সমুদ্রসীমা : নূতন অর্থনৈতিক অঞ্চল
“বঙ্গোপসাগরে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন বাড়ছে” শিরোনামে সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় পাঁচ কলামব্যাপী হেডিং-এ যে রিপোর্টটি প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা যেমন বিস্তারিত তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। ওই হেডিং-এর নিচে বোল্ড টাইপে ইহাও বলা হইয়াছে যে, ২০১২ সালের মধ্যে নূতন অর্থনৈতিক অঞ্চল।। জাতিসংঘের সহিত আলোচনা চালাইয়া যাইতেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং (বাংলাদেশের) সমুদ্রসীমা ৩০০ নটিক্যাল মাইল হইতে পারে। রিপোর্টে যাহা বিস্তারিতভাবে বলা হইয়াছে, উহার সংক্ষেপিত রূপ এই রকম : বাংলাদেশে একান্ত ইকনোমিক জোন বা ইইজেড বিষয়ের বেশ কয়েক মাস যাবৎ জাতিসংঘের সহিত আলোচনা চলিতেছে। আলোচনার উদ্দেশ্য, বিভিন্ন তথ্য- উপাত্ত।। ডাটা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার দাবি প্রতিষ্ঠা। জানা গিয়াছে, জাতিসংঘ আগামী ২০১২ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে এই সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করিবে। ইহাও জানা গিয়াছে যে, স্টেট বেসলাইন ফর্মুলায় এই সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একযোগে কাজ করিবার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হইতে নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছে। আশা করা যাইতেছে যে, এই ফর্মুলার সহিত খাপ খাইতে পারে সে বিষয়ে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতঃ উহা জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট যথাসময়ে দাখিল করিতে সক্ষম হইবে। আর তাহা যদি সম্ভব হয়, তাহা হইলে সমুদ্রে বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা হইবে সাড়ে তিনশত নটিক্যাল মাইল। উল্লেখ্য যে, বিগত তেত্রিশ বৎসরেও ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমা মানিয়া নেয় নাই। আর এই জলসীমা নির্ধারিত না হওয়ায় ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে প্রবেশ করত: তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান কার্য চালাইয়া যাইতেছে। শুধু তাহাই নয়, হর-হামেশা বিভিন্ন ধরনের জাহাজ আমাদের সমুদ্রসীমা লংঘন করিয়া চলিয়াছে। জানা গিয়াছে, একান্ত অর্থনৈতিক উক্ত সাড়ে তিনশত নটিক্যাল মাইল যদি সমুদ্রসীমা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পায়, তাহা হইলে অন্তর্বর্তী সামুদ্রিক অঞ্চলে সবরকম অনুসন্ধান, উত্তোলন, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কাঠামো স্থাপন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অর্থনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা, পানি স্রোত ও ঢেউ হইতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের পুরা অধিকার থাকিবে বাংলাদেশের।
সাগরে কোন দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন বৃদ্ধির অর্থ দেশের শুধু আয়তন বৃদ্ধি নয়, সে দেশের অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক প্রবৃদ্ধিও উহার সহিত সংযুক্ত। আমরা জানি, বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকতের পরিমাণ ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এদিকে প্রাকৃতিক কারণেই গত চার দশকে বাংলাদেশের আয়তন বৃদ্ধি পাইয়াছে প্রায় তিন হাজার বর্গমাইল। বাংলাদেশের দক্ষিণ ভূভাগ হইতে তিন/চারশত কিলোমিটার পর্যন্ত কন্টিজেন্টার শেপ বা মহীসোপান। গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার নিষ্ক্রমণ ব্যবস্থায় এবং আরও বহুসংখ্যক নদ-নদী প্রতিবৎসর ২ শত ৪০ কোটি টন পলি এই অগভীর মহীসোপান অঞ্চলে বহিয়া আনে। উন্নত দেশসমূহের উৎক্ষিপ্ত স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের শাণিত দৃষ্টি বহু আগে হইতেই এই অঞ্চলের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। উপগ্রহের প্রাপ্ত তথ্যই জানাইয়া দেয় যে, বাংলাদেশের দক্ষিণভাগে উপকূল ঘেঁষিয়া সমুদ্রবক্ষে জাগিয়া উঠিতেছে এক বিশাল ভূমিখণ্ড।। যাহা আয়তনে প্রায় বাংলাদেশের সমান।। ওই ভূমিখন্ডের আয়তন ৪০ হইতে ৪৬ হাজার বর্গমাইল। ১৯৫৭ সালে সেই পাকিস্তান আমলে নির্মিত হইয়াছিল মেঘনা এক নম্বর ক্রস ড্যাম। দুই নম্বর মেঘনা ক্রস ড্যাম নির্মিত হয় ১৯৬৪ সালে। ইহার ফলে অত্যল্পকালের মধ্যে এই এলাকার সমুদ্র হইতে প্রায় তিনশত বর্গমাইল ভূমি উদ্ধার সম্ভব হয়। এবং ভূমি উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রহিয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে।
সুতরাং ইহা সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশের আয়তন ক্রমবর্ধমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে যেসব মহল প্রয়োজনীয় ডাটা পরিসংখ্যান আহরণে নিয়জিত, আমরা আশা করিব, এই ভূমি উদ্ধারের বিষয়টি সম্পর্কে তাহারা সম্যক অবহিত। মনে রাখা দরকার, বার্ষিক প্রায় আড়াইশত কোটি টন পলি শুধু মহীসোপানে নিত্য-নূতন চর/দ্বীপ সৃষ্টি করিতেছে না, উহা মহীসোপানের আয়তন বিস্তারের অশেষ ভূমিকা রাখিতেছে। সুতরাং ক্রমবর্ধমান মহীসোপান হইতে সমুদ্রের জলসীমা নির্ধারণের বিষয়টাকে যে কোন তথ্য-উপাত্তে সন্নিবেশিত রাখিতে হইবে। আমরা জানি, সমুদ্রে সরলরৈখিক ভূমি রেখার বিষয়টি ইতিমধ্যে জাতিসংঘে স্বীকৃতিলাভ করিয়াছে। কিন্তু ভারত ও মিয়ানমার এখনও তাহা মানিয়া নেয় নাই। ইতিমধ্যে পলি মাটি পড়িয়া বাংলাদেশের সমুদ্রগর্ভে জন্ম নিয়াছে যেসব দ্বীপ।।সেগুলির উপরে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকারের কথা কোনক্রমেই ভুলিয়া যাওয়া উচিত হইবে না। মূল কথা হইতেছে, ২০১২ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে যাহাতে আমাদের সমুদ্রসীমা ৩০০ নটিক্যাল মাইল হইতে পারে, এবং ওই জলসীমার মধ্যে বাংলাদেশ যাহাতে ইতিপূর্বে উল্লেখিত যাবতীয় কার্যক্রম অবাধে পরিচালনা করিতে পারে, জাতিসংঘের মাধ্যমে উহার নিশ্চয়তা বিধান করিতে হইবে। সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট ইহাই এই মুহূর্তে দেশবাসীর দাবি।০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


