সাদা শাড়ি, কালো পাড়
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
মাঝে মাঝে তিনি আসতেন। নির্দিষ্ট কোন সময় ছিল না। আমাদের সুনসান বাড়িতে প্রায়ই তিনি লম্বা সময় কাটাতেন । দুপুর গড়িয়ে বিকেল কিংবা বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি বিপুল আগ্রহে নিজের কষ্টের কথা বলতেন। শোনাতেন পরাজিত মানুষের জীবন দর্শন। শ্রোতা কেবল আমার নি:সঙ্গ মা। মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গেও মানুষটার দেখা হতো। বয়সী চোখে-মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তিনি বলতেন, ‘কেমন আছো ভাই?’ অচেনা মানুষের এমন আন্তরিকতায় আমার খুব অস্বস্তি লাগতো। বয়সের ভারে তিনি ঠিকঠাক চলতেও পারতেন না। ছোট্ট লাঠিতে ভর করে ধীর পায়ে হাটতেন। তার চলার গতি দেখে ছোট্ট আমি খুব অবাক হতাম। ভাবতাম, রাত নেমে আসার আগেই বুড়িটা গস্তব্যে পৌঁছাতে পারবে তো! আমার বিস্ময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঘোর লাগা কোনো এক কুয়াশার সকালে তিনি ঠিকই আবার হাজির হতেন। সেই চেনা ঢঙে কুশল জানতে চাইতেন। বয়স্ক মানুষটার পাশে বসে মায়ের মত কথা বলার তাগিদ অনুভব করিনি কখনও। জানতে ইচ্ছে হয়নি তিনি কোথায় থাকেন, কেমন থাকেন? মাকেই কেবল দেখতাম মানুষটাকে মমতার চদরে জড়াতে। সংসারের টানা পোড়েন সামলে মা তার হাতে তুলে দিতেন মুঠো ভর্তি চাল, কখনও এক আধটা আলু-পেয়াজ। এভাবেই ক্রমে ক্রমে তিনি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিলেন।যে কোন উৎসব আর আয়োজনে তিনি দাওয়াত পেতেন। চুপচাপ বসে থাকতেন বাড়ির এককোনে। ব্যস্ততার ফোকর গলিয়ে মায়ের নির্দেশে কেউ খাবার দিয়ে গেলে মাথা গুজে সেই খাবার খেতেন। তার মুখায়বে লেগে থাকতো ক্লান্তি, থাকতো হতাশা। কিন্তু কেন যেন আমায় দেখলেই হেসে ফেলতেন। ব্যাস্ত হয়ে উঠতেন কথা বলার জন্যে। আমি সহসাই পাত্তা না দিয়ে বেড়িয়ে যেতাম। তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন চলে যাওয়া পথে। রোজা এলেই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। মা কে ফিতরার টাকা জমিয়ে রাখতে দেখতাম। কখনও সে টাকায় শাড়ীও কিনতেন। সাদা শাড়ি, কালো পাড়। রোজার শেষের দিকে এসে শাড়ী কিংবা টাকা নিয়ে যেতেন তিনি। নতুন শাড়ী পেয়ে বুড়িটার চোখের ভাষা কেমন হয় আমার কখনও দেখা হয়নি। অনাগত ঈদের অনন্দে আমরা তখন বিভোর থাকতাম, নয়তো নতুন জামা-কাপড় কেনায় ব্যস্ত। বাড়ি ফিরলে মায়ের কাছে তার আসার খবর শুনতাম। বুড়িটার জন্যে মায়ের এমন মমতা আমাদের কাছে অতিরঞ্জিতই মনে হত।খুলনা ছাড়ার আগ পর্যন্ত প্রতি ঈদের সকালেই তাকে আমাদের বাড়িতে দেখেছি। ধবধবে সাদা শাড়ি পড়ে দরজার কোনে বসে থাকতেন। সেমাই খেতেন। আমারা ছোটরা হৈ হুলোড় করতাম। তিনি মুগ্ধ হয়ে আমাদের আনন্দ দেখতেন। ধীরে ধীরে তাকে আর ঐচ্ছিক মনে হতো না।পড়াশোনার জন্যে বাড়ি ছাড়ার পর আর একবারই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সেবারের ঈদে তাকে দেখে আমি ভয়ই পেয়েছিলাম। চোখ দুটি কেমন ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। অনেক রোগাও হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। চলার গতিও আগের চেয়ে অনেক মন্থর ছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি পড়ে যাবেন। তবু আমাকে দেখে নি:শ্বাস টেনে টেনে জানতে চাইলেন, ‘কেমন আছে ভাই, চিনতে পারছো?’ আমার চোখ ছলছল করে ওঠে। প্রতিউত্তরে বলি, ‘ভাল আছি, আপনি ভাল আছেন বুড়ি মা?’ খুশিতে তার চোখ চকচক করে ওঠে। দ্রুতগতিতে তিনি মাথা ঝাঁকান। গেল ঈদে ছোট ভাই আর মায়ের জন্যে কেনাকাটা করতে গিয়ে আমার বুড়ি মার কথা মানে পড়ে। মনটা কেমন করে ওঠে। লষ্টালজিক হয়ে তার জন্যে একটা শাড়ি কিনি। সাদা শাড়ী, কালো পাড়। বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে অন্যান্য উপহারগুলির সঙ্গে বুড়ি মার শাড়িটাও এগিয়ে দেই। তিনি কেমন আছেন জানতে চাই। মায়ের কন্ঠে ঝরে পড়ে দীর্ঘশ্বাস, ‘বহুদিন আসে না রে বাবা। বোধহয় মারা গেছে। সে দেখতে হুবহু তোর দাদির মত ছিল।’নির্বাক আমার চোখ ছলছল করে ওঠে।
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
বালুর নিচে সাম্রাজ্য

(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)
ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।
এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার।
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন
জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন
গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন
গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।