
আমি বুঝি না ইফতার সামগ্রীর এত দাম কেন? বংশালে আল রাজ্জাক হোটেলে গেলাম ইফতারী কিনতে। ভাবলাম পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো মন্দ খাই। সেখানে ইফতারীর খুব বেশি দাম রাখা হচ্ছে। খুব বেশি। একটা আস্তো মুরগীর দাম নিচ্ছে ৬৫০ টাকা। কিন্তু এই মুরগীর দাম হওয়ার কথা সর্বচ্চো ৩৫০ টাকা। বাজারে পাকিস্তানী একটা মূরগীর দাম- ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। খাসির এক পিছ লেগ পিচ এর দাম নিচ্ছে ১৪০০ টাকা। খাসির এই লেগ পিছ এর দাম সর্বচ্চো হতে পারে ৪০০ টাকা। হালিম এর দাম নিচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। হালিমে কি দেয় যে এত দাম? ৮০০ টাকা দিয়ে হালিম কিনে আনার পর দেখা যায় তাতে সর্বচ্চো ছোট ছোট ৫/৬ টুকরো হাড্ডি। এমন হাড্ডি যে খাওয়ার কিছু নেই। এই হালিমের দাম হতে পারে সর্বচ্চো ৩০০ টাকা। অথচ দাম নিচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। বোরহানি এক বোতল দাম নিচ্ছে ২০০ টাকা। অথচ এই বোরহানির সর্বচ্চো দাম ১০০ টাকা হওয়ার কথা। দইবড়া ২৫০ টাকা করে নিচ্ছে এক বাটি। অথচ এর দাম হওয়ার কথা ৬০ টাকা। পেস্তা সরবত, লাবাং সব কিছুর দাম প্রচুর বেশি। এত বেশি কেন? একটা জিনিসে ১০০ টাকা খরচ হলে, বিশ টাকা বা ত্রিশ টাকা বেশি নিতে পারে। খরচের ডবল তো নিতে পারে না! জিলাপী কেজি বেশির ভাগ দোকানেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। সোনার গা হোটেলে এক কেজি জিলাপীর দাম নিচ্ছে ২ হাজার টাকা!
স্টারে গেলাম সেখানেও প্রচুর দাম। আনন্দ বেকারিতে গেলাম সেখানেও একই রকম দাম। তিন গুন, চার গুন দাম বেশি। আমি ইফতারী না কিনে বাসায় চলে এলাম। আমার কথা হলো- দুই শ' টাকার জিনিশ কেন আমি ৬০০ টাকা দিয়ে কিনব? টাকা কি এত সস্তা? অবশ্যই তারা ব্যবসা করছে লাভের জন্য। কিন্তু তার জন্য তিন গুন দাম বেশি নিবে এটা কোন নিয়ম? দেখলাম, প্রতিটা ইফতার সাসগ্রীর এত দাম তবু এক শ্রেণির মানূষজন পাগল-ছাগলের মতো ইফতারী কিনছে। আমি হা করে তাকিয়ে দেখছি। নিজেকে বড্ড অসহায় বলে মনে হলো। পিয়াজুর মধ্যে পেয়াজ বা ডাল কিছুই নেই। বেশন দিয়ে পিয়াজু বানাচ্ছে। কেউ কেউ আটা দিয়ে পিয়াজু বানাচ্ছে। এই রোজার মধ্যে একদিন আমি এক দোকানে গিয়ে বললাম, আমাকে দশ টাকার ছোলা দেন। দোকানদার মুখের উপরে বলে দিল দশ টাকার ছোলা বিক্রি করি না। হালিম কিনতে গেলাম এক দোকানে ছোট্র একটা প্লাস্টিকের বাটিতে সামান্য হালিম দিলো। দাম নিলো ২০০ টাকা। বাসায় এসে দেখি, হালিমে একটুকরো মাংস নেই। আর খেতেও স্বাদ না। কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখেছি মানুষজন লম্বা লাইন ধরে হালিম কিনছে।
এই রোজার কোনো একদিন, আধা ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে একটা গ্রীল চিকেন কিনলাম ৩৬০ টাকা দিয়ে। বাসায় আসার পর কেউ একটূকরো মুখে দিতে পারনি। মূরগীটা ভালো করে পোড়ায় নি। কাচা কাচা, ভিতরের মাংস পুরো সাদা হয়ে আছে। কোনো মশলা নেই। চারপাশ দেখে শুনে বুঝলাম, বেশির ভাগ মানুষজন আর মানুষ নেই। পুরা অমানুষ হয়ে গেছে। এদিকে আবার কেউ কেউ ভ্যাট নিচ্ছে। ৪০০ টাকার হালিম নিলে ৯০ টাকা ভ্যাট নিচ্ছে। আচ্ছা, এই ৯০ টাকা কি সরকার পায়? একটা ডাবের দাম নিচ্ছে ৬০/৭০ টাকা। রেস্টুরেন্ট গুলোতে ইফতারীর সেট মেন্যু করে রেখেছে। ৫/৭ আইটেম দিয়ে দাম নিচ্ছে ৭৯৯ টাকা থেকে ৯৯৯ টাকা। সেট মেন্যু গুলোতে থাকে- একটা পিয়াজু, একটা আলুর চপ, একটা বেগুনী। দুই পিছ খেজুর, একটা ছোট পানির বোতল, একটা জিলাপী, এক টুকরো ফার্মের মূরগী ফ্রাই, চা চামুচের এক চামুচ ছোলা, পানিতে দিয়ে বানানো জুস, এক পিছ টিস্যু (ইফতার খেয়ে হাত মুছার জন্য)। এই সেট মেন্যুর সর্বচ্চো দাম হতে পারে ২০০ টাকা। কিন্তু দাম নিচ্ছে চার গুন বেশি। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো চার গুন বেশি দিয়েই অনেক মানুষ কিনছে। এবং আপনি গেলে দেখবেন বসার জন্য জায়গা পাবেন না। অনেক রেস্টুরেন্টে আগের দিন বুকিং দিয়ে রাখতে হবে। ওরা কারা যারা পাগলের মতো ইফতার কিনে তিন গুন দাম দিয়ে? আমার পক্ষে তো সম্ভব না।
অবশেষে আমি ইফতারীর বেশ কয়েকটা দোকান ঘুরে এসে খালি হাতে বাসায় ফিরলাম। আমার অসৎ পথের টাকা না যে এক শ' টাকার জিনিস পাচ শ' টাকা দিয়ে কিনব। প্রচুর পরিশ্রম করি। মাস শেষে যা পাই খুব হিসাব করে চলতে হয়। সুরভিকে বললাম, তেহারি রান্না করো বাসার সবার জন্য। দুই চুলায় রান্না বসিয়ে দাও। বাসায় রান্না হলো তারপর সবাই মিলে মজা করে খেলাম। খাওয়া শেষে আইসক্রীম। আহ! আপনারা কি আমাকে কৃপণ ভাবছেন? আমি মোটেও কৃপণ না। প্রচুর খরচ করি। কিন্তু এলোমেলো খরচ করি না। আমি আজ পারতাম দুই হাত ভর্তি করে ইফতার কিনতে। কিন্তু কেন কিনব? ওরা যদি দামটা সঠিক রাখতো তাহলে কিনতাম। পাঁচ- সাত হাজার টাকার ইফতারি কেনার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু অপচয় করার মানসিকতা আমার নেই।
(আজ লিখতে চেয়েছিলাম, আমার মেয়ের কথা। আজ তার জন্মদিন। কিন্তু লিখলাম এই লেখা। আগামীকাল মেয়েকে নিয়ে লিখব।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

