
অত্যন্ত ভদ্র নিরীহ মানুষ রমেনদা বরাবরই মাথা নিচু করে কথা বলে । আমি ওনাকে কোনদিন কারো মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে দেখিনি । কিন্তু আজ রমেনদাকে প্রথম আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে দেখলাম । যে দৃষ্টিতে যেন দ্যুতি ঠিকরে বেরহচ্ছিল। ছিল একটি জিজ্ঞাসাও।আর ছিল একটি বিরাট বিশ্বাসের আবেদনও। শান্ত করুণ স্বরে বলল,
-মাস্টারদা আপনাকে বলবো বলেই আমি আজ বড় আশা নিয়ে এসেছি। যে বছর ডায়রিয়ায় আমার বউটা মারা গেল, তার আগ পর্যন্ত আমিও গ্রামের সুবল, সুখেনদের সঙ্গে সারাক্ষণ মদ খেয়ে পড়ে থাকতাম। বউটা আমার বড্ড ভালো ছিল দাদা । সারাদিন জঙ্গলে কাঠ কেটে সপ্তাহে দুদিন হাটে তুলত । এ তল্লাটে সব মহিলারা দলবেঁধে জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেত । আর আমরা পুরুষরা মদ খেয়ে ঘরে বসেশুয়ে কাটাতাম । সংসার নিয়ে সারাক্ষণ বউটা এ জঙ্গল সে জঙ্গল করে বেড়াতো। কিন্তু বৌটা মারা যাবার পর জগৎটা যেন বদলে গেল । বাড়িতে আমার বৃদ্ধামা আর দুটোবাচ্চা আছে । সারাক্ষণ খিদে পেয়েছে বলে পোলাদুটো জ্বালাতন করত। একদিন ছোটটাকে ধরে মারলাম বেদম। কিছুক্ষণ পরে সেটা কান্না ভুলে গেলো । ভুলে গেলো কথা বলতেও । ওর সামনে এবার আমি আমার মুখে চড় -থাপ্পড় মারতে লাগলাম । একটা দুটো করে অনেকগুলো । তবুও বাচ্চাটার মুখে আর কোন কথা বার হলো না । আমার বুড়ো মা কোথায় একটা ছিল। তাড়াতাড়ি ছুটে এসে ছেলেটাকে কোলে নিয়ে আমাকে শাপ-শাপান্ত করতে লাগল। বাপ হয়ে সন্তানের মুখে খাবার দিতে পারি না ,উল্টে মারধর করি বলে অভিশাপ দিতে লাগলো । বড় ছেলেটা সারাক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। অনেক পরে যখন ঘোর কেটে গেল তখন বুঝতে পেরেছিলাম সেদিন কত বড় ভুল করেছি। বিকালে জঙ্গলে গিয়ে কিছু পিঁপড়ের ডিম নিয়ে আসলে তা খেয়ে রাতে ওরা ঘুমিয়ে পড়ে ।
সে রাতে আর ঘুম আসেনি । বউ মরে গিয়ে যত ব্যথা পেয়েছিলাম,তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি দুশ্চিন্তায় পরলাম সংসার টানবো কি করে -একথা ভেবে । অনেক বছর আগে এ বাবুর বাবা যখন ছিলেন তখন একবার কাজে এসেছিলাম । বাবুদের বিরাট বাগান বাড়িতে কাজ করতাম ।পরে বিয়ে-শাদী করার জন্য সেই যে চলে গেলাম,তারপর দীর্ঘদিন কোন যোগাযোগ ছিল না। যাই হোক শহরে কাজে যাচ্ছি বলে মাকে বলে পরের দিন সকালে বার হলাম । এসে দেখলাম বাবু স্কুল বানিয়েছেন । এখন অবশ্য বড়বাবু নেই। তবে ছোট বাবুকে একবার বলতেই উনি চিনে ফেললেন। আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে কিচেনে কাজে লাগিয়ে দিলেন। সেই দিন থেকে আমার বোর্ডিংয়ে থাকা।
বোডিংএ আসার পরে মনে হতো এমন মন্দিরে যদি পোলাদুটিকে নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে বাবু হয়তো ওদের দুই ভাইয়ের নিখরচায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করবেন । দেশে গিয়ে মাকে বলতে, মা ওদের ছাড়তে রাজি হলো না । মাকে রাজি করানোর জন্য ঠিক করলাম নিজে যদি কিছুটা লেখাপড়া শিখি তাহলে মা হয়ত ওদেরকে আমার কাছে ছাড়তে রাজি হবে। কিন্তু আমি তো বুড়ো ছাত্র। কে আর এই বয়সে আমাকে পড়াতে রাজি হবেন । মনের কথা একদিন বাবুকে প্রকাশ করতে ,বাবু এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন । তবে স্কুলে শিক্ষক মশাইরা কাজে ব্যস্ত থাকায় কোনো একজনের উপর বাড়তি দায়িত্ব না দিতে বাবু নিজেই আমাকে পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন । তারপর থেকে সপ্তাহে তিন দিন বিকালে বাবু এক ঘন্টা ধরে আমাকে পড়ান।
-কিন্তু তোমার দেওয়াল লিখনগুলি কোন ভাষায় লেখা তাহলে?
-দাদা, ও গুলির সাদরি ভাষায় লেখা, কিন্তু অলচিকি লিপিতে।
-ও আচ্ছা! সেবার তো বেশ কয়েকজন আদিবাসী ছাত্র অলচিকি অলচিকি বললেও শেষ পর্যন্ত বলেছিল ,স্যার ওগুলি অন্য কোন ভাষাতে লেখা হতে পারে।
-হ্যাঁ মাস্টারদা, আসলে ওগুলি যাতে শুধু একজন পড়তে পারে , সেটা ভেবেই আমি ওই পন্থা নিয়েছিলাম।
-কিন্তু রমেনদা বৌদি তো মারা গেছে, তাহলে তোমার প্রেম বিষয়ক দেওয়াল লিখন গুলো কার জন্য?
-হ্যাঁ বলছি , আমি এখানে আসার সম্ভবত বছরখান পরে মিলিদিদিমণি এখানে আসেন । মিলিদিদিমণি আমাদের স্বজাত হওয়ায় প্রথম দিন থেকে উনাকে একটু আলাদা ভালো লাগতো । কিন্তু কিভাবে বা কেনইবা এমন বয়সে উনি এখানে এলেন সেটা জানার প্রবল আগ্রহ চেপে বসে। আকার-ইঙ্গিতে প্রথম দিকে বেশ কয়েকবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও দেখতাম উনি প্রচণ্ড গুটিয়ে থাকেন। মমতামাসি ছাড়া আর কারও সঙ্গে তেমন কথা বলতে দেখতাম না ।পরে অবশ্য সবার সঙ্গে ওনার আলাপচারিতা চোখে পড়েছে । তবে আপনি আসার পরে মিলি দিদিমণিকে আবার ঘোমটা পড়ে থাকতে দেখেছি। আপনার অসাক্ষাতে অবশ্য আগের মতই থাকেন । তবুও পাশ থেকে মনে হয়েছে আপনি আসার পর যেন উনি আরো একটু গুটিয়ে গেছেন । চলাফেরা করেন যন্ত্রের মত। জানিনা আপনার মধ্যে উনি কি দেখেছেন । তবে উনার সার্বিক পরিবর্তনটি কিন্তু আমার চোখে পড়েছে। যাইহোক দাদা, সরাসরি কোনো উত্তর না পেয়ে আমি দেওয়াল লিখনের রাস্তা অনুসরণ করি। রাতে সব গেট বন্ধ করা ও তালা দেওয়ার কাজটি আমিই করি । আর এই সময়টি ছিল দেওয়াল লিখনের আমার আদর্শ সময় । একদিন দিদিমনি দেখেও ফেলেছিলেন। কিন্তু কি লিখছি?কেন লিখছি? এসব নিয়ে উনি কোন প্রশ্ন করেননি । ওনার এই নির্লীপ্ত আচরণে বরং না দমে উনি দেখছেন বা পরে দেখবেন ভেবে আমি আরো আগ্রহে লেখা চালিয়ে যেতাম । আজও মানুষটার সেই একই নির্লিপ্তততা । এজন্যই মাস্টারদা আজ আমি আপনার কাছে সাহায্য প্রার্থী ।
-রমেনদা ,আমাকে একটু সময় দাও । দেখি আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারি কিনা ।
রমেনদার অভিযোগের সুরে সাহায্য প্রার্থনার পরে আমার মনোজগৎএ একটা বিরাট পরিবর্তন চলে আসে। নিজের মনোকষ্ট কোন অবস্থাতেই ধরা দেব না বলে ঠিক করলেও ডাইনিং রুমে বসে ওদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কেমন যেন আড়ষ্ঠতা চলে আসতো । ভোকাল যন্ত্র বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল । নিতান্ত দু একটি কথা ও বোকার মতো একটু হাসি বিনিময় করে আমি স্থান ত্যাগ করতাম । তখন আমার হাতে বরং বেশ সময় । পূর্বের ন্যায় আবার প্রতিযোগিতামূলক পড়াশুনো শুরু করার চেষ্টা করলাম । কিন্তু শুরু করা বললেই তো আর শুরু করা যায় না
। সারাদিন স্কুল, সন্ধ্যাবেলা কোচিং প্রভৃতি সামলিয়ে যেটুকু সময় হাতে পাই তাতে বই সামনে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সময় চলে যেত ।
এ রকমই এক সন্ধ্যে বেলা সবে টিফিন করতে বসেছি এমন সময় হঠাৎ করে সবাইকে খাবার দাবার ফেলে ছাত্রী হোস্টেলের দিকে ছুটে যেতে দেখলাম । এমনিতেই ছাত্রী হোস্টেলের দিকে ছেলেদের যাওয়া কঠোরভাবে নিষেধ । কিন্তু এই সময়ে সকলে যেন সে কথা ভুলে গেল । ছাত্র- ছাত্রী থেকে শুরু করে দু একজন টিচার ও ডাইনিং রুমের স্টাফ সকলেই যে যার মত ছুটছে ওদিকে । আমিও খাবার ফেলে এক-পা দু-পা করে এগোতে লাগলাম । ক্রমশ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম জটলা স্থানে । কয়েকজন দিদিমণির সঙ্গে দেখলাম মান্নাবাবু ছাত্রদেরকে জায়গাটি বড় করার কথা বলছেন । এর মধ্যে হঠাৎ করে দেখলাম মান্নাবাবু কয়েকজনের দিকে তেড়ে যেতেই ছাত্ররা পড়িমড়ি দিল ছুট। অমনি জায়গাটি বেশ বড় হয়ে গেল । আমারও চোখ পড়তেই দেখলাম সবাই পাঁজাকোলা করে শেফালীম্যাডামকে বারান্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন । আমি চমকে উঠলাম এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম । বারান্দার একটি বেঞ্চে উনাকে শুয়ে দিয়ে উপস্থিত কয়েকজন দিদিমণি ওনার মাথায় জল দেওয়া শুরু করলেন । চোখে মুখে জলের ঝাপটাও দিচ্ছেন দিদিমণিরা । কিছুক্ষনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সাহেব ছুটে এলেন । উনি রমেনদাকে বাজারে ডাক্তার ডাকতে পাঠালেন । আমি পাশে দাঁড়িয়ে অসহায় ভাবে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলাম । ডাক্তার তখনও আসেনি ,ক্রমাগত জলের ঝাপটায় এক সময় ম্যাডাম চোখ খুলতেই,মুখে বিড়বিড় করে কি সব বললেন । সেটা অবশ্য আমার কান পর্যন্ত এসে পৌঁছালো না । যাই হোক শেফালী ম্যাডামের চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল।এবার ম্যাডামকে একটু লজ্জিত হতে দেখলাম । নিজেই বললেন,
-একটু আগে বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল । বাবা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ,এটা শুনে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি ।
প্রেসিডেন্ট সাহেব শুনে চমকে উঠলেন !
- বলেন কি! আপনার বাবা অসুস্থ ! কি হয়েছে ওনার?
-বাবার একবার হার্টঅ্যাটাক হয়ে গেছে । তখন একটি মেজর সার্জারিও হয়ে গেছে । তার উপরে আজ আবার একই ঘটনা ।
-আপনি কি এই অবস্থায় বাড়ি যেতে চান?
-যেতে পারলে তো খুব ভালো হতো । কিন্তু এই অসময়ে একাকি এখান থেকে যাবোই বা কেমন করে?
-আমি যদি ব্যবস্থা করে দিই ...
-ঠিক আছে, স্যার । তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন ,প্লিজ। মা একাকি আছে, কি যে করছে বুঝতে পারছি না।
প্রেসিডেন্ট সাহেব ওখানে দাঁড়িয়েই একজন ড্রাইভারকে ফোন করে গাড়ি আনালেন । পরে উনি আবার বললেন,
-তবে ম্যাডাম আপনাকে তো আমি একাকি ছাড়তে পারব না। দিদিমণিরা আপনারা কেউ উনার সঙ্গে একটু যাবেন?
সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশটি অদ্ভুত রকমের শান্ত হয়ে গেল । কয়েকজন দিদিমণি সরাসরি প্রেসিডেন্ট সাহেবকে উনাদের সমস্যার কথা জানালেন । একজন আবার নিজের অক্ষমতা জানিয়ে পরামর্শ দিলেন,
-স্যার, রাত ক্রমশ বাড়ছে । এখন শেফালীম্যাডামের সঙ্গে আমাদের কাউকে না পাঠিয়ে বরং আপনি মাস্টারমশাইদের মধ্য থেকে কাউকে যদি পাঠাতে পারেন সেটি বোধহয় বেশি ভালো হয় । কারণ দুটি মেয়ের নিরাপত্তাজনিত বিষয় এর সঙ্গে জড়িত।
-ধন্যবাদ মিস কাকলী।আপনি ভালো একটি পরামর্শ দিয়েছেন।
এমন সময় প্রেসিডেন্ট সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে উপস্থিত শিক্ষকদের দিকে তাকালেন ।
চলবে.....
বিশেষ দ্রষ্টব্য:-ব্লগে আখেনাটেন ভাইয়ের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে আজকের পোস্টটি আমাদের সবার প্রিয় আখেনাটেন ভাইকে উৎসর্গ করলাম ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০১৯ রাত ৮:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


