
ঢাকা শহরটা বড় অদ্ভুত।
ভর দুপুরবেলা আমি মিরপুর স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হাতে কোনো কাজ নেই। কি করবো, কোথায় যাবো- কিছুই পূর্বনির্ধারিত নয়। গলা শুকিয়ে কাঠ। মাথার উপরে গনগনে সূর্য। চলছে আষাঢ় মাস। অথচ সূর্যের তাপ দেখে মনে হচ্ছে গ্রীস্ম কাল। একলোক ফুটপাতের সামনে দাঁড়িয়ে গেন্ডারির রস বিক্রি করছে। খাবো কিনা বুঝতে পারছি না। ঠিক এই সময় দেখতে পেলাম এক মেয়ে রিকশায় করে আমার দিকেই আসছে। মেয়েটির চোখে মুখে দিশেহারা ভাব। রিকশাওয়ালা আমার সামনে রিকশা থামিয়ে মেয়েটিকে ধমকের সুরে বলল, নামেন রিকশা থিক্কা। যত্তসব! আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম। মায়াময় একটি মুখ। কি সুন্দর করেই না চোখে কাজল দিয়েছে! হালকা নীলের মধ্যে সাদা সাদা ফুল আঁকা শাড়ি খুব সুন্দর করে পড়েছে। শাড়ির কুচি গুলোর ভাঁজ সমান। কোনো হৃদয়বান মানুষের পক্ষে একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করা সম্ভব না। শুধু মাত্র রিকশাওয়ালাদের পক্ষেই সম্ভব।
রিকশাওয়ালা নালিশের ভঙ্গিতে আমাকে বলছে, এই মাইয়া তিন ঘন্টা ধরে আমার রিকশায় করে ঘুরছে। কোথায় যাবে ঠিক করে কিছুই বলছে না। আমি বুড়া রিকশাওয়ালাকে বললাম, শান্ত হোন। আর একটা কথা বলবেন না। আমি দেখছি ব্যাপারটা। মেয়েটিকে দেখেই আমি বুঝতে পারছি, মেয়েটির কাছে টাকা নেই। আমি রিকশাওয়ালাকে বললাম, আপনার কত টাকা? রিকশাওয়ালা বলল, টাকা তো অনেক, আপনে পাঁচ শ' টাকা দিলেই হবে। আমি ম্যানিব্যাগ খুলে একটা পাঁচ শ' টাকার নোট দিয়ে দিলাম। রিকশাওয়ালা চলে গেল। মেয়েটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আর একটু পরপর শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছছে। কোনো মেয়ের চোখের পানি আমি সহ্য করতে পারি না। আমি মেয়েটিকে বললাম, কাঁদবেন না। মনে হয় আপনি সকাল থেকে না খেয়ে আছেন। চলুন আপনাকে আগে কিছু খাইয়ে নিই। আমারও অনেক ক্ষুধা পেয়েছে।
সালমান বিরানী হাউজ নামে আমরা একটা বিরানীর দোকানে বসলাম। আমাদের অনেক ক্ষুধা লেগেছিল। দুইজন মিলে দুই প্লেট কাচ্ছি, দুই প্লেট তেহারি উড়িয়ে দিলাম। সাথে ফানটা তো আছেই। এত ভালো রান্না মনে হয় অনেকদিন খাইনি। মাংস গুলোও খুব নরম। মুখে দিলেই যেন গলে যাচ্ছিল। আমাদের দু'জনের মুখেই এখন প্রশান্তির ছায়া। পেটে ভরা থাকলে আপনাতেই এমন প্রশান্তির ভাব ফুটে উঠে। আমরা সালমান বিরানী হাউজ থেকে বের হলাম। আমি একটা সিগারেট ঠোটে দিয়ে মেয়েটিকে বললাম, কোথায় যাবেন বলুন, আমি আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসি। মেয়েটি বলল, আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। যে হোস্টেলে থাকতাম সে হোস্টেল থেকে পালিয়ে এসেছি। সেখানে তিন মাসের ভাড়া বাকি। আজ বিকেলের মধ্যে ভাড়া দেওয়ার কথা। হোস্টেলে থাকার আগে ছোট মামার বাসায় থাকতাম। কিন্তু মামীর জ্বালা যন্ত্রনায় সেখানে থাকা সম্ভব হয়নি। মামী এক বুড়োর সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমি মেয়েটিকে বললাম, আপনার হোস্টেলের তিন মাসের ভাড়া আমি দিয়ে দিচ্ছি। আপনি হোস্টেলে ফিরে যান। মেয়েটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, তার বিনিময়ে কি আমাকে আপনার সাথে বিছানায় যেতে হবে?
মেয়েটির কথা শুনে আমার প্রচন্ড রাগ করার কথা কিন্তু আমি হেসে দিলাম। মেয়েটি আমার হাসি দেখে বেশ বিভ্রান্ত হলো। কারণ আমার হাসি অনেক সুন্দর। এক জীবনে অসংখ্যবার শুনেছি আমার হাসি সুন্দর। আমি নিশ্চিন্ত মেয়েটি আমার হাসি দেখেই বুঝেছে আমি দুষ্টলোক নই। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। মেঘের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছি কি করবো? মেয়েটি একা ফেলে রেখে উলটো দিকে হাঁটা শুরু করবো? নাকি মেয়েটিকে সঙ্গে করে আমার বাসায় নিয়ে যাবো? দুইজন মিলে বেলকনিতে বসে গল্প করবো। চা খাবো। মেয়েটাই চা বানাবে। মেয়েটা কি ভালো চা বানাতে পারবে? মেয়েটা যদি গান জানে তাহলে বলল, দুই লাইন রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে শুনাও। আচ্ছা, এই মেয়েটিকে যদি বিয়ে করে ফেলি তাহলে কেমন হয়? মেয়েটা কি রান্নাবান্না জানে কিছু? মেয়েটার পেটে যে শিশু জন্ম নিবে, সেই শিশুটি কি মেয়েটার মতোন সুন্দর হবে? মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম।
হঠাৎ দেখি মেয়েটা আমার পাশে নেই। মনটা খুব খারাপ হলো। মেয়েটা আমাকে না বলেই চলে গেল! মনে মনে ভাবছি মানুষ এমন কেন? ভালোবাসা বুঝে না, আন্তরিকতা বুঝে না। আকাশ পুরোপুরি কালো হয়ে গেছে। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামবে। আজ আমি বৃষ্টিতে ভিজব। ভিজে ভিজেই বাসায় ফিরব। আজ আমার মন ভালো নেই। মন ভালো নেই। মন ভালো নেই। এই যে শুনুন! মনে হলো কে যেন আমাকে পেছন থেকে ডাকছে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি মেয়েটি। মেয়েটি যায়নি! তাহলে এতক্ষন কোথায় ছিল? মেয়েটি বলল, বিরানীর দোকানে আমার ব্যাগটা ভুলে রেখে আসছিলাম। সেটাই নিয়ে আসলাম। আমার খুব আনন্দ লাগছে। ইচ্ছা করছে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরি। অনেক ইচ্ছা আমাদের পূরন হবার নয়। তবু বুকের মধ্যে অনেক গোপন ইচ্ছে জাগে। মেয়েটি আমার পাশে তাই নিজেকে এখন রোমের সম্রাট বলে মনে হচ্ছে।
ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে আজ ঢাকা শহর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
এই বৃষ্টির মধ্যেই হুড খোলা রিকশা চলছে বেনারসি পল্লীর সামনের রাস্তা দিয়ে। শাহেদ ও নীলা পাশাপাশি বসা। তারা দুইজন'ই ইচ্ছে করে ভিজছে। নীলা বলল, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছি। শাহেদ শুনলো- আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। শাহেদ মনে মনে বলল, এই ভালোবাসার আমি কোনোদিন অমর্যাদা করবো না। নো, নেভার। শাহেদ গভীর ভালোবাসা নিয়ে বলল, নীলা আমি কি তোমার হাত টা ধরতে পারি? নীলা তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। স্বচ্ছ পবিত্র ভালোবাসার স্পর্শে তাদের জীবন অবশ্যই মঙ্গলময় হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০১৮ সকাল ১০:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




