
পথের পাঁচালী মুভির একটি দৃশ্য। দুর্গা তার বাবার কোলে বসে আছে। দুর্গার মা রান্না করছেন।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের রুচিবোধ বদলায়। এই আমার নিজের কথাই বলি, একসময় শুধু মারামারির মুভি দেখতে ভালো লাগতো। এখন মারামারির ছবি দেখতে একটুও ভালো লাগে না। বিয়ের আগে খুব রোমান্টিক মুভি দেখতাম। এখন রোমান্টিক মুভিও ভালো লাগে না। এখন সময় পেলেই সাসপেন্স, রহস্য, গোয়েন্দা ও মনস্তাতিক মুভি দেখি। ভূতের ছবি দেখি না। ভালো লাগে না। গতকাল রাতে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' বহু বছর পর আবার দেখলাম। মুগ্ধ হলাম। কষ্ট পেলাম। স্কুলে পড়ার সময় যখন পথের পাঁচালী বইটি পড়েছিলাম দারুন কষ্ট হয়েছিল মনে। মুভি দেখেও একই অবস্থা। কিছু কিছু দৃশ মাথায় ভেতর ঢুকে বসে আছে। হুটহাট করে সেই দৃশ গুলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। তখন খুব কষ্ট হয়। খুব।
উপন্যাসটিতে গ্রামের নাম থাকে নিশ্চিন্দিপুর। অপু আর দুর্গা এই দুই ভাই বোন যেন আমার আপন আত্মীয় স্বজন। তাদের আনন্দে আনন্দ পাই, দুঃখ কষ্টে হই ব্যথিত। আমি জানি, সব বাঙ্গালী'ই পথের পাঁচালী বইটি পড়েছেন, যারা বইটি পড়েননি তারা মুভিটি দেখেছেন। অপু আর দুর্গার বাবা হরিহর একজন পুরোহিত। রোজগার অতি সামান্য। তিনি শিক্ষিত সজ্জন ব্যাক্তি। তিনি বউ আর ছেলে মেয়ে নিয়ে সহজ সরল সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। হরিহরের মেয়ে দুর্গা আশে পাশের কারো বাড়িতে গেলেই খুব সামান্য কিছু এটা ওটা চুরী করে আনে। হয়তো একটা পেয়ারা অথবা একটা পুতির মালা। দুর্গা মেয়েটি ওষুধের অভাবে মারা যায়। তখন তারা বাবা পাশে ছিলেন না। অপু আর দুর্গার মতো আমাদের দেশে আজও লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ে আছে। তারা এক আকাশ অভাব নিয়ে বড় হচ্ছে। অথচ তাদের দু'চোখ ভরা স্বপ্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথের পাঁচালী উপন্যাসটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
আমি গত এক সপ্তাহ ধরে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা শুরু করেছি। আমার জানার আগ্রহটা খুব বেশি। এজন্য আমি অনেক পরিশ্রম করতে রাজী আছি। বিভূতিভূষনের প্রথম উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'। তার বেশির ভাগ লেখায় থাকে গ্রাম, দারিদ্রতা, অভাব, আশা, পাওয়া না পাওয়া, স্বপ্ন, জীবনবোধ আর প্রকৃতি থাকবেই। বিভূতিভূষন সারাটা জীবন খুব সহজ সরল সাধারন ভাবে জীবন যাপন করেছেন। যারা গ্রামে থাকেন অথবা গ্রামে বড় হয়েছেন তারা পথের পাঁচালী মুভির প্রতিটা দৃশ্য দেখে নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে পারবেন। উপন্যাস অথবা সিনেমা দু'টোই আপনাকে মুগ্ধ করবে। সত্যজিৎ অসাধারন একজন মানুষ। তার তুলনা হয় না। সব শ্রেণি পেশা এবং বয়সের মানুষ এই মুভিটি দেখতে পারেন। আমি যদি সত্যজিৎ আর আমাদের হুমায়ূন আহমেদেকে একই মাপের মানুষ বলি- সেটা কি আমার ভুল হবে?
পথের পাঁচালী মুভির এই একটা দৃশ্য ইচ্ছা হলে দেখতে পারেন। আমার ধারনা আপনাদের ভালো লাগবে। পথের পাঁচালী মুভির তিন মিনিটের একটা দৃশ্য দেখুন প্রায় ৬৪ বছর আগে এই সিনেমাটি নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ। এই মুভি নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক ধারদেনা করতে হয়েছিল। স্ত্রী গহনা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। টাকার অভাবে এই সিনেমা নির্মাণ অনেকদিন বন্ধও ছিল। আমার প্রিয় পরিচালক সত্যজিৎ মোট ৩৬ টি ছবি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।
ও বলতে ভুলে গেছি, এই উপন্যাসে একজন খুনখুনে বুড়ি আছে নাম ইন্দিরা। এই চরিত্রটি অসাধারন। সিনেমাতে দারুন অভিনয় করেছেন। আমাদের দেশের অনেক অভিনয় শিল্পীর উচিত এই বুড়ির অভিনয় দেখে শিক্ষা নেওয়া। লেখক বিভূতিভূষন তার এই উপন্যাসে যেন বাংলার প্রতিটা গ্রামের দুঃখ-কষ্ট বাস্তব ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই লেখক আমাদের ভাষা আন্দোলনের আগেই ১৯৫০ সালে মৃত্যুবরন করেন।
আমার বিশ্বাস এযুগে এসেও কেউ এই মুভি দেখে বিরক্ত হবে না। বিভূতিভুষনের বাবা কবিরাজ ছিলেন। এটা তাদের বংশ গত পেশা। ১৯১৭ সাথে বিভূতি ভালোবেসে বিয়ে করেন গৌরিকে। বিয়ের এক বছর পর তার স্ত্রী গৌরি কলেরা রোগে মারা যান। তখন তিনি শিক্ষাকতা করতেন। স্কুলের একটি ফাঁকা ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিভূতি তখন প্ল্যানচেট করে স্ত্রীকে কাছে ডাকতে চেষ্টা করতেন। ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। শেষ বয়সে তিন আরেকটি বিয়ে করেন।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

