
কিছু কিছু শব্দের ভার, গভীরতা না বুঝেই সস্তা রসিকতাবোধে আমরা শব্দ গুলোর মূল্য কমিয়েফেলি। যেমন কবি, মাস্টারপিস। কেউ আম পাতা জোড়া জোড়া টাইপ কিছু লিখলেই আমরা উপহাস করে বলি, কি বন্ধু কবি হয়ে গেলা। অতি আবেগে খুব সাধারণ মানের মুভিকেও মাস্টারপিস বলে ফেলি। এতে যে সমস্যা হয়, যখন কেউ সত্যি সত্যি কবি হয়ে যায় এবং অসাধারণ মানের কোন মুভি/সিরিজ কে মাস্টারপিস বলে, তখন সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। ব্রেকিং ব্যাড সেরকমি একটা সিরিজ। সে কথায় বলব, তবে তার আগে। অফকোর্স, আমি যখন লিখছি তার আগে তো থাকবেই।
মুভি একটি আশ্চর্য জটিল মাধ্যম। যেখানে অনেকগুলো মাধ্যম একসঙ্গে কাজ করে। এটা নিয়ে সহজ পাঠের গপ্পো মুভির রিভিউতে বলেছি, চাইলে পড়ে নিতে পারেন। একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ মুভি বা সিরিজ মোড়ানো থাকবে আর্টের মোড়কে। ৱ্যাপিং খুলে ভেতরের দগদগে সত্য খুঁজে নিতে হবে আপনাকেই। আর্ট এটা না যে আপনি কি বলছেন, আর্ট এটা যে কীভাবে বলছেন।
ধরেন, আপনি শোষিত শ্রেণী। শোষকরা আপনাকে দিয়ে শুধু কাজ করিয়ে নেয়, ঠিকমত খেতে দেয় না। আপনি তখন বলছেন আমাকে খেতে দাও, নইলে আমি কাজ করতে পারবো না। এতে আর্ট নেই, এটা আপনার ডিমান্ড। আপনি শুধু আপনার কথাটাই বলছেন। কিন্তু একটু ঘুরিয়ে আপনি যদি বলেন "আজ ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব।" এতে ক্রিয়েটিভি প্রকাশ পায়। এতে ক্ষুধার জ্বালা, কষ্ট এবং শোষকের উপর আপনার যে রাগ, সবটা প্রকাশ পায়। মানচিত্র কিন্তু খাওয়া যায় না আর খাওয়া গেলেও তাতে পেট ভরবে কিনা, কে জানে।
আচ্ছা, কোন লেখা বা মুভি বোঝানোর দায়িত্ব কি সম্পূর্ণ লেখকের, পরিচালকের? আমাদের দর্শকের, পাঠকের কোন দায় নেই। কিন্তু আমরা ধরেই নেই, যেহেতু লেখক, পরিচালক বোঝাতে পারেনি, সেহেতু ওরা কিছু জানেনা, ধুর আঁতেল একেকটা। এবং বিন্দু মাত্র জানার চেষ্টা না করেই আমরা স্মার্টলি বলি "না বোঝা এই আমি।" বিশ্বাস করেন, এতে আপনার স্মার্টনেস না আতলামি প্রকাশ পায়। না বুঝেই বাজে, বস্তাপঁচা বলে নিজেদের বিজ্ঞ জাহির করি, এতে আমাদের গারলতা, মুর্খামীই প্রকাশ পায়। পৃথিবী যত এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা যত অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছি, তত আমাদের লজ্জা-অপমান বোধ কমে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিল- যখন কেউ বলত, আমি রবীন্দনাথ পড়িনি, তার সাথে এমন ব্যবহার করা হত, যেন সে অচ্ছুৎ। এখন কেউ যদি বলে, চোখের বালি পড়েছিস? তখন তার দিকে এমন ভাবে তাকানো হয় যে, খ্যাত একটা, এখনো উপন্যাস পড়ে।
আর্ট যত ভারী হয় তত দুর্বোধ্য হয়। সাথে এটাও মনে রাখতে হবে, শুধু দুর্বোধ্য মানেই সেটা মহান কোন আর্ট বা সৃষ্টি নয়। এ বিষয়ে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। পরবর্তী পোষ্টে সুযোগ পেলে ব্যাখ্যা করব। এখন আপাতত সেদিকে যাচ্ছি না, গল্পে যাওয়া যাক।
SPOILER ALERT
একজন কেমিস্ট্রি টিচার, সাধারণ ছা-পোষা জীবন। হটাৎ একদিন জানতে পারে তার ক্যান্সার আর অল্প কয়েকদিন হাতে আছে। তখন তার মাথায় ঘোড়ে তার একটা প্রতিবন্ধি ছেলে আছে, স্ত্রী গর্ভবতী আর ব্যংক একাউন্টে বিরাট শূন্য। তাহলে সে মারা গেলে তারা সার্ভাইব করবে কীভাবে। সুতরাং তার টাকার দরকার, এতটাকা যে সে মারা গেলেও পরিবারের যেন কোন অসুবিধা না হয়। সে ভাবতে থাকে, এত টাকা পাবে কোথায়। তখন সে অর্থাৎ গল্পের ম্যান কেরেক্টার ওয়াল্টার হোয়াইট তার DEA Agent ভাইরা ভাই হ্যাঙ্ক এর কাছ থেকে জানতে পারে, ড্র্যাগ ডিলারদের প্রচুর টাকা এবং তারা খুব অল্প সময়ে আর্ন করে। ওয়াল্টার হোয়াইট ড্র্যাগ ব্যবসায় জড়িয়ে পরে তারই স্কুল থেকে বের করে দেওয়া পুরাতন এক ছাত্র জেসির সাথে পার্টনার হিসাবে। যেখানে সে একটা নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ (এমাউন্ট মনে নেই এখন) অর্জন করার পর সে ড্রাগ ব্যবসা ছেড়ে দিবে কারণ ওই পরিমান অর্থ পেলেই তার পরিবারের দিব্যি চলে যাবে। কিন্তু অপরাধের দুনিয়া তো ওয়ান ওয়ে, যেখানে ঢোকা যায় কিন্তু বের হওয়া যায় না। তাছাড়া এটা তার লুকায়িত প্যাশন, সেটা অবশ্য তখোনো সে বুঝতে পারে না আর যখন বুঝতে পারে, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। লাস্ট সিজনে সে কিন্তু তার স্ত্রীকে বলে, এটা আমি পরিবারের জন্য শুরু করলেও পরবর্তীতে আমার ভালো লাগতে থাকে। এখানে আমি নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই।
কিছুদিন আগে ব্রেকিং ব্যাড নিয়ে এক রিভিউ পড়লাম, সেখানে রিভিউদাতা বলেছে, হোয়াইট যখন গাস এর সাথে যায় তখন জেসিকে সাথে না রাখলেও পারত। গাস তো জেসিকে চায় না আর হোয়াট যত বিপদে পড়ে, সবতো জেসির কারণে। তার কথা ঠিক, কিন্তু সে শুরুর দিকে অনেক কিছু মিস করে গেছে। যেখানে জেসির সাথে হোয়াট এর রিলেশন বিল্ডআপ করে। গাস পর্যন্ত আসতে আসতে জেসির সাথে হোয়াট এর গাঢ় সম্পর্ক দাঁড়ায়, বাবা-ছেলের, বন্ধুর মত। তাছাড়া হোয়াইট শুধু জেসিকেই বিশ্বাস করে। সে জানে জেসি যত Asshole হোক, সে নিজের মত করে জেসিকে ব্যবহার করতে পারবে, যেটা সে করে, আর এই কারনে জেসি বারবার ছাড়তে চাইলেও হোয়াইট তাকে ফিরিয়ে আনে।
যেগুলো আপনারা সিরিজ দেখলেই বুঝতে পারবেন, আর যদি ওই ভাইয়ের মত বুঝতে না পারেন, তাহলে কিছু করার নাই। এমন ভাবে সব গুলো সিন বোঝাতে গেলে সাত খন্ড রামায়ণ ৭০০ খন্ড হয়ে যাবে। আমি যে কারণে সিরিজটা নিয়ে লিখছি তাহল, ব্রেকিং ব্যাড কে অনেকেই মাস্টারপিস মানতে নারাজ। তারা বলে, ব্রেকিং ব্যাড অনেক স্লো, এর থেকে প্রিজন ব্রেক, মানি হেস্ট, গট অনেক বেটার। তাদের কথা ঠিক। সত্যি তো তাই, প্রিজন ব্রেক, মানি হেস্ট বা গট এ যে ধুন্দুমার মাথা ঘোরানো গল্প, প্রতি মুহূর্তে তীব্র উত্তেজনা "এর পরে কী হবে?" সেসব ব্রেকিং ব্যাড এ কই? তাহলে কি ব্রেকিং ব্যাড মাস্টারপিস না? সে প্রশ্নের উত্তর দেব, তার আগে বলুন তো- একটা মুভি ভালো, খারাপ, বস্তাপচা না মাস্টারপিস, কীসের ভিত্তিতে বিচার করেন আপনারা? শুধুই কি জটিল ধাঁধানো গল্প?
তাহলে তো পথের প্যাঁচালী, The Shawshank Redemption কোন মুভিই না। কই সেই বুক কাঁপানো থ্রীল, সাসপেন্স? The Shawshank Redemption যদিও একটু ছিল কিন্তু পথের প্যাঁচালীতে। সেই এক ঘিয়েমি ঘ্যানঘ্যানানো, প্যানপ্যানানো দু:খ কথা। পথের প্যাঁচালীতে সর্বজয়া অর্থাৎ অপুর মা যখন দীর্ধদিন পর অপুর বাবার চিঠি পায়, তখন তাঁর যে খুশিতে, আনন্দে হৃদয়ের চঞ্চলতা, মন্তাজের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় তা প্রকাশ করেন পানির উপরে পোকার ছুটাছুটিতে। মন্তাজ হল, একটি সিনের পরে বা মাঝে অন্য একটি অর্থপূর্ণ বা অনর্থক সিন কিংবা শব্দ দিয়ে নতুন একটি অনুভূতির প্রকাশ। আগেই বলেছি, আর্ট এটা না যে আপনি কি বলছেন, আর্ট এটা যে আপনি কীভাবে বলছেন। পানির উপর পোকার ছুটাছুটির মত ফালতু একটা সিন দিয়ে এতটা অর্থবোধক অনুভূতি প্রকাশ করা যায়, ভাবা যায়! কেবল মাত্র প্রেজেন্টেশনের কারণে একটা অতি সাধারণ গল্পও অসাধারণ হয়ে যায় আবার অনেক ভারী গল্পও বাজে হয়ে পরে থাকে।
যেখানে আর্ট থাকে সেটা একটু স্লো'ই হয়। ডাক্তার যখন হোয়াইট কে বলে তার ক্যান্সার, তখন হোয়াইট ডাক্তারের জামায় লেগে থাকা ময়লার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ডাক্তারের কথা কিছুই তার কানে ঢোকে না। কতটা ফালতু, বাজে একটা সিন। কোথায় হোয়াট হাউমাউ করে কান্নাকাটি করবে, তা না জামার বোতামে ময়লা লেগে আছে এমন ফালতু একটা জিনিস নিয়ে পরে আছে। ক্যান্সার শোনার পর হোয়াইট এতটা শকড হয় যে, তার মাথা ওই বিষয়টাকে আর নিতেই চায় না। তাই জামার বোতামের মত ফালতু একটা জিনিস নিয়ে পরে থাকে। পরবর্তীতে হোয়াইট কে এভাবেই প্রেজেন্ট করা হয়, যে সহজেই সে বিচলিত হয় না, মাইন্ডটাকে অন্যদিকে ড্রাইভার্ট করে। এখন যেটা বলব সেটা শুনে আপনারা ব্যঙ্গাত্মক হা হা হিউমার, রাগের তীর্যক শব্দ নিয়ে তেড়ে আসবেন তারপরও বলছি। মানি হেস্ট, প্রিজন ব্রেক, গট এর চেয়ে ব্রেকিং ব্যাড এর প্রিকুয়াল বেটার কল সল আমার ভালো লেগেছে কেবল মাত্র এটার প্রেজেন্টেশনের কারণে। এক দম্পতি সল এর কাছে আসে তাদের হয়ে কেস লড়ার জন্য। সলের তখন খারাপ সময়, হাতে কোন কেস নেই। যখন তারা সলকে তাদের উকিল হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য কাগজে সাইন করতে যাবে তখন সলের যে এক্সপ্রেশন, আনন্দে, খুশিতে চোখ চকচক করে, সাথে সাথে ঢোকও গিলে (অবশেষে সে একটা ভালো কেস পাচ্ছে কেবল এটা বোঝানোর জন্য।) এতটা নিখুঁত করে ক্যারেক্টার রাইজেশন কোন সিরিজে আছে? মানি হেস্ট, প্রিজন ব্রেক, গটে পরিচালক একটা গল্প বলতে চেয়েছে এবং বলেছে, আপনার ওই কথা বলার মত আমার ক্ষুধা লেগেছে আমাকে খেতে দাও। কিন্তু সেখানে আর্ট নেই। আর ব্রেকিং ব্যাড ওই লাইনের মত "আজ ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব।"
বাকিটা আপনাদের মেধার উপর। পোষ্ট টা এমনিতেই অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেকেই বলবেন তুলনা করার দরকার কি? প্রতিটা ধর্ম গ্রন্থ আলাদা, তুলনা ধর্ম গ্রন্থ নিয়েও হয় এবং নিজেদের অজান্তেই আপনারও তুলনা করেন। সেটা নিয়ে বিস্তর কথা অন্য কোন রিভিউতে বলব। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, ভালো ভালো মুভি দেখুন। মুভি কে খেয়ে ছেড়ে দিয়ে বাজে, বস্তাপচা বলার আগে বোঝার চেষ্টা করুন। নয়তো আপনার মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ পাবে না।
যে ভ্রমর ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়, নষ্ট ফুলেও, সে আসলে প্রেমিক না মধুখোর।
https://www.facebook.com/groups/bdfilmbug
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৮:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



