা উঠলে, মনটা খারাপ হয়ে যায়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:১৮



বেগম জিয়ার বয়স বেশী হয়েছে, এই বয়সে আত্মীয়স্বজন থেকে দুরে, জেলে বাস করা সহজ নয়, এটা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়; এবং সেটার সমাধানও আছে; উনাকে উনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×