প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা
দুদক চেয়ারম্যান সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা সফরকালে আয়োজিত একাধিক মতবিনিময় সভায় দুর্নীতি বন্ধ করিতে হইলে তৃণমূল পর্যায় হইতে শুরু করিয়া সর্বস্তরে স্ব স্ব অবস্থান হইতে ভূমিকা রাখিবার জন্য আহ্বান জানাইয়াছেন। এক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অবস্থানটি হওয়া উচিত এই রকম যে, নিজেও দুর্নীতি করিব না, অন্যকেও করিতে দিব না।
সমাজের যে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রমের ব্যাপারে প্রথমে সচেতনতার পরিচয় দিতে হইবে নিজেদেরকেই। নতুবা যত আইন প্রণয়ন করা হউক, যত দমন-পীড়ন করা হউক, কাজের কাজ তেমন কিছুই হইবে না। বস্তুত: এই সচেতনতা সৃষ্টির কাজেই অবতীর্ণ হইয়াছেন আমাদের বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের সদ্য নিযুক্ত প্রধান লেঃ জেনারেল (অব
বাস্তবিকপক্ষেই দেশ জুড়িয়া এবং সকল পর্যায়ে একটি মজবুত নৈতিক ভিত রচনা করিতে না পারিলে অনিয়ম-অনাচারের বিষচক্র হইতে বাহির হইয়া আসা কঠিন। এ কাহারও অবিদিত নয় যে, আমাদের এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় বিস্তার করিয়াছে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ। এমন একটি জায়গা এই দেশে খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন, যেখানে অনিয়ম তাহার বিষাক্ত হুল ফুটায় নাই। তাহার বিস্তারিত বিবরণ দিবার প্রয়োজন পড়ে না। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়া পৌঁছাইয়াছিল যে, সোজা-সরল পথে অর্থাৎ ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া যে কোনো কাজ হইতে পারে, সেই বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে হইয়া গিয়াছিলো সাধারণ মানুষের। এমতাবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ও দমন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে পুনর্গঠিত হইয়াছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এবং এই কমিশন দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিয়া চলিয়াছে আইনানুগ ব্যবস্থা। বোধগম্য কারণেই সাধারণ সচেতন মানুষ সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহ পর্যবেক্ষণ করিয়া চলিয়াছেন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে।
দুর্নীতির বিপক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ অবস্থান দেশে-সমাজে নতুন আশা সঞ্চার করিয়াছে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। তবে, একথাও ঠিক যে, শুধু আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা কঠিন। বরঞ্চ, এজন্য অনেক বেশী প্রয়োজন হইল সামাজিক সচেতনতা। আর ইহাও সত্য যে, কেবল আইনের ভয় দেখাইয়া, উপর হইতে উপদেশ বর্ষণ করিয়া কিংবা গালভরা কোনো শ্লোগান দিয়া এ সচেতনতা সৃষ্টি সম্ভবপর নয়। এজন্য বরঞ্চ দরকার সুশিক্ষা এবং উপর হইতে নিচ পর্যন্ত সততা, বিশ্বস্ততা, কর্তব্যপরায়ণতার অব্যাহত অনুশীলন। এমন শিক্ষা দরকার, যাহাতে মানুষের ভিতরের মানুষ অর্থাৎ বিবেক জাগ্রত হয়, জাগ্রত থাকিতে শেখে। অতীতে আমাদের দেশে বাচ্চাদের হাতের লেখা শিখাইবার জন্য সর্বাগ্রে লিখিতে দেওয়া হইত সদা সত্য বলিব। কখনো মিথ্যা বলিব না। বাল্য শিক্ষার বইতে পড়িতে হইত, সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভাল হইয়া চলি। যে ছেলে-মেয়েরা শৈশবে এরূপ শিক্ষা পায়, তাহার পক্ষে অনিয়মের আশ্রয় গ্রহণ করা কঠিন। অবশ্য, পরবর্তীতে উপরের শ্রেণীতে কি পড়িয়াছে, কি শিখিয়াছে- তাহাও বিবেচ্য।
দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, সকলের অলক্ষ্যে জানি না কোন অবকাশে আমাদের দেশে শিক্ষা এবং নৈতিকতা- এই দুইটি বিষয়কে স্বতন্ত্র করিয়া ফেলা হইয়াছে। শিক্ষিত বা ডিগ্রিধারী হইলে নৈতিকভাবেও উন্নত হইতে হইবে-এ যেন এক হাস্যকর ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে এইকালে। সকলে হয়তো নয়, তবুওতো সত্য যে, শিক্ষক শ্রেণীর অনেকেই, শিক্ষার্থীদেরও কেহ কেহ দুর্নীতির চর্চায় দ্বিধাহীন। তাহাদের অর্জিত জ্ঞান, তাহাদের সার্টিফিকেট, তাহাদের পদমর্যাদা, সামাজিক সম্মান কোনো কিছুই তাহাদের পদস্খলনে বাধা দেয় না। তাহা হইলে সমস্যাটা কোথায়, খুঁজিয়া বাহির করা দরকার। শিক্ষার জগৎটি অবশ্যই স্বচ্ছ সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন করিতে হইবে। জ্ঞান বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক বুদ্ধিরও যাহাতে বিকাশ ঘটে সেইরকম একটা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা দরকার।
অন্যদিকে, সামাজিক আন্দোলনের জন্য পারিবারিক পরিমণ্ডলে সত্য এবং ন্যায়ের চর্চা একান্ত প্রয়োজন। মা কিংবা পিতা যদি সন্তানের অন্যায়-অনাচার প্রশ্রয় না দেন, যদি তাহারা সন্তানকে প্রশ্ন করেন যে, তুমি কোথায় পেলে এই অর্থবিত্ত, তাহা হইলেই সত্য বাহির হইয়া আসিবে। আর তখনইতো পারিবারিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে। এমনইভাবে স্ত্রী পুত্র কন্যা সকলেই পারেন জিজ্ঞাসা করিতে এবং সত্য-ন্যায় তথা নৈতিকতার মজবুত ভিত এইভাবেই রচিত হইতে পারে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে।
একইভাবে আত্মীয় পরিজন পাড়া প্রতিবেশী সকলে যখন দুর্নীতির বিপক্ষে অবস্থান করিবেন, দুর্নীতিবাজদের তোষণ-পোষণের পরিবর্তে যেদিন সকলে ধিক্কার দিতে পারিবেন, সেই দিনই আমরা কেবল বলিতে পারিব যে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়িয়া উঠিয়াছে।
এ রকম প্রমিত-কাঙিক্ষত সমাজ নির্মাণ করিবার জন্য আমাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আনিতে হইবে। দেশের বিদ্যমান আইন ও আইন প্রয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের অন্য সকল প্রতিষ্ঠান যদি ঠিকমত কাজ করে, তবেই মানুষ বুঝিতে পারিবে যে, নৈতিক শক্তি নিয়া বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইবার সময় আসিয়াছে। এমনিতেই তখন বেশীরভাগ মানুষ অন্যায় হইতে বিরত থাকিবে। ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই যে, নিজেকে নিজে দুর্নীতি, অনিয়ম-অনাচারের প্রলোভন হইতে মুক্ত রাখিবার যে প্রচেষ্টা, তাহাই হইবে সবচাইতে বড় এবং কার্যকর প্রতিষেধক তথা সামাজিক আন্দোলন।০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


