
সাইয়ূম।
কেমন আছেন সবাই? রোজা তো শেষের দিকে। ঈদে আপনাদের প্লান প্রোগাম কি? হয়তো ভাবছেন সাইয়ূম কি? আগে সাইয়ূম ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে নিই। আমার ছোট ভাইয়ের ছেলে 'আরিশ' আসসালামুয়ালাইকুম বলতে পারে না। সে বলে সাইয়ূম। সাইয়ূম মানে আসসালামুলাইকুম। বাসায় কোনো অতিথি এলেই আরিশ দৌড়ে গিয়ে বলবে- সাইয়ূম।
বেশ কিছু দিন ধরে প্রচুর ব্লগ পড়ছি। প্রচুর মন্তব্যও করছি। পোষ্ট পড়েই মন্তব্য করছি। মন্তব্য গুলো শ্রদ্ধেয় 'চাঁদগাজী'র মতোন করতে গিয়ে অনেকেই ভাবছেন পোষ্ট না পড়েই মন্তব্য করছি। পোষ্ট পড়ে-পড়ে আমি অন্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিচ্ছি। ব্লগে যতক্ষন সময় দেই তাতে আমার মনে হয় না, আমি সময়ের অপচয় করছি। এখন আমি শুধু লেখা পড়েই বলে দিতে পারবো কোন ব্লগার লিখেছেন। যাই হোক, এখন আমি আমার মূল লেখায় ফিরে যাই।
অনেক বছর আগে কথা, ঘরবাড়ি, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সব ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিলাম। উত্তর বঙ্গের এক অজপাড়া গায়ে চলে গিয়েছিলাম। মাটির রাস্তা, বিদ্যুৎ নেই। গ্রামের নাম ছিল রসুলপুর। রসুল পুর গ্রামের সবাই গরীব। একটাও পাকা বাড়ি নেই। গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়িও টিনের। অনেক বাড়িতে চাপকলও নেই। একটা প্রাইমারী স্কুল আছে। সেই স্কুলের অবস্থাও ভালো না। টিনের চাল এক ঝড়ের রাতে উড়ে গেছে। গত দু'বছরেও সেটা ঠিক করা হয়নি।
ঢাকা শহর খুব অসহ্য লাগছিল। কাউকেই সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই কাউকে কিচ্ছু না বলে রসুলপুরে চলে গেলাম। আমাদের বাসায় অনেক আগে এক বুয়া কাজ করতেন। তার নাম রহিমা। আমি তাকে রহিমা খালা বলে ডাকতাম। উনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তার গ্রামের বাড়ি রসুলপুর। তার কাছে অসংখ্য গল্প শুনেছি রসুলপুর গ্রামের। তাই কোনো কিছু বিচার বিবেচনা না করেই রসুলপুর চলে গেলাম। তখন মোবাইলের এত প্রচার প্রসার ছিল না। রসুলপুর গিয়ে রহিমা খালার বাড়ি খুজে বের করতে আমার মোটেও বেগ পেতে হয়নি।
রহিমা খালা আমাকে দেখে প্রচন্ড অবাক। কি করবেন, কোথায় রাখবেন, কোথায় বসতে দিবেন এই ভাবনায় তিনি অস্থির। আমি বললাম, খালা কিছুদিন আপনার বাসায় থাকবো। খালা বললেন, অবশ্যই। এদিকে খালার আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। সবচেয়ে বেশি খারাপ তার ঘরের অবস্থা। ফ্লোর মাটির। ছাদ হলো ছনের। আর দেয়াল হলো টিনের। সেই টিন অনেক জায়গা দিয়ে ফুটা। ফুটা অংশ ফুলো খবরের কাগজ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে। টয়লেটের কথা না-ই বললাম। আচ্ছা বলেই দেই, বাঁশ দিয়ে বানানো আর ছালা দিয়ে ঘেরা। আমি দুই সপ্তাহ রসুলপুর ছিলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কেটেছে সেই রসুলপুর গ্রামে। খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গত। গ্রামের সকাল খুব সুন্দর হয়। কৃষকদের সাথে জমিতে নেমে যেতাম। সারাদিন কৃষকদের সাথে পাল্লা দিয়ে জমিতে কাজ করেছি। দুপুরে রহিমা খালা গামলায় করে মোটা চালের ভাত পাঠাতেন। সাথে থাকতো আলু ভর্তা, মাসকালাইয়ের ডাল। অবশ্য খালা আমার জন্য একটা ডিম বাজি করে দিতেন। গাছের নিচে বসে খেয়েছি। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরেছি। গরুর দুধ দুয়েছি। স্কুলে বাচ্চাদের পড়িয়েছি। ছবি আঁকা শিখিয়েছি। মাত্র দুই সপ্তাহে পুরো গ্রামের মানুষকে আমি আপন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলাম।
ইদানিং আমার মন মেজাজ আবার বিক্ষিপ্ত হয়েছে। ঘর সংসার, চাকরি বাকরি, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব কিছুই ভালো লাগছে না। ইচ্ছা করছে রসুলপুরের মতোন কোনো গ্রামে চলে যাই। কিন্তু বঊ আর বাচ্চার জন্য বাঁধা পড়ে যাচ্ছি। একদিন সুরভিকে সাহস করে বলেই ফেললাম। আমি কিছু দিনের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে চাচ্ছি। তোমরা সুন্দরভাবে থাকো। তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে। আমি দুই মাসের বাজার একসাথে করে দিয়ে যাবো। যাবতীয় সব খরচ দিয়ে যাচ্ছি। আমাকে যেতে দাও। আমি না বলেও চলে যেতে পারতাম। কিন্তু বলে যাওয়াটাই শোভন। তাছাড়া আমি পালিয়ে যাচ্ছি না, কিছুদিন পর ফিরে আসবো। এই কথা শুনেই সুরভি কান্নাকাটি করে অস্থির। চিৎকার চেচামেচি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুললো। আর আমি তো চোখের পানি সহ্য করতে পারি না। বললাম, ঠিক আছে যাবো না। কান্নাকাটি বন্ধ করো। আমি তোমাদের খুব ভালোবাসি, তাতো জানো।
কিন্তু আমার মন পড়ে আছে মাটির রাস্তায়। ধুলো উড়িয়ে সারা বিকাল মাটির রাস্তায় হেঁটে বেড়াবো। মাইলের পর মাইল ধানী জমি। সেই জমিতে কৃষকের সাথে সারাদিন পাল্লা দিয়ে কাজ করবো। বিশাল পুকুর। পুকুরে দাপাদাপি করে গোছল করবো। জাল ফেলে পাঁচ মিশালী মাছ ধরবো। আকাশ ছোয়া বিশাল বিশাল গাছ। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখবো। স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের গল্প শোনাবো। বিকেলে স্কুল মাঠে বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলব। রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে সবাই মিলে উঠোনে খেতে বসবো। পাশেই থাকবে বিড়াল। সে একটু পরপর মিউ মিউ করে তার উপস্থিতি জানান দিবে। তাকে মাছের কাটা খেতে দিব। হারিকেনের আলোয় ঘুম না আসা পর্যন্ত বই পড়বো। খুব ভোরে মাটির পথ দিয়ে হেঁটে যাবো রসুলপুর বাজারে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১৮ রাত ১১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




